আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান নারীবাদী কবি ও সমাজচিন্তক মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘খনাজন্ম’ কবিতাটি বাংলার লোকশ্রুতির কিংবদন্তি চরিত্র ‘খনা’ বা ‘লীলাবতী’-র জীবনকাহিনির ওপর ভিত্তি করে রচিত এক তীব্র রাজনৈতিক, সামাজিক ও নারীবাদী আখ্যান। কবি এখানে ইতিহাসের ধূসর পাতা থেকে খনার কণ্ঠস্বরকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন, যা একই সাথে আদিম পুরুষতান্ত্রিক হিংস্রতা, নারীর মেধার প্রতি সমাজের চিরন্তন ঈর্ষা এবং নারীসত্তার অবিনাশী প্রতিবাদের এক জ্বলন্ত দলিল।
কবিতার প্রারম্ভেই কবি খনার সেই বিখ্যাত বচন—”মঙ্গলে ঊষা বুধে পা / যথা ইচ্ছা তথা যা”—উদ্ধৃত করে তাঁর মুক্ত, স্বাধীন ও মেধাঋদ্ধ সত্তার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু এই স্বাধীনতাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। সিংহল বা শ্রীলঙ্কার মুক্ত পরিবেশে বড় হওয়া খনা শৈশব থেকেই ছিলেন জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শী। তাঁর প্রখর মেধার আলোয় একসময় তাঁর খেলার পুতুল বা সহপাঠী মিহির (বরাহমিহিরের পুত্র) তাঁর প্রেমিক ও স্বামীতে পরিণত হয়। বয়সের ব্যবধান বা সামাজিক নিয়মকে তোয়াক্কা না করে খনা ভালোবেসেছিলেন মিহিরকে। কিন্তু বিয়ের পর যখন তিনি ‘সভ্য’ বঙ্গদেশে শ্বশুর বরাহ এবং স্বামী মিহিরের সংসারে পা রাখেন, তখনই তাঁর মুক্ত জীবনের টুঁটি চেপে ধরে পুরুষতন্ত্রের অদৃশ্য খাঁচা।
কবিতার মধ্যভাগে নারী ও পুরুষের মেধার এক দ্বান্দ্বিক রূপ ফুটে উঠেছে। খনার রচিত কালজয়ী শ্লোক ও বচন যখন বাংলার সাধারণ ‘চাষাভুষা’ মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে ঘুরতে রাজদরবারে বিক্রমাদিত্যের কানে পৌঁছায়, তখন শ্বশুর বরাহ (যিনি রাজজ্যোতিষী) এবং স্বামী মিহির অহংকারে ও ভয়ে সিঁটিয়ে যান। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না যে, একটি গৃহবধূ বা ‘মেয়েমানুষ’ পুরুষদের চেয়ে ভালো জ্যোতিষ গণনা করবে কিংবা বচন লিখবে। রাজসভায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও ‘ঘরের আব্রু’ বাঁচানোর জন্য বরাহ খনাকে হুকুম দেন জ্যোতিষচর্চা ছেড়ে রান্নাঘরে ‘বেগুন আলু ভাতে’র কাজে আত্মনিয়োগ করতে।
এখানেই খনার ভেতরের দ্রোহ জাগ্রত হয়। খনা পরম বেদনায় উপলব্ধি করেন—সিংহলের যে মাটিতে তিনি শিরদাঁড়া সোজা করে হেঁটেছেন, সেখানে কেউ তাঁকে মেয়ে বলে হেলা করেনি। অথচ এই তথাকথিত সভ্য বঙ্গদেশে নারীর মুখশ্রী বড্ড পরাধীন, ঠুনকো আর অসহায়। খনা প্রশ্ন তোলেন—কার তৈরি নিয়মে মেয়েরা বচন বলতে পারবে না? তাঁর ভেতরের মেধার আগুনকে কতদিন ছাইচাপা দিয়ে রাখা যাবে? যে স্বামী ও শ্বশুরের জন্য তিনি অকাতরে সংসার করেছেন, রাজসম্মানের লোভে এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার দম্ভে তারাই আজ খনাকে একঘরে, কোণঠাসা করে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিতে চায়।
কবিতার শেষাংশ এক লোমহর্ষক, নৃশংস অথচ অবিনাশী সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পূর্ণতা পায়। নিজের মেধা আর সত্যের বাণী প্রকাশে খনা তাঁর ‘জিভ’ সামলাতে পারেননি। ফলস্বরূপ, রাজসভার আদেশে এবং স্বামী-শ্বশুরের মৌন সম্মতিতে খোলা মাঠে জল্লাদের তলোয়ার খনার আলজিভটা কেটে নেয়। খনা রক্তাক্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এই ‘জিভ কেটে নেওয়া’ মূলত নারীর বাকস্বাধীনতা, মেধা এবং অধিকারকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক প্রতীকী পুরুষতান্ত্রিক নৃশংসতা।
তবে কবি এই নৃশংসতায় কবিতার ইতি টানেননি। সমাপ্তিতে এসে খনার মৃত্যু এক বৈপ্লবিক রূপান্তর লাভ করে। খনা মরে গেলেও তাঁর সেই কেটে নেওয়া ‘নারীজিহ্বা’ বা প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর আজও বাংলার মাঠে-ঘাটে পড়ে কাঁদছে এবং প্রতিটি সচেতন নারীর চেতনায় আলোড়ন তুলছে। কবি খনার জবানিতেই শেষ চরণে এক অমোঘ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন—তিনি আবার ফিরে আসবেন এই বাংলায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ মেধার অপরাধে নারীর যে কান ও জিভ কেটে নিয়েছিল, সেই ‘দু’কান কাটা মেয়ে’রাই আজ শোষণের দেয়াল ভেঙে, অধিকার আদায়ের মন্ত্র নিয়ে পুনর্জন্ম গ্রহণ করবে। নারীর মেধার অবমাননা এবং তার বিপরীতে এক অনন্ত নারীশক্তির জাগরণের এক অনবদ্য দলিল এই কবিতা।
খনাজন্ম – মল্লিকা সেনগুপ্ত | মল্লিকা সেনগুপ্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | নারী জ্যোতিষী, খনা, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, নারীজিহ্বা ও প্রতিরোধের অসাধারণ কাব্যভাষা
খনাজন্ম: মল্লিকা সেনগুপ্তের খনার জ্যোতিষশাস্ত্র, পিতৃতান্ত্রিক শাসন, জিহ্বা কর্তন ও নারী মুক্তির অসাধারণ কাব্যভাষা
মল্লিকা সেনগুপ্তের “খনাজন্ম” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, শক্তিশালী ও নারীবাদী সৃষ্টি। “মঙ্গলে ঊষা বুধে পা / যথা ইচ্ছা তথা যা / নারী হয়েও জ্যোতিষী / রাগ করলেন পতিশ্রী” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে খনার (লীলাবতী) জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা, পতিশ্রীর রাগ, নবরত্ন সভার ধন, বরাহ ও মিহিরের কন্যা, নারী যদি ঘরেই শেষ হয় তাহলে ধন্য রাজার পুণ্য দেশ, ঘরের আব্রু বাঁচাতে খনায় রাখা খাঁচাতে, খাঁচা ভাঙতে ইষ্টনামের গান, রাজসভায় গিয়ে পাপ জিহ্বা কেটে নেওয়া, যেসব মেয়ে বাড়বে তাদের বাড়বেই, সুন্দর দেশে বড় হওয়া, সমুদ্র সবুজ ও আকাশনীল গ্রাম, বৃহস্পতি-রাহু-কেতু, চাঁদের আলোয় প্রথম শিহরণ, বাংলা ছেলে মিহিরের তনুমন, আয়ুর রেখা গুনতে পিতার ভুল, পুতুল ক্রমে প্রেমিক হয়ে যাওয়া, ভালোবাসার মিহির জ্যোতিষ শেখা, সিংহলের মায়ার টান ও বাংলাদেশের ঘাসে মন পড়া, পুঁথি ভরে রচনা ও শ্লোক, চাষাভুষার বাংলাদেশে বচন পড়া, রাজার কাছে বাতাসের বচন নিয়ে যাওয়া, রাজার প্রশ্ন ও মিহিরের চমক, বউটাকে জ্যান্ত আগুনে ঢাকার আদেশ, বরাহর ক্রুদ্ধ বক্তব্য, জ্যোতিষ জানো না শুধু প্রবাদ আওড়াও, বেগুন আলু ভাতে কাজ, বঙ্গদেশের কাছে আশ্রয় খোঁজা, ঘোমটায় ঢেকে রাখা, সিংহলে শিরদাঁড়া সোজা রাখা, নারীর মুখশ্রী পরাধীন-ঠুনকো-ভঙ্গুর-অসহায়, মুখের বুলি-কলম-কালি ছিঁড়ে নিতে চাওয়া, মেয়েরা জ্যোতিষী নয় ও বচন বলবে না, ভেতরের আগুন কতদিন ছাইচাপা থাকবে, লিখতে ও বলতে চাওয়া, বঙ্গদেশ-বরাহ-মিহিরের না বোঝা, ছেলের ফিরে আসা ও একঘরে কোণঠাসা করা, রাজার সম্মান মাথায় পড়লে ক্ষতি কী, জিভ সামলাতে না পারা ও জল্লাদের তলোয়ার, চিৎকার — আমাকে মারো, জিহ্বা বেঁচে থাক, সুবচনীকে দুর্মুখ করে তুলো না, জল্লাদের আঘাতে জিভ কেটে নেওয়া ও খনার মৃত্যু, নারীজিহ্বা মাঠে পড়ে কাঁদা, ও শেষ পর্যন্ত ‘আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে / মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে’ — এই সব মিলিয়ে এক নারীর জ্যোতিষচর্চা, পিতৃতান্ত্রিক শাসন, জিহ্বা কর্তন, নারী মুক্তি ও প্রতিরোধের অসাধারণ কাব্যচিত্র। মল্লিকা সেনগুপ্ত (জন্ম ১৯৪৯) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নারীমন, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, গ্রামীণ জীবন, এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তবতার জন্য পরিচিত। “খনাজন্ম” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি বাংলার প্রাচীন জ্যোতিষী খনা (লীলাবতী)-র কাহিনি অবলম্বনে নারীর জ্ঞানচর্চা ও তার দমনের ইতিহাস লিখেছেন।
