কবিতার শুরুতেই এক অমোঘ ও আদিম সত্যের উচ্চারণ—‘আজ তিনি ছেড়েছেন ইহলোকধাম / যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’। সৃষ্টির উৎসপুরুষের এই মহাপ্রস্থানের লগ্নে কবি বিশ্ব-প্রকৃতির কাছে আর্তি জানিয়েছেন। আকাশ ও পৃথিবীর কাছে প্রার্থনা করেছেন যেন অন্ধকার পরকালের পথে তাঁর বাবার জন্য আলো থাকে, বৈতরণীর চেনা কষ্ট যেন পুণ্যশ্লোকে রূপ নেয়। কবি তাঁর বাবার এই অন্তিম শয়ানকে সাধারণ কোনো মৃত্যু হিসেবে দেখেননি। যিশুখ্রিস্টের রক্তে ভেজা ক্রুশকাঠ যেভাবে ত্যাগের মহিমায় মহান, তাঁর বাবার শবও জীবনের সমস্ত ক্লান্তি ও ব্যথা বুকে নিয়ে চিতাকাঠে আজ সমভাবে মহান। তাই তো গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সিন্ধু ও সরস্বতীর মতো পবিত্র নদীদের কাছে কবির আবাহন—তারা যেন এসে এই চিরশায়িত পিতার মাথা ধুয়ে দেয়। প্রকৃতির মহানিম, কৃষ্ণচূড়া আর শালের মহাদ্রুমেরা যেন পরম মায়ায় বিছিয়ে দেয় শান্ত ছায়াঘুম।
কবিতার মধ্যভাগে এসে আধ্যাত্মিক আবহটি এক লহমায় রূপ নেয় এক দুর্দান্ত বাস্তব ও স্মৃতিবিজড়িত ফ্ল্যাশব্যাকে। কবি ফিরে গেছেন তাঁর শৈশবে—বাবার কাঁধে চড়েই ছিল যাঁর জীবনের প্রথম বিশ্ব পর্যটন। সারাদিনের চঞ্চলতা শেষে বাবার সেই চেনা কাঁধে মোমের মতো গলে ঘুমে ঢলে পড়ার স্মৃতি আজও কত জীবন্ত! কবি মনে করিয়ে দেন তাঁর বাবার সেই লড়াকু রূপকে, যিনি এক চরম দুর্যোগে দুই কাঁধে দুই ছেলেমেয়েকে তুলে এবং শক্ত হাতে স্ত্রীকে ধরে নিয়ে তিস্তার প্রলয়ংকরী বন্যার খরস্রোতে একাকী বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই ঘোলা জল ঠেলে পরিবারকে ডাঙায় তোলার যে অদম্য জেদ, তা-ই ছিল তাঁর জীবনের মূল চালিকাশক্তি। এই ছোট পরিবারটুকুকে পরম আদরে নিজের পিঠে নিয়ে, সমস্ত ঝড়-ঝাপটা আড়াল করে তিনি পৃথিবীর পথে একনাগাড়ে হেঁটেছেন একাশিটি বছর।
পরিশেষে, কবিতাটি এক চক্রাকার পূর্ণতা ও পরম শান্তিতে গিয়ে পৌঁছায়। যে পিতা একদিন সন্তানদের কাঁধে তুলে জীবনের পথ দেখিয়েছিলেন, আজ সময় বদলেছে। আজ সমস্ত ভাইবোন মিলে সেই পিতাকে নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে চলেছে মহাপ্রস্থানের শেষ সীমানা—সিরিটি শ্মশানের দিকে। তিরিশে নভেম্বর দু’হাজার তিন—কবির ব্যক্তিগত ডায়েরির এই বিষণ্ণ তারিখটিই এক পরম সত্যে মূর্ত হয়ে ওঠে। চিতার আগুন যখন চারপাশকে গ্রাস করে, তখন কবির চোখে ভেসে ওঠে এক অলৌকিক দৃশ্য। সমস্ত জাগতিক অন্ধকার, শোক আর ক্ষয়কে পরাস্ত করে তাঁর বাবার মুখে লেগে থাকে এক জ্যোতির্ময়, চিরন্তন ও ‘মৃত্যুহীন’ আলো।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় মল্লিকা সেনগুপ্তের নিজস্ব গম্ভীর লয়ের ছন্দ, নদী-বৃক্ষ-পুরাণের মহিমান্বিত চিত্রকল্প এবং এক লড়াকু পিতার প্রতি কন্যার পরম কৃতজ্ঞতার স্বীকারোক্তি হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও কালজয়ী শোকগাথা হয়ে অমর হয়ে রয়েছে।
আমার বাবার মুখ – মল্লিকা সেনগুপ্ত | মল্লিকা সেনগুপ্তের পিতৃবিয়োগের কবিতা | পিতার মৃত্যু ও শেষকৃত্যের অসাধারণ শ্রদ্ধাঞ্জলি | ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’ ও ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’
