কবিতার প্রথমাংশে এক পরম আকুলতা ও উৎসবের আবহের চিত্র ফুটে উঠেছে। সারাটা দিন এক অবুঝ শিশু নেচে নেচে বেড়িয়েছে; কারণ আজ তার বাবা মাইনে নিয়ে সকাল-সকাল ফিরবে এবং আসন্ন পূজোর কেনাকাটা এইবেলা সেরে ফেলা হবে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে রাস্তায় আলো জ্বলে উঠলেও বাবার দেখা মেলে না। অবুঝ ছেলের একটাই প্রশ্ন—‘এখনও / বাবা কেন এল না, মা?’ এই দেরিতে ফেরার সমান্তরালে ঘরে এক নিঃশব্দ আশঙ্কার আবহ তৈরি হয়। মায়ের মনের ভেতরের অস্থিরতা মূর্ত হয় কড়ার গায়ে খুন্তির বেশি নড়াচড়ায়, কিংবা ফ্যান গালতে গিয়ে অসাবধানতায় পা পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রণায়। ছেলেটি বই নিয়ে মাদুরে বসেছে, সামনে ইতিহাসের পাতা খোলা—কিন্তু বাপের আদরে মাখা ছেলের চোখে সেই পড়া একগুঁয়ে ও অবাধ্য। যতক্ষণ পূজোর নতুন জামা কেনা না হচ্ছে, মনের ভেতরের সেই ব্যাকুলতা কিছুতেই নড়বে না।
দ্বিতীয় স্তবকে ঘরের ভেতরের সেই রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। রান্না অনেক আগেই শেষ, গা ধোয়াও সারা; মা এখন সোয়েটার বা কিছু বুনতে বসে কেবলই ঘর ভুল করছেন। এই ঘর ভুল করা আসলে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতার রূপক। হঠাৎ ছিটকিনি খোলার ‘খুট’ শব্দে মায়ের বুক কেঁপে ওঠে, কিন্তু না—বাবা নয়, খোকা গলির দরজায় দাঁড়িয়ে। তখন রেডিওতে রাত নয়টার বা কোনো এক অন্তিম প্রহরের খবর বলছে, অথচ সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটা তখনও ঘরে ফেরেনি।
কবিতার শেষাংশে এসে এক অমোঘ ও শিউরে ওঠার মতো নাটকীয় বাঁক তৈরি হয়। বাবা কেন আসছে না—তা একটু এগিয়ে দেখার জন্য খোকা রাস্তায় পা দেয়। মোড়ের মাথায় তখন উপচে পড়া ভিড়, একটা কালো গাড়ি, আর কান ফাটানো শব্দের বাজির আওয়াজ। অবুঝ ছেলেটি ভাবল—আজ কিসের পূজো, কিসের এত বাজি ফুটছে? সে কৌতূহল নিয়ে সেই ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু পাঠক ও কবি জানেন, ওটা কোনো উৎসবের বাজি ছিল না; ওটা ছিল সমকালীন রাজনীতির বোমাবাজি ও বন্দুকের গর্জন।
পরিশেষে, কবিতাটি এক নিদারুণ ও স্তব্ধ করে দেওয়া সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যায়। অনেক গভীর রাত্রে, বারুদের গন্ধে দমবন্ধ হয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে, অজস্র অলিগলি ঘুরে এবং মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে অবশেষে বাবা ঘরে ফিরল। হয়তো তার পকেটে ছিল সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত মাইনের টাকা, হয়তো বা ছিল ছেলের পূজোর জামা কেনার স্বপ্ন। কিন্তু এক চরম ও নির্মম পরিহাসে—‘বাবা এল। / ছেলে এল না।।’ যে ছেলেটি সারাদিন আনন্দের অপেক্ষায় নেচে বেড়িয়েছিল, সে নিজেই সেই অন্ধ রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়ে হরণ করে নিল পরিবারের সমস্ত আলো।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অত্যন্ত সংযত, সরল ও দৃশ্যমান চিত্রকল্পময় ভাষায়, এক মধ্যবিত্ত পরিবারের উৎসবের স্বপ্নকে বোমাবাজির বারুদে পুড়িয়ে ছারখার করার এক অবিনশ্বর সামাজিক প্রতিবাদের গল্প হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অসামান্য ও কালজয়ী ট্র্যাজেডি হয়ে মূর্ত রয়েছে।
কেন এল না – সুভাষ মুখোপাধ্যায় | সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পুজোর কবিতা | বাবার অপেক্ষায় থাকা ছেলের করুণ কাহিনি | ‘বাবা কেন এল না, মা?’ – বারবার প্রশ্ন ও চূড়ান্ত বিপর্যয়
কেন এল না: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পুজোর অপেক্ষা ও অপূর্ণ প্রতীক্ষার অসাধারণ কাব্য, ‘সারাটা দিন ছেলেটা নেচে নেচে বেড়িয়েছে’ বলে শুরু, ‘বাবা কেন এল না, মা?’ বারবার প্রশ্ন, পুজোর কেনাকাটার কথা, রান্নার খুন্তি নড়া ও ফ্যান গালতে পা পুড়ে যাওয়া, ইতিহাসের বই ও অবাধ্য অক্ষর, ‘মা, আমি খোকা’ বলে ফিরে আসা, কালো গাড়ি ও বাজির ভিড়, ও ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে বাবা এল, ছেলে এল না’ বলে চূড়ান্ত করুণ পরিণতির অমর সৃষ্টি
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের “কেন এল না” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, হৃদয়বিদারক ও মর্মন্তুদ সৃষ্টি। “সারাটা দিন ছেলেটা নেচে নেচে বেড়িয়েছে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে পুজোর আগে বাবার অপেক্ষায় থাকা এক ছেলের করুণ কাহিনি; ‘রাস্তায় আলো জ্বলছে অনেকক্ষণ এখনও — বাবা কেন এল না, মা?’ বলে বারবার প্রশ্ন; ‘মাইনে নিয়ে সকাল-সকাল ফিরবে, পুজোর যা কেনাকাটা এইবেলা সেরে ফেলতে হবে’ বলে বাবার কথা; ‘সেই মানুষ এখনও এলো না’ বলে অপেক্ষার দীর্ঘতা; ‘কড়ার গায়ে খুন্তিটা আজ একটু বেশি রকম নড়ছে’ বলে মায়ের উদ্বেগ; ‘ফ্যান গালতে গিয়ে পা-টা পুড়ে গেল’ বলে ছোটো দুর্ঘটনা; ‘সামনে ইতিহাসের পাতা খোলা’ বলে বই পড়ার চেষ্টা; ‘হিজিবিজি অক্ষরগুলো একগুঁয়ে, অবাধ্য — যতক্ষণ পুজোর জামা কেনা না হচ্ছে নড়বে না’ বলে ছেলের একগুঁয়েমি; ‘কেবলি ঘর ভুল করছে’ বলে মায়ের ব্যাকুলতা; ‘খট করে একটা শব্দ — ছিটকিনি খোলার। কে? মা, আমি খোকা’ বলে ছেলের ফেরা; ‘গলির দরজায় ছেলেটা দাঁড়িয়ে’ বলে প্রতীক্ষা; ‘একটা কালো গাড়ি; আর খুব বাজি ফুটছে’ বলে বিপদের পূর্বাভাস; এবং শেষ পর্যন্ত ‘অনেক রাত্তিরে বারুদের গন্ধে-ভরা রাস্তা দিয়ে অনেক অলিগলি ঘুরে মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে বাবা এল, ছেলে এল না’ বলে চূড়ান্ত করুণ পরিণতির অসাধারণ কাব্যচিত্র। সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতা নিয়ে লিখেছেন। “কেন এল না” সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি একটি ছেলের অপেক্ষার কাহিনি বলেছেন, যে অপেক্ষা শেষ হয়েছে বিপর্যয়ে।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়: মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতার কবি
সুভাষ মুখোপাধ্যায় ১৯১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রেম, নিঃসঙ্গতা, মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতা, এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর বেদনা ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পদাতিক’ (১৯৪০), ‘চিরকুট’ (১৯৪৫), ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ (১৯৫১), ‘ফুল ফুটুক’ (১৯৫৫), ‘হাত বাড়িয়ে রেখেছি’ (১৯৬০), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৭০) ইত্যাদি।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যবিত্ত জীবনের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দৈনন্দিন জীবনের সরল চিত্রায়ণ, অপেক্ষার বাস্তবতা, পুজোর কেনাকাটার প্রস্তুতি, ছেলের উৎসুকতা ও মায়ের উদ্বেগ, এবং বিপর্যয়ের আকস্মিক আগমন। ‘কেন এল না’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের পুজোর আগের দিনের অপেক্ষার কাহিনি বলেছেন, যা শেষ হয়েছে মর্মান্তিক বিপর্যয়ে।
কেন এল না: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘কেন এল না’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ছেলের বারবার প্রশ্ন — ‘বাবা কেন এল না?’ এই প্রশ্নের উত্তর কবিতায় সরাসরি নেই। উত্তরের জায়গায় আছে বিপর্যয়।
কবিতাটি পুজোর আগের দিনের পটভূমিতে রচিত। বাবা মাইনে নিয়ে ফিরবেন, পুজোর কেনাকাটা করবেন বলে গেছেন। ছেলেটা সারাদিন নেচে বেড়িয়েছে — উৎসুক, আনন্দিত। কিন্তু বাবা আসছেন না।
কবি শুরুতে বলছেন — সারাটা দিন ছেলেটা নেচে নেচে বেড়িয়েছে। রাস্তায় আলো জ্বলছে অনেকক্ষণ এখনও — বাবা কেন এল না, মা?
