কবিতার খাতা
ভালোবাসা – আবুল হাসান।
আবার এসেছি আমি। বসে আছি তোমার উঠোনে :
প্রোথিত শিকড় নিম্নে : ঊর্ধ্বে তরু, পাতার প্রতীকে
ধুঁকে ধুঁকে আমি আজো অবকাশ, বসন্তবাতাস, ঋতু, সবুজ ঝালর
জানি না কিসের কান্না : শিকড়ে ও সঘন বাকলে
তবু চলে স্ববিরোধ, —যদি চাই ভ্রূণমাটি, —অন্তরীণ আঘাতে লবণ
তখন আমাকে দেয় অনাবৃষ্টি, ক্ষণমৃত্যু, বৈশাখের বিলোল দহন!
ভেতরে দ্বিধায় ক্ষেত্র : বাইরে তাই একা একা যতদূর পারি
নিজেকে নিবিষ্ট করি, শব্দে শূন্যে স্বভাবে ও অভাবে একক
তোমাতে স্থির হই, কিন্তু নিচে ভিন্নদেশ আমাতে চঞ্চল!
চেপে যাই! তবু একি অস্থিরতা, অন্তরালে এ কী ঝড় বয়!
ভাঙ্গে, খণ্ড খণ্ড করে যেন সব নিয়ন্ত্রিত গোপন বিন্যাস
আমাতে লুকিয়ে ছিল : আজ তারা অকস্মাৎ এদিকে ওদিকে
খুলে পড়ে, পাখি, বীজ, অমরতা, লৌহবোধ, শক্তির বিকাশ!
আর আমি পড়ে থাকি একা একা দ্রবীভূত আত্মার কানন,
আমাকে দেখে না কেউ : না পুষ্প, না ফলশ্রুতি—অদৃশ্য হাওয়ার
স্বেচ্ছাচার ধীরে ধীরে গিলে খায়—নিয়তিও আমাকে অস্থির
বধির বিনাশে রেখে ধাবমান, দ্যাখো ঐ, ঐ ধাবমান!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আবুল হাসানের কবিতা।
কবিতার কথা –
আবুল হাসানের ‘ভালোবাসা’ কবিতাটি প্রেম, অস্তিত্বের টানাপোড়েন এবং অন্তর্জগতের গভীর দ্বন্দ্ব ও ক্ষয়িষ্ণু বেদনার এক প্রগাঢ় কাব্যিক অন্বেষণ। সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান এই কবির কবিতায় ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং সত্তার অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধ যেভাবে ফুটে ওঠে, এই কবিতাতেও তা অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
কবিতার শুরুতেই কবি নিজেকে প্রকৃতির এক রূপক—একটি বৃক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা প্রিয়তমার উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। তার শিকড় গভীরে প্রোথিত, আর ঊর্ধ্বে পাতার প্রতীকে জেগে আছে বাঁচবার ব্যাকুলতা। কিন্তু এই ব্যাকুলতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর ক্ষয় ও যন্ত্রণা। সবুজ ঝালর বা বসন্ত বাতাসের প্রচ্ছদে জীবন চললেও, অস্তিত্বের গভীরে—শিকড়ে ও বাকলে অবিরাম কান্না জমে থাকে। প্রকৃতি ও মৃত্তিকা যেখানে লালন করার কথা, সেখানে কবি পান অনাবৃষ্টি, ক্ষণমৃত্যু আর বৈশাখের দহন। অর্থাৎ ভালোবাসার আকুতি সত্ত্বেও কবি পায় কেবল আত্মিক দহন ও যন্ত্রণা।
কবিতাটিতে ভালোবাসা এবং মানুষের ভেতরের দ্বৈততার এক অপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। কবি বাইরে নিজেকে শান্ত, নিবিষ্ট ও শব্দ-শূন্যে স্থির রাখার চেষ্টা করেন; প্রিয়তমাতে স্থির হতে চান। কিন্তু তাঁর ভেতরের “ভিন্নদেশ” বা অবচেতন মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ভালোবাসার ভেতরে যে এক গভীর আত্মনিয়ন্ত্রণ থাকে, অন্তরালের প্রবল ঝড় সেই গোপন বিন্যাসকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেয়। কবির ভেতরে লুকিয়ে থাকা শক্তি, সম্ভাবনা, স্মৃতি ও লৌহবোধের মতো জমাট অনুভূতিগুলো অকস্মাৎ এলোমেলো হয়ে খুলে পড়ে।
কবিতার শেষাংশে এসে কবি এক চরম নিঃসঙ্গতা ও আত্মবিলোপের মুখোমুখি হন। ঝড় আর অন্তর্দ্বন্দ্বে সব বিদীর্ণ হয়ে যাওয়ার পর কবি যেন এক দ্রবীভূত আত্মার কানন হয়ে একা পড়ে থাকেন। চারপাশের ফুল, ফল কিংবা স্বাভাবিক বিশ্বসংসার কেউ তাঁর এই অন্তর্নিহিত ক্ষয় দেখতে পায় না। সময়ের অবলীলা আর নিয়তির নিষ্ঠুর ধাবমান গতি তাঁকে এক বধির বিনাশের দিকে ঠেলে দেয়। আবুল হাসান ভালোবাসাকে কেবল এক প্রাপ্তি বা আনন্দের অনুভূতি হিসেবে দেখেননি; বরং ভালোবাসার গভীরে লুকিয়ে থাকা অস্তিত্বের স্ববিরোধ, বিচ্ছেদ এবং অন্তর্জগতের এই ধসে পড়াকেই এক চিরন্তন ও করুণ সত্য হিসেবে উন্মোচিত করেছেন।