মল্লিকা সেনগুপ্ত: নারীমন, ইতিহাস ও প্রতিরোধের কবি
মল্লিকা সেনগুপ্ত ১৯৪৯ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর কবিতায় নারীমন, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, গ্রামীণ জীবন, মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন বাস্তবতা, এবং ঐতিহাসিক নারী চরিত্রের পুনর্ব্যাখ্যা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘উদ্বাস্তু পাখি’ (১৯৭৮), ‘বালিকা ও দুষ্টু লোক’ (১৯৮৫), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০০০), ‘শিশিরের শিশু’ (২০১০), ‘চিঠি’ (২০১৮) ইত্যাদি।
মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — নারীর মনস্তত্ত্বের গভীর অনুসন্ধান, ঐতিহাসিক নারী চরিত্রের পুনর্নির্মাণ (খনা, লীলাবতী), জ্যোতিষ ও জ্ঞানের প্রতি নারীর অধিকার, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর জিহ্বা কর্তনের ইতিহাস, নারী মুক্তি ও প্রতিরোধের চেতনা, এবং সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ ও ঐতিহাসিক ব্যথা প্রকাশের দক্ষতা। ‘খনাজন্ম’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি খনার জীবনীকে কেন্দ্র করে নারীর জ্ঞানচর্চা ও তার দমনের এক চিরন্তন কাহিনি লিখেছেন।
খনাজন্ম: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার ঐতিহাসিক পটভূমি
শিরোনাম ‘খনাজন্ম’ অত্যন্ত তাৎপর্পণপূর্ণ। ‘খনা’ — প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতিষী লীলাবতী, যিনি ‘খনার বচন’ নামে কৃষি জ্যোতিষশাস্ত্র রচনা করেছিলেন। ‘জন্ম’ — তাঁর জন্মকাহিনি, অথবা তাঁর জন্মের মাধ্যমে নারী জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্তের সূচনা।
কবি শুরুতে বলছেন — মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা। নারী হয়েও জ্যোতিষী, রাগ করলেন পতিশ্রী। নবরত্ন সভার ধন, বরাহ আর মিহির কন— নারী যদি ঘরেই শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ। ঘরের আব্রু বাঁচাতে খনায় রাখি খাঁচাতে। খাঁচা যদি ভাঙতে চাও, ইষ্টনামের গান গাও।
যেই গিয়েছে রাজসভা, কেটে নিলাম পাপ জিহ্বা। যে মেয়েদের বাড়বে বাড়, তাদের হবে হবেই ঝাড়। কী সুন্দর একটা দেশে বড় হচ্ছিলাম, সমুদ্রটা সবুজ আর আকাশনীল গ্রাম। তুঙ্গে ছিল বৃহস্পতি, আকাশ হাতের তালু, রাহু এবং কেতুর ভয়ে চাঁদ সেখানে ঢালু।
চাঁদের আলোয় তার সঙ্গে প্রথম শিহরণ, জলে ভাসান বাংলা ছেলে মিহির তনুমন। আয়ুর রেখা গুনতে তার ভুল করেছে পিতা, আসলে তার পরমায়ু একশো পারমিতা। পুতুল পেয়ে সেই আমার পুতুল খেলা এল, কখন যেন পুতুল ক্রমে প্রেমিক হয়ে গেল। না হয় সে বয়সে ছোট, না হয় আমি বড়, তাই বলে কি ভালবাসা আটকে থাকে, বলো!
ভালবাসার মিহির ক্রমে জ্যোতিষ শিখে নিল, গুরুমশাই বুড়ো হলেন, মিহির যুবক ছিল। সিংহলের মায়ার টান কাটাতে চায় সে, মন পড়েছে মাটির টানে বাংলাদেশের ঘাসে। বাংলাদেশ এলাম, তার বাপপিতেমোর ঠাঁই, অনেক জল ঘোলার শেষে সংসারে পাক খাই।
পুঁথি আমার উঠল ভরে রচনা এবং শ্লোকে, চাষাভুষার বাংলাদেশে বচন পড়ে লোকে। বাতাস সেই বচন নিয়ে গেল রাজার কাছে, স্বামী শ্বশুর সিঁটিয়ে থাকে, রাজা বকেন পাছে। মেয়েমানুষ বচন লেখে, জ্যোতিষ গোনে ভালো! ওকে আমার সামনে আনো মুখে ফেলব আলো।
রাজার কথা শুনে মিহির বড়ই চমকান, কী করে ওই গুহ্যকথা হল পঞ্চকান! বউটা বড় বেহায়া তোর, মিহির শুনে রাখ, জ্যান্ত আগুন ঘরের মাঝে এখনি ওকে ঢাক। কোন বাদারে কী শিখেছে, জানে না সহবত, বাংলাবধূর মুখ কি দেখে সভার পঞ্চঘট!
