কবিতার খাতা
এখন খোলা আকাশ – অরুণ মিত্র।
চাঁদোয়ার লতাফুল গলে গিয়েছে
এখন খোলা আকাশ,
চাঁদ তারা সূর্য মেঘ ধ্বনির একই নীলে ভাসে,
এই নতুন শূন্যে আমি তাদের কাছাকাছি
বিলম্বিত লয়ে আমার স্বপ্ন অন্য সংসারে,
মহাজগতের কোনো ঘর
অসীম প্রান্তরের মর্মরে উদ্ভাসিত,
আমি দিনরাতের সীমানা পার হয়ে চলি।
কিন্তু বৃষ্টি নামে।
হালকা সাদা মেঘ এমন ঘনঘোর হবে কে জানত?
আষাঢ় শ্রাবণ কলস্বরে ঝাঁপিয়ে পড়ে
আমার চোখে মুখে চেতনায়,
ঘুমন্ত উপকূল ভাসিয়ে সমুদ্রও এসে যায়
আর বাতাসে ভরে পঞ্চমুখী শাঁখ;
গুরুগুরু মেঘ সমুদ্র হৃৎপিণ্ড
ধমনীর বিদ্যুৎ গমক
উতরোল নির্জনতা।
বৃষ্টি থামে।
ঘাসের ডগায় কচুপাতায় টলটলে ফোঁটা,
সুস্থির নিশ্বাসে তাদের ধরে রাখতে হয়;
আলোর দিকে অন্ধকারের দিকে মিড়
আমাদের চিরকালের আপন বসুন্ধরা
ললিত রঙের ছটা পুবে
পটদীপে সাজানো সন্ধ্যা
গম্ভীর রাত্রি যোগে আবিষ্ট প্রাণ।
কখন আমি চোখ বন্ধ করেছি জানি না,
উত্তরঙ্গ পথের ওপর শান্তির আভা ফুটছে দেখি।
পাশ থেকে কে একজন জিজ্ঞেস করে কটা বাজল;
কী করে বলব?
আমি তো সময়ের আরম্ভে রয়েছি।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। অরুণ মিত্রের কবিতা।
কবিতার কথা-
অরুণ মিত্রের ‘এখন খোলা আকাশ’ কবিতাটি মানুষের চেতনা, প্রকৃতির রূপান্তর এবং মহাজাগতিক ও লৌকিক সময়ের এক অপূর্ব আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। প্রথাগত কৃত্রিমতার আবরণ সরিয়ে প্রকৃতির মুক্ত রূপ এবং মানুষের আত্মার অসীম যাত্রাকে কবি এখানে অতি প্রাঞ্জল অথচ গভীর দর্শনে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবিতার শুরুতে কৃত্রিমতার দেয়াল বা “চাঁদোয়ার লতাফুল” গলে গিয়ে এক উন্মুক্ত ও অসীম আকাশের উন্মেষ ঘটে। চাঁদ, তারা, সূর্য ও মেঘ একই নীলিমায় ভেসে উঠলে কবি এক নতুনের মুখোমুখি হন। দিনরাতের সীমানা পার হয়ে কবির স্বপ্ন তখন অন্য এক মহাজাগতিক সংসারে বা ঘরহীন অসীম প্রান্তরে ডানা মেলে। চেতনার এই স্তরে কবি সাধারণ লৌকিক জগতের সীমানা ছাড়িয়ে যেন এক অসীম শূন্যতার কাছাকাছি পৌঁছে যান।
তবে এই অসীম ও শান্ত যাত্রার মাঝেই নেমে আসে বাস্তবতার প্রলয়ঙ্করী “বৃষ্টি”। হালকা সাদা মেঘ আচমকা ঘনঘোর হয়ে আষাঢ়-শ্রাবণের কলস্বরে কবির চোখে, মুখে ও চেতনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘনিয়ে আসা মেঘের গুরুগুরু শব্দ, ধমনীতে বিদ্যুতের গমক আর ঘুমন্ত উপকূল ভাসিয়ে সমুদ্রের আগমন যেন ভিতরের উতরোল নির্জনতাকে পঞ্চমুখী শাঁখের ধ্বনিতে জাগিয়ে তোলে। এই বৃষ্টি কেবল প্রকৃতির বর্ষণ নয়, তা মানুষের চেতনার এক প্রলয়ঙ্করি আলোড়নের রূপক।
ঝড়-বৃষ্টি থামার পর পৃথিবীতে নেমে আসে এক সুস্থির ও শান্ত রূপ। ঘাসের ডগায় ও কচুপাতায় জমতে থাকা টলটলে জলের ফোটাগুলো ধরে রাখতে হয় পরম মমতায়। পূর্ব আকাশের ললিত আলো, পটদীপে সাজানো শান্ত সন্ধ্যা আর গম্ভীর রাত্রের আবিষ্টতায় কবি তাঁর চিরকালের আপন বসুন্ধরাকে নতুন করে আবিষ্কার করেন।
কবিতার শেষাংশে এসে জীবন ও সময়ের ওপর এক পরম উপলব্ধির প্রকাশ ঘটে। জীবনের উত্তাল পথ পার হয়ে শান্তির আভা ফুটতে দেখে কবি কখন যেন চোখ বুজে ফেলেন। যখন পাশ থেকে কেউ জিজ্ঞেস করে “কটা বাজল”, কবি তখন কোনো ঘড়ির কাঁটার হিসাব দিতে পারেন না। কারণ লৌকিক ঘড়ির সময় পার হয়ে কবি তখন পৌঁছে গেছেন প্রকৃতির ও অস্তিত্বের সৃষ্টির একদম সূচনালগ্নে—যেখানে সময়ের সংজ্ঞাই বদলে যায়।






