কবিতার খাতা
- 30 mins
কথা ছিলো সুবিনয় – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।
কথা ছিলো রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত,
রাখালেরা পুনর্বার বাঁশিতে আঙুল রেখে
রাখালিয়া বাজাবে বিশদ।
কথা ছিলো বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপনি খুলে বোসবে না,
চিত্রর তরুন হরিনেরা সহসাই হয়ে উঠবে না
রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট।
কথা ছিলো, শিশু হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের নাম।
নদীর চুলের রেখা ধরে হেঁটে হেঁটে যাবে এক মগ্ন ভগীরথ,
কথা ছিলো, কথা ছিলো আঙুর ছোঁবো না কোনোদিন।
অথচ দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল,
রাখালের হাত দুটি বড় বেশি শীর্ণ আর ক্ষীণ,
বাঁশি কেনা জানি তার কখনোই হয়ে উঠে নাই-
কথা ছিলো, চিল-ডাকা নদীর কিনারে একদিন ফিরে যাবো।
একদিন বট বিরিক্ষির ছায়ার নিচে জড়ো হবে
সহজিয়া বাউলেরা,
তাদের মায়াবী আঙুলের টোকা ঢেউ তুলবে একতারায়-
একদিন সুবিনয় এসে জড়িয়ে ধরে বলবেঃ উদ্ধার পেয়েছি।
কথা ছিলো, ভাষার কসম খেয়ে আমরা দাঁড়াবো ঘিরে
আমাদের মাতৃভূমি, জল, অরণ্য, জমিন, আমাদের
পাহাড় ও সমুদ্রের আদিগন্ত উপকূল-
আজন্ম এ-জলাভূমি খুঁজে পাবে প্রকৃত সীমানা তার।
কথা ছিলো, আর্য বা মোঘল নয়, এ-জমিন অনার্যের হবে।
অথচ এখনো আদিবাসী পিতাদের শৃঙ্খলিত জীবনের
ধারাবাহিকতা
কৃষকের রন্ধ্রে রক্তে বুনে যায় বন্দিত্বের বীজ।
মাতৃভূমি-খন্ডিত দেহের পরে তার থাবা বসিয়েছে
আর্য বণিকের হাত।
আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব
লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা,
প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানারঙা পতাকা ওড়ায়।
কথা ছিলো ’আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন’,
আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ।
অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু
অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে।
জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি,
আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।
কথা ছিলো সুবিনয় – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ | কথা ছিলো সুবিনয় কবিতা | রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা | বাংলা কবিতা
কথা ছিলো সুবিনয়: রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতা ও সামাজিক দ্বন্দ্বের অসাধারণ কাব্যভাষা
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর “কথা ছিলো সুবিনয়” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতা, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও মানবিক মূল্যবোধের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “কথা ছিলো রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত, / রাখালেরা পুনর্বার বাঁশিতে আঙুল রেখে / রাখালিয়া বাজাবে বিশদ।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর হতাশার জগৎ, যেখানে যা কিছু কথা ছিলো, তা আর পূরণ হয়নি। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করলেও বাংলা কবিতায় এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন। তাঁর কবিতায় সাম্যবাদ, মানবতা, প্রকৃতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের গভীর প্রকাশ ঘটে। “কথা ছিলো সুবিনয়” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ: সাম্যের কবি
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ১৯৯১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উপদ্রুত উপকূল’ (১৯৭৮) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’, ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’, ‘মৌলিক মুখোশ’, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় সাম্যবাদ, মানবতা, প্রকৃতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও শোষিতের মুক্তির গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি স্বল্প জীবনে বাংলা কবিতায় এক অনন্য স্থান তৈরি করে গেছেন। “কথা ছিলো সুবিনয়” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
কথা ছিলো সুবিনয় কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“কথা ছিলো সুবিনয়” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘কথা ছিলো’ — প্রতিশ্রুতি ছিল, আশা ছিল, বিশ্বাস ছিল। ‘সুবিনয়’ — একটি নাম? নাকি ‘সু-বিনয়’ অর্থাৎ ভালো বিনয়? শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা প্রতিশ্রুতির, আশার, কিন্তু সেই আশা পূর্ণ না হওয়ার বেদনার কবিতা।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কথা ছিলো রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত, / রাখালেরা পুনর্বার বাঁশিতে আঙুল রেখে / রাখালিয়া বাজাবে বিশদ। / কথা ছিলো বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপনি খুলে বোসবে না, / চিত্রর তরুন হরিনেরা সহসাই হয়ে উঠবে না / রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট।” প্রথম স্তবকে কবি সেই সব প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন যা ছিল। তিনি বলেছেন — কথা ছিলো রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত। রাখালেরা পুনর্বার বাঁশিতে আঙুল রেখে রাখালিয়া বাজাবে বিশদ। কথা ছিলো বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপনি খুলে বসবে না। চিত্রর তরুণ হরিণেরা সহসাই হয়ে উঠবে না রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট।
‘রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রক্ত-প্লাবন — সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধ বা কোনো বড় সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের পর শস্যক্ষেত মুক্ত হবে — অর্থাৎ কৃষকেরা তাদের জমিতে স্বাধীনভাবে চাষ করবে, শোষণমুক্ত হবে।
‘রাখালেরা পুনর্বার বাঁশিতে আঙুল রেখে রাখালিয়া বাজাবে বিশদ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রাখালেরা আবার বাঁশি বাজাবে — অর্থাৎ শান্তি ফিরে আসবে, গ্রামীণ জীবনের সরলতা ফিরে আসবে।
‘বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের বিপনি খুলে বোসবে না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বৃক্ষের সমাজ — প্রকৃতির জগৎ। সেখানে কেউ কাঠের ব্যবসা করবে না — অর্থাৎ প্রকৃতিকে শোষণ করা হবে না, গাছ কেটে ব্যবসা করা হবে না।
‘চিত্রর তরুন হরিনেরা সহসাই হয়ে উঠবে না রপ্তানিযোগ্য চামড়ার প্যাকেট’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সুন্দর তরুণ হরিণেরা চামড়ার প্যাকেটে পরিণত হবে না — অর্থাৎ পশুদের হত্যা করে তাদের চামড়া রপ্তানি করা হবে না।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কথা ছিলো, শিশু হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের নাম। / নদীর চুলের রেখা ধরে হেঁটে হেঁটে যাবে এক মগ্ন ভগীরথ, / কথা ছিলো, কথা ছিলো আঙুর ছোঁবো না কোনোদিন।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি আরও প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — কথা ছিলো, শিশু হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের নাম। নদীর চুলের রেখা ধরে হেঁটে হেঁটে যাবে এক মগ্ন ভগীরথ। কথা ছিলো, কথা ছিলো আঙুর ছোঁবো না কোনোদিন।
‘শিশু হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্পদের নাম’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শিশুরা হবে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ — অর্থাৎ শিশুদের যত্ন নেওয়া হবে, তাদের অধিকার রক্ষা করা হবে, তারা সুখে বড় হবে।
‘নদীর চুলের রেখা ধরে হেঁটে হেঁটে যাবে এক মগ্ন ভগীরথ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ভগীরথ — পুরাণের রাজা যিনি গঙ্গাকে মর্ত্যে এনেছিলেন। নদীর চুলের রেখা — নদীর স্রোত। ভগীরথ সেই পথ ধরে হাঁটবেন — অর্থাৎ নদীকে রক্ষা করা হবে, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বজায় থাকবে।
‘আঙুর ছোঁবো না কোনোদিন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আঙুর — সম্ভবত মদের প্রতীক। আঙুর ছোঁবো না — মদ স্পর্শ করব না, মাদক থেকে দূরে থাকব। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতিও কি পূরণ হয়েছে?
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“অথচ দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল, / রাখালের হাত দুটি বড় বেশি শীর্ণ আর ক্ষীণ, / বাঁশি কেনা জানি তার কখনোই হয়ে উঠে নাই-” তৃতীয় স্তবকে কবি বাস্তবতার চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলেছেন — অথচ দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল। রাখালের হাত দুটি বড় বেশি শীর্ণ আর ক্ষীণ। বাঁশি কেনা জানি তার কখনোই হয়ে উঠে নাই।
‘দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
দ্রাক্ষার রস — মদ। আরশিমহল — রাজপ্রাসাদ? অর্থাৎ ধনীদের প্রাসাদ মদে নিমজ্জিত, তারা বিলাসে মত্ত। কিন্তু রাখালেরা ক্ষীণ, তারা বাঁশিও কিনতে পারে না।
‘রাখালের হাত দুটি বড় বেশি শীর্ণ আর ক্ষীণ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রাখালের হাত শীর্ণ, ক্ষীণ — অর্থাৎ তারা দরিদ্র, অপুষ্ট, অবহেলিত। তাদের অবস্থা ভালো হয়নি।
‘বাঁশি কেনা জানি তার কখনোই হয়ে উঠে নাই’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রাখালের বাঁশি কেনা হয়নি — সে বাঁশি বাজাতে পারেনি, শান্তি ও আনন্দ ফিরে আসেনি। প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কথা ছিলো, চিল-ডাকা নদীর কিনারে একদিন ফিরে যাবো। / একদিন বট বিরিক্ষির ছায়ার নিচে জড়ো হবে / সহজিয়া বাউলেরা, / তাদের মায়াবী আঙুলের টোকা ঢেউ তুলবে একতারায়- / একদিন সুবিনয় এসে জড়িয়ে ধরে বলবেঃ উদ্ধার পেয়েছি।” চতুর্থ স্তবকে কবি আরেকটি প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — কথা ছিলো, চিল-ডাকা নদীর কিনারে একদিন ফিরে যাবো। একদিন বটবৃক্ষের ছায়ার নিচে জড়ো হবে সহজিয়া বাউলেরা। তাদের মায়াবী আঙুলের টোকা ঢেউ তুলবে একতারায়। একদিন সুবিনয় এসে জড়িয়ে ধরে বলবে — উদ্ধার পেয়েছি।
‘চিল-ডাকা নদীর কিনারে একদিন ফিরে যাবো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
চিল-ডাকা নদী — সম্ভবত কোনো নির্দিষ্ট নদী, অথবা প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়ার প্রতীক। তিনি ফিরে যেতে চান প্রকৃতির কাছে, শিকড়ের কাছে।
‘বটবৃক্ষের ছায়ার নিচে জড়ো হবে সহজিয়া বাউলেরা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বটবৃক্ষের ছায়া — গ্রামীণ বাংলার চিরন্তন চিত্র। সহজিয়া বাউলেরা — যারা সহজ সরল জীবনযাপন করে, যারা আধ্যাত্মিক। তারা জড়ো হবে — অর্থাৎ সংস্কৃতি চর্চা হবে, আধ্যাত্মিক চেতনা জাগবে।
‘একদিন সুবিনয় এসে জড়িয়ে ধরে বলবেঃ উদ্ধার পেয়েছি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সুবিনয় — সম্ভবত কোনো চরিত্রের নাম, অথবা ‘সু-বিনয়’ অর্থাৎ ভালো বিনয়ী মানুষ। তিনি এসে বলবেন — উদ্ধার পেয়েছি। অর্থাৎ মুক্তি পেয়েছি, শান্তি পেয়েছি।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কথা ছিলো, ভাষার কসম খেয়ে আমরা দাঁড়াবো ঘিরে / আমাদের মাতৃভূমি, জল, অরণ্য, জমিন, আমাদের / পাহাড় ও সমুদ্রের আদিগন্ত উপকূল- / আজন্ম এ-জলাভূমি খুঁজে পাবে প্রকৃত সীমানা তার।” পঞ্চম স্তবকে কবি মাতৃভূমির প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — কথা ছিলো, ভাষার কসম খেয়ে আমরা দাঁড়াবো ঘিরে আমাদের মাতৃভূমি, জল, অরণ্য, জমিন, আমাদের পাহাড় ও সমুদ্রের আদিগন্ত উপকূল। আজন্ম এ-জলাভূমি খুঁজে পাবে প্রকৃত সীমানা তার।
‘ভাষার কসম খেয়ে আমরা দাঁড়াবো ঘিরে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ভাষার শপথ করে আমরা রক্ষা করব আমাদের মাতৃভূমি, জল, অরণ্য, জমিন, পাহাড়, সমুদ্র। একুশের চেতনায় আমরা সব কিছু রক্ষা করব।
ষষ্ঠ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কথা ছিলো, আর্য বা মোঘল নয়, এ-জমিন অনার্যের হবে। / অথচ এখনো আদিবাসী পিতাদের শৃঙ্খলিত জীবনের / ধারাবাহিকতা / কৃষকের রন্ধ্রে রক্তে বুনে যায় বন্দিত্বের বীজ।” ষষ্ঠ স্তবকে কবি শোষণের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — কথা ছিলো, আর্য বা মোঘল নয়, এ-জমিন অনার্যের হবে। অথচ এখনো আদিবাসী পিতাদের শৃঙ্খলিত জীবনের ধারাবাহিকতা কৃষকের রন্ধ্রে রক্তে বুনে যায় বন্দিত্বের বীজ।
‘আর্য বা মোঘল নয়, এ-জমিন অনার্যের হবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আর্য ও মোঘল — বহিরাগত শাসক। কথা ছিলো, এই জমিন আর্য বা মোঘলদের হবে না, হবে অনার্যদের — অর্থাৎ এদেশের আদিম বাসিন্দাদের, শোষিতদের। কিন্তু তা হয়নি।
‘আদিবাসী পিতাদের শৃঙ্খলিত জীবনের ধারাবাহিকতা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আদিবাসীরা আজও শৃঙ্খলিত — তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেই শৃঙ্খলিত জীবনের ধারা কৃষকদের রক্তে বন্দিত্বের বীজ বুনে যায়।
সপ্তম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“মাতৃভূমি-খন্ডিত দেহের পরে তার থাবা বসিয়েছে / আর্য বণিকের হাত।” সপ্তম স্তবকে কবি শোষণের আরও চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলেছেন — মাতৃভূমির খন্ডিত দেহের পরে তার থাবা বসিয়েছে আর্য বণিকের হাত।
‘আর্য বণিকের হাত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
আর্য বণিক — পুঁজিবাদী শোষক, যারা মাতৃভূমিকে খন্ডিত করেছে, শোষণ করেছে।
অষ্টম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব / লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা, / প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানারঙা পতাকা ওড়ায়।” অষ্টম স্তবকে কবি ইতিহাসের মিথ্যে নির্মাণের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — আর কী অবাক! ইতিহাসে দেখি সব লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা। প্রশস্তি, বহিরাগত তস্করের নামে নানারঙা পতাকা ওড়ায়।
‘লুটেরা দস্যুর জয়গানে ঠাঁসা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ইতিহাস লুটেরাদের জয়গানে ভরা — যারা এদেশ লুট করেছে, তারাই ইতিহাসে বীর হয়ে আছে। আর সত্যিকারের বীরদের কথা কেউ লেখে না।
নবম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কথা ছিলো ’আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন’, / আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ। / অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু / অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে। / জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি, / আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন।” নবম স্তবকে কবি চূড়ান্ত বক্তব্য পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন — কথা ছিলো, আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন। আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ। অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে। জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি, আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন।
‘আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন — অর্থাৎ ধর্ম হবে ন্যায়বিচার, শোষণমুক্তি। আর আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ মাঠ — প্রকৃতিই হবে আমাদের পূজাস্থল।
‘পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু অমলিন সবুজের দিকে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পান্ডুর নগর — ফ্যাকাশে, প্রাণহীন শহর। তার অপচ্ছায়া (মন্দ ছায়া) ক্রমশ সবুজের দিকে বাড়াচ্ছে বাহু — অর্থাৎ নগরায়ণ, শিল্পায়ণ, পুঁজিবাদ ক্রমশ প্রকৃতি ধ্বংস করছে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“কথা ছিলো সুবিনয়” কবিতাটি প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বের এক অসাধারণ চিত্র। কবি বারবার বলেছেন ‘কথা ছিলো’ — কী কী প্রতিশ্রুতি ছিল। রক্তপ্লাবনের পর শস্যক্ষেত মুক্ত হবে, রাখালেরা বাঁশি বাজাবে, বৃক্ষের সমাজে কেউ কাঠের ব্যবসা করবে না, হরিণেরা চামড়ার প্যাকেট হবে না, শিশু হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ, নদী রক্ষা পাবে, আঙুর ছোঁয়া হবে না, চিল-ডাকা নদীর কিনারে ফিরে যাওয়া যাবে, বাউলেরা জড়ো হবে, সুবিনয় উদ্ধার পাবে, মাতৃভূমি রক্ষা পাবে, এ-জমিন অনার্যের হবে, ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতিগুলোর কোনোটাই পূরণ হয়নি। বাস্তবে দেখা যায় — দ্রাক্ষারসে নিমজ্জিত আরশিমহল, রাখালের হাত শীর্ণ, বাঁশি কেনা হয়নি। আদিবাসীরা আজও শৃঙ্খলিত, আর্য বণিকের হাত মাতৃভূমিতে থাবা বসিয়েছে। ইতিহাস লুটেরাদের জয়গানে ভরা। নগরের অপচ্ছায়া সবুজ গ্রাস করছে। সব কিছু ভেসে যাচ্ছে জলোচ্ছাসে।
কথা ছিলো সুবিনয় কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: কথা ছিলো সুবিনয় কবিতার লেখক কে?
কথা ছিলো সুবিনয় কবিতার লেখক রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১)। তিনি বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তাঁর কবিতায় সাম্যবাদ, মানবতা, প্রকৃতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের গভীর প্রকাশ ঘটে।
প্রশ্ন ২: কথা ছিলো সুবিনয় কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
কথা ছিলো সুবিনয় কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব। কবি বারবার ‘কথা ছিলো’ বলে সেই সব প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করেছেন যা একদিন করা হয়েছিল — শোষণমুক্তি, প্রকৃতি রক্ষা, শিশুদের অধিকার, ন্যায়বিচার। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।
প্রশ্ন ৩: ‘রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘রক্ত-প্লাবনের পর মুক্ত হবে শস্যক্ষেত’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি মুক্তিযুদ্ধ বা কোনো বড় সংগ্রামের পর কৃষকের মুক্তির প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন। রক্তপাতের পর শস্যক্ষেত মুক্ত হবে — অর্থাৎ কৃষকেরা তাদের জমিতে স্বাধীনভাবে চাষ করবে, শোষণমুক্ত হবে।
প্রশ্ন ৪: ‘অথচ দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘অথচ দ্রাক্ষার রসে নিমজ্জিত আজ দেখি আরশিমহল’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি বাস্তবতার চিত্র এঁকেছেন। দ্রাক্ষার রস — মদ। আরশিমহল — রাজপ্রাসাদ। ধনীদের প্রাসাদ মদে নিমজ্জিত, তারা বিলাসে মত্ত, কিন্তু রাখালেরা ক্ষীণ, তারা বাঁশিও কিনতে পারে না।
প্রশ্ন ৫: ‘একদিন সুবিনয় এসে জড়িয়ে ধরে বলবেঃ উদ্ধার পেয়েছি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘একদিন সুবিনয় এসে জড়িয়ে ধরে বলবেঃ উদ্ধার পেয়েছি’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি একদিনের প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন। সুবিনয় — সম্ভবত কোনো চরিত্রের নাম, অথবা ‘সু-বিনয়’ অর্থাৎ ভালো বিনয়ী মানুষ। তিনি এসে বলবেন — উদ্ধার পেয়েছি, মুক্তি পেয়েছি, শান্তি পেয়েছি। কিন্তু সেই দিন কি আসবে?
প্রশ্ন ৬: ‘আর্য বা মোঘল নয়, এ-জমিন অনার্যের হবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘আর্য বা মোঘল নয়, এ-জমিন অনার্যের হবে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি ভূমি স্বত্বের প্রতিশ্রুতির কথা বলেছেন। আর্য ও মোঘল — বহিরাগত শাসক। কথা ছিলো, এই জমিন আর্য বা মোঘলদের হবে না, হবে অনার্যদের — অর্থাৎ এদেশের আদিম বাসিন্দাদের, শোষিতদের। কিন্তু তা হয়নি।
প্রশ্ন ৭: রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উপদ্রুত উপকূল’ (১৯৭৮) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় সাম্যবাদ, মানবতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের গভীর প্রকাশ ঘটে।
ট্যাগস: কথা ছিলো সুবিনয়, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা, কথা ছিলো সুবিনয় কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, সাম্যের কবিতা, প্রতিশ্রুতির কবিতা