বলে গেল — মাইনে নিয়ে সকাল- সকাল ফিরবে। পুজোর যা কেনাকাটা এইবেলা সেরে ফেলতে হবে। বলে গেল। সেই মানুষ এখনও এলো না। কড়ার গায়ে খুন্তিটা আজ একটু বেশি রকম নড়ছে। ফ্যান গালতে গিয়ে পা-টা পুড়ে গেল।
জানালার দিকে মুখ করে ছেলেটা বই নিয়ে বসল মাদুরে। সামনে ইতিহাসের পাতা খোলা — ঘড়িতে টিকটিক শব্দ। কলে জল পড়ছে। ও- বাড়ির পাঁচিলটা থেকে লাফিয়ে নামল একটা গোঁফওলা বেড়াল।
বাপের- আদরে-মাখা- খাওয়া ছেলের মত হিজিবিজি অক্ষরগুলো একগুঁয়ে, অবাধ্য — যতক্ষণ পুজোর জামা কেনা না হচ্ছে নড়বে না। এখনও — বাবা কেন এল না, মা?
রান্না কোন্ কালে শেষ, গা ধোয়াও সারা। মা এখন বুনতে বসে কেবলি ঘর ভুল করছে। খুট করে একটা শব্দ — ছিটকিনি খোলার। কে? মা, আমি খোকা।
গলির দরজায় ছেলেটা দাঁড়িয়ে। এখন রেডিওয় খবর বলছে। মানুষটা এখনও কেন এল না? একটু এগিয়ে দেখবে বলে ছেলেটা রাস্তায় পা দিল। মোড়ে ভিড়; একটা কালো গাড়ি; আর খুব বাজি ফুটছে।
কিসের পুজো আজ? ছেলেটা দেখে আসতে গেল।
তারপর অনেক রাত্তিরে, বারুদের গন্ধে-ভরা রাস্তা দিয়ে অনেক অলিগলি ঘুরে, মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে বাবা এল। ছেলে এল না।
কেন এল না: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ (সংক্ষিপ্ত আকারে)
প্রথম স্তবক: সারাটা দিন নেচে বেড়ানো ছেলে ও ‘বাবা কেন এল না?’ প্রশ্ন
“সারাটা দিন ছেলেটা নেচে নেচে বেড়িয়েছে। / রাস্তায় আলো জ্বলছে অনেকক্ষণ এখনও / বাবা কেন এল না, মা?”
প্রথম স্তবকে ছেলের উৎসুকতা ও অপেক্ষা। সারাটা দিন নেচে বেড়ানো — পুজোর আনন্দ। রাস্তায় আলো জ্বলছে — সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ‘বাবা কেন এল না?’ — এই প্রশ্ন কবিতার মূল সুর।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবক: বাবার কথা ও মায়ের উদ্বেগ
“বলে গেল / মাইনে নিয়ে সকাল- সকাল ফিরবে। / পুজোর যা কেনাকাটা / এইবেলা সেরে ফেলতে হবে। / বলে গেল। / সেই মানুষ এখনও এলো না। / كড়ার গায়ে খুন্তিটা / আজ একটু বেশি ركম نড়ছে। / فان گالতে গিয়ে / পা-টা পুড়ে গেল।”
দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে বাবার কথা ও মায়ের উদ্বেগের চিত্র। বাবা কথা দিয়ে গেছেন। ‘সেই মানুষ এখনও এলো না’ — ‘সেই মানুষ’ বলে স্নেহের সম্বোধন। ‘খুন্তি নড়ছে’ ও ‘পা পুড়ে যাওয়া’ — মায়ের অস্থিরতা ও ছোটো বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।
চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবক: ইতিহাসের বই, হিজিবিজি অক্ষর ও আবার প্রশ্ন
“জানালার দিকে মুখ করে / ছেলেটা বই নিয়ে বসল মাদুরে / সামনে ইতিহাসের পাতা খোলা— / ঘড়িতে টিকটিক শব্দ। / كله জল পড়ছে। / ও- বাড়ির পাঁচিলটা থেকে لাফিয়ে নামল / একটা গোঁফওলা বেড়াল। / বাপের- আদরে-মাখা- খাওয়া ছেলের মত / হিজিবিজি অক্ষরগুলো একগুঁয়ে / অবাধ্য– / যতক্ষণ পুজোর جামা কেনা না হচ্ছে / نড়বে না। / এখনও / بাবা কেন এল না, মা?”
চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবকে ছেলের বই পড়ার চেষ্টা ও ব্যর্থতা। ইতিহাসের পাতা খোলা, ঘড়ির টিকটিক শব্দ, কলের জল পড়া, গোঁফওলা বেড়াল — পরিবেশের চিত্র। ‘হিজিবিজি অক্ষরগুলো অবাধ্য’ — ছেলের মন বসছে না। কারণ ‘পুজোর জামা কেনা না হওয়া পর্যন্ত’ নড়বে না। আবার প্রশ্ন — ‘বাবা কেন এল না, মা?’
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবক: মায়ের ব্যাকুলতা ও ‘মা, আমি খোকা’
“رান্না কোন্ কালে শেষ / گا ধোয়াও سارا / مা এখন بুনতে বসে / كেবলি ঘর ভুল করছে। / খুট করে একটা شــব্দ — / ছিটকিনি খোলার। / كے? / مা, আমি খোকا।”
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে মায়ের ব্যাকুলতা ও ছেলের ফেরা। ‘রান্না শেষ, গা ধোয়া সারা’ — সব কাজ শেষ। ‘ঘর ভুল করছে’ — মায়ের মন অস্থির। ‘খুট করে ছিটকিনি খোলার শব্দ’ — আকস্মিক। ‘কে? মা, আমি খোকা’ — ছেলে ফিরে এল, কিন্তু বাবা এল না।
অষ্টম ও নবম স্তবক: রাস্তায় পা দেওয়া, কালো গাড়ি ও বাজি ফাটা
“گলির দরজায় ছেলেটা দাঁড়িয়ে। / এখন রেডিওয় খবর বলছে। / মানুষটা এখনও কেন এল না? / একটু এগিয়ে দেখবে বলে / ছেলেটা রাস্তায় পা দিল। / مোড়ে ভিড়; / একটা কালো গাড়ি; / আর খুব বাজি ফুটছে। / كيسের پوجو আজ? / ছেলেটা দেখে আসতে গেল।”
অষ্টম ও নবম স্তবকে বিপদের পূর্বাভাস। ‘গলির দরজায় ছেলে দাঁড়িয়ে’ — অপেক্ষা। ‘রেডিওয় খবর’ — সম্ভবত দুর্ঘটনার খবর? ‘একটু এগিয়ে দেখবে বলে ছেলেটা রাস্তায় পা দিল’ — চূড়ান্ত ভুল সিদ্ধান্ত। ‘মোড়ে ভিড়, একটা কালো গাড়ি, খুব বাজি ফুটছে’ — উৎসবের ভিড়, কিন্তু কালো গাড়ি বিপদের প্রতীক। ‘ছেলেটা দেখে আসতে গেল’ — শেষবারের মতো বেরিয়ে পড়া।
দশম ও শেষ স্তবক: বাবা এল, ছেলে এল না
“তারপর অনেক রাত্তিরে / بارুদের গন্ধে-ভরা রাস্তা দিয়ে / অনেক অলিগলি ঘুরে / مৃত্যুর পাশ كাটিয়ে / بাবা এল। / ছেলে এল না।”
দশম ও শেষ স্তবকে চূড়ান্ত বিপর্যয়। ‘বারুদের গন্ধে-ভরা রাস্তা’ — কোথাও বিস্ফোরণ ঘটেছে। ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে বাবা এল’ — বাবা বেঁচে ফিরেছেন। ‘ছেলে এল না’ — ছেলে ফিরল না। এই এক লাইনে সমস্ত অপেক্ষা ও আশা ধ্বংস হয়েছে।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত, দীর্ঘ লাইনে প্রবাহিত। ‘বাবা কেন এল না, মা?’ — প্রশ্নটি দুইবার পুনরাবৃত্তি। ‘বলে গেল’ — পুনরাবৃত্তি। ‘সেই মানুষ এখনও এলো না’ — অপেক্ষার দীর্ঘতা। ‘খুন্তি নড়া’, ‘পা পুড়ে যাওয়া’, ‘টিকটিক শব্দ’, ‘কলে জল পড়া’, ‘গোঁফওলা বেড়াল’ — পরিবেশের চিত্র। ‘হিজিবিজি অক্ষর অবাধ্য’ — ছেলের মনোযোগের অভাব। ‘ঘর ভুল করছে’ — মায়ের অস্থিরতা। ‘খট করে ছিটকিনি খোলা’ — আকস্মিকতা। ‘কালো গাড়ি’ ও ‘বাজি ফাটা’ — বিপদের পূর্বাভাস। ‘বারুদের গন্ধ’ — বিস্ফোরণ। ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে’ — মৃত্যুকে এড়িয়ে। ‘ছেলে এল না’ — চূড়ান্ত আঘাত।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী। ‘নেচে নেচে বেড়ানো’ — শৈশবের উৎসুকতার প্রতীক। ‘আলো জ্বলা’ — সন্ধ্যা, অপেক্ষার সময়ের প্রতীক। ‘মাইনে’ — মধ্যবিত্ত বাবার একমাত্র আয়ের প্রতীক। ‘কড়ার গায়ে খুন্তি নড়া’ — মায়ের উদ্বেগের প্রতীক। ‘পা পুড়ে যাওয়া’ — ছোটো বিপর্যয়ের প্রতীক, বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। ‘ইতিহাসের পাতা’ — শিক্ষার চিহ্ন, কিন্তু ছেলের মন বসছে না। ‘গোঁফওলা বেড়াল’ — রহস্যময়, অশুভ চিহ্ন। ‘হিজিবিজি অক্ষর’ — জ্ঞানার্জনের ব্যর্থতার প্রতীক। ‘পুজোর জামা কেনা’ — অপেক্ষার শেষ লক্ষ্য। ‘ঘর ভুল করা’ — মায়ের মানসিক অস্থিরতার প্রতীক। ‘খট করে ছিটকিনি খোলা’ — আকস্মিক ঘটনার প্রতীক। ‘কালো গাড়ি’ — মৃত্যুর প্রতীক। ‘বাজি ফাটা’ — উৎসব, কিন্তু এখানে সম্ভবত গুলি বা বোমা বিস্ফোরণের প্রতীক। ‘বারুদের গন্ধ’ — বিস্ফোরণের প্রতীক। ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে’ — মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়ার প্রতীক। ‘ছেলে এল না’ — চূড়ান্ত শূন্যতার প্রতীক।
বৈপরীত্য ব্যবহার অত্যন্ত দক্ষ। পুজোর আনন্দ ও বিপর্যয়ের বৈপরীত্য। অপেক্ষার আশা ও বাস্তবের শূন্যতার বৈপরীত্য। বাবার ফেরা ও ছেলের না ফেরার বৈপরীত্য।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“কেন এল না” সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে পুজোর আগের দিনের অপেক্ষার কাহিনির মাধ্যমে মানুষের আশা ও বিপর্যয়ের চিরন্তন সত্য ফুটিয়ে তুলেছেন।
প্রথম স্তবকে — সারাটা দিন নেচে বেড়ানো ছেলে ও ‘বাবা কেন এল না?’ প্রশ্ন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে — বাবার কথা ও মায়ের উদ্বেগ। চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবকে — ইতিহাসের বই, হিজিবিজি অক্ষর ও আবার প্রশ্ন। ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবকে — মায়ের ব্যাকুলতা ও ‘মা, আমি খোকা’। অষ্টম ও নবম স্তবকে — রাস্তায় পা দেওয়া, কালো গাড়ি ও বাজি ফাটা। দশম ও শেষ স্তবকে — বাবা এল, ছেলে এল না।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — পুজোর আগে বাবা মাইনে নিয়ে ফিরবেন বলে গেছেন; সারাটা দিন ছেলেটা নেচে বেড়িয়েছে; রাস্তায় আলো জ্বলছে অনেকক্ষণ, কিন্তু ‘বাবা কেন এল না, মা?’; খুন্তি নড়ছে, ফ্যান গালতে পা পুড়ে গেছে; ছেলেটা ইতিহাসের বই নিয়ে বসেছে, কিন্তু হিজিবিজি অক্ষরগুলো অবাধ্য; মা ঘর ভুল করছে; খট করে ছিটকিনি খোলার শব্দ — ‘মা, আমি খোকা’; একটু এগিয়ে দেখবে বলে ছেলেটা রাস্তায় পা দিল; মোড়ে ভিড়, কালো গাড়ি, খুব বাজি ফুটছে; অনেক রাত্তিরে বারুদের গন্ধে-ভরা রাস্তা দিয়ে বাবা এল; ‘ছেলে এল না’ — এই শেষ লাইনটি সমস্ত আশা ভেঙে চুরমার করে দেয়।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় অপেক্ষা, আশা ও বিপর্যয়
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় অপেক্ষা, আশা ও বিপর্যয় একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘কেন এল না’ কবিতায় পুজোর আগের দিনের অপেক্ষার কাহিনির মাধ্যমে আশা ও বিপর্যয়ের চিরন্তন দ্বান্দ্বিকতা ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ছেলেটা সারাটা দিন নেচে বেড়িয়েছে; কীভাবে ‘বাবা কেন এল না?’ প্রশ্ন বারবার উঠেছে; কীভাবে মায়ের উদ্বেগ বেড়েছে; কীভাবে ছেলেটা ইতিহাসের বই নিয়ে বসেও পড়তে পারেনি; কীভাবে ‘মা, আমি খোকা’ বলে ছেলে ফিরেছে; কীভাবে একটু এগিয়ে দেখতে গিয়ে ছেলেটা রাস্তায় পা দিয়েছে; আর কীভাবে শেষ পর্যন্ত ‘বাবা এল, ছেলে এল না’।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কেন এল না’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার মনস্তত্ত্ব, পরিবারের বাস্তব চিত্র, পুজোর প্রস্তুতি ও বিপর্যয়ের আকস্মিকতা, এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বাস্তববাদী কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘সারাটা দিন ছেলেটা নেচে নেচে বেড়িয়েছে’, ‘বাবা কেন এল না, মা?’, ‘সেই মানুষ এখনও এলো না’, ‘কড়ার গায়ে খুন্তিটা নড়ছে’, ‘ফ্যান গালতে গিয়ে পা-টা পুড়ে গেল’, ‘হিজিবিজি অক্ষরগুলো অবাধ্য’, ‘কেবলি ঘর ভুল করছে’, ‘মা, আমি খোকা’, ‘কালো গাড়ি ও বাজি ফাটা’, ‘বারুদের গন্ধে-ভরা রাস্তা’, ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে বাবা এল’, এবং ‘ছেলে এল না’ — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, মানবিক মূল্যবোধ ও বাস্তবজ্ঞান উপলব্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কেন এল না সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: কেন এল না কবিতাটির রচয়িতা কে?
এই কবিতাটির রচয়িতা সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩)। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রেম, নিঃসঙ্গতা, মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতা, এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পদাতিক’, ‘চিরকুট’, ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’, ‘ফুল ফুটুক’, ‘হাত বাড়িয়ে রেখেছি’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘বাবা কেন এল না, মা?’ — এই প্রশ্নটি দুইবার পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য কী?
প্রথমবার ছেলের সরল উৎসুকতা ও অপেক্ষা। দ্বিতীয়বার বই পড়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আবার প্রশ্ন — বারবার প্রশ্ন অপেক্ষার দীর্ঘতা ও উদ্বেগকে নির্দেশ করে।
প্রশ্ন ৩: ‘কড়ার গায়ে খুন্তিটা আজ একটু বেশি রকম নড়ছে’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
মায়ের অস্থিরতা ও উদ্বেগের প্রতীক। ‘খুন্তি নড়া’ রান্নার কাজ, কিন্তু ‘বেশি রকম নড়া’ মানে মন কাজে নেই, অস্থিরতা।
প্রশ্ন ৪: ‘ফ্যান গালতে গিয়ে পা-টা পুড়ে গেল’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
একটি ছোটো দুর্ঘটনা। কিন্তু এই ছোটো দুর্ঘটনা বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যৎ বিপদের পূর্বাভাস।
প্রশ্ন ৫: ‘বাপের- আদরে-মাখা- খাওয়া ছেলের মত হিজিবিজি অক্ষরগুলো একগুঁয়ে, অবাধ্য’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
ছেলের মনোযোগ পড়ার দিকে নেই। তার মন জামা কেনার অপেক্ষায়। অক্ষরগুলো ‘অবাধ্য’ — নিজের ইচ্ছায় নড়ে না। এটি ছেলের বালকসুলভ একগুঁয়েমির চিত্র।
প্রশ্ন ৬: ‘কেবলি ঘর ভুল করছে’ — মা কেন ঘর ভুল করছে?
মায়ের মন অস্থির। বাবা এখনও আসেনি, সময় হয়েছে, ছেলে বাইরে গেছে — এসব ভাবনা থেকে মন কাজে নেই, তাই কাজ করতে গিয়ে ‘ঘর ভুল’ করছে।
প্রশ্ন ৭: ‘খট করে একটা শব্দ — ছিটকিনি খোলার। কে? মা, আমি খোকা’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
আকস্মিক শব্দ। মা ভয় পেয়ে জিজ্ঞাসা করেন — ‘কে?’ উত্তর আসে ‘মা, আমি খোকা’। এটি স্বস্তির মুহূর্ত — ছেলে ফিরে এসেছে। কিন্তু বাবা আসেনি।
প্রশ্ন ৮: ‘একটা কালো গাড়ি; আর খুব বাজি ফুটছে’ — কালো গাড়ি ও বাজির প্রতীকী অর্থ কী?
কালো গাড়ি মৃত্যু বা বিপদের প্রতীক। বাজি ফাটা উৎসবের চিহ্ন — কিন্তু এখানে সম্ভবত গুলি বা বোমা বিস্ফোরণের ইঙ্গিত।
প্রশ্ন ৯: ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে বাবা এল। ছেলে এল না’ — শেষ লাইনের চূড়ান্ত বাণী কী?
বাবা মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে বেঁচে ফিরেছেন, কিন্তু ছেলে ফিরল না। এই এক লাইনে সমস্ত আশার পরিণতি। অপেক্ষার ফল — শূন্যতা।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — পুজোর আগে বাবা মাইনে নিয়ে ফিরবেন বলে গেছেন; সারাটা দিন ছেলেটা নেচে বেড়িয়েছে; রাস্তায় আলো জ্বলছে অনেকক্ষণ, কিন্তু ‘বাবা কেন এল না, মা?’; খুন্তি নড়ছে, ফ্যান গালতে পা পুড়ে গেছে; ছেলেটা ইতিহাসের বই নিয়ে বসেছে, কিন্তু হিজিবিজি অক্ষরগুলো অবাধ্য; মা ঘর ভুল করছে; খট করে ছিটকিনি খোলার শব্দ — ‘মা, আমি খোকা’; একটু এগিয়ে দেখবে বলে ছেলেটা রাস্তায় পা দিল; মোড়ে ভিড়, কালো গাড়ি, খুব বাজি ফুটছে; অনেক রাত্তিরে বারুদের গন্ধে-ভরা রাস্তা দিয়ে বাবা এল; ‘ছেলে এল না’ — এই শেষ লাইনটি সমস্ত আশা ভেঙে চুরমার করে দেয়। এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — অপেক্ষার বেদনা, পরিবারের বাস্তবতা, বিপর্যয়ের আকস্মিকতা — সবকিছুই চিরন্তন ও সময়োপযোগী বিষয়।
ট্যাগস: কেন এল না, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পুজোর কবিতা, বাবা কেন এল না, পুজোর জামা, কালো গাড়ি, মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে
© Kobitarkhata.com – কবি: সুভাষ মুখোপাধ্যায় | কবিতার প্রথম লাইন: “সারাটা দিন ছেলেটা নেচে নেচে বেড়িয়েছে” | পুজোর অপেক্ষা ও অপূর্ণ প্রতীক্ষার অমর কবিতা বিশ্লেষণ | সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বাস্তববাদী কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন