কবিতার খাতা
ঘুরে যেতে ঠিক এক মুহূর্ত লাগে – শ্রীজাত।
ঘুরে যেতে ঠিক এক মুহূর্ত লাগে,
বাঁচা তো বণিক। এক মুহূর্ত লাগে।
হারাতে চাইলে হারিয়ে যেতেই পারো,
খুঁজে পেতে দিক এক মুহূর্ত লাগে।
দিন তো কাটে না, রাত ভারী হয়ে আসে…
পেরোতে তারিখ, এক মুহূর্ত লাগে।
পাতা আছে হাত প্রস্তাবে, কতদিন…
নিলে নিয়ে নিক, এক মুহূর্ত লাগে।
ভয়ে ভয়ে থেকে সারাটা জীবন যায়,
দুঃসাহসিক — এক মুহূর্ত লাগে।
আলোচনা ক’রে শান্তি ফেরায় কে,
আধা সামরিক, এক মুহূর্ত লাগে।
শ্রীজাত, কে আর মনে রাখে প্রতিদিন,
স্মৃতি বার্ষিক। এক মুহূর্ত লাগে।
ঘুরে যেতে ঠিক এক মুহূর্ত লাগে,
বাঁচা তো বণিক। এক মুহূর্ত লাগে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শ্রীজাতের কবিতা।
কবিতার কথা –
শ্রীজাতর ‘ঘুরে যেতে ঠিক এক মুহূর্ত লাগে’ কবিতাটি জীবনের আকস্মিকতা, সময়ের আপেক্ষিকতা এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের এক অনবদ্য ও নিপুণ আখ্যান। গজল বা সমিল অন্ত্যমিলের কাঠামোয় রচিত এই কবিতায় কবি বারবার ‘এক মুহূর্ত’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে দেখিয়েছেন কীভাবে চরম ও পরম সিদ্ধান্তগুলো কোনো দীর্ঘ প্রস্তুতি ছাড়াই চোখের পলকে ঘটে যায়। কবিতার শুরুতেই এক গভীর বাস্তবতার উচ্চারণ—‘বাঁচা তো বণিক’। বণিক যেমন লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে চলে, মানুষও তার প্রাত্যহিক জীবনে এক ধরণের হিসেবি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। কিন্তু সেই চিরচেনা জীবনের মোড় ‘ঘুরে যেতে ঠিক এক মুহূর্ত লাগে’।
কবিতার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবকে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সময়ের ভারাক্রান্ত রূপ ফুটে উঠেছে। মানুষ যদি মন থেকে দূরে চলে যেতে চায়, তবে তাকে আটকে রাখা অসম্ভব; হারানোর এই সিদ্ধান্তের পাশে তাকে খুঁজে পাওয়ার বা পুনরায় আবিষ্কার করার জন্য এক মুহূর্তের বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। জীবনের একঘেয়েমি আর বিষণ্ণতার দিনে যখন ‘রাত ভারী হয়ে আসে’, তখন ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো বা ‘তারিখ পেরোতে’ সেই এক মুহূর্তের স্পন্দনই যথেষ্ট।
চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবকে কবি মানুষের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ও সাহসিকতাকে স্পর্শ করেছেন। প্রস্তাবে হাত বাড়িয়ে কতদিন ধরে কেউ অপেক্ষা করে থাকে, অথচ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করার চূড়ান্ত সম্মতি বা প্রত্যাখানের জন্য কেবল একটি মুহূর্তের প্রয়োজন। মানুষ সারাজীবন নানা সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, কিন্তু সেই ভয়ের শেকল ভেঙে ‘দুঃসাহসিক’ হয়ে ওঠার রূপান্তরটি ঘটে এক পলকেই। এই এক মুহূর্তই কাপুরুষ আর বীরের মধ্যকার ব্যবধান গড়ে দেয়।
কবিতার শেষাংশে কবি এক তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক শ্লেষ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তথাকথিত আলোচনা বা কূটনৈতিক বৈঠকের মাধ্যমে সমাজে শান্তি ফেরে না; রাষ্ট্র যখন ‘আধা সামরিক’ বাহিনী নামিয়ে দেয়, তখন মুহূর্তের মধ্যে এক কৃত্রিম ও স্তব্ধ শান্তি নেমে আসে। পরিশেষে, কবি নিজের নাম ধরে এক চিরন্তন নস্টালজিয়ার অবতারণা করেছেন। প্রাত্যহিক জীবনের ব্যস্ততায় মানুষ কাউকে প্রতিদিন মনে রাখে না, স্মৃতি হয়ে যায় ‘বার্ষিক’ বা এক বিশেষ দিনের আনুষ্ঠানিকতা। সেই স্মৃতির পাতায় ফিরে যেতেও কেবল এক মুহূর্তই লাগে।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতার প্রতিটি চরণে জীবনের গতিময়তা, অনিশ্চয়তা এবং এক নিদারুণ দার্শনিক সত্যকে অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর বাঙ্ময়তায় ফুটিয়ে তুলেছে।






