কবিতার খাতা
কে খেয়েছে চাঁদ – পূর্ণেন্দু পত্রী।
দাঁতে কামড়িয়ে কে খেয়েছে চাঁদ?
সন্ধেবেলায়?
মহাশূন্যের ছড়ানো টেবিলে
পড়ে আছে যেন ছিরিছাঁদহীন ভাঙা বিস্কুট।
কে খেয়েছে চাঁদ?
কদিন আগেও কোজাগরী শাড়ি লুটিয়ে হেঁটেছে
বর-বর্ণিনী।
যমুনার মতো চিকন অঙ্গ
বুকে তরঙ্গ, কাঁখে তরঙ্গ
আকাশের ঘাটে স্নান করে গেছে লজ্জা ভাসিয়ে
কলসি ভাসিয়ে।
কে খেয়েছে চাঁদ?
কার তৃষ্ণার উনোনে আগুন জ্বলে উঠেছিল?
আগুন দিয়ে কে মেজেছিল দাঁত?
ইচ্ছা-সুখের কালো ভীমরুল
কাকে কামড়িয়ে করেছিল লাল?
কে খেয়েছে চাঁদ?
রত্নের থালা কে এঁটো করেছে জিভের লালায়?
আলোর কুসুম ছিঁড়ে ছিঁড়ে মালা
কে গেঁথেছে মিহি মনের সুতোয়?
ফুসলিয়ে তাকে নদীর আড়ালে কে নিয়ে গিয়েছে?
সন্ধেবেলায়?
কে খেয়েছে চাঁদ?
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। পূর্ণেন্দু পত্রীর কবিতা।
কবিতার খাতা –
পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘কে খেয়েছে চাঁদ’ কবিতাটি আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনবদ্য, সুররিয়ালিস্টিক (পরাবাস্তব) এবং নান্দনিক সৃষ্টি। সচরাচর কবিতায় চাঁদকে রূপালী থালা, স্নিগ্ধতার প্রতীক কিংবা সৌন্দর্যের উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কবি এখানে এক সম্পূর্ণ নতুন ও চমকপ্রদ কোণ থেকে চাঁদের ক্ষয়িষ্ণু রূপকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের ক্রমশ ছোট হয়ে যাওয়া বা ক্ষয়ে যাওয়াকে কবি এক অদ্ভুত ও অলৌকিক কল্পনার রঙে রাঙিয়েছেন। কবিতাটি মূলত প্রকৃতির একটি রূপান্তরকে মানুষের অবদমিত কামনা, তীব্র মানসিক তৃষ্ণা এবং সৌন্দর্যের রহস্যময় হরণের এক মনস্তাত্ত্বিক দলিল হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে।
কবিতার প্রারম্ভেই কবি এক শিশুসুলভ অথচ গভীর কৌতূহলী প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন—সন্ধ্যাবেলায় দাঁতে কামড়ে কে চাঁদকে খেয়েছে? আকাশের একাদশীর বা দ্বাদশীর বাঁকা চাঁদকে দেখে কবির মনে হয়েছে, মহাশূন্যের এক বিশাল ও ছড়ানো ডাইনিং টেবিলে যেন এক ছিরিছাঁদহীন, আধখাওয়া ‘ভাঙা বিস্কুট’ পড়ে আছে। এই চমকপ্রদ উপমাটি চিরাচরিত রোমান্টিক চাঁদের ধারণাকে ভেঙে দেয়। অথচ কদিন আগেই, অর্থাৎ পূর্ণিমার রাতে, এই চাঁদ ছিল রাজকীয় ও সর্বাঙ্গসুন্দর। কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে সে যেন শাড়ি লুটিয়ে এক অপরূপা শ্রেষ্ঠ নারীর মতো হেঁটে বেড়াত। যমুনা নদীর মতো তার নিটোল ও চিকন অঙ্গে ছিল আলোর তরঙ্গ। সে আকাশের ঘাটে সমস্ত লজ্জা আর কলসি ভাসিয়ে দিয়ে মনের সুখে স্নান করত। সেই পূর্ণাঙ্গ ও দীপ্তিময় চাঁদ আজ এভাবে কার কামড়ে ক্ষয়ে গেল—কবি বারবার সেই অপরাধীকে খুঁজছেন।
কবিতার দ্বিতীয় অংশে কবি এই চাঁদ ক্ষয়ের পেছনে থাকা এক তীব্র, আদিম ও গোপন মানবিক আকাঙ্ক্ষার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কবি প্রশ্ন তুলেছেন—কার ভেতরের তীব্র তৃষ্ণার উনুনে এমন আগুন জ্বলে উঠেছিল, যে সেই আগুন দিয়ে দাঁত মেজে চাঁদকে কামড়ে খেয়েছে? এখানে ‘উনুনের আগুন’ ও ‘দাঁত মাজা’ মূলত মানুষের তীব্র কামনাবোধ এবং কোনো সুন্দরকে গ্রাস করার আদিম প্রবৃত্তিকেই নির্দেশ করে। ‘ইচ্ছা-সুখের কালো ভীমরুল’ কামড়ে কাকে লাল করে দিয়েছিল? এই রূপকের মাধ্যমে কবি বুঝিয়েছেন যে, তীব্র ইচ্ছা বা অবদমিত কামনা যখন মানুষকে দংশন করে, তখন মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
পরবর্তী পঙ্ক্তিগুলোতে কবি আরও কিছু মায়াবী ও রহস্যময় প্রশ্ন তোলেন। আকাশের এই রত্নের থালাটিকে কে নিজের জিভের লালায় এঁটো করে দিয়ে গেল? কে এই আলোর কুসুম বা ফুলগুলোকে এক এক করে ছিঁড়ে নিজের মনের মিহি সুতো দিয়ে মালা গাঁথল? চাঁদের এই রহস্যময় নিখোঁজ বা ক্ষয়ে যাওয়ার পেছনে কবি এক চতুর প্রতারণার আভাসও পেয়েছেন। সন্ধ্যাবেলায় কে তাকে ফুসলিয়ে, প্রলোভন দেখিয়ে নদীর আড়ালে বা দিগন্তের ওপারে নিয়ে গিয়ে হরণ করল? এই ‘নদীর আড়ালে নিয়ে যাওয়া’ মূলত সৌন্দর্যের এক গোপন বিনাশ বা রূপান্তরের মায়াবী রূপ।
সামগ্রিকভাবে, ‘কে খেয়েছে চাঁদ’ কবিতাটি কেবল একটি কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের বর্ণনা নয়, এটি মানুষের অবচেতন মনের এক গভীর রূপক। জগতের সমস্ত সুন্দর ও পূর্ণতা কীভাবে সময়ের নিয়মে কিংবা কারো তীব্র আকাঙ্ক্ষার দহনে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়, কবি অত্যন্ত চমত্কার কিছু উপমা ও চিত্রকল্পের সাহায্যে তা ফুটিয়ে তুলেছেন। কবির বারবার করা প্রশ্ন—”কে খেয়েছে চাঁদ?”—পাঠকের মনে কেবল চাঁদের জন্য নয়, বরং জীবনের সমস্ত হারিয়ে যাওয়া এবং ক্ষয়ে যাওয়া সুন্দরের প্রতি এক অদ্ভুত রহস্য ও দীর্ঘশ্বাস তৈরি করে।