আমার বাবার মুখ: মল্লিকা সেনগুপ্তের পিতৃবিয়োগের বেদনা ও চিরন্তন স্মৃতির অসাধারণ কাব্য, ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’ বলে শুরু, ‘হে আকাশ, হে পৃথিবী, শান্তি দিয়ো তাঁকে’ বলে প্রার্থনা, বৈতরণী-গঙ্গা-যমুনা-গোদাবরী-সিন্ধু-সরস্বতীর জল দিয়ে পিতার মাথা ধোয়ার আহ্বান, ‘চাল ডাল ঘি লবণ বাগানের সবুজ ফসল’ দিয়ে অন্নজল বেড়ে দেওয়ার কথা, ‘পৃথিবীর যত গাছ বাবাকে দাও শান্ত ছায়াঘুম’ বলে প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা, পিতার কাঁধে চড়ে প্রথম পর্যটন ও ঘুমিয়ে পড়ার স্মৃতি, তিস্তার বন্যার জলে একাকী দাঁড়িয়ে পরিবার বাঁচানোর চিত্র, ‘একাশি বছর ধরে হেঁটেছেন তিনি’ বলে পিতার সংগ্রাম, ‘আজ তাঁকে কাঁধে নিয়ে ভাইবোন আমরা চলেছি মহাপ্রস্থানের পথে সিরিটি শ্মশানে’ বলে চূড়ান্ত বিদায়, ও ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’ বলে চূড়ান্ত ঘোষণার অমর সৃষ্টি
মল্লিকা সেনগুপ্তের “আমার বাবার মুখ” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, হৃদয়বিদারক ও আত্মজীবনীমূলক সৃষ্টি। “আজ তিনি ছেড়েছেন ইহলোকধাম, যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে পিতার মৃত্যু ও শেষকৃত্যের অসাধারণ শ্রদ্ধাঞ্জলির কাহিনি; ‘হে আকাশ, হে পৃথিবী, শান্তি দিয়ো তাঁকে, অন্ধকারে তাঁর পথে যেন আলো থাকে’ বলে প্রার্থনা; ‘বৈতরণী পুণ্যশ্লোক হোক, যেভাবে গঙ্গার জলে ভেসে আসে মাঙ্গলিক শ্লোক’ বলে নদীর কাছে প্রার্থনা; ‘যিশুর শোণিতে ভেজা ক্রুশকাঠ যেরকম ব্যথায় মহান, আমার বাবার শব ব্যথাকাঠে সেরকম চিতায় শয়ান’ বলে পিতার কষ্টের সঙ্গে যিশুর ব্যথার উপমা; ‘গঙ্গে যমুনে চৈব গোদাবরী সিন্ধু সরস্বতী, আমার বাবার মাথা ধুয়ে দাও ধুয়ে দাও নদী’ বলে সাত নদীর কাছে প্রার্থনা; ‘চাল ডাল ঘি লবণ বাগানের সবুজ ফসল, আমার বাবার পাতে বেড়ে দিয়ে যাও অন্নজল’ বলে শেষ নিবেদন; ‘মহানিম কৃষ্ণচূড়া শাল সেগুনের মহাদ্রুম, পৃথিবীর যত গাছ আমার বাবাকে দাও শান্ত ছায়াঘুম’ বলে গাছের কাছে প্রার্থনা; ‘তাঁর কাঁধে চড়ে আমি পর্যটন করেছি প্রথম, অনেক হাঁটার শেষে তাঁর কাঁধে ঘুমে ঢলে মোম’ বলে শৈশবের স্মৃতি; ‘দু’কাঁধে দু’ ছেলেমেয়ে, শক্ত হাতে স্ত্রীকে ধরে নিয়ে তিস্তার বন্যার জলে খরস্রোতে একাকী দাঁড়িয়ে ঘোলা জল বুকে ঠেলে হেঁটেছেন ডাঙার আশায়’ বলে পিতার আত্মত্যাগ ও সাহসের চিত্র; ‘ছোট পরিবারটুকু পিঠে নিয়ে পৃথিবীর পথে একাশি বছর ধরে হেঁটেছেন তিনি’ বলে দীর্ঘ জীবনের সংগ্রাম; ‘আজ তাঁকে কাঁধে নিয়ে ভাইবোন আমরা চলেছি মহাপ্রস্থানের পথে সিরিটি শ্মশানে’ বলে শেষযাত্রা; এবং শেষ পর্যন্ত ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’ বলে চূড়ান্ত ঘোষণার অসাধারণ কাব্যচিত্র। মল্লিকা সেনগুপ্ত একজন সমসাময়িক বাঙালি কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি নারীবাদী চেতনা, পারিবারিক বন্ধন, মৃত্যু ও স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন। “আমার বাবার মুখ” সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি পিতার মৃত্যুতে এক গভীর ও আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি রচনা করেছেন।
মল্লিকা সেনগুপ্ত: পিতৃবিয়োগ, স্মৃতি ও আত্মজীবনীর কবি
মল্লিকা সেনগুপ্ত একজন সমসাময়িক বাঙালি কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি নারীবাদী চেতনা, পারিবারিক বন্ধন, পিতৃবিয়োগের বেদনা, মৃত্যু ও স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ, আন্তরিকতা ও আত্মজীবনীমূলক সত্যতা ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ইয়েস বস্’, ‘তারা রং গাছ’, ‘আমার বাবার মুখ’, ‘অন্য নামে ডাকো’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি।
মল্লিকা সেনগুপ্তের পিতৃবিয়োগের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’ বলে পিতার সঙ্গে দেহের সম্পর্কের স্বীকারোক্তি, ‘আকাশ-পৃথিবীর কাছে শান্তি প্রার্থনা’, ‘নদী দিয়ে মাথা ধোয়ার আহ্বান’, ‘গাছ থেকে ছায়াঘুম চাওয়া’, ‘যিশুর ক্রুশকাঠের সঙ্গে পিতার কষ্টের উপমা’, ‘শৈশবে পিতার কাঁধে চড়ার স্মৃতি’, ‘তিস্তার বন্যায় পরিবার বাঁচানোর চিত্র’, ‘একাশি বছর সংগ্রামের কথা’, ‘সিরিটি শ্মশানে শেষযাত্রা’, এবং ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’ বলে চূড়ান্ত ঘোষণা। ‘আমার বাবার মুখ’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি পিতার মৃত্যুতে এক আন্তরিক ও অনন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি রচনা করেছেন।
আমার বাবার মুখ: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘আমার বাবার মুখ’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘আমার বাবার মুখ’ — যেখানে জীবনের শেষ ছবি, শেষ আলো। কবিতার শেষ লাইনে বলা হয়েছে — ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’। এই মুখের আলো কখনো নিভবে না।
কবিতাটি পিতার মৃত্যু ও শেষকৃত্যের পটভূমিতে রচিত। কবির পিতা ২০০৩ সালের ৩০ নভেম্বর মারা যান। কবি সেই দিনের স্মৃতি লিখেছেন।
কবি শুরুতে বলছেন — আজ তিনি ছেড়েছেন ইহলোকধাম, যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম।
হে আকাশ, হে পৃথিবী, শান্তি দিয়ো তাঁকে। অন্ধকারে তাঁর পথে যেন আলো থাকে। আমার বাবার পথে বৈতরণী পুণ্যশ্লোক হোক, যেভাবে গঙ্গার জলে ভেসে আসে মাঙ্গলিক শ্লোক।
যিশুর শোণিতে ভেজা ক্রুশকাঠ যেরকম ব্যথায় মহান, আমার বাবার শব ব্যথাকাঠে সেরকম চিতায় শয়ান।
গঙ্গেচ যমুনেচৈব গোদাবরী সিন্ধু সরস্বতী, আমার বাবার মাথা ধুয়ে দাও ধুয়ে দাও নদী।
চাল ডাল ঘি লবণ বাগানের সবুজ ফসল, আমার বাবার পাতে বেড়ে দিয়ে যাও অন্নজল।
মহানিম কৃষ্ণচূড়া শাল সেগুনের মহাদ্রুম, পৃথিবীর যত গাছ আমার বাবাকে দাও শান্ত ছায়াঘুম।
তাঁর কাধে চড়ে আমি পর্যটন করেছি প্রথম। অনেক হাঁটার শেষে তাঁর কাঁধে ঘুমে ঢলে মোম।
দু’কাঁধে দু’ ছেলেমেয়ে, শক্ত হাতে স্ত্রীকে ধরে নিয়ে তিস্তার বন্যার জলে খরস্রোতে একাকী দাঁড়িয়ে ঘোলা জল বুকে ঠেলে হেঁটেছেন ডাঙার আশায়।
ছোট পরিবারটুকু পিঠে নিয়ে পৃথিবীর পথে একাশি বছর ধরে হেঁটেছেন তিনি।
আজ তাঁকে কাঁধে নিয়ে ভাইবোন আমরা চলেছি মহাপ্রস্থানের পথে সিরিটি শ্মশানে। তিরিশে নভেম্বর দু’হাজার তিন। আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন।
আমার বাবার মুখ: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ (সংক্ষিপ্ত আকারে)
প্রথম স্তবক: পিতার মৃত্যু ও ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’
“আজ তিনি ছেড়েছেন ইহলোকধাম / যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম”
প্রথম স্তবকে পিতার মৃত্যুর ঘোষণা। ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’ — দেহের সম্পর্কের সরল ও গভীর স্বীকারোক্তি।
দ্বিতীয় স্তবক: আকাশ-পৃথিবীর কাছে শান্তি প্রার্থনা ও আলো চাওয়া
“হে আকাশ, হে পৃথিবী, শান্তি দিয়ো তাঁকে / অন্ধকারে তাঁর পথে যেন আলো থাকে।”
দ্বিতীয় স্তবকে প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা। আকাশ ও পৃথিবী — দুই মৌলিক উপাদান। ‘অন্ধকারে তাঁর পথে যেন আলো থাকে’ — মৃত্যুর পরের পথে আলোর প্রার্থনা।
তৃতীয় স্তবক: বৈতরণী ও গঙ্গার মাঙ্গলিক শ্লোক
“আমার বাবার পথে বৈতরণী পুণ্যশ্লোক হোক / يেভাবে গঙ্গার جলে ভেসে আসে মাঙ্গলিক শ্লোক۔”
তৃতীয় স্তবকে নদীর প্রতীক। বৈতরণী মৃত্যুর পরের নদী। ‘পুণ্যশ্লোক হোক’ — পবিত্র মন্ত্র। গঙ্গার জলে যেমন মাঙ্গলিক শ্লোক ভাসে, তেমনি বাবার পথে শ্লোক ভাসুক।
চতুর্থ স্তবক: যিশুর ক্রুশকাঠের সঙ্গে পিতার কষ্টের উপমা
“يিশুর শোণিতে ভেজা كروشكاঠ يেরকম ب্যথায় মহান / আমার বাবার শব ب্যথাকাঠে سেরকم چিতায় شয়ان۔”
চতুর্থ স্তবকে ধর্মীয় প্রতীক। যিশু ক্রুশে বেদনা পেয়েছিলেন, সেই বেদনা তাকে মহান করেছে। কবির বাবার শব ‘ব্যথাকাঠে’ চিতায় শয়ান — অর্থাৎ পিতার কষ্টের কাঠের ওপর শব রাখা হয়েছে।
পঞ্চম স্তবক: সাত নদী দিয়ে মাথা ধোয়ার আহ্বান
“گنگেচ যমুনেচৈব گودابরী সিন্ধু সরস্বতী / আমার বাবার مাথا ধুয়ে دাও ধুয়ে دাও نদী”
পঞ্চম স্তবকে সাতটি পবিত্র নদীর নাম। কবি নদীগুলোর কাছে প্রার্থনা করছেন — বাবার মাথা ধুয়ে দাও।
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবক: অন্নজল বেড়ে দেওয়া ও গাছের ছায়াঘুম চাওয়া
“চাল ডال ঘি لوبن باغানের সবুজ فسل / আমার বাবার پاته بেড়ে দিয়ে যাও অন্নজল। / মহানিম كৃষ্ণচূڑা শال سگুনের মহাদ্রوم / পৃথিবীর যত گاچ আমার বাবাকে داو شانت ছায়াঘوم۔”
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে শেষ নিবেদন ও প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা। চাল-ডাল-ঘি-লবণ-ফসল দিয়ে বাবার পাতে অন্নজল বেড়ে দেওয়ার আহ্বান। গাছের কাছে বাবাকে শান্ত ছায়াঘুম দেওয়ার প্রার্থনা।
অষ্টম, নবম ও দশম স্তবক: শৈশবের স্মৃতি ও তিস্তার বন্যায় পিতার সংগ্রাম
“তাঁর কাধে چڑে আমি পর্যটন করেছি প্রথম / অনেক هাঁটার শেষে তাঁর কাঁধে ঘুমে ঢলে موم / دو’كাঁধে دو’ چেলেমেয়ে, শক্ত هاته স্ত্রীকে ধরে নিয়ে / تিস্তার বন্যার جলে খরস্রোতে একاكی دাঁড়িয়ে / ঘোলا জল বুকে ঠেলে هেঁটেছেন ডাঙার আশায় / ছোট পরিবারটুকু পিঠে নিয়ে পৃথিবীর پاته / একাশি বছর ধরে هেঁটেছেন তিনি”
অষ্টম, নবম ও দশম স্তবকে পিতার জীবনের স্মৃতি ও সংগ্রাম। শৈশবে পিতার কাঁধে চড়ে প্রথম পর্যটন, ক্লান্ত হয়ে পিতার কাঁধে ঘুমিয়ে পড়া। তিস্তার বন্যার জলে একাকী দাঁড়িয়ে পরিবার বাঁচানোর চিত্র। একাশি বছর ধরে পৃথিবীর পথে হাঁটা — দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক।
একাদশ ও শেষ স্তবক: শেষযাত্রা ও ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’
“আজ তাঁকে কাঁধে নিয়ে ভাইبون আমরা চলেছি / মহাপ্রস্থানের পথে سিরিটি ش্মশানে / তিরিশে নভেম্বর دو’হাজার তিন / আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন।”
একাদশ ও শেষ স্তবকে শেষযাত্রা ও চূড়ান্ত ঘোষণা। ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ — মৃত্যুর পথে। ‘সিরিটি শ্মশানে’ — কলকাতার একটি শ্মশান। ‘তিরিশে নভেম্বর দু’হাজার তিন’ — পিতার মৃত্যুর তারিখ। ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’ — চূড়ান্ত ঘোষণা: মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু মুখের আলো কখনো নিভবে না।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত, দীর্ঘ লাইনে প্রবাহিত। ‘আজ তিনি ছেড়েছেন ইহলোকধাম’ — শুরু। ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’ — দেহের সম্পর্কের স্বীকারোক্তি। ‘হে আকাশ, হে পৃথিবী’ — সম্বোধন। ‘বৈতরণী’, ‘গঙ্গার মাঙ্গলিক শ্লোক’ — ধর্মীয় প্রতীক। ‘যিশুর ক্রুশকাঠ’ — খ্রিস্টান প্রতীক। ‘গঙ্গেচ যমুনেচৈব…’ — সংস্কৃত শ্লোকের আদলে। ‘চাল ডাল ঘি লবণ’ — গ্রামীণ সরলতার প্রতীক। ‘মহানিম কৃষ্ণচূড়া শাল সেগুন’ — গাছের নাম। ‘তিস্তার বন্যার জল’ — বাস্তব স্মৃতি। ‘একাশি বছর’ — দীর্ঘ জীবনের প্রতীক। ‘সিরিটি শ্মশানে’ — বাস্তব স্থান। ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’ — চূড়ান্ত ঘোষণা।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘বীজ’ — পিতৃত্ব ও জন্মের প্রতীক। ‘আকাশ, পৃথিবী’ — প্রকৃতির মৌলিক শক্তির প্রতীক। ‘বৈতরণী’ — মৃত্যুর পরের নদীর প্রতীক। ‘গঙ্গার মাঙ্গলিক শ্লোক’ — পবিত্রতার প্রতীক। ‘যিশুর ক্রুশকাঠ’ — আত্মত্যাগ ও বেদনার প্রতীক। ‘সাত নদী’ — পবিত্রতা ও শুদ্ধির প্রতীক। ‘চাল ডাল ঘি লবণ’ — শেষ নিবেদনের প্রতীক। ‘গাছ’ — ছায়া ও প্রশান্তির প্রতীক। ‘পিতার কাঁধ’ — নিরাপত্তা ও ভালোবাসার প্রতীক। ‘তিস্তার বন্যা’ — জীবনের সংকটের প্রতীক। ‘একাশি বছর’ — দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক। ‘মহাপ্রস্থান’ — মৃত্যুপথের প্রতীক। ‘সিরিটি শ্মশান’ — শেষ বিদায়ের স্থানের প্রতীক। ‘আলো মৃত্যুহীন’ — চিরন্তন স্মৃতির প্রতীক।
বৈপরীত্য ব্যবহার অত্যন্ত দক্ষ। ‘অন্ধকার পথ’ ও ‘আলো’ — মৃত্যু ও আশার বৈপরীত্য। ‘যিশুর ক্রুশ’ ও ‘ব্যথাকাঠে চিতা’ — ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত ব্যথার বৈপরীত্য। ‘ঘোলা জল বুকে ঠেলা’ ও ‘ডাঙার আশা’ — সংকট ও আশার বৈপরীত্য। ‘মৃত্যু’ ও ‘আলো মৃত্যুহীন’ — বিনাশ ও চিরন্তনতার বৈপরীত্য।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“আমার বাবার মুখ” মল্লিকা সেনগুপ্তের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে পিতার মৃত্যু ও শেষকৃত্যের মাধ্যমে এক গভীর ও আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি রচনা করেছেন।
প্রথম স্তবকে — পিতার মৃত্যু ও ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’। দ্বিতীয় স্তবকে — আকাশ-পৃথিবীর কাছে শান্তি প্রার্থনা ও আলো চাওয়া। তৃতীয় স্তবকে — বৈতরণী ও গঙ্গার মাঙ্গলিক শ্লোক। চতুর্থ স্তবকে — যিশুর ক্রুশকাঠের সঙ্গে পিতার কষ্টের উপমা। পঞ্চম স্তবকে — সাত নদী দিয়ে মাথা ধোয়ার আহ্বান। ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে — অন্নজল বেড়ে দেওয়া ও গাছের ছায়াঘুম চাওয়া। অষ্টম, নবম ও দশম স্তবকে — শৈশবের স্মৃতি ও তিস্তার বন্যায় পিতার সংগ্রাম। একাদশ ও শেষ স্তবকে — শেষযাত্রা ও ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — ‘আজ তিনি ছেড়েছেন ইহলোকধাম, যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’; ‘হে আকাশ, হে পৃথিবী, শান্তি দিয়ো তাঁকে, অন্ধকারে তাঁর পথে যেন আলো থাকে’; ‘বৈতরণী পুণ্যশ্লোক হোক, যেভাবে গঙ্গার জলে ভেসে আসে মাঙ্গলিক শ্লোক’; ‘যিশুর শোণিতে ভেজা ক্রুশকাঠ যেরকম ব্যথায় মহান, আমার বাবার শব ব্যথাকাঠে সেরকম চিতায় শয়ান’; ‘গঙ্গে যমুনে চৈব গোদাবরী সিন্ধু সরস্বতী, আমার বাবার মাথা ধুয়ে দাও ধুয়ে দাও নদী’; ‘চাল ডাল ঘি লবণ বাগানের সবুজ ফসল, আমার বাবার পাতে বেড়ে দিয়ে যাও অন্নজল’; ‘মহানিম কৃষ্ণচূড়া শাল সেগুনের মহাদ্রুম, পৃথিবীর যত গাছ আমার বাবাকে দাও শান্ত ছায়াঘুম’; ‘তাঁর কাঁধে চড়ে আমি পর্যটন করেছি প্রথম, অনেক হাঁটার শেষে তাঁর কাঁধে ঘুমে ঢলে মোম’; ‘দু’কাঁধে দু’ ছেলেমেয়ে, শক্ত হাতে স্ত্রীকে ধরে নিয়ে তিস্তার বন্যার জলে খরস্রোতে একাকী দাঁড়িয়ে ঘোলা জল বুকে ঠেলে হেঁটেছেন ডাঙার আশায়’; ‘ছোট পরিবারটুকু পিঠে নিয়ে পৃথিবীর পথে একাশি বছর ধরে হেঁটেছেন তিনি’; ‘আজ তাঁকে কাঁধে নিয়ে ভাইবোন আমরা চলেছি মহাপ্রস্থানের পথে সিরিটি শ্মশানে। তিরিশে নভেম্বর দু’হাজার তিন’; আর শেষ পর্যন্ত — ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’।
মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতায় পিতৃবিয়োগ, স্মৃতি ও চিরন্তন আলো
মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতায় পিতৃবিয়োগ, স্মৃতি ও চিরন্তন আলো একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘আমার বাবার মুখ’ কবিতায় পিতার মৃত্যু ও শেষকৃত্যের অসাধারণ কাব্যিক চিত্র এঁকেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’ বলা যায়; কীভাবে ‘আকাশ-পৃথিবীর কাছে শান্তি প্রার্থনা করা যায়’; কীভাবে ‘বৈতরণী ও গঙ্গার শ্লোক’ চাওয়া যায়; কীভাবে ‘যিশুর ক্রুশের সঙ্গে পিতার কষ্টের তুলনা’ করা যায়; কীভাবে ‘সাত নদী দিয়ে মাথা ধোয়া’ যায়; কীভাবে ‘গাছের ছায়াঘুম’ চাওয়া যায়; কীভাবে ‘শৈশবে পিতার কাঁধে চড়ার স্মৃতি’ ফিরে আসে; কীভাবে ‘তিস্তার বন্যায় পিতার সংগ্রাম’ চিত্রিত হয়; আর কীভাবে শেষ পর্যন্ত ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’ ঘোষণা করা হয়।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘আমার বাবার মুখ’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের পিতৃবিয়োগের বেদনা, শেষকৃত্যের আচার, স্মৃতিচারণা, এবং মল্লিকা সেনগুপ্তের আন্তরিক কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’, ‘হে আকাশ, হে পৃথিবী, শান্তি দিয়ো তাঁকে’, ‘বৈতরণী পুণ্যশ্লোক হোক’, ‘যিশুর ক্রুশকাঠের উপমা’, ‘গঙ্গেচ যমুনেচৈব’, ‘চাল ডাল ঘি লবণ’, ‘পৃথিবীর যত গাছ দাও ছায়াঘুম’, ‘তাঁর কাঁধে চড়ে প্রথম পর্যটন’, ‘তিস্তার বন্যার জলে একাকী দাঁড়িয়ে’, ‘একাশি বছর ধরে হেঁটেছেন’, ‘মহাপ্রস্থানের পথে সিরিটি শ্মশানে’, এবং ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’ — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ ও মৃত্যুচেতনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আমার বাবার মুখ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: আমার বাবার মুখ কবিতাটির রচয়িতা কে?
এই কবিতাটির রচয়িতা মল্লিকা সেনগুপ্ত। তিনি একজন সমসাময়িক বাঙালি কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি নারীবাদী চেতনা, পারিবারিক বন্ধন, পিতৃবিয়োগের বেদনা, মৃত্যু ও স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ইয়েস বস্’, ‘তারা রং গাছ’, ‘আমার বাবার মুখ’, ‘অন্য নামে ডাকো’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
পিতার সঙ্গে দেহের সম্পর্কের সরল ও গভীর স্বীকারোক্তি। ‘বীজ’ শব্দটি জৈবিক সত্যকে নির্দেশ করে, কিন্তু এখানে তা আন্তরিক শ্রদ্ধায় ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রশ্ন 3: ‘হে আকাশ, হে পৃথিবী, শান্তি দিয়ো তাঁকে’ — কেন আকাশ ও পৃথিবীর কাছে প্রার্থনা?
আকাশ ও পৃথিবী প্রকৃতির দুই মৌলিক উপাদান। মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তির জন্য প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করা — এটি এক ধরনের সর্বপ্রাণবাদী চেতনা।
প্রশ্ন ৪: ‘যিশুর শোণিতে ভেজা ক্রুশকাঠ যেরকম ব্যথায় মহান’ — কেন যিশুর উপমা দেওয়া হয়েছে?
যিশু ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মানবজাতির পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন। তার ব্যথা ছিল মহান। কবি পিতার কষ্টকেও সেই ব্যথার সমকক্ষ বলে মনে করছেন।
প্রশ্ন ৫: ‘গঙ্গেচ যমুনেচৈব গোদাবরী সিন্ধু সরস্বতী’ — কেন সাত নদীর নাম নেওয়া হয়েছে?
এটি একটি সংস্কৃত শ্লোকের আদলে রচিত। সাতটি পবিত্র নদী হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র। কবি এই নদীগুলোকে বাবার মাথা ধোয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন — যেন বাবার আত্মা শুদ্ধ হয়।
প্রশ্ন ৬: ‘পৃথিবীর যত গাছ আমার বাবাকে দাও শান্ত ছায়াঘুম’ — কেন গাছের কাছে প্রার্থনা?
গাছ ছায়া দেয়, প্রশান্তি দেয়। কবি চান বাবা যেন গাছের ছায়ায় ঘুমান — অর্থাৎ প্রকৃতির কোলে চিরশান্তি লাভ করেন।
প্রশ্ন ৭: ‘তাঁর কাধে চড়ে আমি পর্যটন করেছি প্রথম’ — লাইনটির সৌন্দর্য কী?
শৈশবে পিতার কাঁধে চড়ে বসার একটি অতি সাধারণ স্মৃতি। কিন্তু এই সরল স্মৃতির মাধ্যমে পিতার স্নেহ ও সন্তানের নির্ভরতার অসাধারণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রশ্ন ৮: ‘তিস্তার বন্যার জলে খরস্রোতে একাকী দাঁড়িয়ে ঘোলা জল বুকে ঠেলে হেঁটেছেন ডাঙার আশায়’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
এটি পিতার আত্মত্যাগ ও সাহসের চিত্র। তিস্তার বন্যায় একাকী দাঁড়িয়ে, পরিবারকে বাঁচানোর জন্য ঘোলা জল বুকে ঠেলে হেঁটেছেন। এটি একটি বাস্তব ও করুণ চিত্র।
প্রশ্ন ৯: ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’ — শেষ লাইনের চূড়ান্ত বার্তা কী?
মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু বাবার মুখের আলো কখনো নিভবে না। এই আলো স্মৃতির, ভালোবাসার, প্রভাবের। এটি পিতার প্রতি চিরন্তন শ্রদ্ধার ঘোষণা।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — ‘আজ তিনি ছেড়েছেন ইহলোকধাম, যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম’; ‘হে আকাশ, হে পৃথিবী, শান্তি দিয়ো তাঁকে, অন্ধকারে তাঁর পথে যেন আলো থাকে’; ‘বৈতরণী পুণ্যশ্লোক হোক, যেভাবে গঙ্গার জলে ভেসে আসে মাঙ্গলিক শ্লোক’; ‘যিশুর শোণিতে ভেজা ক্রুশকাঠ যেরকম ব্যথায় মহান, আমার বাবার শব ব্যথাকাঠে সেরকম চিতায় শয়ান’; ‘গঙ্গে যমুনে চৈব গোদাবরী সিন্ধু সরস্বতী, আমার বাবার মাথা ধুয়ে দাও ধুয়ে দাও নদী’; ‘চাল ডাল ঘি লবণ বাগানের সবুজ ফসল, আমার বাবার পাতে বেড়ে দিয়ে যাও অন্নজল’; ‘মহানিম কৃষ্ণচূড়া শাল সেগুনের মহাদ্রুম, পৃথিবীর যত গাছ আমার বাবাকে দাও শান্ত ছায়াঘুম’; ‘তাঁর কাঁধে চড়ে আমি পর্যটন করেছি প্রথম, অনেক হাঁটার শেষে তাঁর কাঁধে ঘুমে ঢলে মোম’; ‘দু’কাঁধে দু’ ছেলেমেয়ে, শক্ত হাতে স্ত্রীকে ধরে নিয়ে তিস্তার বন্যার জলে খরস্রোতে একাকী দাঁড়িয়ে ঘোলা জল বুকে ঠেলে হেঁটেছেন ডাঙার আশায়’; ‘ছোট পরিবারটুকু পিঠে নিয়ে পৃথিবীর পথে একাশি বছর ধরে হেঁটেছেন তিনি’; ‘আজ তাঁকে কাঁধে নিয়ে ভাইবোন আমরা চলেছি মহাপ্রস্থানের পথে সিরিটি শ্মশানে। তিরিশে নভেম্বর দু’হাজার তিন’; আর শেষ পর্যন্ত — ‘আমার বাবার মুখে আলো মৃত্যুহীন’। এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — পিতৃবিয়োগের বেদনা, শেষকৃত্যের আচার, স্মৃতির চিরন্তনতা — সবকিছুই চিরন্তন ও সময়োপযোগী বিষয়।
ট্যাগস: আমার বাবার মুখ, মল্লিকা সেনগুপ্ত, মল্লিকা সেনগুপ্তের পিতৃবিয়োগের কবিতা, যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম, বৈতরণী, সাত নদী, তিস্তার বন্যা, সিরিটি শ্মশান
© Kobitarkhata.com – কবি: মল্লিকা সেনগুপ্ত | কবিতার প্রথম লাইন: “আজ তিনি ছেড়েছেন ইহলোকধাম, যাঁর বীজ থেকে আমি জন্মেছিলাম” | পিতৃবিয়োগ ও চিরন্তন স্মৃতির অমর কবিতা বিশ্লেষণ | মল্লিকা সেনগুপ্তের আত্মজীবনীমূলক কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন