কবিতার খাতা
স্মরণ – নির্মলেন্দু গুণ।
নাম ভুলে গেছি, দুর্বল মেধা
স্মরণে রেখেছি মুখ;
কাল রজনীতে চিনিব তোমায়
আপাতত স্মৃতিভুক ।
ডাকিব না প্রিয়, কেবলি দেখিব
দু’চোখে পরান ভরে;
পূজারী যেমন প্রতিমার মুখে
প্রদীপ তুলিয়া ধরে ।
তুমি ফিরে যাবে উড়ন্ত রথে
মাটিতে পড়িবে ছায়া,
মন্দির খুঁড়ে দেখিব তোমায়
মন্দ্রিত মহামায়া ।
ভুলে যাব সব সময়-নিপাতে
স্মরণে জাগিয়ে প্রেম,
আঁধারে তখন জ্বলিবে তোমার
চন্দনে মাখা হেম ।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নির্মলেন্দু গুণের কবিতা।
কবিতার কথা-
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ও তুমুল জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘স্মরণ’ কবিতাটি প্রেম, স্মৃতির অবিনাশী ক্ষমতা, আধ্যাত্মিক আর্তি এবং প্রিয় মানুষের রূপকে এক শাশ্বত দেবীবন্দনার এক মায়াবী ও মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবি এখানে পার্থিব ও জাগতিক প্রেমের সীমানা ডিঙিয়ে ভালোবাসাকে এক অলৌকিক ও পবিত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে মানুষের নাম বা পরিচয় হারিয়ে গেলেও তার চিরন্তন অবয়বটি হৃদয়ের মণিকোঠায় অক্ষত থেকে যায়।
কবিতার প্রারম্ভেই কবি এক অদ্ভুত মানবিক সীমাবদ্ধতা ও স্মৃতির গভীরতাকে তুলে ধরেছেন। সময়ের নিয়মে এবং নিজের ‘দুর্বল মেধার’ কারণে কবি হয়তো প্রিয় মানুষের জাগতিক নাম বা পরিচয়টি ভুলে গেছেন; কিন্তু সেই প্রিয় মুখের অবয়ব ও তার ভেতরের সৌন্দর্য কবি নিজের হৃদয়ে পরম যত্নে স্মরণ করে রেখেছেন। বর্তমানের এই ব্যস্ত সময়ে কবি নিজেকে কেবলই এক ‘স্মৃতিভুক’ বা স্মৃতি রোমন্থনকারী একলা মানুষ হিসেবে দেখিয়েছেন। তবে কবি এক অমোঘ প্রত্যয়ে বিশ্বাস করেন যে, যখন সব কোলাহল শান্ত হবে, সেই গভীর রজনী বা নিভৃত অবসরে তিনি তাঁর সেই ভালোবাসাকে ঠিক চিনে নিতে পারবেন।
কবিতার মধ্যভাগে প্রেমের এক পরম পবিত্র ও পূজনীয় রূপ ফুটে ওঠে। কবি জানিয়েছেন, প্রিয় মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি তাকে কোনো চেনা নামে ডাকবেন না বা কোনো জাগতিক দাবি তুলবেন না; তিনি কেবল দু’চোখ ভরে পরম তৃপ্তিতে তাকে দেখে যাবেন। এই দেখাকে কবি তুলনা করেছেন এক নিবেদিতপ্রাণ পূজারীর সাথে, যে গভীর অন্ধকারে দেবী প্রতিমার মুখমণ্ডলটি ভালো করে দেখার জন্য ভক্তিভরে প্রদীপ তুলে ধরে। ভালোবাসার মানুষের প্রতি কবির এই যে নিঃশর্ত ও পবিত্র সমর্পণ, তা কামনার ঊর্ধ্বে উঠে এক ধরণের আধ্যাত্মিক আরাধনায় রূপ নেয়।
পরবর্তী অংশে প্রিয় মানুষের বিদায় এবং তার চিরন্তন উপস্থিতির এক পরাবাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। প্রিয়তমা বা সেই দেবীসত্তা যখন সময়ের নিয়ম মেনে কোনো এক ‘উড়ন্ত রথে’ চড়ে মর্ত্যলোক ছেড়ে বিদায় নেবে, তখন মাটিতে পড়ে থাকবে কেবলই তার এক চিলতে মায়াবী ছায়া। সেই ছায়াকে সম্বল করেই কবি মনের অন্তহীন গভীরে বা ‘মন্দির খুঁড়ে’ তাকে সারাজীবন ধরে অন্বেষণ করবেন। প্রিয় মানুষের এই অবিনাশী রূপকে কবি আখ্যা দিয়েছেন ‘মন্দ্রিত মহামায়া’ বলে, যা দূর থেকেও কবির পুরো অস্তিত্বকে এক পবিত্র সুরে আচ্ছন্ন করে রাখে।
শেষাংশে এসে কবিতাটি এক কালজয়ী ও শাশ্বত দর্শনে রূপ নেয়। সময়ের অমোঘ নিয়মে এবং ‘সময়-নিপাতে’ অর্থাৎ মহাকালের স্রোতে একদিন পৃথিবীর সবকিছু হয়তো ধ্বংস বা বিলীন হয়ে যাবে। কবিও ভুলে যাবেন তাঁর জীবনের সমস্ত জাগতিক হিসাব-নিকাশ। কিন্তু এই সমস্ত বিনাশের মাঝেও কবির হৃদয়ে চিরকাল অমলিন ও জাগ্রত থাকবে কেবলই তাঁর সেই পবিত্র ‘প্রেম’। চারপাশের জমাটবদ্ধ ঘন আঁধারেও তখন সেই প্রিয়তমার চন্দনে মাখা ‘হেম’ বা স্বর্ণালী আভা এক স্বর্গীয় আলোর মতো জ্বলজ্বল করতে থাকবে। ভালোবাসার এই যে মৃত্যুহীন জয়গান এবং স্মৃতির আলোয় অন্ধকারকে জয় করার এক পরম আর্তি—তার মাঝেই কবিতাটি পূর্ণতা লাভ করে।






