কবিতার প্রারম্ভেই এক নস্টালজিক ও চেনা আবহ তৈরি হয়। অনেক দিন পর কবি তাঁর জীবনের সেই পুরোনো জায়গায় ফিরে এসেছেন, যেখানে তাঁর যৌবন বা অতীতে কাটানো সোনালী দিনগুলো জড়িয়ে ছিল। ফিরে আসার পর মানুষের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী কবিরও খুব ইচ্ছে করছে চারপাশের চেনা বাস্তবতার সাথে নিজের স্মৃতির ভেতরের ছবিটাকে একটু মিলিয়ে নিতে। কবি দেখতে চান, সেই স্টেশন বা ইস্টিশানে যাওয়ার রাস্তার বাঁকে লাল টালির বাড়িটা আজও আগের মতো অক্ষত আছে কি না, আর সেই বাড়িটার ঠিক পেছনে বিশাল ডালপালা মেলে মস্ত বড় সেই ছাতিম গাছটি এখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কি না। এই বাড়ি আর গাছ মূলত কবির অতীত জীবনের স্থবির ও চেনা অনুষঙ্গের রূপক।
কবিতার মধ্যভাগে এক অদ্ভুত অধিকারবোধ ও হিসাব-নিকাশের সুর ফুটে ওঠে। কবি যখন এই চেনা জায়গা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর জীবনের যাবতীয় সঞ্চয়, আবেগ ও স্মৃতি এক পরম ভালোবাসায় ও বিশ্বাসে এক ‘বিশেষ মানুষের’ হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। এখন দীর্ঘ প্রবাস বা বিরহ শেষে কবি ফিরে এসেছেন এবং তিনি তাঁর সেই আমানত, তাঁর সেই পুরনো দিনগুলোর পূর্ণ হিসাব মিলিয়ে সবকিছু ফেরত নিতে চান। কিন্তু অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে, যখনই কবি সেই ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে যান, তখনই তাঁর জীবনের সমস্ত সাজানো হিসাব-নিকাশ হঠাৎ এক নিমেষে ওলটপালট বা ভণ্ডুল হয়ে যায়।
শেষাংশে এসে কবিতাটি এক পরম মনস্তাত্ত্বিক সত্য ও বিষাদে রূপ নেয়। কবি চোখ মেলে দেখছেন যে বাইরের বস্তুগত পৃথিবীটা কিন্তু বিন্দুমাত্র বদলায়নি। রাস্তার বাঁকের সেই লাল টালির বাড়িটা ঠিক আগের মতোই আছে, তার পেছনে আকাশে মাথা ঠেকিয়ে মস্ত বড় ছাতিম গাছটিও একই রকম অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কবি যখন সেই মানুষের দিকে—যার কাছে তিনি সবকিছু গচ্ছিত রেখেছিলেন—তার চোখের দিকে তাকান, তখন এক নির্মম সত্য আবিষ্কার করেন। বাড়ি বা গাছ না বদলালেও, সময়ের অমোঘ নিয়মে সেই মানুষটি বদলে গেছে। তার ভেতরের সেই পুরোনো আবেগ, সেই মায়া আর চেনা টানটুকু চিরতরে হারিয়ে গেছে। বাইরের জড় জগত এক থাকলেও ভেতরের আত্মিক জগতটা যখন সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে যায়, তখন মানুষের জীবনের কোনো হিসাবই আর মেলে না। প্রিয় মানুষের ভেতরের এই অলক্ষিত রূপান্তর আর এক বুক নীরব হাহাকারের মাঝেই কবিতাটি এক গভীর শূন্যতায় শেষ হয়।
তোমার দিকে তাকিয়ে – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী | নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | ফিরে আসা, হিসেব মিলানো ও ছাতিম গাছের অসাধারণ কাব্যভাষা
তোমার দিকে তাকিয়ে: নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর পুরনো জায়গায় ফেরা, লাল টালির বাড়ি, ছাতিম গাছ ও হিসেব ভন্ডুল হওয়ার অসাধারণ কাব্যভাষা
