কবিতার খাতা
স্নান – জয় গোস্বামী।
সংকোচে জানাই আজ: একবার মুগ্ধ হতে চাই।
তাকিয়েছি দূর থেকে। এতদিন প্রকাশ্যে বলিনি।
এতদিন সাহস ছিল না কোনো ঝর্ণাজলে লুণ্ঠিত হবার-
আজ দেখি অবগাহনের কাল পেরিয়ে চলেছি দিনে দিনে…
জানি, পুরুষের কাছে দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছো।
তোমাকে ফুলের দেশে নিয়ে যাবে ব’লে যে-প্রেমিক
ফেলে রেখে গেছে পথে, জানি, তার মিথ্যে বাগদান
হাড়ের মালার মতো এখনো জড়িয়ে রাখো চুলে।
আজ যদি বলি, সেই মালার কঙ্কালগ্রন্থি আমি
ছিন্ন করবার জন্য অধিকার চাইতে এসেছি? যদি বলি
আমি সে-পুরুষ, দ্যাখো, যার জন্য তুমি এতকাল
অক্ষত রেখেছো ওই রোমাঞ্চিত যমুনা তোমার?
শোনো, আমি রাত্রিচর। আমি এই সভ্যতার কাছে
এখনো গোপন ক’রে রেখেছি আমার দগ্ধ ডানা;
সমস্ত যৌবন ধ’রে ব্যধিঘোর কাটেনি আমার। আমি একা
দেখেছি ফুলের জন্ম মৃতের শয্যার পাশে বসে,
জন্মান্ধ মেয়েকে আমি জ্যোৎস্নার ধারণা দেব ব’লে
এখনো রাত্রির এই মরুভুমি জাগিয়ে রেখেছি।
দ্যাখো, সেই মরুরাত্রি চোখ থেকে চোখে আজ পাঠালো সংকেত-
যদি বুঝে থাকো তবে একবার মুগ্ধ করো বধির কবিকে;
সে যদি সংকোচ করে, তবে লোকসমক্ষে দাঁড়িয়ে
তাকে অন্ধ করো, তার দগ্ধ চোখে ঢেলে দাও অসমাপ্ত চুম্বন তোমার…
পৃথিবী দেখুক, এই তীব্র সূর্যের সামনে তুমি
সভ্য পথচারীদের আগুনে স্তম্ভিত ক’রে রেখে
উন্মাদ কবির সঙ্গে স্নান করছো প্রকাশ্য ঝর্ণায়।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জয় গোস্বামীর কবিতা।
কবিতার কথা –
কবি জয় গোস্বামীর ‘স্নান‘ কবিতাটি এক অবদমিত বাসনা, তীব্র প্রেম, সামাজিক সংস্কার ভাঙার স্পর্ধা এবং এক পরম আত্মিক ও শারীরিক শুদ্ধিকরণের মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবি এখানে ‘স্নান’ বা অবগাহনকে দেখিয়েছেন সমস্ত জাগতিক ব্যাধি, অতীত ক্ষত এবং কৃত্রিম সামাজিকতার খোলস ছেড়ে ভালোবাসার পবিত্র ও আদিম উৎসে নিমজ্জিত হওয়ার এক অলৌকিক রূপক হিসেবে।
কবিতার প্রারম্ভেই এক তীব্র আত্মস্বীকৃতি ও সময়ের বয়ে চলার এক ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। কবি অত্যন্ত সংকোচের সাথে স্বীকার করেছেন যে, জীবনের এই প্রান্তে এসে তিনি অন্তত একবারের জন্য হলেও প্রিয়তমার প্রেমে পুরোপুরি মুগ্ধ হতে চান। এতদিন তিনি দূর থেকে নীরবে চেয়ে দেখেছেন, প্রকাশ্যে নিজের ভালোবাসা প্রকাশের সাহস পাননি। কিন্তু আজ কবি অনুভব করছেন, জীবনের যৌবন বা অবগাহনের উপযুক্ত সময় দিনে দিনে পেরিয়ে যাচ্ছে। এই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ই কবিকে সমস্ত জড়তা ভেঙে প্রকাশ্যে নিজের অধিকার দাবি করার সাহস জুগিয়েছে।
কবিতার মধ্যভাগে কবি পুরুষের চেনা আদিম রূপ এবং প্রিয়তমার অতীতের এক করুণ ক্ষতের চিত্র তুলে ধরেছেন। কবি জানেন, সমাজ হয়তো পুরুষের কাছে এক ধরণের দস্যুতা বা জোর-জুলুমই প্রত্যাশা করে। তিনি আরও জানেন, প্রিয়তমাকে একসময় ‘ফুলের দেশে’ বা সুখের স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে যে প্রেমিক তাকে পথের মাঝে একলা ফেলে চলে গেছে, তার সেই প্রতারণার স্মৃতি বা মিথ্যে বাগদানকে প্রিয়তমা আজও এক তীব্র অভিমানে হাড়ের মালার মতো নিজের চুলে জড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু কবি আজ সেই নির্মম অতীতের কঙ্কালগ্রন্থি ছিঁড়ে ফেলার অধিকার চাইতে এসেছেন। কবি অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে নিজেকে সেই কাঙ্ক্ষিত পুরুষ হিসেবে দাবি করেন, যার জন্য প্রিয়তমা তার ভেতরের সমস্ত প্রেম, আবেগ আর রোমাঞ্চিত ‘যমুনা’-কে বা তার কুমারীত্বকে এতদিন ধরে পরম মমতায় অক্ষত ও পবিত্র করে রেখে দিয়েছে।
পরবর্তী অংশে কবির নিজের জীবনের এক অন্ধকার, ক্ষয়িষ্ণু ও তীব্র সংবেদনশীল রূপ উন্মোচিত হয়। কবি নিজেকে ‘রাত্রিচর’ বলে ঘোষণা করেছেন, যিনি আধুনিক সভ্যতার চেনা আলো থেকে দূরে নিজের দগ্ধ বা পুড়ে যাওয়া ডানা লুকিয়ে রেখেছেন। সমস্ত যৌবনজুড়ে কবির এক অদ্ভুত ‘ব্যাধিঘোর’ বা মানসিক দহন কাটেনি। তিনি এতখানি নিঃসঙ্গ যে, মৃত মানুষের শয্যার পাশে বসে তিনি ফুলের জন্ম বা জীবনের নতুন স্পন্দন দেখেছেন। কবির জীবনের এক পরম ও মহৎ লক্ষ্য হলো—তিনি এক জন্মান্ধ মেয়েকে, যে কখনো আলো দেখেনি, তাকে ‘জ্যোৎস্না’ বা সৌন্দর্যের এক অলৌকিক ধারণা দিতে চান; আর সেই কারণেই তিনি রাত্রির এই দীর্ঘ ও শুষ্ক মরুভূমিকে আজও জাগিয়ে রেখেছেন।
শেষাংশে এসে কবিতাটি সমস্ত সামাজিক নিয়ম, লোকলজ্জা এবং কৃত্রিমতার দেয়াল ভেঙে এক প্রলয়ঙ্করী ও উন্মাতাল পূর্ণতা লাভ করে। কবির সেই দীর্ঘ মরুরাত্রির মতো চোখ আজ প্রিয়তমার চোখে এক গোপন সংকেত পাঠিয়েছে। কবি আহ্বান জানিয়েছেন—প্রিয়তমা যেন এই বধির ও সমাজ-বিচ্ছিন্ন কবিকে তার রূপের মায়ায় মুগ্ধ করে। কবি যদি লোকলজ্জায় পিছিয়েও যায়, প্রিয়তমা যেন সর্বসমক্ষে দাঁড়িয়ে কবিকে তার প্রেমের আলোয় অন্ধ করে দেয় এবং কবির সেই দগ্ধ, ক্লান্ত চোখে ঢেলে দেয় তার ঠোঁটের অসমাপ্ত ও পবিত্র চুম্বন।
সমাপ্তিতে এসে কবিতাটি এক রাজকীয় ও বৈপ্লবিক বিদ্রোহে রূপ নেয়। কবি চান এই স্বার্থপর ও কৃত্রিম পৃথিবী দেখুক—দুপুরের এই তীব্র ও প্রখর সূর্যের সামনে, সভ্যতার চেনা রাজপথের সমস্ত মুখোশধারী পথচারীদের আগুনে স্তম্ভিত ও স্তব্ধ করে দিয়ে, এক রূপসী নারী সমস্ত লোকলজ্জা ও সামাজিক সংস্কার পায়ে ঠেলে এক উন্মাদ কবির হাত ধরে প্রকাশ্য ঝর্ণার জলে স্নান করছে। এই স্নান কেবল জলের নয়, তা হলো সমস্ত ক্ষত ধুয়ে মুছে ভালোবাসার আদিম ও পবিত্রতম উৎসে দুই আত্মার একাকার হয়ে যাওয়ার এক মৃত্যু