বরাহ বড় ক্রুদ্ধ হন, রাজ জ্যোতিষী তিনি, তাঁরই ঘরের আব্রু নিয়ে এমন ছিনিমিনি! বলেন, শোনো বউমা তুমি রাজাকে বলে দাও, জ্যোতিষ কিছু জানো না শুধু প্রবাদ আওড়াও। আর না যেন দেখি তোমায় জ্যোতিষ চর্চাতে, এখন থেকে তোমার কাজ বেগুন আলু ভাতে।
ওগো বঙ্গদেশ আমি তোমার বাহুতে মাথা রেখে আশ্রয় খুঁজেছি এতদিন। কেন যে আমাকে শুধু ঘোমটায় ঢেকে রাখো, বুঝতে পারি না আজও। সিংহলসূর্যের নিচে হেঁটে বেড়াতাম আমি শিরদাঁড়া সোজা রেখে। সে দেশের ঘাসমাটি সমুদ্র মানুষ কেউ মেয়ে বলে হেলা করত না।
এই সভ্য বঙ্গদেশে নারীর মুখশ্রী বড় পরাধীন, ঠুনকো, ভঙ্গুর, বড় অসহায়। আমার মুখের বুলি, আমার কলম কালি ছিঁড়ে নিতে চায় বঙ্গদেশ। মেয়েরা জ্যোতিষী নয়, মেয়েরা বচন বলবে না। কে বলেছে এসব নিয়ম! আমার ভেতরে যদি আগুন জাগ্রত থাকে, কতদিন ছাইচাপা দেবে! আমি যে লিখতে চাই, আমি যে বলতে চাই, আমারও মুখের ভাষা আছে।
সেকথা বোঝার মতো মন নেই তোমাদের, বঙ্গদেশ, বরাহ মিহির। যে ছেলে আমার জন্য বেঁচে ফিরে এল তার ঘরে, যে পিতা ছেলেকে ফিরে পেল, তারা আজ আমাকেই একঘরে কোণঠাসা করে হেঁশেলে বন্দি করে রাখে! রাজা যদি গুণীজনে সমাদর করে, সে সম্মান আমারও মাথায় পড়ে যদি, তোমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে যদি সে সম্মান নিতে পারি, ক্ষতি কি মিহির তাতে!
ক্ষতি হল বড় ভয়ানক, ক্ষতি ছিল বড় ভয়ানক। জিভ সামলাতে পারিনি, জিভ আগলাতে পারিনি। খোলা মাঠে একা অসহায় দাঁড়িয়েছে মোর জিহ্বা। তলোয়ার খোলা জল্লাদ ছুটে এল ওকে মারতে। চিৎকার করে বললাম মারতে তো মারো আমাকে। আমি মরে যাব লহমায়, বেঁচে থাক শুধু জিহ্বা।
সুবচনী এই মেয়েকে দুর্মুখ করে তুলো না। বেঁচে থাক তুমি বরাহ, বেঁচে থাক ন্যায়দ- মেয়েদের কথা বলবার অধিকার কেড়ে নিও না। জল্লাদ তবু থামে না, ভয়ানক এক আঘাতে কেটে নিল আলজিভটা, খনা মরে গেল তখনই।
আমাদের নারীজিহ্বা মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে। মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে আমাদের নারীজিহ্বা…
আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে…
খনাজন্ম: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: জ্যোতিষচর্চা, পতিশ্রীর রাগ, নবরত্ন সভার ধন, নারী ঘরেই শেষ, খাঁচায় রাখা
“মঙ্গলে ঊষা বুধে পা / যথা ইচ্ছা তথা যা / نারী হয়েও ج্যোতিষী / رাগ করলেন پতিশ্রী / نবরত্ন سভার ধন / বরাহ আর মিহير কন– / نারী যদি ঘরেই শেষ / ধন্য রাজার পুণ্য দেশ / ঘরের আব্রু বাঁচাতে / খনায় রাখی খাঁচাতে”
প্রথম স্তবকে খনার জ্যোতিষচর্চা ও সমাজের প্রতিক্রিয়া। ‘মঙ্গলে ঊষা বুধে পা’ — জ্যোতিষের শব্দ। নারী জ্যোতিষী হলে পতিশ্রী রাগ করেন। নারী যদি ঘরেই শেষ হয়, তবেই রাজার দেশ পুণ্য। খাঁচায় রাখা — নারীর স্বাধীনতা খর্ব করা।
দ্বিতীয় স্তবক: খাঁচা ভাঙার গান, রাজসভায় জিহ্বা কর্তন, মেয়েদের বাড়বেই