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর “তোমার দিকে তাকিয়ে” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, স্নিগ্ধ ও আত্মস্থ সৃষ্টি। “অনেক দিন বাদে আবার পুরনো জায়গায় / ফিরে এসেছি। এখন / সবকিছুকে আবার মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। / দেখতে ইচ্ছে করছে, / ইস্টিশানে যাবার রাস্তার বাঁকে সেই / লাল টালির বাড়িটা এখনও / আছে কি না, আর / বাড়িটার পিছনে এখনও দাঁড়িয়ে আছে কি না / মস্ত সেই ছাতিম গাছ।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে অনেক দিন বাদে পুরনো জায়গায় ফিরে আসা, সবকিছু মিলিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা, ইস্টিশানের রাস্তার বাঁকে লাল টালির বাড়ি ও পিছনে ছাতিম গাছ দেখা, যাবার আগে সব তুলে দেওয়া, ফিরে এসে হিসেব মিলিয়ে ফেরত নেওয়ার ইচ্ছা, কিন্তু ফেরত নিতে গিয়ে হিসেব ভন্ডুল হয়ে যাওয়া, বাড়ি ও ছাতিম গাছ থাকা, কিন্তু প্রিয়জনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারা যে কোনো হিসেব আর মিলবে না — এই সব মিলিয়ে এক ফিরে আসা, সময়ের পরীক্ষা, হিসেব মিলানোর অসম্ভবতা ও প্রেমের অসীমতার গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (১৯২৪-২০১৮) আধুনিক বাংলা কবিতার এক মহীরুহ। তিনি প্রকৃতি, নিসর্গ, ঘর, শান্তি ও একাকীত্বের কবি হিসেবে পরিচিত। “তোমার দিকে তাকিয়ে” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি ফিরে এসে প্রিয়জনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন, সময়ের হিসেব আর মেলে না।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী: ফিরে আসা, সময় ও প্রেমের কবি
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ১৯২৪ সালে ফরিদপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। দেশভাগের পর তিনি কলকাতায় চলে আসেন। তিনি শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা করেছেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, নিসর্গ, ঘরবাড়ি, শান্তি, একাকীত্ব ও ফিরে আসার বোধ গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি জীবনানন্দ দাশ ও সুধীন্দ্রনাথ দত্তের পরবর্তী প্রজন্মের অন্যতম প্রধান কবি।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নীল নির্জন’, ‘অন্ধকার বারান্দা’, ‘উলঙ্গ রাজা’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রভৃতি।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — পুরনো জায়গায় ফিরে আসার বোধ, হিসেব মিলানোর ইচ্ছা ও তার অসম্ভবতা, লাল টালির বাড়ি ও ছাতিম গাছের প্রতীক, প্রেমের কাছে হিসেব ভন্ডুল হয়ে যাওয়া, সহজ-সরল কিন্তু গভীর চিত্রকল্পময় ভাষা, এবং নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বকে সরলতায় প্রকাশের দক্ষতা। ‘তোমার দিকে তাকিয়ে’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি ফিরে এসে সব হিসেব মিলাতে চান, কিন্তু প্রিয়জনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন — কোনো হিসেবই আর মিলবে না।
তোমার দিকে তাকিয়ে: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘তোমার দিকে তাকিয়ে’ অত্যন্ত তাৎপর্পূর্ণ। ‘তোমার দিকে তাকিয়ে’ — মানে কোনো কিছু বুঝতে বা হিসেব মিলাতে গেলে প্রিয়জনের দিকে তাকানো। আর সেই তাকানোতে হিসেব ভন্ডুল হয়ে যায়।
কবি শুরুতে বলছেন — অনেক দিন বাদে আবার পুরনো জায়গায় ফিরে এসেছি। এখন সবকিছুকে আবার মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। দেখতে ইচ্ছে করছে, ইস্টিশানে যাবার রাস্তার বাঁকে সেই লাল টালির বাড়িটা এখনও আছে কি না, আর বাড়িটার পিছনে এখনও দাঁড়িয়ে আছে কি না মস্ত সেই ছাতিম গাছ।
যাবার আগে তোমার হাতেই সব তুলে দিয়েছিলুম। এখন আমি ফিরে এসেছি। এখন আমার হিসেব মিলিয়ে সব ফেরত নেব।
কিন্তু ফেরত নিতে গিয়েই আমার সমস্ত হিসেব হঠাৎ ভন্ডুল হয়ে যায়।
বাড়িটা আছে। বাড়ির পিছনে আকাশে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছাতিম গাছটাও। কিন্তু তোমার দিকে তাকিয়ে তবু আমি বুঝতে পারি যে, আমার কোনো হিসেবই আর কখনও মিলবে না।
তোমার দিকে তাকিয়ে: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: পুরনো জায়গায় ফিরে আসা, সবকিছু মিলিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা, লাল টালির বাড়ি ও ছাতিম গাছ দেখা
“অনেক দিন বাদে আবার পুরনো জায়গায় / ফিরে এসেছি। এখন / সবকিছুকে আবার মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। / দেখতে ইচ্ছে করছে, / ইস্টিশানে যাবার রাস্তার বাঁকে সেই / লাল টালির বাড়িটা এখনও / আছে কি না, আর / বাড়িটার পিছনে এখনও দাঁড়িয়ে আছে কি না / মস্ত সেই ছাতিম গাছ।”
প্রথম স্তবকে ফিরে আসা ও পুরনো চিহ্ন খোঁজা। ‘অনেক দিন বাদে’ — দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান। ‘মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে’ — অতীতের সাথে বর্তমানের মিল খোঁজা। ‘লাল টালির বাড়ি ও ছাতিম গাছ’ — স্মৃতির চিহ্ন।
দ্বিতীয় স্তবক: যাবার আগে সব তুলে দেওয়া, ফিরে এসে হিসেব মিলিয়ে ফেরত নেওয়ার ইচ্ছা
“যাবার আগে তোমার হাতেই সব / তুলে দিয়েছিলুম। / এখন আমি ফিরে এসেছি। / এখন আমার হিসেব মিলিয়ে সব / ফেরত নেব।”
দ্বিতীয় স্তবকে হিসেব মিলানোর প্রতিজ্ঞা। ‘তোমার হাতেই সব তুলে দেওয়া’ — প্রিয়জনের কাছে সব জমা রাখা। ‘ফিরে এসে হিসেব মিলিয়ে ফেরত নেওয়া’ — হিসেব চুকিয়ে দেওয়া, বা পাওনা আদায় করে নেওয়া।
তৃতীয় স্তবক: ফেরত নিতে গিয়ে হিসেব ভন্ডুল হয়ে যাওয়া
“কিন্তু ফেরত নিতে গিয়েই আমার / সমস্ত হিসেব হঠাৎ / ভন্ডুল হয়ে যায়।”
তৃতীয় স্তবকে হিসেব ভন্ডুল হওয়ার মুহূর্ত। ‘ভন্ডুল’ — অকার্যকর, অবৈধ, বাতিল। ফেরত নিতে গেলে হিসেব বাতিল হয়ে যায়।
চতুর্থ স্তবক: বাড়ি ও ছাতিম গাছ আছে, কিন্তু প্রিয়জনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারা — কোনো হিসেব মিলবে না
“বাড়িটা আছে। বাড়ির পিছনে / আকাশে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই / ছাতিম গাছটাও। / কিন্তু তোমার দিকে তাকিয়ে তবু আমি / বুঝতে পারি যে, আমার / কোনো হিসেবই আর কখনও মিলবে না।”
চতুর্থ স্তবকে চূড়ান্ত উপলব্ধি। বাড়ি ও ছাতিম গাছ — সব আছে, বাস্তব আছে। কিন্তু প্রিয়জনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারা — কোনো হিসেব মিলবে না। অর্থাৎ প্রেম বা সম্পর্কের হিসেব কখনো মেলে না।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবক ৮ লাইন, দ্বিতীয় ৪ লাইন, তৃতীয় ৩ লাইন, চতুর্থ ৫ লাইন। মুক্তছন্দ, গদ্যকাব্যের ধাঁচে লেখা। ভাষা অত্যন্ত সরল, প্রাঞ্জল, আত্মস্থ ও আবেগঘন।
প্রতীক ব্যবহারে অসাধারণ। ‘পুরনো জায়গায় ফিরে আসা’ — অতীতে ফেরা, স্মৃতির খোঁজ। ‘ইস্টিশানে যাবার রাস্তার বাঁক’ — যাত্রাপথের স্মৃতি, চলে যাওয়ার পথ। ‘লাল টালির বাড়ি’ — গ্রাম বাংলার চেনা চিহ্ন, আবাস, নিরাপত্তা। ‘ছাতিম গাছ’ — স্মৃতির গাছ, প্রকৃতির চিহ্ন, মস্ত (বড়) হওয়া সত্ত্বেও স্থির। ‘তোমার হাতেই সব তুলে দেওয়া’ — প্রিয়জনের কাছে আত্মসমর্পণ, বিশ্বাস। ‘হিসেব মিলিয়ে ফেরত নেওয়া’ — সম্পর্কের সমীকরণ, দাবি আদায়। ‘ভন্ডুল হয়ে যাওয়া’ — সমীকরণ ভাঙা, হিসেব বাতিল। ‘আকাশে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়ানো’ — ছাতিম গাছের মহিমা, প্রকৃতির স্থিরতা। ‘তোমার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারা’ — প্রেমের কাছে হিসেবের অসম্ভবতা।
পুনরাবৃত্তি কৌশল — ‘আছে কি না’ — প্রথম স্তবকে দুইবার (বাড়ি ও ছাতিম গাছ)। ‘এখন’ — দ্বিতীয় স্তবকে দুইবার। ‘হিসেব’ — দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ স্তবকে।
শেষের ‘আমার কোনো হিসেবই আর কখনও মিলবে না’ — একটি চূড়ান্ত ও নিশ্চিত উপলব্ধি।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“তোমার দিকে তাকিয়ে” নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে পুরনো জায়গায় ফিরে আসা, লাল টালির বাড়ি ও ছাতিম গাছ দেখা, যাবার আগে সব তুলে দেওয়া, ফিরে এসে হিসেব মিলিয়ে ফেরত নেওয়ার ইচ্ছা, ফেরত নিতে গিয়ে হিসেব ভন্ডুল হয়ে যাওয়া, বাড়ি ও ছাতিম গাছ থাকা, কিন্তু প্রিয়জনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারা — কোনো হিসেব আর মিলবে না — এই সব মিলিয়ে এক ফিরে আসা, সময়ের পরীক্ষা ও প্রেমের অসীমতার চিত্র এঁকেছেন।
প্রথম স্তবকে — ফিরে আসা ও খোঁজ। দ্বিতীয় স্তবকে — হিসেব মিলানোর প্রতিজ্ঞা। তৃতীয় স্তবকে — হিসেব ভন্ডুল হওয়া। চতুর্থ স্তবকে — সব আছে, কিন্তু হিসেব মিলবে না।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — সম্পর্কের কোনো হিসেব মেলে না। তুমি চলে যাওয়ার আগে সব জমা রেখে এসেছিলে, কিন্তু ফিরে এসে হিসেব মিলাতে চাইলে তুমি দেখবে — বাড়ি আছে, ছাতিম গাছ আছে, সব আছে, কিন্তু প্রিয়জনের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে — কোনো হিসেব আর মিলবে না। প্রেমের মধ্যে হিসেব রাখা যায় না, যা দেওয়া যায় তা ফেরত নেওয়া যায় না। সময় বদলে দেয় সবকিছু, আর প্রেমের হিসেব কখনো মেলে না।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতায় ফিরে আসা, বাড়ি ও হিসেব মিলানো
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতায় ফিরে আসা ও বাড়ি একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘তোমার দিকে তাকিয়ে’ কবিতায় পুরনো জায়গায় ফিরে এসে লাল টালির বাড়ি ও ছাতিম গাছ খুঁজেছেন, হিসেব মিলাতে চেয়েছেন, কিন্তু প্রিয়জনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছেন — কোনো হিসেব মিলবে না। এটি প্রেমের অনির্দেশ্যতা ও সময়ের অপরিবর্তনীয়তার এক চমৎকার প্রকাশ।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘তোমার দিকে তাকিয়ে’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের ফিরে আসার বোধ, সময় ও প্রেমের সম্পর্ক, হিসেব মিলানোর অসম্ভবতা, এবং সহজ-সরল ভাষায় গভীর দার্শনিকতা প্রকাশের কৌশল সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
তোমার দিকে তাকিয়ে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘তোমার দিকে তাকিয়ে’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (১৯২৪-২০১৮)। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার এক মহীরুহ। প্রকৃতি, নিসর্গ ও শান্তির কবি হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্ন ২: ‘পুরনো জায়গায় ফিরে এসেছি’ — কেন ফিরে এসেছেন?
কবি অনেক দিন পর পুরনো স্মৃতির জায়গায় ফিরে এসেছেন। হয়তো প্রিয়জনের কাছে, অথবা শৈশবের বা প্রেমের স্মৃতির জায়গায়।
প্রশ্ন ৩: ‘সবকিছুকে আবার মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে’ — কী মিলিয়ে নিতে চান?
অতীতের স্মৃতি ও বর্তমানের বাস্তবতার মিল খুঁজতে চান। পুরনো বাড়ি, গাছ, মানুষ — সবকিছু ঠিক আছে কি না দেখতে চান।
প্রশ্ন ৪: ‘লাল টালির বাড়ি ও ছাতিম গাছ’ — কেন এই দুটি প্রতীক?
এগুলি স্মৃতির চিহ্ন, অতীতের স্থির প্রমাণ। লাল টালির বাড়ি — আবাস, নিরাপত্তা, শৈশব। ছাতিম গাছ — প্রকৃতি, সময়ের সাক্ষী, মস্ত ও স্থির।
প্রশ্ন ৫: ‘যাবার আগে তোমার হাতেই সব তুলে দিয়েছিলুম’ — কী তুলে দিয়েছিলেন?
তাঁর সবকিছু — ভালোবাসা, স্মৃতি, সম্পত্তি, সময়, হিসেব — সব প্রিয়জনের হাতে জমা রেখেছিলেন।
প্রশ্ন ৬: ‘এখন আমার হিসেব মিলিয়ে সব ফেরত নেব’ — কী হিসেব?
সম্পর্কের হিসেব, দেবার-নেওয়ার হিসেব, সময়ের হিসেব। তিনি ফিরে এসে সেই হিসেব চুকাতে চান।
প্রশ্ন ৭: ‘ফেরত নিতে গিয়েই আমার সমস্ত হিসেব হঠাৎ ভন্ডুল হয়ে যায়’ — কেন?
কারণ প্রেম বা সম্পর্কের কোনো হিসেব মেলে না। ফেরত নিতে গেলে দেখা যায় — যা দেওয়া হয়েছে তা আর ফেরত নেওয়া যায় না, সময় বদলে গেছে।
প্রশ্ন ৮: ‘বাড়িটা আছে। ছাতিম গাছটাও আছে’ — সব থাকা সত্ত্বেও কী সমস্যা?
বাস্তব সব আছে, কিন্তু সম্পর্কের হিসেব মিলছে না। প্রিয়জনের দিকে তাকালেই বোঝা যায় — সময় অতীত হয়ে গেছে, কিছুই আর আগের মতো নেই।
প্রশ্ন ৯: ‘তোমার দিকে তাকিয়ে তবু আমি বুঝতে পারি যে, আমার কোনো হিসেবই আর কখনও মিলবে না’ — শেষ লাইনের তাৎপর্য কী?
এটি চূড়ান্ত উপলব্ধি। প্রেমের কাছে হিসেব অকার্যকর। প্রিয়জনের দিকে তাকিয়েই বোঝা যায় — যা দেওয়া হয়েছে তা আর ফেরত পাওয়া যায় না, সময়ের হিসেব কখনো মেলে না।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — সম্পর্কের কোনো হিসেব মেলে না। তুমি চলে যাওয়ার আগে সব জমা রেখে এসেছিলে, কিন্তু ফিরে এসে হিসেব মিলাতে চাইলে তুমি দেখবে — বাড়ি আছে, ছাতিম গাছ আছে, সব আছে, কিন্তু প্রিয়জনের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে — কোনো হিসেব আর মিলবে না। প্রেমের মধ্যে হিসেব রাখা যায় না, যা দেওয়া যায় তা ফেরত নেওয়া যায় না। সময় বদলে দেয় সবকিছু, আর প্রেমের হিসেব কখনো মেলে না।
ট্যাগস: তোমার দিকে তাকিয়ে, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, ফিরে আসা, হিসেব মিলানো, লাল টালির বাড়ি, ছাতিম গাছ, পুরনো জায়গা, প্রেমের হিসেব, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী | কবিতার প্রথম লাইন: “অনেক দিন বাদে আবার পুরনো জায়গায় / ফিরে এসেছি। এখন / সবকিছুকে আবার মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে। / দেখতে ইচ্ছে করছে, / ইস্টিশানে যাবার রাস্তার বাঁকে সেই / লাল টালির বাড়িটা এখনও / আছে কি না, আর / বাড়িটার পিছনে এখনও দাঁড়িয়ে আছে কি না / মস্ত সেই ছাতিম গাছ।” | ফিরে আসা, সময় ও প্রেমের অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন