কবিতার খাতা
আমাদের আর কখনো দেখা হবে না – সাদাত হোসাইন।
আমাদের আর কখনো দেখা হবে না।
যেখানে শেষ দেখা, সেখানে পড়ে থাকবে শিউলিফুল,
অথচ গন্ধ ছড়াবে রাফ্রেশিয়া। অলকানন্দা নামের যে নদী, সেও শুকিয়ে যাবে।
আর সেখানে জেগে উঠবে আদিগন্ত সাহারা।
আমাদের বুকের ভেতর ক্ষয়ে যেতে থাকবে স্মৃতির সৌধ।
জেগে উঠতে থাকবে আলোকবর্ষ পথ।
আমরা দূরে চলে যাব বিবর্ণ মেঘ, ধূসর কুয়াশা কিংবা দিগন্তরেখার মতো।
দূর থেকে দূরে। আরও দূরে।
আমাদের আর কখনোই দেখা হবে না। কথা হবে না।
প্রাচীন রোম, গ্রীস, মেসোপোটেমিয়া, কিংবা মাহেঞ্জোদারোর মতো
আমাদের ঝলমলে দিন, সৌকর্য ক্রমশ ঢেকে দিতে থাকবে সময়ের অমোঘ আলখাল্লা।
বিস্মৃতির অতলে ডুবে যেতে থাকবে আলো।
নেমে আসতে থাকবে অন্ধকার।
আমাদের দগদগে বেদনার ক্ষত হয়ে উঠতে থাকবে ক্রমক্ষয়িষ্ণু দাগ।
আর আমরা সময়ের ধুলোয় ঢেকে যাওয়া প্রাগৈতিহাসিক পাথরের মূর্তি, নির্বাক।
আমাদের আর কখনো দেখা হবে না।
যেখানে শেষ দেখা সেখানে পড়ে থাকবে
পুরোনো আতরের ঘ্রাণ, টুকরো হৃদয়, অনন্ত বিচ্ছেদ।
আর ক্রমশ জেগে উঠতে থাকবে অলঙ্ঘনীয় দূরত্বের প্রাচীন প্রাচীর।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সাদাত হোসাইনের কবিতা।
কবিতার কথা-
সাদাত হোসাইনের ‘আমাদের আর কখনো দেখা হবে না’ কবিতাটি এক চূড়ান্ত বিচ্ছেদ, অবধারিত দূরত্ব এবং স্মৃতির ক্রমশ ক্ষয়ে যাওয়ার এক নিদারুণ ও হাহাকারময় আখ্যান। এখানে ‘দেখা না হওয়া’ কেবল দুটি মানুষের শারীরিক দূরত্ব নয়, বরং তা দুটি হৃদয়ের মাঝখানে এক মহাজাগতিক ও অলঙ্ঘনীয় শূন্যতা তৈরি হওয়ার নামান্তর। কবি অত্যন্ত আধুনিক কিছু রূপক এবং ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ ব্যবহার করে এই চিরন্তন বিচ্ছেদের ক্যানভাসটিকে এক মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন।
কবিতার শুরুতে এক অবধারিত ও নির্মম ঘোষণা—‘আমাদের আর কখনো দেখা হবে না’। যেখানে শেষ দেখা হয়েছিল, সেখানে পবিত্র ও স্নিগ্ধ ‘শিউলিফুল’ পড়ে থাকলেও তা থেকে ছড়াবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও দুর্গন্ধময় ফুল ‘রাফ্লেসিয়া’র গন্ধ। অর্থাৎ, প্রেমের সেই পবিত্র স্মৃতিটি বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় একসময় কদর্য ও বিষাক্ত হয়ে উঠবে। যে হৃদয় একসময় ‘অলকানন্দা’ নদীর মতো প্রবহমান ও সজীব ছিল, তা শুকিয়ে সেখানে জেগে উঠবে ‘আদিগন্ত সাহারা’র মতো এক তপ্ত ও বন্ধ্যা মরুভূমি। দুটি মানুষের মাঝখানের এই দূরত্বকে কবি কোনো সাধারণ দূরত্ব বলেননি, একে তুলনা করেছেন ‘আলোকবর্ষ’ বা মহাজাগতিক দূরত্বের সাথে, যা কখনো অতিক্রম করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় স্তবকে কবি সময়ের অমোঘ নিয়ম এবং সভ্যতার ক্ষয়িষ্ণুতার চিত্র এনেছেন। প্রাচীন রোম, গ্রীস, মেসোপোটেমিয়া কিংবা মাহেঞ্জোদাড়োর মতো মহান ও ঝলমলে সভ্যতাগুলো যেভাবে আজ ধ্বংসস্তূপ আর মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে, প্রেমিকের সেই সোনালী ও আনন্দময় দিনগুলোও তেমনি ‘সময়ের অমোঘ আলখাল্লা’য় ঢেকে যাবে। আলো মুছে নেমে আসবে এক প্রাচীন অন্ধকার। মানুষ যেভাবে সময়ের সাথে সাথে তার তীব্র বেদনাকেও ভুলে যায়, তেমনি একসময় হৃদয়ের সেই ‘দগদগে বেদনার ক্ষত’ ম্লান হতে হতে এক ক্ষয়িষ্ণু দাগে পরিণত হবে। আর প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল রূপ নেবে ইতিহাসের ধুলোয় ঢেকে যাওয়া এক একটি ‘প্রাগৈতিহাসিক পাথরের মূর্তি’তে—যারা পাশাপাশি দাঁড়িয়েও চিরকাল নির্বাক ও নিস্পন্দ।
পরিশেষে, কবিতাটি এক তীব্র নস্টালজিয়া ও চিরন্তন বিচ্ছেদের মোহনায় এসে থমকে দাঁড়ায়। শেষ দেখার সেই চেনা আঙিনায় পড়ে থাকবে পুরোনো আতরের ক্ষীয়মাণ ঘ্রাণ, ভেঙে যাওয়া টুকরো হৃদয় আর এক অনন্ত আদিহীন বিচ্ছেদ। আর তাদের মাঝখানে ক্রমশ উঁচু হতে থাকবে ‘অলঙ্ঘনীয় দূরত্বের প্রাচীন প্রাচীর’, যা কোনোদিন কোনো অনুশোচনা বা আর্তনাদ দিয়ে ভাঙা যাবে না।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় আধুনিক মানুষের সম্পর্কের ভঙ্গুরতা, তীব্র একাকীত্ব এবং সময়ের নিষ্ঠুর স্রোতে প্রেমের ধুলিস্যাৎ হয়ে যাওয়ার বেদনাকে এক অনবদ্য ও গভীর বাঙ্ময়তায় ফুটিয়ে তুলেছে।






