কবিতার খাতা
- 46 mins
খনাজন্ম – মল্লিকা সেনগুপ্ত।
মঙ্গলে ঊষা বুধে পা
যথা ইচ্ছা তথা যা
নারী হয়েও জ্যোতিষী
রাগ করলেন পতিশ্রী
নবরত্ন সভার ধন
বরাহ আর মিহির কন–
নারী যদি ঘরেই শেষ
ধন্য রাজার পুণ্য দেশ
ঘরের আব্রু বাঁচাতে
খনায় রাখি খাঁচাতে
খাঁচা যদি ভাঙতে চাও
ইষ্টনামের গান গাও
যেই গিয়েছে রাজসভা
কেটে নিলাম পাপ জিহ্বা।
যে মেয়েদের বাড়বে বাড়
তাদের হবে হবেই ঝাড়
কী সুন্দর একটা দেশে
বড় হচ্ছিলাম
সমুদ্রটা সবুজ আর
আকাশনীল গ্রাম
তুঙ্গে ছিল বৃহস্পতি
আকাশ হাতের তালু
রাহু এবং কেতুর ভয়ে
চাঁদ সেখানে ঢালু
চাঁদের আলোয় তার সঙ্গে
প্রথম শিহরণ
জলে ভাসান বাংলা ছেলে
মিহির তনুমন
আয়ুর রেখা গুনতে তার
ভুল করেছে পিতা
আসলে তার পরমায়ু
একশো পারমিতা
পুতুল পেয়ে সেই আমার
পুতুল খেলা এল
কখন যেন পুতুল ক্রমে
প্রেমিক হয়ে গেল
না হয় সে বয়সে ছোট
না হয় আমি বড়
তাই বলে কি ভালবাসা
আটকে থাকে, বলো!
ভালবাসার মিহির ক্রমে
জ্যোতিষ শিখে নিল
গুরুমশাই বুড়ো হলেন
মিহির যুবক ছিল
সিংহলের মায়ার টান
কাটাতে চায় সে
মন পড়েছে মাটির টানে
বাংলাদেশের ঘাসে
বাংলাদেশ এলাম, তার
বাপপিতেমোর ঠাঁই
অনেক জল ঘোলার শেষে
সংসারে পাক খাই
পুঁথি আমার উঠল ভরে
রচনা এবং শ্লোকে
চাষাভুষার বাংলাদেশে
বচন পড়ে লোকে
বাতাস সেই বচন নিয়ে
গেল রাজার কাছে
স্বামী শ্বশুর সিঁটিয়ে থাকে
রাজা বকেন পাছে
মেয়েমানুষ বচন লেখে
জ্যোতিষ গোনে ভালো!
ওকে আমার সামনে আনো
মুখে ফেলব আলো
রাজার কথা শুনে মিহির
বড়ই চমকান
কী করে ওই গুহ্যকথা
হল পঞ্চকান!
বউটা বড় বেহায়া তোর
মিহির শুনে রাখ
জ্যান্ত আগুন ঘরের মাঝে
এখনি ওকে ঢাক
কোন বাদারে কী শিখেছে
জানে না সহবত
বাংলাবধূর মুখ কি দেখে
সভার পঞ্চঘট!
বরাহ বড় ক্রুদ্ধ হন
রাজ জ্যোতিষী তিনি
তাঁরই ঘরের আব্রু নিয়ে
এমন ছিনিমিনি!
বলেন, শোনো বউমা তুমি
রাজাকে বলে দাও
জ্যোতিষ কিছু জানো না শুধু
প্রবাদ আওড়াও
আর না যেন দেখি তোমায়
জ্যোতিষ চর্চাতে
এখন থেকে তোমার কাজ
বেগুন আলু ভাতে
ওগো বঙ্গদেশ আমি
তোমার বাহুতে মাথা রেখে
আশ্রয় খুঁজেছি এতদিন
কেন যে আমাকে শুধু
ঘোমটায় ঢেকে রাখো
বুঝতে পারি না আজও
সিংহলসূর্যের নিচে
হেঁটে বেড়াতাম আমি
শিরদাঁড়া সোজা রেখে
সে দেশের ঘাসমাটি
সমুদ্র মানুষ কেউ
মেয়ে বলে হেলা করত না
এই সভ্য বঙ্গদেশে
নারীর মুখশ্রী বড় পরাধীন
ঠুনকো, ভঙ্গুর, বড় অসহায়
আমার মুখের বুলি
আমার কলম কালি
ছিঁড়ে নিতে চায় বঙ্গদেশ
মেয়েরা জ্যোতিষী নয়
মেয়েরা বচন বলবে না।
কে বলেছে এসব নিয়ম!
আমার ভেতরে যদি
আগুন জাগ্রত থাকে
কতদিন ছাইচাপা দেবে!
আমি যে লিখতে চাই
আমি যে বলতে চাই
আমারও মুখের ভাষা আছে
সেকথা বোঝার মতো
মন নেই তোমাদের
বঙ্গদেশ, বরাহ মিহির
যে ছেলে আমার জন্য
বেঁচে ফিরে এল তার ঘরে
যে পিতা ছেলেকে ফিরে পেল
তারা আজ আমাকেই
একঘরে কোণঠাসা করে
হেঁশেলে বন্দি করে রাখে!
রাজা যদি গুণীজনে
সমাদর করে, সে সম্মান
আমারও মাথায় পড়ে যদি
তোমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে
যদি সে সম্মান নিতে পারি
ক্ষতি কি মিহির তাতে!
ক্ষতি হল বড় ভয়ানক
ক্ষতি ছিল বড় ভয়ানক
জিভ সামলাতে পারিনি
জিভ আগলাতে পারিনি
খোলা মাঠে একা অসহায়
দাঁড়িয়েছে মোর জিহ্বা
তলোয়ার খোলা জল্লাদ
ছুটে এল ওকে মারতে
চিৎকার করে বললাম
মারতে তো মারো আমাকে
আমি মরে যাব লহমায়
বেঁচে থাক শুধু জিহ্বা
সুবচনী এই মেয়েকে
দুর্মুখ করে তুলো না
বেঁচে থাক তুমি বরাহ
বেঁচে থাক ন্যায়দ-
মেয়েদের কথা বলবার
অধিকার কেড়ে নিও না
জল্লাদ তবু থামে না
ভয়ানক এক আঘাতে
কেটে নিল আলজিভটা
খনা মরে গেল তখনই
আমাদের নারীজিহ্বা
মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে
মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে
আমাদের নারীজিহ্বা…
আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে
মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে…
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মল্লিকা সেনগুপ্ত।
খনাজন্ম – মল্লিকা সেনগুপ্ত | খনাজন্ম কবিতা মল্লিকা সেনগুপ্ত | মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | নারীবাদী কবিতা | খনা ও মিহিরের কাহিনী | নারী-জিহ্বার কবিতা
খনাজন্ম: মল্লিকা সেনগুপ্তের নারী-জিহ্বা, বিদ্রোহ ও নীরব কান্নার অসাধারণ কাব্যভাষা
মল্লিকা সেনগুপ্তের “খনাজন্ম” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও শক্তিশালী নারীবাদী কবিতা। “মঙ্গলে ঊষা বুধে পা / যথা ইচ্ছা তথা যা / নারী হয়েও জ্যোতিষী / রাগ করলেন পতিশ্রী” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে প্রাচীন ভারতের নারী জ্যোতিষী খনার কিংবদন্তি, তাঁর বিদ্যা, প্রতিভা, পিতৃপুরুষের রোষ, ভাষার দণ্ড, এবং নারী-জিহ্বার চিরন্তন কান্নার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। মল্লিকা সেনগুপ্ত (জন্ম: ১৯৬৫) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় নারীবাদ, ইতিহাস, পৌরাণিক পুনর্লিখন, এবং নারীর শরীর ও ভাষার রাজনীতি গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। “খনাজন্ম” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি খনার কিংবদন্তি পুনর্বিবৃত্তি করেছেন, দেখিয়েছেন কীভাবে একজন বিদুষী নারীকে তাঁর জ্ঞানের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে তাঁর জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়েছিল, এবং কীভাবে সেই নারী-জিহ্বা আজও মাঠে পড়ে কাঁদছে।
মল্লিকা সেনগুপ্ত: ইতিহাস, নারী ও ভাষার কবি
মল্লিকা সেনগুপ্ত ১৯৬৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য আলাদা স্থান তৈরি করেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘খনাজন্ম’ (১৯৯৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০০৫), ‘মেয়েদের ইতিহাস’ (২০১০), ‘আমার কবিতা’ (২০১৫) ইত্যাদি। তিনি ছোটগল্প ও প্রবন্ধও লিখেছেন।
মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ইতিহাস ও পুরাণের নারীবাদী পুনর্লিখন, নারীর শরীর ও ভাষার রাজনীতি, এবং নীরব কণ্ঠস্বরকে ভাষা দেওয়ার প্রয়াস। ‘খনাজন্ম’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
খনাজন্ম: ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক পটভূমি
কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘খনা’ — প্রাচীন ভারতের একজন বিখ্যাত নারী জ্যোতিষী। কিংবদন্তি অনুসারে, তিনি ছিলেন জ্যোতিষী বরাহমিহিরের পুত্রবধূ, মিহিরের স্ত্রী। তাঁর জ্যোতিষ বিদ্যা ছিল অসামান্য। কিন্তু একজন নারী হয়ে জ্যোতিষ চর্চা করায়, পিতৃপুরুষের ক্রোধের শিকার হন। তাঁর জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়েছিল — যাতে তিনি আর জ্যোতিষ বচন বলতে না পারেন। তাঁর বচনগুলি ‘খনার বচন’ নামে পরিচিত, যা বাংলার কৃষিজীবী সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত।
মল্লিকা সেনগুপ্ত এই কিংবদন্তিকে পুনর্বিবৃত্তি করেছেন — খনার জন্ম থেকে শুরু করে তাঁর বিদ্যা, পতিশ্রীর রাগ, রাজসভার বিচার, জিহ্বা কর্তন, এবং শেষে নারী-জিহ্বার চিরন্তন কান্না। কবিতাটি বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক — নারীর জ্ঞান, নারীর ভাষা, নারীর অধিকার আজও কতটা সীমিত, কতটা শাসিত।
খনাজন্ম: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: নারী জ্যোতিষীর জন্ম ও পতিশ্রীর রাগ
“মঙ্গলে ঊষা বুধে পা / যথা ইচ্ছা তথা যা / নারী হয়েও জ্যোতিষী / রাগ করলেন পতিশ্রী”
প্রথম স্তবকে খনার জন্ম ও পতিশ্রীর রাগের কথা বলা হয়েছে। ‘মঙ্গলে ঊষা বুধে পা’ — জ্যোতিষের ভাষায় গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান। ‘যথা ইচ্ছা তথা যা’ — যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাও। ‘নারী হয়েও জ্যোতিষী / রাগ করলেন পতিশ্রী’ — নারী হয়েও জ্যোতিষী হওয়ায় পতিশ্রী (স্বামী মিহির) রাগ করলেন।
দ্বিতীয় স্তবক: নবরত্ন সভা ও নারীর ঘর
“নবরত্ন সভার ধন / বরাহ আর মিহির কন– / নারী যদি ঘরেই শেষ / ধন্য রাজার পুণ্য দেশ”
দ্বিতীয় স্তবকে রাজসভা ও নারীর স্থানের কথা বলা হয়েছে। ‘নবরত্ন সভার ধন / বরাহ আর মিহির কন’ — রাজার নবরত্ন সভার ধন বরাহ (বরাহমিহির) ও মিহির। ‘নারী যদি ঘরেই শেষ / ধন্য রাজার পুণ্য দেশ’ — নারী যদি ঘরেই শেষ হয়, তবে রাজার পুণ্য দেশ ধন্য। এটি বিদ্রূপাত্মক — নারীকে ঘরে সীমাবদ্ধ রাখাই রাজার পুণ্য।
তৃতীয় স্তবক: ঘরের আব্রু ও খাঁচা
“ঘরের আব্রু বাঁচাতে / খনায় রাখি খাঁচাতে / খাঁচা যদি ভাঙতে চাও / ইষ্টনামের গান গাও”
তৃতীয় স্তবকে ঘরের আব্রু ও খাঁচার কথা বলা হয়েছে। ‘ঘরের আব্রু বাঁচাতে / খনায় রাখি খাঁচাতে’ — ঘরের আব্রু (সম্মান) বাঁচাতে খনাকে খাঁচায় রাখা হয়েছে। ‘খাঁচা যদি ভাঙতে চাও / ইষ্টনামের গান গাও’ — খাঁচা ভাঙতে চাইলে ইষ্টনামের (ঈশ্বরের নাম) গান গাও।
চতুর্থ স্তবক: রাজসভা ও পাপ জিহ্বা
“যেই গিয়েছে রাজসভা / কেটে নিলাম পাপ জিহ্বা।”
চতুর্থ স্তবকে রাজসভার রায়ের কথা বলা হয়েছে। ‘যেই গিয়েছে রাজসভা / কেটে নিলাম পাপ জিহ্বা’ — রাজসভায় গিয়ে পাপ জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়েছে। এটি খনার জিহ্বা কর্তনের ঘটনা।
পঞ্চম স্তবক: মেয়েদের বাড়বে বাড়
“যে মেয়েদের বাড়বে বাড় / তাদের হবে হবেই ঝাড়”
পঞ্চম স্তবকে নারীর শিক্ষার বিরুদ্ধে ভবিষ্যদ্বাণীর কথা বলা হয়েছে। ‘যে মেয়েদের বাড়বে বাড় / তাদের হবে হবেই ঝাড়’ — যে মেয়েদের বাড়বে বাড় (শিক্ষা, জ্ঞান), তাদের হবে হবেই ঝাড় (শাস্তি, ধ্বংস)। এটি নারী-শিক্ষার বিরুদ্ধে প্রচলিত ভয়ের প্রতীক।
ষষ্ঠ স্তবক: বাংলাদেশের শৈশব স্মৃতি
“কী সুন্দর একটা দেশে / বড় হচ্ছিলাম / সমুদ্রটা সবুজ আর / আকাশনীল গ্রাম / তুঙ্গে ছিল বৃহস্পতি / আকাশ হাতের তালু / রাহু এবং কেতুর ভয়ে / চাঁদ সেখানে ঢালু”
ষষ্ঠ স্তবকে খনার শৈশবের স্মৃতি ফুটে উঠেছে। ‘কী সুন্দর একটা দেশে / বড় হচ্ছিলাম’ — তিনি একটি সুন্দর দেশে বড় হচ্ছিলেন। ‘সমুদ্রটা সবুজ আর / আকাশনীল গ্রাম’ — সবুজ সমুদ্র, আকাশনীল গ্রাম। ‘তুঙ্গে ছিল বৃহস্পতি / আকাশ হাতের তালু’ — বৃহস্পতি উঁচুতে, আকাশ হাতের তালুতে। ‘রাহু এবং কেতুর ভয়ে / চাঁদ সেখানে ঢালু’ — রাহু-কেতুর ভয়ে চাঁদ সেখানে ঢালু।
সপ্তম স্তবক: প্রথম প্রেম ও মিহির
“চাঁদের আলোয় তার সঙ্গে / প্রথম শিহরণ / জলে ভাসান বাংলা ছেলে / মিহির তনুমন / আয়ুর রেখা গুনতে তার / ভুল করেছে পিতা / আসলে তার পরমায়ু / একশো পারমিতা”
সপ্তম স্তবকে প্রথম প্রেম ও মিহিরের কথা বলা হয়েছে। ‘চাঁদের আলোয় তার সঙ্গে / প্রথম শিহরণ’ — চাঁদের আলোয় তাঁর সঙ্গে প্রথম শিহরণ (রোমাঞ্চ)। ‘জলে ভাসান বাংলা ছেলে / মিহির তনুমন’ — জলে ভাসান বাংলা ছেলে মিহিরের তনু-মন। ‘আয়ুর রেখা গুনতে তার / ভুল করেছে পিতা’ — তাঁর আয়ুর রেখা গণনা করতে পিতা ভুল করেছেন। ‘আসলে তার পরমায়ু / একশো পারমিতা’ — আসলে তাঁর পরমায়ু একশো পারমিতা (অসীম)।
অষ্টম স্তবক: পুতুল থেকে প্রেমিক
“পুতুল পেয়ে সেই আমার / পুতুল খেলা এল / কখন যেন পুতুল ক্রমে / প্রেমিক হয়ে গেল / না হয় সে বয়সে ছোট / না হয় আমি বড় / তাই বলে কি ভালবাসা / আটকে থাকে, বলো!”
অষ্টম স্তবকে পুতুল থেকে প্রেমিকে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। ‘পুতুল পেয়ে সেই আমার / পুতুল খেলা এল’ — পুতুল পেয়ে পুতুল খেলা শুরু হলো। ‘কখন যেন পুতুল ক্রমে / প্রেমিক হয়ে গেল’ — কখন যেন পুতুল ক্রমে প্রেমিক হয়ে গেল। ‘না হয় সে বয়সে ছোট / না হয় আমি বড় / তাই বলে কি ভালবাসা / আটকে থাকে, বলো!’ — সে বয়সে ছোট, আমি বড়, তাই বলে কি ভালোবাসা আটকে থাকে? এটি প্রেমের বয়সের বাধার বিরুদ্ধে প্রশ্ন।
নবম স্তবক: মিহিরের জ্যোতিষ শিক্ষা
“ভালবাসার মিহির ক্রমে / জ্যোতিষ শিখে নিল / গুরুমশাই বুড়ো হলেন / মিহির যুবক ছিল / সিংহলের মায়ার টান / কাটাতে চায় সে / মন পড়েছে মাটির টানে / বাংলাদেশের ঘাসে”
নবম স্তবকে মিহিরের জ্যোতিষ শিক্ষা ও বাংলাদেশের প্রতি টানের কথা বলা হয়েছে। ‘ভালবাসার মিহির ক্রমে / জ্যোতিষ শিখে নিল’ — ভালোবাসার মিহির ক্রমে জ্যোতিষ শিখে নিল। ‘গুরুমশাই বুড়ো হলেন / মিহির যুবক ছিল’ — গুরু বুড়ো হলেন, মিহির যুবক ছিল। ‘সিংহলের মায়ার টান / কাটাতে চায় সে’ — সিংহলের মায়ার টান কাটাতে চায় সে। ‘মন পড়েছে মাটির টানে / বাংলাদেশের ঘাসে’ — মন পড়েছে মাটির টানে, বাংলাদেশের ঘাসে।
দশম স্তবক: বাংলাদেশে আগমন ও সংসার
“বাংলাদেশ এলাম, তার / বাপপিতেমোর ঠাঁই / অনেক জল ঘোলার শেষে / সংসারে পাক খাই / পুঁথি আমার উঠল ভরে / রচনা এবং শ্লোকে / চাষাভুষার বাংলাদেশে / বচন পড়ে লোকে”
দশম স্তবকে বাংলাদেশে আগমন ও সংসারের কথা বলা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ এলাম, তার / বাপপিতেমোর ঠাঁই’ — বাংলাদেশ এলাম, তার বাপ-পিতামহের ঠাঁই। ‘অনেক জল ঘোলার শেষে / সংসারে পাক খাই’ — অনেক জল ঘোলার শেষে সংসারে পাক খাইলাম। ‘পুঁথি আমার উঠল ভরে / রচনা এবং শ্লোকে’ — পুঁথি আমার ভরে উঠল রচনা ও শ্লোকে। ‘চাষাভুষার বাংলাদেশে / বচন পড়ে লোকে’ — চাষাভুষার (কৃষিজীবী) বাংলাদেশে বচন পড়ে লোকে। এটি খনার বচনের কথা — যা কৃষিজীবীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।
একাদশ স্তবক: রাজসভায় বচন ও শাস্তির নির্দেশ
“বাতাস সেই বচন নিয়ে / গেল রাজার কাছে / স্বামী শ্বশুর সিঁটিয়ে থাকে / রাজা বকেন পাছে / মেয়েমানুষ বচন লেখে / জ্যোতিষ গোনে ভালো! / ওকে আমার সামনে আনো / মুখে ফেলব আলো / রাজার কথা শুনে মিহির / বড়ই চমকান / কী করে ওই গুহ্যকথা / হল পঞ্চকান! / বউটা বড় বেহায়া তোর / মিহির শুনে রাখ / জ্যান্ত আগুন ঘরের মাঝে / এখনি ওকে ঢাক”
একাদশ স্তবকে রাজসভায় বচন পৌঁছানো ও শাস্তির নির্দেশের কথা বলা হয়েছে। ‘বাতাস সেই বচন নিয়ে / গেল রাজার কাছে’ — বাতাস সেই বচন নিয়ে রাজার কাছে গেল। ‘স্বামী শ্বশুর সিঁটিয়ে থাকে / রাজা বকেন পাছে’ — স্বামী-শ্বশুর সিঁটিয়ে থাকে, রাজা বকেন পাছে। ‘মেয়েমানুষ বচন লেখে / জ্যোতিষ গোনে ভালো! / ওকে আমার সামনে আনো / মুখে ফেলব আলো’ — মেয়েমানুষ বচন লেখে, জ্যোতিষ গণে ভালো! ওকে আমার সামনে আনো, মুখে আলো ফেলব। ‘রাজার কথা শুনে মিহির / বড়ই চমকান’ — রাজার কথা শুনে মিহির বড়ই চমকান। ‘কী করে ওই গুহ্যকথা / হল পঞ্চকান!’ — কী করে ওই গুহ্য কথা হল পঞ্চকান! ‘বউটা বড় বেহায়া তোর / মিহির শুনে রাখ / জ্যান্ত আগুন ঘরের মাঝে / এখনি ওকে ঢাক’ — বউটা বড় বেহায়া তোর, মিহির শুনে রাখ, জ্যান্ত আগুন ঘরের মাঝে এখনি ওকে ঢাক।
দ্বাদশ স্তবক: বরাহের ক্রোধ ও খনার শাস্তি
“কোন বাদারে কী শিখেছে / জানে না সহবত / বাংলাবধূর মুখ কি দেখে / সভার পঞ্চঘট! / বরাহ বড় ক্রুদ্ধ হন / রাজ জ্যোতিষী তিনি / তাঁরই ঘরের আব্রু নিয়ে / এমন ছিনিমিনি! / বলেন, শোনো বউমা তুমি / রাজাকে বলে দাও / জ্যোতিষ কিছু জানো না শুধু / প্রবাদ আওড়াও / আর না যেন দেখি তোমায় / জ্যোতিষ চর্চাতে / এখন থেকে তোমার কাজ / বেগুন আলু ভাতে”
দ্বাদশ স্তবকে বরাহের ক্রোধ ও খনার শাস্তির কথা বলা হয়েছে। ‘কোন বাদারে কী শিখেছে / জানে না সহবত’ — কোন বাদারে (গ্রহ-নক্ষত্রে) কী শিখেছে, জানে না সহবত (সঙ্গী)। ‘বাংলাবধূর মুখ কি দেখে / সভার পঞ্চঘট!’ — বাংলাবধূর মুখ কি দেখে সভার পঞ্চঘট! ‘বরাহ বড় ক্রুদ্ধ হন / রাজ জ্যোতিষী তিনি’ — বরাহ বড় ক্রুদ্ধ হন, তিনি রাজ জ্যোতিষী। ‘তাঁরই ঘরের আব্রু নিয়ে / এমন ছিনিমিনি!’ — তাঁরই ঘরের আব্রু নিয়ে এমন ছিনিমিনি! ‘বলেন, শোনো বউমা তুমি / রাজাকে বলে দাও / জ্যোতিষ কিছু জানো না শুধু / প্রবাদ আওড়াও’ — বলেন, শোনো বউমা তুমি, রাজাকে বলে দাও, জ্যোতিষ কিছু জানো না, শুধু প্রবাদ আওড়াও। ‘আর না যেন দেখি তোমায় / জ্যোতিষ চর্চাতে / এখন থেকে তোমার কাজ / বেগুন আলু ভাতে’ — আর না যেন দেখি তোমায় জ্যোতিষ চর্চাতে, এখন থেকে তোমার কাজ বেগুন-আলু ভাতে (রান্নাবান্না)।
ত্রয়োদশ স্তবক: বঙ্গদেশের প্রতি প্রশ্ন
“ওগো বঙ্গদেশ আমি / তোমার বাহুতে মাথা রেখে / আশ্রয় খুঁজেছি এতদিন / কেন যে আমাকে শুধু / ঘোমটায় ঢেকে রাখো / বুঝতে পারি না আজও”
ত্রয়োদশ স্তবকে বঙ্গদেশের প্রতি প্রশ্ন। ‘ওগো বঙ্গদেশ আমি / তোমার বাহুতে মাথা রেখে / আশ্রয় খুঁজেছি এতদিন’ — হে বঙ্গদেশ, আমি তোমার বাহুতে মাথা রেখে আশ্রয় খুঁজেছি এতদিন। ‘কেন যে আমাকে শুধু / ঘোমটায় ঢেকে রাখো / বুঝতে পারি না আজও’ — কেন যে আমাকে শুধু ঘোমটায় ঢেকে রাখো, বুঝতে পারি না আজও।
চতুর্দশ স্তবক: সিংহলের স্মৃতি ও বঙ্গের পরাধীনতা
“সিংহলসূর্যের নিচে / হেঁটে বেড়াতাম আমি / শিরদাঁড়া সোজা রেখে / সে দেশের ঘাসমাটি / সমুদ্র মানুষ কেউ / মেয়ে বলে হেলা করত না / এই সভ্য বঙ্গদেশে / নারীর মুখশ্রী বড় পরাধীন / ঠুনকো, ভঙ্গুর, বড় অসহায়”
চতুর্দশ স্তবকে সিংহলের স্মৃতি ও বঙ্গের পরাধীনতার কথা বলা হয়েছে। ‘সিংহলসূর্যের নিচে / হেঁটে বেড়াতাম আমি / শিরদাঁড়া সোজা রেখে’ — সিংহলের সূর্যের নিচে হেঁটে বেড়াতাম আমি শিরদাঁড়া সোজা রেখে। ‘সে দেশের ঘাসমাটি / সমুদ্র মানুষ কেউ / মেয়ে বলে হেলা করত না’ — সে দেশের ঘাস-মাটি, সমুদ্র, মানুষ — কেউ মেয়ে বলে হেলা করত না। ‘এই সভ্য বঙ্গদেশে / নারীর মুখশ্রী বড় পরাধীন / ঠুনকো, ভঙ্গুর, বড় অসহায়’ — এই সভ্য বঙ্গদেশে নারীর মুখশ্রী বড় পরাধীন, ঠুনকো, ভঙ্গুর, বড় অসহায়।
পঞ্চদশ স্তবক: জিহ্বা কর্তনের আগে খনার কান্না
“আমার মুখের বুলি / আমার কলম কালি / ছিঁড়ে নিতে চায় বঙ্গদেশ / মেয়েরা জ্যোতিষী নয় / মেয়েরা বচন বলবে না। / কে বলেছে এসব নিয়ম! / আমার ভেতরে যদি / আগুন জাগ্রত থাকে / কতদিন ছাইচাপা দেবে! / আমি যে লিখতে চাই / আমি যে বলতে চাই / আমারও মুখের ভাষা আছে / সেকথা বোঝার মতো / মন নেই তোমাদের / বঙ্গদেশ, বরাহ মিহির”
পঞ্চদশ স্তবকে জিহ্বা কর্তনের আগে খনার বিদ্রোহের কথা বলা হয়েছে। ‘আমার মুখের বুলি / আমার কলম কালি / ছিঁড়ে নিতে চায় বঙ্গদেশ’ — আমার মুখের বুলি, আমার কলম-কালি ছিঁড়ে নিতে চায় বঙ্গদেশ। ‘মেয়েরা জ্যোতিষী নয় / মেয়েরা বচন বলবে না। / কে বলেছে এসব নিয়ম!’ — মেয়েরা জ্যোতিষী নয়, মেয়েরা বচন বলবে না — কে বলেছে এসব নিয়ম! ‘আমার ভেতরে যদি / আগুন জাগ্রত থাকে / কতদিন ছাইচাপা দেবে!’ — আমার ভেতরে যদি আগুন জাগ্রত থাকে, কতদিন ছাইচাপা দেবে! ‘আমি যে লিখতে চাই / আমি যে বলতে চাই / আমারও মুখের ভাষা আছে’ — আমি লিখতে চাই, আমি বলতে চাই, আমারও মুখের ভাষা আছে। ‘সেকথা বোঝার মতো / মন নেই তোমাদের / বঙ্গদেশ, বরাহ মিহির’ — সেকথা বোঝার মতো মন নেই তোমাদের, বঙ্গদেশ, বরাহ মিহির।
ষোড়শ স্তবক: পিতা-স্বামীর ভূমিকা ও খনার একঘরে হওয়া
“যে ছেলে আমার জন্য / বেঁচে ফিরে এল তার ঘরে / যে পিতা ছেলেকে ফিরে পেল / তারা আজ আমাকেই / একঘরে কোণঠাসা করে / হেঁশেলে বন্দি করে রাখে! / রাজা যদি গুণীজনে / সমাদর করে, সে সম্মান / আমারও মাথায় পড়ে যদি / তোমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে / যদি সে সম্মান নিতে পারি / ক্ষতি কি মিহির তাতে!”
ষোড়শ স্তবকে পিতা-স্বামীর দ্বৈত ভূমিকা ও খনার একঘরে হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ‘যে ছেলে আমার জন্য / বেঁচে ফিরে এল তার ঘরে / যে পিতা ছেলেকে ফিরে পেল / তারা আজ আমাকেই / একঘরে কোণঠাসা করে / হেঁশেলে বন্দি করে রাখে!’ — যে ছেলে আমার জন্য বেঁচে ফিরে এল তার ঘরে, যে পিতা ছেলেকে ফিরে পেল, তারা আজ আমাকেই একঘরে কোণঠাসা করে, হেঁশেলে বন্দি করে রাখে! ‘রাজা যদি গুণীজনে / সমাদর করে, সে সম্মান / আমারও মাথায় পড়ে যদি / তোমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে / যদি সে সম্মান নিতে পারি / ক্ষতি কি মিহির তাতে!’ — রাজা যদি গুণীজনে সমাদর করে, সে সম্মান আমারও মাথায় পড়ে যদি, তোমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে যদি সে সম্মান নিতে পারি, ক্ষতি কি মিহির তাতে!
সপ্তদশ স্তবক: জিহ্বা কর্তন ও খনার মৃত্যু
“ক্ষতি হল বড় ভয়ানক / ক্ষতি ছিল বড় ভয়ানক / জিভ সামলাতে পারিনি / জিভ আগলাতে পারিনি / খোলা মাঠে একা অসহায় / দাঁড়িয়েছে মোর জিহ্বা / তলোয়ার খোলা জল্লাদ / ছুটে এল ওকে মারতে / চিৎকার করে বললাম / মারতে তো মারো আমাকে / আমি মরে যাব লহমায় / বেঁচে থাক শুধু জিহ্বা / সুবচনী এই মেয়েকে / দুর্মুখ করে তুলো না / বেঁচে থাক তুমি বরাহ / বেঁচে থাক ন্যায়দ- / মেয়েদের কথা বলবার / অধিকার কেড়ে নিও না / জল্লাদ তবু থামে না / ভয়ানক এক আঘাতে / কেটে নিল আলজিভটা / খনা মরে গেল তখনই”
সপ্তদশ স্তবকে জিহ্বা কর্তন ও খনার মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। ‘ক্ষতি হল বড় ভয়ানক / ক্ষতি ছিল বড় ভয়ানক’ — ক্ষতি হল বড় ভয়ানক, ক্ষতি ছিল বড় ভয়ানক। ‘জিভ সামলাতে পারিনি / জিভ আগলাতে পারিনি’ — জিভ সামলাতে পারিনি, জিভ আগলাতে পারিনি। ‘খোলা মাঠে একা অসহায় / দাঁড়িয়েছে মোর জিহ্বা’ — খোলা মাঠে একা অসহায় দাঁড়িয়েছে মোর জিহ্বা। ‘তলোয়ার খোলা জল্লাদ / ছুটে এল ওকে মারতে’ — তলোয়ার খোলা জল্লাদ ছুটে এল ওকে মারতে। ‘চিৎকার করে বললাম / মারতে তো মারো আমাকে / আমি মরে যাব লহমায় / বেঁচে থাক শুধু জিহ্বা’ — চিৎকার করে বললাম, মারতে তো মারো আমাকে, আমি মরে যাব লহমায়, বেঁচে থাক শুধু জিহ্বা। ‘সুবচনী এই মেয়েকে / দুর্মুখ করে তুলো না’ — সুবচনী এই মেয়েকে দুর্মুখ করে তুলো না। ‘বেঁচে থাক তুমি বরাহ / বেঁচে থাক ন্যায়দ-‘ — বেঁচে থাক তুমি বরাহ, বেঁচে থাক ন্যায়দ-। ‘মেয়েদের কথা বলবার / অধিকার কেড়ে নিও না’ — মেয়েদের কথা বলবার অধিকার কেড়ে নিও না। ‘জল্লাদ তবু থামে না / ভয়ানক এক আঘাতে / কেটে নিল আলজিভটা / খনা মরে গেল তখনই’ — জল্লাদ তবু থামে না, ভয়ানক এক আঘাতে কেটে নিল আল-জিভটা, খনা মরে গেল তখনই।
অষ্টাদশ স্তবক: নারী-জিহ্বার চিরন্তন কান্না
“আমাদের নারীজিহ্বা / মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে / মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে / আমাদের নারীজিহ্বা… / আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে / মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে…”
অষ্টাদশ স্তবকে নারী-জিহ্বার চিরন্তন কান্নার কথা বলা হয়েছে। ‘আমাদের নারীজিহ্বা / মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে / মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে / আমাদের নারীজিহ্বা…’ — আমাদের নারী-জিহ্বা মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে, মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে আমাদের নারী-জিহ্বা। ‘আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে / মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে…’ — আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে, মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে। এটি কবিতার চূড়ান্ত সমাপ্তি — নারী-জিহ্বা কাটা হলেও, নারী আবার ফিরে আসবে, বারবার ফিরে আসবে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি অষ্টাদশটি স্তবকে বিভক্ত। প্রতিটি স্তবক দুই থেকে আট পঙ্ক্তির মধ্যে। ছন্দ সহজ, প্রাঞ্জল, গেয়তার সাথে স্মরণীয়। তিনি লোকগাথার ধারায় কবিতা রচনা করেছেন — যা খনার কিংবদন্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘খনার জিহ্বা’ — নারীর ভাষা, নারীর জ্ঞান, নারীর স্বাধীনতার প্রতীক। ‘জিহ্বা কর্তন’ — নারীর মুখ বন্ধ করে দেওয়ার প্রতীক। ‘খোলা মাঠে পড়ে থাকা জিহ্বা’ — নারীর ভাষার চিরন্তন উপস্থিতি, যা কাটা গেলেও নীরব থাকে না। ‘সুবচনী’ ও ‘দুর্মুখ’ — ভালো ভাষা ও খারাপ ভাষার দ্বৈরথ।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে / মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে / আমাদের নারীজিহ্বা…’ — এই পুনরাবৃত্তি নারী-জিহ্বার চিরন্তন কান্নাকে জোরালো করেছে।
শেষের ‘আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে / মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে…’ — এটি সুভাষচন্দ্র বসুর বিখ্যাত উক্তির পুনর্লিখন। সুভাষ বলেছিলেন ‘তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে’ নয়, তিনি বলেছিলেন ‘তোমারই উড়ান চিহ্ন রাখিব’। মল্লিকা সেনগুপ্ত এখানে সুভাষের ভাষাকে নারী-জিহ্বার সঙ্গে যুক্ত করেছেন — নারী আবার ফিরে আসবে, বারবার ফিরে আসবে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“খনাজন্ম” মল্লিকা সেনগুপ্তের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি প্রাচীন ভারতের নারী জ্যোতিষী খনার কিংবদন্তি পুনর্বিবৃত্তি করেছেন। খনা নারী হয়ে জ্যোতিষী হয়েছিলেন। তাঁর জ্ঞান, তাঁর বচন, তাঁর ভাষা — সবই ছিল অসামান্য। কিন্তু পিতৃপুরুষের ক্রোধ, রাজার রোষ, এবং সমাজের নারী-বিদ্বেষ তাঁকে গ্রাস করল। তাঁর জিহ্বা কেটে নেওয়া হলো। তিনি মারা গেলেন। কিন্তু তাঁর জিহ্বা মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে। সেই জিহ্বার কান্না আজও শোনা যায় — যখন নারীকে জ্ঞানচর্চা করতে দেওয়া হয় না, যখন নারীকে ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, যখন নারীর ভাষাকে কেটে ফেলা হয়।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — নারীর ভাষা কাটা যায়, কিন্তু নারীর ভাষা মরে না। নারী-জিহ্বা মাঠে পড়ে কাঁদে, কিন্তু সেই কান্না চিরকাল শোনা যায়। আর নারী আবার ফিরে আসে — বারবার, যুগে যুগে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে।
মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতায় ইতিহাস, নারী ও ভাষার রাজনীতি
মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতায় ইতিহাস ও পুরাণের নারীবাদী পুনর্লিখন একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ইতিহাসে নারীদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে তাদের জ্ঞান ও ভাষাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। ‘খনাজন্ম’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
তাঁর কবিতায় ‘জিহ্বা’ একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক — নারীর ভাষা, নারীর স্বাধীনতা, নারীর অস্তিত্ব। জিহ্বা কাটা যায়, কিন্তু জিহ্বার কান্না থামানো যায় না।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘খনাজন্ম’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের ইতিহাসের নারীবাদী পুনর্লিখন, প্রতীক ব্যবহারের কৌশল, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
খনাজন্ম সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: খনাজন্ম কবিতাটির লেখিকা কে?
এই কবিতাটির লেখিকা মল্লিকা সেনগুপ্ত (জন্ম: ১৯৬৫)। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘খনাজন্ম’ (১৯৯৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০০৫), ‘মেয়েদের ইতিহাস’ (২০১০), ‘আমার কবিতা’ (২০১৫)।
প্রশ্ন ২: কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘খনা’ কে?
খনা প্রাচীন ভারতের একজন বিখ্যাত নারী জ্যোতিষী। কিংবদন্তি অনুসারে, তিনি ছিলেন জ্যোতিষী বরাহমিহিরের পুত্রবধূ, মিহিরের স্ত্রী। তাঁর জ্যোতিষ বিদ্যা ছিল অসামান্য। কিন্তু নারী হয়ে জ্যোতিষ চর্চা করায় তাঁর জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর বচনগুলি ‘খনার বচন’ নামে পরিচিত।
প্রশ্ন ৩: ‘নারী যদি ঘরেই শেষ / ধন্য রাজার পুণ্য দেশ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি বিদ্রূপাত্মক। নারী যদি ঘরেই শেষ হয়, ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে রাজার পুণ্য দেশ ধন্য। এটি নারীকে ঘরে আটকে রাখার সামাজিক চেতনার বিরুদ্ধে বিদ্রূপ।
প্রশ্ন ৪: ‘যে মেয়েদের বাড়বে বাড় / তাদের হবে হবেই ঝাড়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
যে মেয়েদের বাড়বে বাড় (শিক্ষা, জ্ঞান), তাদের হবে হবেই ঝাড় (শাস্তি, ধ্বংস)। এটি নারী-শিক্ষার বিরুদ্ধে প্রচলিত ভয়ের প্রতীক। নারী যদি শিক্ষিত হয়, তবে তার শাস্তি অনিবার্য — এই ভয় সমাজে প্রচলিত ছিল।
প্রশ্ন ৫: ‘পুতুল পেয়ে সেই আমার / পুতুল খেলা এল / কখন যেন পুতুল ক্রমে / প্রেমিক হয়ে গেল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শৈশবে পুতুল খেলা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেই পুতুল ক্রমে প্রেমিক হয়ে গেল। এটি শৈশবের সঙ্গী থেকে প্রেমিক হওয়ার রূপান্তরের চিত্র।
প্রশ্ন ৬: ‘বউটা বড় বেহায়া তোর / মিহির শুনে রাখ / জ্যান্ত আগুন ঘরের মাঝে / এখনি ওকে ঢাক’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রাজার কথা। তিনি মিহিরকে বলছেন — তোমার বউ বড় বেহায়া (লজ্জাহীনা), জ্যান্ত আগুন ঘরের মাঝে এখনি ওকে ঢাক (পুঁতে ফেল)। এটি নারীর জ্ঞান ও ভাষার বিরুদ্ধে হিংসার চিত্র।
প্রশ্ন ৭: ‘এই সভ্য বঙ্গদেশে / নারীর মুখশ্রী বড় পরাধীন / ঠুনকো, ভঙ্গুর, বড় অসহায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সিংহলে নারীরা শিরদাঁড়া সোজা রেখে চলতেন, মেয়ে বলে কেউ হেলা করত না। কিন্তু এই সভ্য বঙ্গদেশে নারীর মুখশ্রী (মর্যাদা, চেহারা) বড় পরাধীন, ঠুনকো, ভঙ্গুর, বড় অসহায়। এটি সভ্যতার নামে নারীর পরাধীনতার বিদ্রূপ।
প্রশ্ন ৮: ‘মারতে তো মারো আমাকে / আমি মরে যাব লহমায় / বেঁচে থাক শুধু জিহ্বা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
জিহ্বা কর্তনের সময় খনা চিৎকার করে বলছেন — মারতে তো মারো আমাকে, আমি মরে যাব লহমায়, বেঁচে থাক শুধু জিহ্বা। এটি আত্মদানের চিত্র — নিজের শরীরের চেয়ে ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা।
প্রশ্ন ৯: ‘আমাদের নারীজিহ্বা / মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
খনার জিহ্বা কাটা হয়েছিল, মাঠে পড়েছিল। কিন্তু সেই জিহ্বা আজও কাঁদছে। এটি প্রতীকী — নারীর ভাষা কাটা গেলেও, নারীর মুখ বন্ধ করে দেওয়া গেলেও, সেই ভাষা নীরব নয়। এটি আজও কাঁদছে, আজও শোনা যায়।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — নারীর ভাষা কাটা যায়, কিন্তু নারীর ভাষা মরে না। নারী-জিহ্বা মাঠে পড়ে কাঁদে, কিন্তু সেই কান্না চিরকাল শোনা যায়। আর নারী আবার ফিরে আসে — বারবার, যুগে যুগে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে। আজকের পৃথিবীতে — যেখানে নারীদের কথা বলার অধিকার এখনও সীমিত, যেখানে নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে এখনও প্রতিরোধ আছে — এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম।
ট্যাগস: খনাজন্ম, মল্লিকা সেনগুপ্ত, মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, নারীবাদী কবিতা, খনা ও মিহিরের কাহিনী, নারী-জিহ্বার কবিতা, ইতিহাসের নারীবাদী পুনর্লিখন, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: মল্লিকা সেনগুপ্ত | কবিতার প্রথম লাইন: “মঙ্গলে ঊষা বুধে পা / যথা ইচ্ছা তথা যা” | নারী-জিহ্বার কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন





