সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী।
নরক কুন্ড বলিয়া তোমা’ করে নারী হেয় জ্ঞান?
তারে বল, আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর শয়তান।
অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,
ক্লীব সে, তাই নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।
এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল
নারী দিল তাহে রূপ-রস-সূধা-গন্ধ সুনির্মল।
তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছ তার প্রাণ?
অন্তরে তার মমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান।
জ্ঞানের লক্ষী, গানের লক্ষী, শষ্য-লক্ষী নারী,
সুষম-লক্ষী নারীওই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারী’।
পুরুষ এনেছে দিবসের জ্বালা তপ্ত রৌদ্রদাহ
কামিনী এনেছে যামিনী শান্তি সমীরণ বারিবাহ।
দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশিথে হয়েছে বঁধু
পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে নারী যোগায়েছে মধু।
শষ্য ক্ষেত্র উর্বর হল,পুরুষ চালাল হাল,
নারী সেই মাঠে শষ্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল।
নর বাহে হল, নারী বহে জল,সেই জল মাটি মিশে’
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে
স্বর্ণ-রৌপ্যভার,
নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হয়েছে অলঙ্কার।
নারীর বিরহে, নারীর মিলনে নর পেল কবি-প্রাণ
যত কথা হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।
নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুঢা,সুঢায় ক্ষুধায় মিলে’
জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে।
জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান
মাতা ভগ্নি বধুদের ত্যাগে হইয়াছে মহান।
কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে
কত নারী দিল সিঁথির সিদুর, লেখা নাই তার পাশে।
কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি, কত বোন দিল সেবা
বীর স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোন কালে একা হয়নি ক জয়ী পুরুষের তরবারী
প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষী নারী।
রাজা করিতেছে রাজ্য শাসন, রাজারে শাসিছে রানী,
রানীর দরদে ধুইয়া গেছে রাজ্যের যত গ্লানি।
পুরুষ-হৃদয়হীন,
মানুষ করিতে নারী দিল তারে অর্ধেক হৃদয় ঋণ।
ধরায় যাদের যশ ধরে নাক, অমর মহামানব,
বরষে বরষে যাদের স্মরণে, করি মোরা উৎসব
খেয়ালের বশে তাদের জম্ম দিয়েছে পিতা
লব কুশ বনে ত্যাজিয়াছে রাম, পালন করেছে সীতা!
নারী, সে শিখাল শিশু পুরুষেরে, স্নেহ-প্রেম, দয়া-মায়া
দীপ্ত নয়নে পরল কাজল, বেদনার ঘন ছায়া!
অদ্ভুত রূপে পুরুষ পুরুষে করিল সে ঋণ শোধ,
বুকে নিয়ে তারে চুমিল যে তারে করিল সে অবরোধ!
তিনি নর-অবতার-
পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানি’ কুঠার!
পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর-
নারী চাপা ছিল এতদিন,আজ চাপা পড়িয়াছে নর!
সে-যুগ হয়েছে বাসি,
যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক, নারীরা আছিল দাসী!
বেদনার যুগ,মানুষের যুগ, সাম্যর যুগ আজি,
কেহ রহিবেনা বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি!
নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
আপনারি রচা অই কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে।
যুগের ধর্ম এই-
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই!
শোনো মর্ত্যের জীব!
অন্যরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!
স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরিতে নারী!
করিল তোমা বন্দিনী, বল, কোন সে অত্যাচারী?
আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যকুলতা,
আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নৈপথ্যে কও কথা!
চোখে চোখে আজ চাহিতে পারনা; হাতে রুলি,পায়ে মল,
মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙ্গে ফেল ও শিকল!
যে ঘোমটা তোমা করিয়াছে ভীরু ঊড়াও সে আবরণ!
দূর করে দাও দাসীর চিহ্ণ, ঐ যত আভরণ!
ধরার দুলালী মেয়ে
ফের না ত আর গিরিদরীবনে শাখী-সনে গান গেয়ে।
কখন আসল “প্লুটো” যমরাজ নিশিথ পাখায় উড়ে’,
ধরিয়া তোমায় পুড়িল তাহার বিবর-পুরে!
সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হতে আছ মরি’
মরণের পুরে;নামিল ধরায় সেই দিন বিভাবরী।
ভেঙ্গে যম্পুরী নাগিনীর মত আয় মা পাতাল ফূঁড়ি।‘
আধাঁরে তোমায় পতজ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুঁড়ি!
পুরুষ-যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে
লুটায়ে পড়িবে ও চরণ-তলে দলিত যমের সাথে!
এতদিন শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে,
যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে।
সেদিন সুদূর নয়-
যে দিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীর ও জয়।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা।
কবিতার কথা— কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতাটি কেবল একটি কাব্যিক সৃষ্টি নয়, বরং এটি লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে এক বজ্রকণ্ঠ ইশতেহার এবং মানবিক সাম্যের এক ধ্রুপদী দলিল। কবি এখানে শুরুতেই পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে নস্যাৎ করে দিয়ে নারী ও নরকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। বিশ্বের যা কিছু মহৎ এবং কল্যাণকর, তাতে নারী ও পুরুষের অবদান সমান—এই বৈপ্লবিক সত্যটি নজরুল অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীকে যে ‘নরক কুণ্ড’ বা পাপের মূল হিসেবে দেখা হয়েছে, কবি সেই মধ্যযুগীয় অন্ধ ধারণাকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন। তাঁর মতে, নারী বা নর আলাদা করে কোনো পাপের উৎস নয়, বরং অশুভ শক্তিই আসল শয়তান। পৃথিবীর প্রতিটি ফুল আর ফলের সুবাসে কবি নারীর স্পর্শ খুঁজে পান, যা প্রমাণ করে যে সৃষ্টিশীল জগত নারীর মমতা ও রূপের সুধায় ধন্য। নজরুল এখানে নারীর চিরন্তন শক্তি ও রূপের আধারকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
সভ্যতার নির্মাণে নারীর অদৃশ্য কিন্তু বিশাল অবদানের কথা বলতে গিয়ে কবি তাজমহলের উদাহরণ টেনেছেন। তাজমহলের বাইরের পাথরের কাঠামোর কারিগর হয়তো সম্রাট শাহজাহান, কিন্তু তার আত্মায় মিশে আছে মমতাজ নারীর মমতা। জ্ঞানের লক্ষ্মী কিংবা শস্য-লক্ষ্মী রূপে নারী এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করেছে। পুরুষ যেখানে দিনের উত্তপ্ত রৌদ্রে কঠোর পরিশ্রম করেছে, নারী সেখানে শান্তির শীতল বাতাস আর জলের ধারা হয়ে নেমে এসেছে। কৃষিকাজে পুরুষ যখন হাল চালিয়েছে, নারী তখন পরম মায়ায় শস্য রোপণ করে মাঠকে সুজলা-সুফলা করে তুলেছে। এমনকি পুরুষের ভেতরে যে কবি-প্রাণের জন্ম হয় বা পৃথিবীর যত বড় বড় জয় আর অভিযান সফল হয়েছে, তার নেপথ্যে রয়েছে মা, বোন ও বধূদের বিশাল ত্যাগ। ইতিহাসে যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কথা লেখা থাকলেও কত নারী তাঁদের সিঁথির সিঁদুর বিসর্জন দিয়েছেন, তার কোনো যথাযথ লিপি রাখা হয়নি। এই অকৃতজ্ঞতার বিরুদ্ধে নজরুল এক নৈতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন।
