কবিতার খাতা
কে চায় তোমাকে পেলে – মহাদেব সাহা।
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায়
বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন
জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান,
কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে?
তোমার স্বীকৃতি পেলে কে চায় মঞ্চের মালা
কে চায় তাহলে আর মানপত্র তোমার হাতের চিঠি পেলে,
তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো কে চায় বৃক্ষের ছায়া
তোমার শুশ্রূষা পেলে কে চায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো,
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ চায় শ্রেষ্ঠ পদ
কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন,
তোমার প্রশ্রয় পেলে কে চায় লোকের করুণা
বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট?
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়,
কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মহাদেব সাহা।
কে চায় তোমাকে পেলে – মহাদেব সাহা | কে চায় তোমাকে পেলে কবিতা মহাদেব সাহা | মহাদেব সাহার কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | প্রেমের কবিতা | মূল্যবোধের কবিতা | ভালোবাসার শ্রেষ্ঠত্বের কবিতা
কে চায় তোমাকে পেলে: মহাদেব সাহার প্রেম, মূল্যবোধ ও ভালোবাসার শ্রেষ্ঠত্বের অসাধারণ কাব্যভাষা
মহাদেব সাহার “কে চায় তোমাকে পেলে” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও শক্তিশালী প্রেমের কবিতা। “বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায় / বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন / জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান, / কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে?” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে প্রেমের তুলনায় সব পার্থিব মূল্যবোধের তুচ্ছতা, স্বর্ণসিংহাসন, জয়ের শিরোপা, খ্যাতির সম্মান, সোনার খনি — সব কিছু ত্যাগ করার ঘোষণা, এবং শেষ পর্যন্ত প্রেমিকার কাছে স্থান পেলেই সব পাওয়ার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। মহাদেব সাহা (১৯৪০-২০২০) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় প্রেম, মূল্যবোধ, জীবনদর্শন, এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানবিক আবেগের মেলবন্ধন গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। “কে চায় তোমাকে পেলে” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি প্রেমের কাছে সব পার্থিব মূল্যবোধকে তুচ্ছ বলে ঘোষণা করেছেন।
মহাদেব সাহা: প্রেম, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের কবি
মহাদেব সাহা ১৯৪০ সালের ১৬ অক্টোবর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘একা’ (১৯৭০), ‘বেঁচে আছি এই তো আনন্দ’ (১৯৭৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৮৫), ‘প্রেমের কবিতা’ (১৯৯০), ‘তোমাকে ভুলতে চেয়ে আরো বেশী ভালোবেসে ফেলি’ (১৯৯৫), ‘কে চায় তোমাকে পেলে’ (২০০০), ‘আমার কবিতা’ (২০০৫) সহ আরও অসংখ্য গ্রন্থ। তিনি ২০২০ সালের ১২ মে মৃত্যুবরণ করেন।
মহাদেব সাহার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রেমের গভীর উপলব্ধি, মূল্যবোধের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ, সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় দার্শনিক সত্য প্রকাশ, এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানবিক আবেগের মেলবন্ধন। ‘কে চায় তোমাকে পেলে’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি প্রেমের কাছে সব পার্থিব মূল্যবোধকে তুচ্ছ বলে ঘোষণা করেছেন।
কে চায় তোমাকে পেলে: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘কে চায় তোমাকে পেলে’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একটি প্রশ্ন — তুমি (প্রেমিকা) পেলে কে আর অন্য কিছু চায়? অর্থাৎ প্রেমিকা পাওয়ার পর সব পার্থিব সম্পদ, খ্যাতি, সম্মান কিছুই তুচ্ছ হয়ে যায়।
কবি শুরুতে বলছেন — বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায়। বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন, জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান। কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে?
তোমার স্বীকৃতি পেলে কে চায় মঞ্চের মালা। কে চায় তাহলে আর মানপত্র তোমার হাতের চিঠি পেলে। তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো কে চায় বৃক্ষের ছায়া। তোমার শুশ্রূষা পেলে কে চায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো।
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ চায় শ্রেষ্ঠ পদ। কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন। তোমার প্রশ্রয় পেলে কে চায় লোকের করুণা। বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট?
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়। কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!
কে চায় তোমাকে পেলে: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: অর্থ-পদ, স্বর্ণসিংহাসন, জয়ের শিরোপা, খ্যাতির সম্মানের তুলনায় প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব
“বলো না তোমাকে পেলে কোন مূর্খ অর্থ-পদ চায় / বলো কে চায় তোমাকে فেলে স্বর্ণসিংহাসন / জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান, / كے چায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে?”
প্রথম স্তবকে অর্থ-পদ, স্বর্ণসিংহাসন, জয়ের শিরোপা, খ্যাতির সম্মানের তুলনায় প্রেমের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে। ‘বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায়’ — বলো না, তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায়। ‘বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন’ — বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন। ‘জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান’ — জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান। ‘কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে?’ — কে চায় সোনার খনি, তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা (সোনার চাঁপা ফুল) পেলে?
দ্বিতীয় স্তবক: স্বীকৃতি, মঞ্চের মালা, মানপত্র, হাতের চিঠির তুলনায় প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব
“تومার স্বীকৃতি পেলে كے چায় مঞ্চের ماله / كے چায় তাহলে আর মানپتر তোমার হাতের চিঠি পেলে, / তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো كے چায় বৃক্ষের ছায়া / তোমার শুশ্রূষা পেলে كے چায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো,”
দ্বিতীয় স্তবকে স্বীকৃতি, মঞ্চের মালা, মানপত্র, হাতের চিঠির তুলনায় প্রেমের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে। ‘تومার স্বীকৃতি পেলে كے چায় মঞ্চের মালা’ — তোমার স্বীকৃতি পেলে কে চায় মঞ্চের মালা। ‘কে চায় তাহলে আর মানপত্র তোমার হাতের চিঠি পেলে’ — কে চায় তাহলে আর মানপত্র, তোমার হাতের চিঠি পেলে। ‘تومار স্নেহের ছায়া পেলে বলো كے چায় বৃক্ষের ছায়া’ — তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো কে চায় বৃক্ষের ছায়া। ‘تومار শুশ্রূষা পেলে كے چায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো’ — তোমার শুশ্রূষা পেলে কে চায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো।
তৃতীয় স্তবক: শ্রেষ্ঠ পদ, স্বীকৃতি, মিথ্যা সমর্থন, লোকের করুণার তুলনায় প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব
“بولو না তোমাকে پেলে কোন مূর্খ چায় শ্রেষ্ঠ পদ / كے چায় তাহলে بولو স্বীকৃতি বা مিথ্যা সমর্থন, / তোমার প্রশ্রয় পেলে كے چায় লোকের كرুণا / بولو كے چায় তোমাকে فেলে স্বর্ণمুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট?”
তৃতীয় স্তবকে শ্রেষ্ঠ পদ, স্বীকৃতি, মিথ্যা সমর্থন, লোকের করুণার তুলনায় প্রেমের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে। ‘বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ চায় শ্রেষ্ঠ পদ’ — বলো না, তোমাকে পেলে কোন মূর্খ চায় শ্রেষ্ঠ পদ। ‘কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন’ — কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন। ‘تومار প্রশ্রয় পেলে كے چায় লোকের করুণা’ — তোমার প্রশ্রয় পেলে কে চায় লোকের করুণা। ‘بولو كے چায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট?’ — বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট?
চতুর্থ স্তবক: প্রেমিকার বুকে স্থান পেলে সব পাওয়া
“بولو না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়, / كے আর তোমার বুকে স্থان پেলে অন্যখানে যায়!”
চতুর্থ স্তবকে প্রেমিকার বুকে স্থান পেলে সব পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ‘বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়’ — বলো না, তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়। ‘কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!’ — কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে অর্থ-পদ, স্বর্ণসিংহাসন, জয়ের শিরোপা, খ্যাতির সম্মানের তুলনায় প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব, দ্বিতীয় স্তবকে স্বীকৃতি, মঞ্চের মালা, মানপত্র, হাতের চিঠির তুলনায় প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব, তৃতীয় স্তবকে শ্রেষ্ঠ পদ, স্বীকৃতি, মিথ্যা সমর্থন, লোকের করুণার তুলনায় প্রেমের শ্রেষ্ঠত্ব, চতুর্থ স্তবকে প্রেমিকার বুকে স্থান পেলে সব পাওয়া।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কথ্যরীতির কাছাকাছি, কিন্তু গভীর আবেগে পরিপূর্ণ। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘অর্থ-পদ’, ‘স্বর্ণসিংহাসন’, ‘জয়ের শিরোপা’, ‘খ্যাতির সম্মান’, ‘সোনার খনি’, ‘স্বর্ণচাঁপা’, ‘স্বীকৃতি’, ‘মঞ্চের মালা’, ‘মানপত্র’, ‘হাতের চিঠি’, ‘স্নেহের ছায়া’, ‘বৃক্ষের ছায়া’, ‘শুশ্রূষা’, ‘সুস্থতার ছাড়পত্র’, ‘শ্রেষ্ঠ পদ’, ‘মিথ্যা সমর্থন’, ‘প্রশ্রয়’, ‘লোকের করুণা’, ‘স্বর্ণমুদ্রা’, ‘রাজ্যপাট’, ‘বুকে স্থান’।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘অর্থ-পদ’ — সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতীক। ‘স্বর্ণসিংহাসন’ — রাজত্ব, ক্ষমতার প্রতীক। ‘জয়ের শিরোপা’ — বিজয়ের গৌরবের প্রতীক। ‘খ্যাতির সম্মান’ — নাম-যশের প্রতীক। ‘সোনার খনি’ — অপরিমেয় সম্পদের প্রতীক। ‘স্বর্ণচাঁপা’ — প্রেমিকার সৌন্দর্যের প্রতীক, প্রেমের মূল্যের প্রতীক। ‘স্বীকৃতি’ — সামাজিক স্বীকৃতির প্রতীক। ‘মঞ্চের মালা’ — সম্মানের প্রতীক। ‘মানপত্র’ — সরকারি বা সামাজিক সম্মাননার প্রতীক। ‘হাতের চিঠি’ — প্রেমিকার ব্যক্তিগত স্পর্শের প্রতীক। ‘স্নেহের ছায়া’ — প্রেমের স্নেহের প্রতীক। ‘বৃক্ষের ছায়া’ — প্রকৃতির সাধারণ আশ্রয়ের প্রতীক। ‘শুশ্রূষা’ — যত্ন, সেবার প্রতীক। ‘সুস্থতার ছাড়পত্র’ — আরোগ্যের নিশ্চয়তার প্রতীক। ‘শ্রেষ্ঠ পদ’ — সর্বোচ্চ অবস্থানের প্রতীক। ‘মিথ্যা সমর্থন’ — ভুয়া প্রশংসার প্রতীক। ‘প্রশ্রয়’ — পৃষ্ঠপোষকতার প্রতীক। ‘লোকের করুণা’ — অন্যের দয়ার প্রতীক। ‘স্বর্ণমুদ্রা’ — অর্থের প্রতীক। ‘রাজ্যপাট’ — রাজত্বের প্রতীক। ‘বুকে স্থান’ — প্রেমিকার সান্নিধ্যের প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘বলো না’ — প্রতিটি স্তবকের শুরুতে পুনরাবৃত্তি প্রশ্নের জোরালোতা নির্দেশ করে। ‘কে চায়’ — প্রতিটি স্তবকের পুনরাবৃত্তি তুলনার জোরালোতা নির্দেশ করে।
শেষের ‘কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাপ্তি। প্রেমিকার বুকে স্থান পেলে আর অন্য কিছু চাওয়ার প্রয়োজন নেই।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“কে চায় তোমাকে পেলে” মহাদেব সাহার এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি প্রেমের কাছে সব পার্থিব মূল্যবোধকে তুচ্ছ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলছেন — বলো না, তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায়। বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন, জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান। কে চায় সোনার খনি, তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে?
তোমার স্বীকৃতি পেলে কে চায় মঞ্চের মালা। কে চায় তাহলে আর মানপত্র, তোমার হাতের চিঠি পেলে। তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো কে চায় বৃক্ষের ছায়া। তোমার শুশ্রূষা পেলে কে চায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো।
বলো না, তোমাকে পেলে কোন মূর্খ চায় শ্রেষ্ঠ পদ। কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন। তোমার প্রশ্রয় পেলে কে চায় লোকের করুণা। বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট?
বলো না, তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়। কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!
এই কবিতা আমাদের শেখায় — প্রেমের তুলনায় সব পার্থিব মূল্যবোধ তুচ্ছ। স্বর্ণসিংহাসন, জয়ের শিরোপা, খ্যাতির সম্মান, সোনার খনি, মঞ্চের মালা, মানপত্র, বৃক্ষের ছায়া, সুস্থতার ছাড়পত্র, শ্রেষ্ঠ পদ, স্বীকৃতি, মিথ্যা সমর্থন, লোকের করুণা, স্বর্ণমুদ্রা, রাজ্যপাট — সব কিছু প্রেমের কাছে মূল্যহীন। প্রেমিকার বুকে স্থান পেলেই সব পাওয়া যায়।
মহাদেব সাহার কবিতায় প্রেম ও মূল্যবোধ
মহাদেব সাহার কবিতায় প্রেম ও মূল্যবোধ একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘কে চায় তোমাকে পেলে’ কবিতায় প্রেমের কাছে সব পার্থিব মূল্যবোধকে তুচ্ছ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে অর্থ, ক্ষমতা, খ্যাতি, সম্মান, স্বীকৃতি — সব কিছু প্রেমের কাছে মূল্যহীন, কীভাবে প্রেমিকার বুকে স্থান পেলেই সব পাওয়া যায়।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে মহাদেব সাহার ‘কে চায় তোমাকে পেলে’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের প্রেমের গভীরতা, মূল্যবোধের বিশ্লেষণ, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
কে চায় তোমাকে পেলে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: কে চায় তোমাকে পেলে কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক মহাদেব সাহা (১৯৪০-২০২০)। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘একা’ (১৯৭০), ‘বেঁচে আছি এই তো আনন্দ’ (১৯৭৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৮৫), ‘প্রেমের কবিতা’ (১৯৯০), ‘তোমাকে ভুলতে চেয়ে আরো বেশী ভালোবেসে ফেলি’ (১৯৯৫), ‘কে চায় তোমাকে পেলে’ (২০০০), ‘আমার কবিতা’ (২০০৫)।
প্রশ্ন ২: ‘বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায় না। অর্থাৎ প্রেম পাওয়ার পর সম্পদ ও ক্ষমতার মূল্য তুচ্ছ হয়ে যায়।
প্রশ্ন ৩: ‘কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘স্বর্ণচাঁপা’ — সোনার চাঁপা ফুল, প্রেমিকার বুকের সৌন্দর্যের প্রতীক। প্রেমিকার সৌন্দর্য পেলে সোনার খনির প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ৪: ‘তোমার স্বীকৃতি পেলে কে চায় মঞ্চের মালা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমিকার স্বীকৃতি পেলে আর মঞ্চের মালা (সামাজিক সম্মান) চাওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ৫: ‘তোমার হাতের চিঠি পেলে / কে চায় তাহলে আর মানপত্র’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমিকার হাতের চিঠি পেলে আর মানপত্র (সরকারি সম্মাননা) চাওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ৬: ‘তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো কে চায় বৃক্ষের ছায়া’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমিকার স্নেহের ছায়া পেলে আর বৃক্ষের ছায়া (প্রকৃতির সাধারণ আশ্রয়) চাওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ৭: ‘তোমার শুশ্রূষা পেলে কে চায় সুস্থতার ছাড়পত্র’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমিকার শুশ্রূষা (যত্ন) পেলে আর সুস্থতার ছাড়পত্র (আরোগ্যের নিশ্চয়তা) চাওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ৮: ‘কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেম পেলে আর স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন চাওয়ার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ৯: ‘কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমিকার বুকে স্থান পেলে আর অন্য কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা থাকে না। এটি প্রেমের চূড়ান্ত প্রকাশ।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — প্রেমের তুলনায় সব পার্থিব মূল্যবোধ তুচ্ছ। স্বর্ণসিংহাসন, জয়ের শিরোপা, খ্যাতির সম্মান, সোনার খনি, মঞ্চের মালা, মানপত্র, বৃক্ষের ছায়া, সুস্থতার ছাড়পত্র, শ্রেষ্ঠ পদ, স্বীকৃতি, মিথ্যা সমর্থন, লোকের করুণা, স্বর্ণমুদ্রা, রাজ্যপাট — সব কিছু প্রেমের কাছে মূল্যহীন। প্রেমিকার বুকে স্থান পেলেই সব পাওয়া যায়। আজকের বস্তুবাদী পৃথিবীতে — যেখানে মানুষ সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতির পেছনে ছুটে — এই কবিতা প্রেমের প্রকৃত মূল্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ট্যাগস: কে চায় তোমাকে পেলে, মহাদেব সাহা, মহাদেব সাহার কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, প্রেমের কবিতা, মূল্যবোধের কবিতা, ভালোবাসার শ্রেষ্ঠত্বের কবিতা, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: মহাদেব সাহা | কবিতার প্রথম লাইন: “বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায় / বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন / জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান” | প্রেম ও মূল্যবোধের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






