কবিতার খাতা
অনুরোধ – পল্লীকবি জসীমউদ্দীন।
তুমি কি আমার গানের সুরের
পূবালী বাতাস হবে,
তুমি কি আমার মনের বনের
বাঁশীটি হইয়া রবে!
রাঙা অধরের রামধনুটিরে,
ছড়াবে কি তুমি মোর মেঘ-নীড়ে,
আমি কি তোমার কবি হব রাণী,
তুমি কি কবিতা হবে;
তুমি কি আমার মনের বনের
বাঁশীটি হইয়া রবে!
তুমি কি আমার মালার ফুলের
ফিরিবে গন্ধ বয়ে,
হাসিবে কি তুমি মোর কপালের
চন্দন ফোঁটা হয়ে!
তুমি কি আমার নীলাকাশ পরে,
ফুটাবে কুসুম সারারাত ভরে,
সাঁঝ-সকালের রাঙা মেঘ ধরে
অঙ্গে জড়ায়ে লবে;
তুমি কি আমার মনের বনের
বাঁশীটি হইয়া রবে!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতা।
কবিতার কথা-
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ‘অনুরোধ’ কবিতাটি মূলত গভীর প্রেম, আত্মিক ব্যাকুলতা এবং প্রকৃতির অনুষঙ্গে সাজানো এক অনন্য রোমান্টিক নিবেদন। কবি এখানে তাঁর হৃদয়ের সুপ্ত ভালোবাসাকে গ্রামীণ প্রকৃতির অতি সাধারণ অথচ চিরসুন্দর উপাদানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। মনের অবিন্যস্ত আবেগকে সুরে বাঁধার জন্য এবং জীবনের নিঃসঙ্গতাকে দূর করার জন্য প্রিয়তমার উপস্থিতি এখানে একান্তভাবে কামনা করা হয়েছে। প্রিয়তমা যেন কেবল সাধারণ কোনো মানুষ নন, বরং কবির সমস্ত সৃষ্টিশীলতা, গান ও অনুভূতির মূল প্রেরণা।
কবিতাটিতে প্রেম ও প্রকৃতি একাকার হয়ে গেছে। কবি জানতে চেয়েছেন, প্রিয়তমা তাঁর গানের সুরের পূবালী বাতাস কিংবা মনের বনের বাঁশি হয়ে সুর তুলবে কি না। বিষণ্ণ মেঘের মতো হৃদয়ে তিনি প্রিয়তমার রাঙা অধরের রামধনু রঙের আলো ছড়াতে চান। কবি নিজেকে ‘কবি’ এবং প্রিয়তমাকে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ‘কবিতা’ হিসেবে কল্পনা করে এক চিরন্তন সম্পর্কের বন্ধনে জড়াতে চেয়েছেন। এখানে প্রিয়তমাকে জীবনের প্রতিটি শূন্যতা ও পূর্ণতার মাঝে পাওয়ার এক আকুল আর্তি প্রকাশ পেয়েছে।
শেষাংশে কবির এই চাওয়ার পরিধি আরও বিস্তৃত ও গভীর হয়েছে। তিনি প্রিয়তমাকে তাঁর গলার মালার সুবাস, কপালের পবিত্র চন্দন ফোঁটা কিংবা রাতের আকাশে ফুটে থাকা তারার মতো করে সারাক্ষণ পাশে পেতে চান। সকাল-সন্ধ্যার রাঙা মেঘের মতো মায়াবী রূপে প্রিয়তমা যেন কবিকে জড়িয়ে রাখে, এই আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে। কোনো জাগতিক ঐশ্বর্য নয়, বরং প্রিয় মানুষটি যেন তাঁর জীবনের সুর, ছন্দ ও সৌন্দর্যের একমাত্র উৎস হয়ে চিরকাল পাশে থাকে—এটাই এই কবিতার মূল সুর।






