খনাজন্ম – মল্লিকা সেনগুপ্ত।

মঙ্গলে ঊষা বুধে পা
যথা ইচ্ছা তথা যা

নারী হয়েও জ্যোতিষী
রাগ করলেন পতিশ্রী

নবরত্ন সভার ধন
বরাহ আর মিহির কন–

নারী যদি ঘরেই শেষ
ধন্য রাজার পুণ্য দেশ

ঘরের আব্রু বাঁচাতে
খনায় রাখি খাঁচাতে

খাঁচা যদি ভাঙতে চাও
ইষ্টনামের গান গাও

যেই গিয়েছে রাজসভা
কেটে নিলাম পাপ জিহ্বা।

যে মেয়েদের বাড়বে বাড়
তাদের হবে হবেই ঝাড়

কী সুন্দর একটা দেশে
বড় হচ্ছিলাম
সমুদ্রটা সবুজ আর
আকাশনীল গ্রাম

তুঙ্গে ছিল বৃহস্পতি
আকাশ হাতের তালু
রাহু এবং কেতুর ভয়ে
চাঁদ সেখানে ঢালু

চাঁদের আলোয় তার সঙ্গে
প্রথম শিহরণ
জলে ভাসান বাংলা ছেলে
মিহির তনুমন

আয়ুর রেখা গুনতে তার
ভুল করেছে পিতা
আসলে তার পরমায়ু
একশো পারমিতা

পুতুল পেয়ে সেই আমার
পুতুল খেলা এল
কখন যেন পুতুল ক্রমে
প্রেমিক হয়ে গেল

না হয় সে বয়সে ছোট
না হয় আমি বড়
তাই বলে কি ভালবাসা
আটকে থাকে, বলো!

ভালবাসার মিহির ক্রমে
জ্যোতিষ শিখে নিল
গুরুমশাই বুড়ো হলেন
মিহির যুবক ছিল

সিংহলের মায়ার টান
কাটাতে চায় সে
মন পড়েছে মাটির টানে
বাংলাদেশের ঘাসে

বাংলাদেশ এলাম, তার
বাপপিতেমোর ঠাঁই
অনেক জল ঘোলার শেষে
সংসারে পাক খাই

পুঁথি আমার উঠল ভরে
রচনা এবং শ্লোকে
চাষাভুষার বাংলাদেশে
বচন পড়ে লোকে

বাতাস সেই বচন নিয়ে
গেল রাজার কাছে
স্বামী শ্বশুর সিঁটিয়ে থাকে
রাজা বকেন পাছে

মেয়েমানুষ বচন লেখে
জ্যোতিষ গোনে ভালো!
ওকে আমার সামনে আনো
মুখে ফেলব আলো

রাজার কথা শুনে মিহির
বড়ই চমকান
কী করে ওই গুহ্যকথা
হল পঞ্চকান!

বউটা বড় বেহায়া তোর
মিহির শুনে রাখ
জ্যান্ত আগুন ঘরের মাঝে
এখনি ওকে ঢাক

কোন বাদারে কী শিখেছে
জানে না সহবত
বাংলাবধূর মুখ কি দেখে
সভার পঞ্চঘট!

বরাহ বড় ক্রুদ্ধ হন
রাজ জ্যোতিষী তিনি
তাঁরই ঘরের আব্রু নিয়ে
এমন ছিনিমিনি!

বলেন, শোনো বউমা তুমি
রাজাকে বলে দাও
জ্যোতিষ কিছু জানো না শুধু
প্রবাদ আওড়াও

আর না যেন দেখি তোমায়
জ্যোতিষ চর্চাতে
এখন থেকে তোমার কাজ
বেগুন আলু ভাতে

ওগো বঙ্গদেশ আমি
তোমার বাহুতে মাথা রেখে
আশ্রয় খুঁজেছি এতদিন

কেন যে আমাকে শুধু
ঘোমটায় ঢেকে রাখো
বুঝতে পারি না আজও

সিংহলসূর্যের নিচে
হেঁটে বেড়াতাম আমি
শিরদাঁড়া সোজা রেখে

সে দেশের ঘাসমাটি
সমুদ্র মানুষ কেউ
মেয়ে বলে হেলা করত না

এই সভ্য বঙ্গদেশে
নারীর মুখশ্রী বড় পরাধীন
ঠুনকো, ভঙ্গুর, বড় অসহায়

আমার মুখের বুলি
আমার কলম কালি
ছিঁড়ে নিতে চায় বঙ্গদেশ

মেয়েরা জ্যোতিষী নয়
মেয়েরা বচন বলবে না।
কে বলেছে এসব নিয়ম!

আমার ভেতরে যদি
আগুন জাগ্রত থাকে
কতদিন ছাইচাপা দেবে!

আমি যে লিখতে চাই
আমি যে বলতে চাই
আমারও মুখের ভাষা আছে

সেকথা বোঝার মতো
মন নেই তোমাদের
বঙ্গদেশ, বরাহ মিহির

যে ছেলে আমার জন্য
বেঁচে ফিরে এল তার ঘরে
যে পিতা ছেলেকে ফিরে পেল

তারা আজ আমাকেই
একঘরে কোণঠাসা করে
হেঁশেলে বন্দি করে রাখে!

রাজা যদি গুণীজনে
সমাদর করে, সে সম্মান
আমারও মাথায় পড়ে যদি

তোমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে
যদি সে সম্মান নিতে পারি
ক্ষতি কি মিহির তাতে!

ক্ষতি হল বড় ভয়ানক
ক্ষতি ছিল বড় ভয়ানক

জিভ সামলাতে পারিনি
জিভ আগলাতে পারিনি

খোলা মাঠে একা অসহায়
দাঁড়িয়েছে মোর জিহ্বা

তলোয়ার খোলা জল্লাদ
ছুটে এল ওকে মারতে

চিৎকার করে বললাম
মারতে তো মারো আমাকে

আমি মরে যাব লহমায়
বেঁচে থাক শুধু জিহ্বা

সুবচনী এই মেয়েকে
দুর্মুখ করে তুলো না

বেঁচে থাক তুমি বরাহ
বেঁচে থাক ন্যায়দ-

মেয়েদের কথা বলবার
অধিকার কেড়ে নিও না

জল্লাদ তবু থামে না
ভয়ানক এক আঘাতে

কেটে নিল আলজিভটা
খনা মরে গেল তখনই

আমাদের নারীজিহ্বা
মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে

মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে
আমাদের নারীজিহ্বা…

আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে
মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে…

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মল্লিকা সেনগুপ্ত।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x