“খাঁচা যদি ভাঙতে چাও / ইষ্টনামের গان গাও / যেই গিয়েছে রাজসভা / كেটে নিলাম پاپ جিহ্বা। / যে মেয়েদের বাড়বে বাড় / তাদের হবে حبেই ঝাড়।”
দ্বিতীয় স্তবকে খাঁচা ভাঙার উপায় ও জিহ্বা কর্তন। ‘ইষ্টনামের গান’ — প্রেমের গান। রাজসভায় গিয়ে জিহ্বা কেটে নেওয়া — নারীর মুখ বন্ধ করা। মেয়েরা যদি বাড়ে (বড় হয়, শক্তিশালী হয়), তাদের ‘ঝাড়’ (প্রতিবাদ, বাধা) হবে।
তৃতীয় স্তবক: শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, সমুদ্র-আকাশ-গ্রাম, প্রথম শিহরণ, মিহিরের প্রেম
“كی সুন্দর একটা দেশে / বড় হচ্ছিলাম / সমুদ্রটা সবুজ আর / আকাশনীল গ্রাম / তুঙ্গে ছিল বৃহস্পতি / আকাশ হাতের তালু / رাহু এবং كেতুর ভয়ে / چাঁদ সেখানে ঢালু / چাঁদের আলোয় তার সঙ্গে / প্রথম শিহরণ / جলে ভাসান বাংলা ছেলে / মিহির تনومন”
তৃতীয় স্তবকে শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি ও প্রথম প্রেম। সবুজ সমুদ্র, নীল আকাশের গ্রাম। বৃহস্পতি, রাহু, কেতু, চাঁদ — জ্যোতিষের জগৎ। চাঁদের আলোয় প্রথম শিহরণ — প্রথম ভালোবাসা। বাংলা ছেলে মিহিরের তনুমন।
চতুর্থ স্তবক: আয়ুর রেখা, পুতুল-প্রেমিক, বয়সের ব্যবধান, ভালোবাসা আটকে থাকে না
“آয়ুর رেখা گুনতে তার / ভুল করেছে পিতা / আসলে তার পরমায়ু / একশو پارমিতা / পুতুল পেয়ে সেই আমার / পুতুল খেলা এল / كখন যেন پুতুল ক্রমে / প্রেমিক হয়ে গেল / না হয় সে বয়সে ছোট / না হয় আমি বড় / তাই বলে কি ভালবাসা / আটকে থাকে, বলো!”
চতুর্থ স্তবকে আয়ুর হিসাব ও পুতুল-প্রেমিকের সম্পর্ক। পিতা আয়ুর রেখা গুনতে ভুল করেন। পুতুল ক্রমে প্রেমিক হয়ে যায় — ছোটবেলার খেলার সাথী প্রেমিক হয়। বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও ভালোবাসা আটকে থাকে না।
পঞ্চম স্তবক: মিহিরের জ্যোতিষ শিক্ষা, সিংহলের মায়া ও বাংলাদেশের টান
“ভালবাসার মিহير ক্রমে / জ্যোতিষ শিখে نيل / গুরুমশাই বুড়ো হলেন / মিহير যুবক ছিল / সিংহলের مায়ার টান / كাটাতে চায় সে / মন পড়েছে مাটির টানে / বাংলাদেশের ঘাসে”
পঞ্চম স্তবকে মিহিরের জ্যোতিষ শিক্ষা ও বাংলাদেশের প্রতি টান। সিংহলের মায়া কাটাতে চায়, কিন্তু মন পড়েছে বাংলাদেশের ঘাসে, মাটির টানে।
ষষ্ঠ স্তবক: বাংলাদেশে আসা, পুঁথি রচনা, বচন পড়া, রাজার কাছে যাওয়া
“বাংলাদেশ এলাম, তার / باپপিতেমোর ঠাঁই / অনেক جول ঘোলার শেষে / সংসারে পাক খাই / پুঁথি আমার উঠল ভরে / رচনা এবং শ্লোকে / چাষাভুষার বাংলাদেশে / بچন পড়ে لوكে / বাতাস সেই بچن নিয়ে / گেল রাজার কাছে / স্বামী শ্বশুর সিঁটিয়ে থাকে / রাজা বকেন পাছে”
ষষ্ঠ স্তবকে বাংলাদেশে আগমন ও জ্ঞানচর্চা। পুঁথি ভরে রচনা ও শ্লোক। চাষাভুষার দেশে বচন পড়ে। বাতাস সেই বচন রাজার কাছে নিয়ে যায়। স্বামী-শ্বশুর ভয় পান, রাজা কথা বলেন।
সপ্তম স্তবক: রাজার প্রশ্ন, মিহিরের চমক, জ্যান্ত আগুনের আদেশ
“মেয়েমানুষ بچن লেখে / ج্যোতিষ গোনে ভালো! / ওকে আমার সামনে আনো / মুখে ফেলب আলো / রাজার কথা শুনে মিহির / বড়ই چمকان / কী করে ওই গুহ্যكথা / হল پঞ্চكान! / بউটা বড় বেহায়া তোর / মিহير শুনে রাখ / ج্যান্ত আগুন ঘরের مাঝে / এখনি ওকে ঢাক”
সপ্তম স্তবকে রাজার কৌতূহল ও ক্ষোভ। রাজা খনাকে ডাকতে চান, মুখে আলো ফেলতে চান। মিহির চমকান — গুহ্য কথা পঞ্চকান (সবার কাছে) হল। বউটা বেহায়া, জ্যান্ত আগুনে ঢাকার আদেশ দেওয়া হয়।
অষ্টম স্তবক: বরাহর ক্রোধ, জ্যোতিষ না জানার অভিযোগ, বেগুন আলু ভাতে কাজ
“কোন بادارے কী شিখেছে / جানে না সহبত / বাংলাবধূর মুখ কি দেখে / সভার پঞ্চঘট! / বরাহ বড় ক্রুদ্ধ হন / রাজ ج্যোতিষী তিনি / তাঁরই ঘরের আব্রু নিয়ে / এমন ছিনিমিনি! / বলেন, শোনো بউما তুমি / রাজাকে বলে দাও / ج্যোতিষ কিছু জানো না শুধু / প্রবাদ آওড়াও / আর না যেন দেখي তোমায় / ج্যোতিষ চর্চাতে / এখন থেকে তোমার কাজ / বেগুন আলু ভাতে”
অষ্টম স্তবকে বরাহর ক্রোধ ও নারীর জ্ঞানের অবমূল্যায়ন। বরাহ রাজ জ্যোতিষী, তাঁর ঘরের আব্রু নিয়ে ছিনিমিনি। তিনি খনাকে বলেন — তুমি জ্যোতিষ জানো না, শুধু প্রবাদ আওড়াও। এখন থেকে তোমার কাজ বেগুন আলু ভাতে — অর্থাৎ শুধু রান্না।
নবম স্তবক: বঙ্গদেশের কাছে আশ্রয়, ঘোমটায় ঢেকে রাখা, সিংহলের শিরদাঁড়া সোজা রাখা
“ওগো বঙ্গদেশ আমি / তোমার বাহুতে মাথা رেখে / আশ্রয় খুঁজেছি এতদিন / কেন যে আমাকে শুধু / ঘোমটায় ঢেকে রাখো / বুঝতে পারি না আজও / সিংহলসূর্যের নিচে / হেঁটে বেড়াতাম আমি / শিরদাঁড়া সোজা رেখে / সে দেশের ঘাসমাটি / সমুদ্র মানুষ كেউ / মেয়ে বলে হেলা করত না”
নবম স্তবকে বঙ্গদেশের প্রতি অভিযোগ ও সিংহলের তুলনা। বঙ্গদেশে ঘোমটায় ঢেকে রাখা হয়। অথচ সিংহলে শিরদাঁড়া সোজা রেখে হাঁটা যেত, কেউ মেয়ে বলে হেলা করত না।
দশম স্তবক: বঙ্গদেশে নারীর পরাধীনতা, মুখের বুলি ও কলম কালি ছিঁড়ে নেওয়া
“এই سভ্য بঙ্গদেশে / نارীর মুখশ্রী বড় পরাধীন / ঠুনকো, ভঙ্গুর, بড় অসহায় / আমার মুখের বুলي / আমার কলم كالي / ছিঁড়ে نিতে چায় বঙ্গদেশ / মেয়েরা জ্যোতিষী নয় / মেয়েরা بচন বলবে না। / كে বলেছে এসب নিয়م! / আমার ভেতরে যদি / আগুন জাগ্রত থাকে / كতদিন ছাইচাপা দেবে! / আমি যে লিখতে চাই / আমি যে বলতে চাই / আমারও মুখের ভাষা আছে”
দশম স্তবকে নারীর পরাধীনতা ও ভাষার অধিকার। মুখশ্রী পরাধীন, ঠুনকো, ভঙ্গুর। মুখের বুলি ও কলম কালি ছিঁড়ে নিতে চায়। মেয়েরা জ্যোতিষী নয়, বচন বলবে না — এই নিয়ম কে করেছে? ভেতরের আগুন কতদিন ছাইচাপা থাকবে? তিনি লিখতে ও বলতে চান, তাঁরও ভাষা আছে।
একাদশ স্তবক: না বোঝা, একঘরে কোণঠাসা ও হেঁশেলে বন্দি
“سেকথা বোঝার মতো / মন নেই তোমাদের / বঙ্গদেশ, বরাহ মিহिर / যে ছেলে আমার জন্য / বেঁচে ফিরে এল তার ঘরে / যে পিতা ছেলেকে ফিরে پেল / তারা আজ আমাকেই / একঘরে কোণঠাসা করে / هেঁশেলে بন্দি করে রাখে!”
একাদশ স্তবকে খনার বেদনা। বঙ্গদেশ, বরাহ, মিহির — কেউ বোঝে না। যে ছেলে তার জন্য ফিরে এল, যে পিতা ছেলেকে পেল, তারা তাকে একঘরে কোণঠাসা করে হেঁশেলে বন্দি করে রাখে।
দ্বাদশ স্তবক: রাজার সম্মান, ক্ষতি, জিভ সামলাতে না পারা
“রাজা যদি গুণীজনে / সমাদর করে, সে সম্মান / আমারও মাথায় পড়ে যদি / তোমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে / যদি সে সম্মান نিতে পারি / ক্ষতি কি مিহير تাতে! / ক্ষতি হল بڑ ভয়انك / ক্ষতি ছিল بڑ ভয়انك / জিভ সামলাতে پارিনি / জিভ আগলাতে পারিনি”
দ্বাদশ স্তবকে রাজার সম্মান ও জিভের বেদনা। রাজা যদি গুণীজনকে সম্মান করে, সেই সম্মান মাথায় পড়ে, পাশে দাঁড়িয়ে সম্মান নিলে ক্ষতি কী? কিন্তু ক্ষতি হয়েছে ভয়ানক। জিভ সামলাতে পারেননি।
ত্রয়োদশ স্তবক: জিহ্বার জন্য চিৎকার, জল্লাদের আঘাত, খনার মৃত্যু
“খোলা মাঠে একا অসহায় / دাঁড়িয়েছে মোর جিহ্বা / তলোয়ার খোলা جল্লাদ / ছুটে এল ওকে مارতে / চিৎكار করে বললাম / مارতে তো مارো আমাকে / আমি مরে যাব لہمায় / বেঁচে থাক শুধু جিহ্বা / সুبچনী این মেয়েকে / দুর্মুখ করে তুলো না / বেঁচে থাক তুমি বরাহ / বেঁচে থাক ن্যায়দ- / মেয়েদের কথা বলবার / অধিকার كেড়ে نিও না / جল্লاد تبو থামে না / ভয়انك এক আঘাতে / كেটে নিল আলجিভটা / খنا مরে গেল তখনই”
ত্রয়োদশ স্তবকে জিহ্বা কর্তনের নৃশংস দৃশ্য। খোলা মাঠে জিহ্বা দাঁড়িয়ে। জল্লাদ তলোয়ার নিয়ে আসে। খনা চিৎকার করে — আমাকে মারো, জিহ্বা বেঁচে থাক। সুবচনীকে দুর্মুখ করো না। ন্যায়ের অধিকার কেড়ে নিও না। জল্লাদ থামে না, আঘাতে জিভ কেটে নেয়, খনা মরে যায়।
চতুর্দশ স্তবক: নারীজিহ্বা মাঠে কাঁদে, ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা
“আমাদের نারীجিহ্বা / مাঠে পড়ে আজও কাঁদছে / مাঠে পড়ে আজও কাঁদছে / আমাদের نারীجিহ্বা… / আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, گঙ্গাজল বেয়ে / মনে رেখো ও ভারত, তোমারই দু’كان كাটা مেয়ে…”
চতুর্দশ স্তবকে নারীজিহ্বার চিরন্তন কান্না ও ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা। নারীজিহ্বা মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে। শেষে খনার কিংবদন্তি ভাষায় — ‘আবার আসিব ফিরে, বঙ্গদেশে, গঙ্গাজল বেয়ে / মনে রেখো ও ভারত, তোমারই দু’কান কাটা মেয়ে’।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চৌদ্দটি স্তবকে বিভক্ত (বাস্তবে স্তবকভিত্তিক নয়, ধারাবাহিক)। মুক্তছন্দ, গদ্যকাব্যের ধাঁচে লেখা, কিন্তু গীতিময় ও আবেগঘন। ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কথ্য ও ঐতিহাসিক।
প্রতীক ব্যবহারে অসাধারণ। ‘খনার বচন’ — জ্ঞান, নারীর ভাষা। ‘জ্যোতিষ’ — জ্ঞানচর্চা, পুরুষের একচেটিয়া ক্ষেত্র। ‘খাঁচা’ — নারীর বন্দিত্ব। ‘জিহ্বা’ — নারীর কথা, ভাষা, অধিকার। ‘জল্লাদ’ — পিতৃতান্ত্রিক শাসন। ‘আগুন’ — নারীর ভেতরের শক্তি। ‘ঘোমটা’ — নারীর আবরণ, লুকিয়ে ফেলা। ‘বেগুন আলু ভাত’ — নারীর কাজ রান্নায় সীমিত। ‘নারীজিহ্বা কাঁদছে’ — নারীর চিরন্তন বেদনা। ‘দু’কান কাটা মেয়ে’ — নারীর প্রতিরোধের প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি কৌশল — ‘মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে’ — শেষ স্তবকে দুইবার। ‘ক্ষতি হল বড় ভয়ানক’ — দ্বাদশ স্তবকে দুইবার।
শেষের ‘আবার আসিব ফিরে… দু’কান কাটা মেয়ে’ — একটি ঐতিহাসিক ও সাহসী সমাপ্তি, যা খনার কথাকে চিরন্তন করে রেখেছে।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘খনাজন্ম’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের নারী জ্ঞানচর্চার ইতিহাস, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের শাসন, জিহ্বা কর্তনের প্রতীক, নারী মুক্তি ও প্রতিরোধের চেতনা, এবং ঐতিহাসিক নারী চরিত্রের কাব্যিক পুনর্নির্মাণ সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
খনাজন্ম সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: ‘খনাজন্ম’ কবিতাটির লেখিকা কে?
এই কবিতাটির লেখিকা মল্লিকা সেনগুপ্ত (জন্ম ১৯৪৯)। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি।
প্রশ্ন ২: ‘খনা’ কে?
‘খনা’ — প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতিষী লীলাবতী, যিনি ‘খনার বচন’ নামে কৃষি জ্যোতিষশাস্ত্র রচনা করেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: ‘নারী হয়েও জ্যোতিষী’ — কেন সমস্যা?
পিতৃতান্ত্রিক সমাজে জ্যোতিষশাস্ত্র পুরুষের একচেটিয়া ক্ষেত্র ছিল। নারী সেখানে প্রবেশ করলে তা অপরাধ ও লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়াত।
প্রশ্ন ৪: ‘ঘরের আব্রু বাঁচাতে খনায় রাখি খাঁচাতে’ — কী বোঝায়?
সমাজের মান-সম্মান বাঁচাতে নারীকে খাঁচায় (গৃহবন্দি) রাখা হয় — স্বাধীনতা হরণ করা হয়।
প্রশ্ন ৫: ‘জিভ কেটে নেওয়া’ — কী বোঝায়?
নারীর মুখ বন্ধ করা, কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া — নারীর জ্ঞানচর্চা ও ভাষাকে দমন করা।
প্রশ্ন ৬: ‘বেগুন আলু ভাতে কাজ’ — কী বোঝায়?
নারীর কাজ শুধু রান্নায় সীমিত — জ্ঞানচর্চা নয়, শুধু গৃহস্থালি।
প্রশ্ন ৭: ‘সিংহলের শিরদাঁড়া সোজা রাখা’ — কী বোঝায়?
সিংহলে (শ্রীলঙ্কা) নারীরা স্বাধীনভাবে শিরদাঁড়া সোজা রেখে চলতে পারত, কিন্তু বঙ্গদেশে নয়।
প্রশ্ন ৮: ‘আমারও মুখের ভাষা আছে’ — কী বোঝায়?
নারীরও নিজস্ব ভাষা, কথা বলার অধিকার, জ্ঞানচর্চার অধিকার আছে — যা সমাজ অস্বীকার করে।
প্রশ্ন ৯: ‘আবার আসিব ফিরে… দু’কান কাটা মেয়ে’ — শেষ লাইনের তাৎপর্য কী?
এটি খনার কিংবদন্তি উক্তি — নারী আবার ফিরে আসবে, তার কথা বলবে, তার অধিকার দাবি করবে। ‘দু’কান কাটা মেয়ে’ — নারীর প্রতিরোধের প্রতীক।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — নারীর জ্ঞানচর্চা ও কথা বলার অধিকার পিতৃতান্ত্রিক সমাজে দমন করা হয়েছে। খনার জিহ্বা কর্তনের ঘটনা নারীর ভাষা দমনের চিরন্তন প্রতীক। কিন্তু সেই জিহ্বা মাঠে পড়ে আজও কাঁদছে, আর ‘আবার আসিব ফিরে’ বলে নারী প্রতিরোধের ডাক দিচ্ছে। এটি একটি চিরন্তন নারীবাদী ও প্রতিরোধের কবিতা।
ট্যাগস: খনাজন্ম, মল্লিকা সেনগুপ্ত, মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, খনা, নারী জ্যোতিষী, জিহ্বা কর্তন, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, নারীবাদ, খনার বচন, বরাহ মিহির, নারী মুক্তি, বঙ্গদেশ, গঙ্গাজল, দুকান কাটা মেয়ে, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: মল্লিকা সেনগুপ্ত | কবিতার প্রথম লাইন: “মঙ্গলে ঊষা বুধে পা / যথা ইচ্ছা তথা যা / نারী হয়েও ج্যোতিষী / رাগ করলেন পতিশ্রী” | নারী জ্যোতিষী, জিহ্বা কর্তন ও প্রতিরোধের অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন