কবিতার খাতা
- 30 mins
একটি অরাজনৈতিক কবিতা – তারাপদ রায়।
দেখুন, একটা কথা বলি,
আমাকে আর অনুরোধ করবেন না।
আপনারা যে যাই বলুন, যে যতই বলুন,
বনমালীবাবুর কাছে আমি যেতে পারবো না,
বনমালীবাবু ভদ্রলোকটি বড় বুদ্ধিমান
আমি আবার আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমানদের
যথাসাধ্য এড়িয়ে চলি।
বনমালীবাবুর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বসার ঘরে
নরম সোফায় গা এলিয়ে
সুদৃশ্য পেয়ালায় দার্জিলিং চা—
সেই সঙ্গে ভগবান গোলার ভাগচাষীদের সমস্যা
অথবা বিশ্বায়নের সুযোগে নিমের দাঁতনের কারখানা।
সেবার আমি গিয়েছিলাম, আপনাদেরই পরামর্শে।
আমাদের বাড়ির পুরনো কাজের দিদি মঙ্গলার
চৌদ্দ বছরের মেয়েকে তাদের বস্তি থেকে
আগের দিন মাঝ রাতে, কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল,
তার কোনো খোঁজ খবর করা সম্ভব কিনা—
বনমালীবাবু শুনলেন কি শুনলেন না,
তার ঘরে তখন মিটিং, মন্ত্রীর জন্মদিন
যত বছর বয়েস ততগুলি গাজিপুরী গোলাপ
নাকি রক্তকমল দিয়ে মালা গাঁথা হবে—
এই নিয়ে আলোচনা। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরি কলা।
‘সিঙ্গাপুরী কলা দিয়ে জন্মদিনের মালা হোক’,
এই বলে খোলা জানলার ওপাশ থেকে কে যেন ছুটে পালালো।
তারপর হৈ হৈ হাতাহাতি, চিৎকার, আস্ফালন
মঙ্গলার মেয়ের খোঁজ আর নেওয়া গেল না।
কোনদিন কোনো খোঁজই, কোনো সমাধানই
বনমালীবাবুর কাছে পাওয়া যায়নি
কোনোদিন পাওয়া যাবেও বলে মনে হয় না।
আপনারা আমাকে অনুরোধ করবেন না।
আমি বনমালীবাবুর কাছে যাবো না।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। তারাপদ রায়।
একটি অরাজনৈতিক কবিতা – তারাপদ রায় | একটি অরাজনৈতিক কবিতা তারাপদ রায় | তারাপদ রায়ের কবিতা | বাংলা কবিতা
একটি অরাজনৈতিক কবিতা: তারাপদ রায়ের ব্যঙ্গ, বাস্তবতা ও সামাজিক বৈষম্যের অসাধারণ কাব্যভাষা
তারাপদ রায়ের “একটি অরাজনৈতিক কবিতা” বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা ব্যঙ্গ, বাস্তবতা ও সামাজিক বৈষম্যের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “দেখুন, একটা কথা বলি, আমাকে আর অনুরোধ করবেন না” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক অসাধারণ ব্যঙ্গচিত্র, যেখানে বনমালীবাবু নামের একজন ভদ্রলোকের মাধ্যমে উচ্চবিত্তের উদাসীনতা ও নিম্নবিত্তের প্রতি উপেক্ষা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তারাপদ রায় (১৯৩৬-২০০৭) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি, যিনি তার কবিতায় সমাজের নানা অসঙ্গতি, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটিয়েছেন। “একটি অরাজনৈতিক কবিতা” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা নামের বিপরীতে অত্যন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতন।
তারাপদ রায়: সমাজ সচেতন কবি
তারাপদ রায় (১৯৩৬-২০০৭) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৭ নভেম্বর বৃহত্তর রংপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যখন সময় তখন’ (১৯৬৮) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অবশেষে তুমি’, ‘পৃথিবীর দিকে’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘দুঃখীরা কথা বলে’ প্রভৃতি। তার কবিতায় সমাজের নানা অসঙ্গতি, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম, গ্রামীণ জীবন ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। “একটি অরাজনৈতিক কবিতা” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা নামের বিপরীতে অত্যন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতন।
একটি অরাজনৈতিক কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“একটি অরাজনৈতিক কবিতা” শিরোনামটি অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক। কবিতাটি নামে অরাজনৈতিক হলেও আসলে এটি অত্যন্ত রাজনৈতিক। এটি উচ্চবিত্তের রাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সামাজিক বৈষম্য ও নিম্নবিত্তের প্রতি উদাসীনতার বিরুদ্ধে এক তীব্র রাজনৈতিক সচেতন কবিতা। শিরোনামের ‘অরাজনৈতিক’ শব্দটি পাঠকের মনে একটি কৌতূহল তৈরি করে — একটি অরাজনৈতিক কবিতায় আসলে কী আছে? আর কবিতা পড়তে পড়তে পাঠক বুঝতে পারেন — এটি আসলে সবচেয়ে রাজনৈতিক কবিতাগুলোর একটি।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“দেখুন, একটা কথা বলি, / আমাকে আর অনুরোধ করবেন না। / আপনি যে যাই বলুন, যে যতই বলুন, / বনমালীবাবুর কাছে আমি যেতে পারবো না” প্রথম স্তবকে কবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন — তিনি বনমালীবাবুর কাছে যেতে পারবেন না, যেতে চান না। তিনি অনুরোধ করছেন — তাকে আর অনুরোধ করতে। এটি একটি প্রত্যাখ্যানের সুর। কিন্তু বনমালীবাবু কে? তা আমরা এখনও জানি না। এই কৌতূহল তৈরি করেই কবি আমাদের পরবর্তী স্তবকে নিয়ে যান।
‘বনমালীবাবু’ নামের তাৎপর্য
বনমালী একটি সাধারণ বাংলা নাম। কিন্তু ‘বাবু’ শব্দটি একটি বিশেষ সামাজিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয় — তিনি সম্ভ্রান্ত, তিনি ধনী, তিনি উচ্চবিত্ত। ‘বাবু’ শব্দটি ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা একটি সম্বোধন, যা উচ্চ শ্রেণীর মানুষদের জন্য ব্যবহৃত হতো। বনমালীবাবু তাই উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“বনমালীবাবু ভদ্রলোকটি বড় বুদ্ধিমান / আমি আবার আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমানদের / যথাসাধ্য এড়িয়ে চলি।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি বনমালীবাবুর একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন — তিনি বড় বুদ্ধিমান। আর কবি নিজের একটি বৈশিষ্ট্য বলেছেন — তিনি তার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমানদের এড়িয়ে চলেন। এটি একটি চমৎকার ব্যঙ্গ। বুদ্ধিমান মানুষদের এড়িয়ে চলার কারণ কী? কারণ তারা বুদ্ধি দিয়ে অন্যকে ঠকাতে পারে, তারা বুদ্ধি দিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধ করতে পারে। তাই কবি তাদের এড়িয়ে চলেন।
বুদ্ধিমানদের এড়িয়ে চলার তাৎপর্য
কবি বলেছেন — তিনি তার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমানদের এড়িয়ে চলেন। এটি একটি আত্মরক্ষার কৌশল। বুদ্ধিমান মানুষরা নিজেদের স্বার্থে অন্যদের ব্যবহার করতে পারে, তাদের কথা এড়িয়ে যেতে পারে, তাদের সমস্যা এড়িয়ে যেতে পারে। তাই কবি তাদের এড়িয়ে চলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো — বনমালীবাবু কি সেই রকম বুদ্ধিমান?
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“বনমালীবাবুর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বসার ঘরে / নরম সোফায় গা এলিয়ে / সুদৃশ্য পেয়ালায় দার্জিলিং চা— / সেই সঙ্গে ভগবান গোলার ভাগচাষীদের সমস্যা / অথবা বিশ্বায়নের সুযোগে নিমের দাঁতনের কারখানা।” তৃতীয় স্তবকে কবি বনমালীবাবুর বিলাসবহুল জীবনের একটি চিত্র এঁকেছেন। তার বসার ঘর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত — অর্থাৎ তিনি আরামে থাকেন। নরম সোফায় গা এলিয়ে দেন — আরাম করেন। সুদৃশ্য পেয়ালায় দার্জিলিং চা পান — ব্যয়বহুল চা পান। আর সেই আরামের মাঝেই তিনি আলোচনা করেন — ভগবান গোলার ভাগচাষীদের সমস্যা, বিশ্বায়নের সুযোগে নিমের দাঁতনের কারখানা। অর্থাৎ তিনি সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু সেই আলোচনা হয় তার আরামের ঘরে, বিলাসবহুল পরিবেশে।
বিলাসবহুল পরিবেশের তাৎপর্য
বনমালীবাবুর বিলাসবহুল পরিবেশ — শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর, নরম সোফা, দার্জিলিং চা — এই সবই তার উচ্চবিত্ত অবস্থানের প্রতীক। তিনি আরামে বসে সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু সেই আলোচনা কতটা বাস্তবসম্মত? তিনি কি আসলেই সেই সমস্যা বুঝতে পারেন? নাকি শুধু আলোচনার জন্য আলোচনা করেন?
ভগবান গোলা ও নিমের দাঁতনের কারখানার তাৎপর্য
ভগবান গোলা একটি গ্রামের নাম হতে পারে। সেখানকার ভাগচাষীদের সমস্যা — জমিদারি প্রথার অধীনে ভাগচাষীরা যে সমস্যার সম্মুখীন হয়, তা নিয়ে আলোচনা। নিমের দাঁতনের কারখানা — নিম দিয়ে তৈরি দাঁতন, যা গ্রামীণ অর্থনীতির একটি অংশ। বিশ্বায়নের সুযোগে এই কারখানা কীভাবে বিকশিত হতে পারে — তা নিয়ে আলোচনা। অর্থাৎ বনমালীবাবু উন্নয়ন, অর্থনীতি, কৃষি — এইসব বিষয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু এই আলোচনা কতটা বাস্তবসম্মত?
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“সেবার আমি গিয়েছিলাম, আপনাদেরই পরামর্শে। / আমাদের বাড়ির পুরনো কাজের দিদি মঙ্গলার / চৌদ্দ বছরের মেয়েকে তাদের বস্তি থেকে / আগের দিন মাঝ রাতে, কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল, / তার কোনো খোঁজ খবর করা সম্ভব কিনা—” চতুর্থ স্তবকে কবি বনমালীবাবুর কাছে যাওয়ার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তিনি গিয়েছিলেন অন্যদের পরামর্শে। কারণ — তাদের বাড়ির পুরনো কাজের দিদি মঙ্গলার চৌদ্দ বছরের মেয়েকে তাদের বস্তি থেকে আগের দিন মাঝরাতে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। তার কোনো খোঁজ খবর করা সম্ভব কিনা — এই প্রশ্ন নিয়ে তিনি বনমালীবাবুর কাছে গিয়েছিলেন।
মঙ্গলার মেয়ের ঘটনার তাৎপর্য
মঙ্গলা তাদের বাড়ির কাজের দিদি — অর্থাৎ নিম্নবিত্ত, সম্ভবত দরিদ্র পরিবারের মানুষ। তার চৌদ্দ বছরের মেয়েকে মাঝরাতে বস্তি থেকে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এটি একটি গুরুতর অপরাধ — সম্ভবত অপহরণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা। এই ঘটনার খোঁজ খবর করতে চেয়েছিলেন কবি। কিন্তু বনমালীবাবু কি সাহায্য করেছিলেন?
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“বনমালীবাবু শুনলেন কি শুনলেন না, / তার ঘরে তখন মিটিং, মন্ত্রীর জন্মদিন / যত বছর বয়েস ততগুলি গাজিপুরী গোলাপ / নাকি রক্তকমল দিয়ে মালা গাঁথা হবে— / এই নিয়ে আলোচনা। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরি কলা। / ‘সিঙ্গাপুরী কলা দিয়ে জন্মদিনের মালা হোক’, / এই বলে খোলা জানলার ওপাশ থেকে কে যেন ছুটে পালালো। / তারপর হৈ হৈ হাতাহাতি, চিৎকার, আস্ফালন / মঙ্গলার মেয়ের খোঁজ আর নেওয়া গেল না।” পঞ্চম স্তবকে কবি বনমালীবাবুর উদাসীনতার চিত্র এঁকেছেন। তিনি শুনলেন কি শুনলেন না — বোঝা গেল না। তার ঘরে তখন মিটিং চলছে — মন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে কী ধরনের মালা গাঁথা হবে, তা নিয়ে আলোচনা। যত বছর বয়েস ততগুলি গাজিপুরী গোলাপ, নাকি রক্তকমল দিয়ে মালা গাঁথা হবে — এই নিয়ে আলোচনা। এর মধ্যে কেউ একজন বলে উঠল — সিঙ্গাপুরি কলা দিয়ে মালা হোক। তারপর হৈ হৈ, হাতাহাতি, চিৎকার, আস্ফালন। আর মঙ্গলার মেয়ের খোঁজ নেওয়া গেল না।
মন্ত্রীর জন্মদিনের তাৎপর্য
মন্ত্রীর জন্মদিন উদযাপন — এটি ক্ষমতাবানদের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার একটি উপলক্ষ। বনমালীবাবু সেই অনুষ্ঠানের আয়োজনে ব্যস্ত। তার কাছে মঙ্গলার মেয়ের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো মন্ত্রীর জন্মদিনের মালা। এটি ক্ষমতাবানদের অগ্রাধিকারের একটি চিত্র — যারা ক্ষমতাবান, তাদের অনুষ্ঠানই গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণ মানুষের সমস্যা নয়।
গোলাপ, রক্তকমল, সিঙ্গাপুরি কলার তাৎপর্য
গোলাপ, রক্তকমল, সিঙ্গাপুরি কলা — এসব দিয়েই মালা গাঁথার আলোচনা। এগুলো বিলাসবহুল, দামি, সৌন্দর্যময়। কিন্তু মঙ্গলার মেয়ের জন্য কোনো সৌন্দর্য নেই, কোনো গুরুত্ব নেই। এই বৈপরীত্য কবিতাকে এক তীব্র ব্যঙ্গাত্মক মাত্রা দিয়েছে।
হৈ হৈ হাতাহাতি, চিৎকার, আস্ফালনের তাৎপর্য
মালা গাঁথার বিষয় নিয়ে এত হৈ হৈ, হাতাহাতি, চিৎকার, আস্ফালন। কিন্তু মঙ্গলার মেয়ের অপহরণ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এটি সমাজের মূল্যবোধের এক তীব্র সমালোচনা — ক্ষমতাবানদের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তুমুল আলোচনা, কিন্তু সাধারণ মানুষের বড় সমস্যা নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীনতা।
ষষ্ঠ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“কোনদিন কোনো খোঁজই, কোনো সমাধানই / বনমালীবাবুর কাছে পাওয়া যায়নি / কোনোদিন পাওয়া যাবেও বলে মনে হয় না।” ষষ্ঠ স্তবকে কবি তার অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্তে এসেছেন — বনমালীবাবুর কাছে কোনোদিন কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি, কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। এবং ভবিষ্যতেও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এটি একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার সিদ্ধান্ত।
সপ্তম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আপনারা আমাকে অনুরোধ করবেন না। / আমি বনমালীবাবুর কাছে যাবো না।” সপ্তম স্তবকে কবি প্রথম স্তবকে ফিরে গেছেন। তিনি আবার বলছেন — তাকে অনুরোধ করবেন না, তিনি বনমালীবাবুর কাছে যাবেন না। এই পুনরাবৃত্তি কবিতাকে একটি চক্রাকার রূপ দিয়েছে। শুরুতে যা বলেছিলেন, শেষেও তাই বলেছেন। কিন্তু এখন আমরা জানি কেন তিনি যাবেন না।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“একটি অরাজনৈতিক কবিতা” নামের বিপরীতে অত্যন্ত রাজনৈতিক একটি কবিতা। এটি ক্ষমতা, বৈষম্য, উচ্চবিত্তের উদাসীনতা ও নিম্নবিত্তের প্রতি উপেক্ষার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। বনমালীবাবু চরিত্রের মাধ্যমে কবি সেই উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, যারা সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে বটে, কিন্তু তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের মাঝে সেই আলোচনা কখনো বাস্তবে রূপ নেয় না। মঙ্গলার মেয়ের ঘটনা সেই বাস্তবতা — যেখানে একটি চৌদ্দ বছরের মেয়ে মাঝরাতে অপহৃত হয়, কিন্তু ক্ষমতাবানদের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো মন্ত্রীর জন্মদিনের মালা কী দিয়ে হবে। এই বৈপরীত্য কবিতাকে এক অসাধারণ ব্যঙ্গাত্মক মাত্রা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কবি সিদ্ধান্তে এসেছেন — বনমালীবাবুর কাছে কোনোদিন কোনো খোঁজ পাওয়া যাবে না, কোনো সমাধান পাওয়া যাবে না। তাই তিনি আর বনমালীবাবুর কাছে যাবেন না।
একটি অরাজনৈতিক কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: একটি অরাজনৈতিক কবিতার লেখক কে?
একটি অরাজনৈতিক কবিতার লেখক তারাপদ রায় (১৯৩৬-২০০৭)। তিনি বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যখন সময় তখন’ (১৯৬৮) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অবশেষে তুমি’, ‘পৃথিবীর দিকে’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘দুঃখীরা কথা বলে’ প্রভৃতি। তার কবিতায় সমাজের নানা অসঙ্গতি, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে।
প্রশ্ন ২: একটি অরাজনৈতিক কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
একটি অরাজনৈতিক কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো ক্ষমতা, বৈষম্য, উচ্চবিত্তের উদাসীনতা ও নিম্নবিত্তের প্রতি উপেক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বনমালীবাবু চরিত্রের মাধ্যমে কবি সেই উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, যারা সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে বটে, কিন্তু তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের মাঝে সেই আলোচনা কখনো বাস্তবে রূপ নেয় না। মঙ্গলার মেয়ের অপহরণের ঘটনা প্রমাণ করে — ক্ষমতাবানদের কাছে সাধারণ মানুষের সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
প্রশ্ন ৩: বনমালীবাবু চরিত্রটি কীসের প্রতীক?
বনমালীবাবু চরিত্রটি উচ্চবিত্ত, ক্ষমতাবান ও উদাসীন সমাজের প্রতীক। তিনি বুদ্ধিমান, বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন, সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন কিন্তু কোনো সমাধান দেন না। তিনি ক্ষমতাবানদের সাথে সম্পর্ক রাখেন, তাদের অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তার কাছে মন্ত্রীর জন্মদিনের মালা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, মঙ্গলার মেয়ের অপহরণ নয়।
প্রশ্ন ৪: ‘মঙ্গলার মেয়ের খোঁজ আর নেওয়া গেল না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘মঙ্গলার মেয়ের খোঁজ আর নেওয়া গেল না’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি নিম্নবিত্তের প্রতি সমাজের উদাসীনতা তুলে ধরেছেন। মঙ্গলা তাদের বাড়ির কাজের দিদি — নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষ। তার চৌদ্দ বছরের মেয়ে অপহৃত হয়েছে, কিন্তু বনমালীবাবুর মতো ক্ষমতাবানদের কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো মন্ত্রীর জন্মদিনের মালা। তাই মঙ্গলার মেয়ের খোঁজ নেওয়া গেল না।
প্রশ্ন ৫: ‘বনমালীবাবু ভদ্রলোকটি বড় বুদ্ধিমান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘বনমালীবাবু ভদ্রলোকটি বড় বুদ্ধিমান’ — এই পঙ্ক্তিতে একটি গভীর ব্যঙ্গ লুকিয়ে আছে। বুদ্ধিমান বলতে এখানে চালাক, নিজের স্বার্থ বুঝে চলা, সাধারণ মানুষের সমস্যা এড়িয়ে চলা বোঝানো হয়েছে। বনমালীবাবু এত বুদ্ধিমান যে তিনি মঙ্গলার মেয়ের সমস্যা শুনলেন কি শুনলেন না, তা বোঝা গেল না। তিনি বুদ্ধি করে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন, নিজের বিলাসবহুল জীবন নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন।
প্রশ্ন ৬: কবিতার শিরোনাম ‘একটি অরাজনৈতিক কবিতা’ কেন?
কবিতার শিরোনাম ‘একটি অরাজনৈতিক কবিতা’ একটি ব্যঙ্গাত্মক শিরোনাম। কবিতাটি নামে অরাজনৈতিক হলেও আসলে এটি অত্যন্ত রাজনৈতিক। এটি ক্ষমতা, বৈষম্য, উচ্চবিত্তের উদাসীনতা ও নিম্নবিত্তের প্রতি উপেক্ষার বিরুদ্ধে এক তীব্র রাজনৈতিক সচেতন কবিতা। শিরোনামের ‘অরাজনৈতিক’ শব্দটি পাঠকের মনে একটি কৌতূহল তৈরি করে এবং কবিতা পড়ার পর সেই কৌতূহলের জবাব মেলে।
প্রশ্ন ৭: তারাপদ রায় সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
তারাপদ রায় (১৯৩৬-২০০৭) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৭ নভেম্বর বৃহত্তর রংপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যখন সময় তখন’ (১৯৬৮) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার কবিতায় সমাজের নানা অসঙ্গতি, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ট্যাগস: একটি অরাজনৈতিক কবিতা, তারাপদ রায়, তারাপদ রায়ের কবিতা, একটি অরাজনৈতিক কবিতা তারাপদ রায়, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, ব্যঙ্গাত্মক কবিতা, সামাজিক বৈষম্যের কবিতা, বনমালীবাবু