মানুষের সভ্যতায় নারীর ত্যাগ এবং পুরুষের অবজ্ঞার এক নিদারুণ চিত্রকল্প এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। পুরুষ যখন নিজের খেয়ালে চলে গেছে, নারী তখন পরম ধৈর্যে সন্তানকে মানুষ করেছে, তাকে স্নেহ ও দয়া-মায়ার শিক্ষা দিয়েছে। রামচন্দ্র যখন সীতাকে বনে ত্যাগ করেছিলেন, তখন সীতাই লব-কুশকে লালন-পালন করেছিলেন—এই পৌরাণিক রেফারেন্সটি নারীর সহনশীলতার এক চরম দৃষ্টান্ত। নজরুল এখানে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বলেছেন যে পুরুষ অনেক সময় হৃদয়হীন হয়ে পড়ে, আর তাকে মানুষ করার জন্য নারীই নিজের হৃদয়ের অর্ধেক ঋণ দান করে। অথচ বিনিময়ে পুরুষ নারীকে বন্দি করেছে, অন্দরমহলে আবদ্ধ রেখেছে। কবি হুশিয়ার করে দিয়েছেন যে, যুগ পাল্টে গেছে এবং আজকের এই সাম্যের যুগে নারী আর দাসী হয়ে থাকবে না। শোষণ ও পীড়নের যে নীতি পুরুষরা এতদিন চালিয়ে এসেছে, সেই পীড়ন একদিন পুরুষকেই পীড়া দেবে। কারণ অন্যের ওপর অত্যাচার করলে মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেই হীনবল বা ক্লীব হয়ে পড়ে।
বিশ্বের মুক্তির নেশায় কবি নারীকে তাঁর সমস্ত শিকল ও ঘোমটা ছিঁড়ে ফেলার ডাক দিয়েছেন। দাসত্বের চিহ্ন হিসেবে যে অলঙ্কার বা আবরণ নারীকে ভীরু করে রেখেছে, কবি সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার নির্দেশ দিয়েছেন। নজরুল মনে করেন, সময় এসেছে যখন নারীর হাতে অমৃতের বদলে প্রয়োজনে ‘কূট বিষ’ তুলে নিতে হবে। নারীর হাতে যে অমিত শক্তি লুকানো আছে, তা দিয়ে যমের যমপুরী ভেঙে পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। নারীর এই জাগরণই পৃথিবীর প্রকৃত সাম্য নিয়ে আসবে। যে হাতে নারী স্নেহ বিলিয়েছে, সেই হাতই প্রয়োজনে অসুর বিনাশী হবে। যেদিন পৃথিবী পুরুষ ও নারীর জয়গান একসাথে গাইবে, সেদিনই মানবতার প্রকৃত মুক্তি ঘটবে। নজরুল এখানে কেবল নারীর জয়গান গাননি, বরং তিনি একটি সুষম ও সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন বুনেছেন যেখানে মানুষ হিসেবে নারী ও পুরুষের অধিকার হবে অভিন্ন। এই কবিতাটি আজীবন শোষিত মানুষের হৃদয়ে সাম্যের আগুন জ্বালিয়ে রাখার এক অক্ষয় প্রেরণা।
নারী – কাজী নজরুল ইসলাম | কাজী নজরুল ইসলামের সেরা কবিতা | সাম্যের গান | পুরুষ-রমণী ভেদাভেদ নাই | নারী জাগরণের কবিতা | বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি | নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সাম্যবাদী কাব্য
নারী: কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যের গান — পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নাই, বিশ্বের মহান সৃষ্টির অর্ধেক নারী, অর্ধেক পুরুষ
কাজী নজরুল ইসলামের (Kazi Nazrul Islam) “নারী” আধুনিক বাংলা কবিতার এক বৈপ্লবিক, সাম্যবাদী ও যুগান্তকারী সৃষ্টি। “সাম্যের গান গাই- আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে নারীর মর্যাদা, নারীর অবদান ও নারীর প্রতি চিরাচরিত বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বিদ্রোহ। তিনি বলেন — বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি, চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। পাপ-তাপ-বেদনা-অশ্রুবারির অর্ধেকও এনেছে নারী, অর্ধেক নর। তিনি আদি-পাপের কুসংস্কার ভেঙে দেন — আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর শয়তান। তিনি তাজমহলের উদাহরণ টেনে বলেন — অন্তরে তার মমতাজ নারী, বাহিরেতে শাহজাহান। নারী দিয়েছে রূপ-রস-সুধা-গন্ধ, পুরুষ এনেছে দিবসের জ্বালা, নারী এনেছে যামিনীর শান্তি। তিনি প্রশ্ন তোলেন — কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে; কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে। শেষে নারীকে আহ্বান জানান — “মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙ্গে ফেল ও শিকল! যে ঘোমটা তোমা করিয়াছে ভীরু উড়াও সে আবরণ!” কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি। তাঁর কবিতায় শোষণমুক্তি, সাম্যবাদ, নারীজাগরণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিশেষভাবে চিহ্নিত। “নারী” কবিতাটি তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি নারীকে পূজার বেদী থেকে নামিয়ে এনে রাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, বলেন — তুমি আর দাসী নও, আজ প্রকাশের সময় এসেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহী কবি ও নারীজাগরণের অগ্রদূত
কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাত। তাঁর কবিতা, গান ও রচনায় শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন ও নারীর সম অধিকারের কথা উচ্চারিত হয়েছে।
তাঁর অসাধারণ কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে — ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২), ‘বিষের বাঁশি’ (১৯২৪), ‘দোলন চাঁপা’ (১৯২৫), ‘সঞ্চিতা’ (১৯২৫), ‘ফণীমনসা’ (১৯২৭), ‘নির্বাচিত কবিতা’ ও গানের সংকলন ‘গীতি শতদল’ প্রভৃতি।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো — (১) সাম্যবাদী চেতনা ও নারী-পুরুষের সম অধিকার (২) নারীকে দাসীর স্থান থেকে উদ্ধার করে স্বাধীন চেতনার অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা (৩) ধর্মীয় ও সামাজিক রীতির কঠোর সমালোচনা (৪) সোজা, সশব্দ ও বৈপ্লবিক ভাষা (৫) উপমা ও প্রতীকের অনন্য ব্যবহার (তাজমহল, প্লুটো, যমরাজ) (৬) নারীকে নবজাগরণের আহ্বান। ‘নারী’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি সৃষ্টি, শিল্প, কৃষি, যুদ্ধ ও প্রেমের সব ক্ষেত্রে নারীর অবদান চিহ্নিত করে পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসচর্চার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।
নারী শিরোনামের গূঢ়ার্থ: নারীকে বন্দনা নয়, জাগরণের আহ্বান
শিরোনাম ‘নারী’ — এতটুকুই। কোনো বিশেষণ নেই, কোনো প্রশংসার জাঁকালো কথামালা নেই। নারীর অসামান্য অবদান চিহ্নিত করেই কবি শুরু করছেন “সাম্যের গান গাই” — সোজাসাপটা ঘোষণা দিয়ে।
ঐতিহ্যগতভাবে নারীরা বন্দনা পেয়েছেন — মা, দুর্গা, দেবী, লক্ষ্মী, সরস্বতী রূপে, কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁরা নিগৃহীতা ও বন্দী। কবি সেই দ্বৈত মানদণ্ড ভেঙে দেন। তিনি ঘোষণা করেন — বিশ্বের সব সৃষ্টির অর্ধেক নারী। জ্ঞান, সঙ্গীত, শস্য, সৌন্দর্য, ফুল, ফল — সব ক্ষেত্রে নারীর অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য।
তবে শুধু বন্দনা করেই থেমে যাননি নজরুল। তিনি নারীকে আঘাত করা পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন। শেষ পর্যন্ত নারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন — “মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙ্গে ফেল ও শিকল!” শিরোনামের ধারাবাহিকতায় তিনি নারীকে শ্রদ্ধা করেছেন, তার সংগ্রামের কাহিনি লিখেছেন, শেষে তাকে স্বাধীনতার আহ্বান জানিয়েছেন।
নারী: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ — প্রতিটি লাইনের গভীর অর্থ
প্রথম স্তবক: সাম্যের ঘোষণা — পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই
“সাম্যের গান গাই- / আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই! / বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
কবি সরাসরি ‘সাম্যের গান’ গাওয়ার কথা বলেন। ‘আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই’ — এটি একটি দৃঢ় ও স্পষ্ট ঘোষণা। এরপর তিনি সৃষ্টির সব মহান কাজের অর্ধেক কৃতিত্ব নারীকে দেন। এখানে ‘মহান সৃষ্টি’ বলতে শিল্প, স্থাপত্য, কাব্য, সঙ্গীত, দর্শন, মানবিক মূল্যবোধ — সবকিছু বোঝানো হয়েছে।
দ্বিতীয় স্তবক: পাপ-তাপ-বেদনায়ও নারীর অর্ধেক দায়, আদি-পাপের কুসংস্কার ভাঙা
“বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি, / অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী। / নরক কুন্ড বলিয়া তোমা’ করে নারী হেয় জ্ঞান? / তারে বল, আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর শয়তান।”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি দেখিয়েছেন — শুধু ভালো কাজের নয়, পাপ-তাপ-বেদনার জন্যও সমান দায় পুরুষ ও নারীর। তিনি ধর্মীয় গাথা ‘আদি-পাপ’-এর কথা উল্লেখ করে কটাক্ষ করেন — ‘নরক কুন্ড বলে নারী হেয় জ্ঞান?’। তিনি স্পষ্ট বলেন — আদি-পাপ নারী নয়, নর শয়তান। বাইবেলের আদম-হাওয়ার কাহিনির বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ বাংলা কবিতায় অত্যন্ত দুর্লভ ও সাহসী।
তৃতীয় স্তবক: পাপ-শয়তানের ক্লীবতা, নর-নারীতে সমান মেশা, ফুল-ফলে নারীর অবদান
“অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে, / ক্লীব সে, তাই নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে। / এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল / নারী দিল তাহে রূপ-রস-সূধা-গন্ধ সুনির্মল।”
তৃতীয় স্তবকে ‘শয়তান’ বা পাপকে নরও নারী না বলে ‘ক্লীব’ (নপুংসক) আখ্যা দেওয়া হয়েছে — ধর্মীয় কাঠামোর বাইরে গিয়ে একটি নিজস্ব দার্শনিক অবস্থান। ফুল ও ফলের রূপ-রস-গন্ধ সুনির্মল করতে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
চতুর্থ ও পঞ্চম স্তবক: তাজমহলের উদাহরণ, মমতাজ ও শাহজাহানের দ্বৈত সত্তা
“তাজমহলের পাথর দেখেছ, দেখিয়াছ তার প্রাণ? / অন্তরে তার মমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান। / জ্ঞানের লক্ষী, গানের লক্ষী, শস্য-লক্ষী নারী, / সুষম-লক্ষী নারীওই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারী’।”
তাজমহলকে কবি শুধু স্থাপত্য নয়, নারী-পুরুষের মিলনক্ষেত্র হিসেবে দেখিয়েছেন — অন্তরে নারী, বাহিরে পুরুষ। নারী জ্ঞান, সঙ্গীত, শস্য ও সৌন্দর্যের অধিষ্ঠাত্রী। ‘সঞ্চারী’ বলতে বোঝানো হয়েছে নারী সব রূপেই বিরাজ করেন।
ষষ্ঠ ও সপ্তম স্তবক: পুরুষের দিবসের জ্বালা, নারীর যামিনির শান্তি; কৃষি, অলঙ্কার, শিল্প ও সংস্কৃতিতে নারীর ভূমিকা
“পুরুষ এনেছে দিবসের জ্বালা তপ্ত রৌদ্রদাহ / কামিনী এনেছে যামিনী শান্তি সমীরণ বারিবাহ। / দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশিথে হয়েছে বঁধু / পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে নারী যোগায়েছে মধু।”
কবি পুরুষের সংগ্রামী ও কঠোর রূপকে (দিবসের জ্বালা, তপ্ত রৌদ্র) আর নারীর স্নিগ্ধ, প্রশান্ত রূপের (যামিনী শান্তি, সমীরণ, জল) সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — পরিপূর্ণ সমাজ ও সভ্যতা গঠনে পুরুষের শক্তি ও নারীর মাধুর্য একসঙ্গে কাজ করেছে। পরবর্তী লাইনে তিনি কৃষি, অলঙ্কার ও কবিতার ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন।
অষ্টম ও নবম স্তবক: নারীর ত্যাগের ইতিহাস উপেক্ষিত, বীরস্তম্ভ ও যুদ্ধে নারীর ভূমিকা লিখিত হয়নি
“কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে / কত নারী দিল সিঁথির সিদুর, লেখা নাই তার পাশে। / কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি, কত বোন দিল সেবা / বীর স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?”
ইতিহাসের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে এটি অমোঘ আক্রমণ। রণে পুরুষের আত্মদানের কথা লিখিত আছে, কিন্তু নারীর স্বামী, ভাই, পুত্র হারানোর ত্যাগের কথা কোনো ইতিহাসে স্থান পায়নি। স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে মায়ের সেবার নাম লেখেনি কেউ। নজরুল এই লাইনে নারীর প্রতি সামাজিক ও ঐতিহাসিক অন্যায়ের পর্দা তুলে ধরেছেন।
দশম ও একাদশ স্তবক: পুরুষের হৃদয়হীনতা, নারীর অর্ধেক হৃদয়ঋণ; সীতার ত্যাগে লব-কুশ বাঁচে
“পুরুষ-হৃদয়হীন, / মানুষ করিতে নারী দিল তারে অর্ধেক হৃদয় ঋণ। / … লব কুশ বনে ত্যাজিয়াছে রাম, পালন করেছে সীতা!”
কবি ঐতিহাসিক-পুরাণের চরম উদাহরণ — রাম সীতা ও লব-কুশকে বনে ত্যাগ করেছিলেন, আর সীতা সন্তানদের পালন করেছিলেন। নারী ছাড়া পুরুষ অসম্পূর্ণ; ‘হৃদয়হীন’ পুরুষকে ‘মানুষ’ করতে নারী তার অর্ধেক হৃদয় ধার দিয়েছেন।
দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ স্তবক: অর্ধনারীশ্বর, চাপা পড়া নারী ও পুরুষের দম্ভ, নতুন যুগের সাম্য ডাক
“পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর- / নারী চাপা ছিল এতদিন,আজ চাপা পড়িয়াছে নর! / বেদনার যুগ,মানুষের যুগ, সাম্যর যুগ আজি, / কেহ রহিবেনা বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি!”
এখানে অর্ধনারীশ্বর শিবের রূপ — বাম অর্ধেক নারী, ডান অর্ধেক পুরুষ। কবি বলছেন — নারী চাপা ছিল, এখন পুরুষ চাপা পড়ছে (অতিরিক্ত দম্ভের জের)। শেষে সাম্যের যুগের ডঙ্কা বাজান — কেউ বন্দী থাকবে না।
পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ স্তবক: ঘোমটা ছিঁড়ে ফেলার আহ্বান, প্লুটো ও যমরাজের চিত্র, নারীকে শেষ অভ্যুত্থানের ডাক
“মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙ্গে ফেল ও শিকল! / যে ঘোমটা তোমা করিয়াছে ভীরু ঊড়াও সে আবরণ! / ভেঙ্গে যম্পুরী নাগিনীর মত আয় মা পাতাল ফুঁড়ি। / পুরুষ-যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে / লুটায়ে পড়িবে ও চরণ-তলে দলিত যমের সাথে!”
এটি রয়েছে এক বৈপ্লবিক আহ্বান। নারীকে শারীরিক ও মানসিক বন্ধন (ঘোমটা, শিকল, গয়না) ছিঁড়ে ফেলতে বলা হয়েছে। মৃত্যুপুরী (প্লুটো-যমরাজ) ভাঙার প্রতীকে নারীর চূড়ান্ত জাগরণ কল্পনা করেছেন। শেষ লাইন পর্যন্ত তিনি বলেন — “যে দিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীর ও জয়” — নারী ও পুরুষ মিলে জয়গান করবে সেই দিন সুদূর নয়।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি ছন্দোময় ও বৈপ্লবিক। নজরুলের নিজস্ব অমিত্রাক্ষর ও পয়ার মিশ্রিত ছন্দে রচিত। ভাষা শক্ত, প্রত্যক্ষ ও আবেগোদ্বেল। প্রতীক ব্যবহার অসাধারণ — ‘তাজমহল’, ‘অর্ধনারীশ্বর’, ‘প্লুটো’, ‘যমরাজ’, ‘নাগিনী’, ‘হাল-শস্য’, ‘সিঁথির সিঁদুর’, ‘ঘোমটা’, ‘শিকল’ — প্রতিটি প্রতীকে কাব্যের ব্যঞ্জনা বহুমাত্রিক। তিনি ‘সাম্যের গান’ থেকে ‘নারীর জয়’ পর্যন্ত উত্তাল আবহ তৈরি করেছেন। নিয়মিত পুনরাবৃত্তি, সরলতার মধ্যেই গভীর দর্শন এবং শেষ পর্যন্ত বৈপ্লবিক আহ্বান — এই কাব্যরূপ আজও প্রাসঙ্গিক ও অম্লান।
নারী: সাম্যবাদ, নারীর মর্যাদা ও মুক্তির দর্শন
‘নারী’ শুধু কবিতা নয়, নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনের এক প্রকাশ। কোরআন, বাইবেল বা পুরাণের আদি-পাপের কাহিনির বিপরীতে গিয়ে তিনি সরাসরি বলেছেন — আদি-পাপ নর শয়তানের কাজ, নারী নয়। তিনি নারীর সংস্কার, বিবর্তন, সৃজনী শক্তি, সহমর্মিতা ও ত্যাগের ইতিহাসকে অমর করে দিয়েছেন।
তাঁর মতে, সৃষ্টি, কৃষি, শিল্প, স্থাপত্য, সংগীত, ও যুদ্ধের পেছনের নারীর ভূমিকা কখনো উপেক্ষা করা উচিত নয়। কবি এই অদৃশ্য ইতিহাসকে আলোয় আনেন। নারীর বন্দনায় নয়, বরং নারীকে বর্তমান শৃঙ্খল ও ছদ্ম আবরণ (ঘোমটা, অলংকার) ভাঙার নির্দেশ দেন।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, নজরুল এখানে ‘অর্ধনারীশ্বর’ কে ব্যাবহার করে প্রমাণ করেন — নারী ও পুরুষ আলাদা নয়, একটি অপরটির পরিপূরক। আর উভয়ের মুক্তির মন্ত্র তিনি নারীর স্বাধীন আত্মপ্রকাশের মধ্যে দেখেন।
নারী: আধুনিক নারীজাগরণের এক চিরন্তন নথি
‘নারী’ কবিতাটি প্রায় শতাব্দী আগে রচিত হলেও আজকের দিনে অপরিসীম প্রাসঙ্গিক। নারীর ঘোমটা, শিকল, আভরণ ও দাসী মানসিকতা নিয়ে কবির কঠিন বাণী আজও নবজাগরণের পথ দেখায়। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ব্লগে এই কবিতার ‘সাম্যের গান গাই’ ও ‘মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল’ লাইনগুলি বারবার উদ্ধৃত হয়—কারণ এটি নারীদের নীরব কষ্ট ও প্রতিবাদের প্রতীক।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় বাংলাতেই পঠিত নজরুলের এই কবিতা শুধু সাহিত্যই নয়, বরং নারীর স্বাধীনতা আন্দোলনের দলিল হয়ে রয়েছে। তাজমহল ও রাম-সীতার ইতিহাসের উদাহরণ এটিকে কালজয়ী করে তুলেছে।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব: পাঠ্যক্রমে ‘নারী’ স্থান পেলে শিক্ষার্থীরা যা শিখবে
১) সাম্যের আদর্শ ও পুরুষ-নারী বৈষম্যের তীব্র সমালোচনা ২) ইতিহাসের পুনর্লিখনের প্রয়োজনীয়তা ৩) পৌরাণিক ও ধর্মীয় কাঠিন্যের জবাবদিহি ৪) নারীর মুক্তি ও আত্মপ্রকাশের সাহসিক পথ ৫) কাব্যিক উপমা, প্রতীক ও ছন্দের চমৎকার ব্যবহার ৬) সামাজিক বিপ্লবে কবির ভূমিকা — এসব অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে শিক্ষার্থীদের বোঝানো যায়।
নারী (কাজী নজরুল ইসলাম) সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর — পরীক্ষা ও সাধারণ জ্ঞানের জন্য
প্রশ্ন ১: ‘নারী’ কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে? এটি কবে রচিত?
এই কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সঞ্চিতা’ বা ‘অগ্নিবীণা’ পর্যায়ের রচনা, মোটামুটি ১৯২০-এর দশকে রচিত।
প্রশ্ন ২: ‘সাম্যের গান গাই’ — অর্থাৎ নজরুল এখানে কী ঘোষণা করছেন?
তিনি ঘোষণা করছেন — পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। বিশ্বের সব মহান সৃষ্টিতে নর-নারী সমান ভাগীদার।
প্রশ্ন ৩: ‘আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর শয়তান’ — এর পেছনের যুক্তি কী?
খ্রিস্টান ও ইহুদি পুরাণে বলা হয় — সাপের প্ররোচনায় হাওয়া (নারী) আদমকে পাপে প্রলুব্ধ করেন। নজরুল সেই পৌরাণিক দোষারোপকে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণ করেছেন।
প্রশ্ন ৪: ‘অন্তরে তার মমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান’ — এতে তাজমহলকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে?
তাজমহল প্রেমের স্মারক, যার ভিতরে নারী ও বাহিরে পুরুষের প্রতীক। নারীর মহিমা ও পুরুষের শিল্পশক্তির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
প্রশ্ন ৫: কবিতায় কীভাবে নারীর কৃষি ও শস্য উৎপাদনে ভূমিকা চিহ্নিত হয়েছে?
নর চালায় হাল, নারী মাঠে শস্য রোপণ করে ফসল তোলে এবং অবশেষে সোনালি ধানের শীষ উৎপন্ন হয়।
প্রশ্ন ৬: ‘অলঙ্কার’ সৃষ্টিতে নারীর ভূমিকা কী?
স্বর্ণ-রৌপ্যের অলঙ্কার নারীর অঙ্গ-পরশ লাভ করিয়াই অলঙ্কার নাম পেয়েছে — অর্থাৎ অলঙ্কারের মূল্য নির্ধারিত হয় নারীর সৌন্দর্য ও উপস্থিতিতে।
প্রশ্ন ৭: ‘যত কথা হইল কবিতা, শব্দ হইল গান — নারীর প্রভাব কোথায় এখানে?
নারীর বিরহ-মিলন, স্পর্শ ও আবেগ থেকেই কবি হৃদয়ে কাব্য ও সঙ্গীতের সৃষ্টি হয়। তাই ‘নারীর বিরহে, নারীর মিলনে’ পুরুষ পেয়েছে কবিপ্রাণ।
প্রশ্ন ৮: ‘কত নারী দিল সিঁথির সিদুর, লেখা নাই তার পাশে’ — লাইনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।
যুদ্ধে পুরুষের শহীদ হওয়ার সংখ্যা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ, কিন্তু যে সব নারী স্বামী হারিয়ে সিঁথির সিঁদুর মুছে দেন (বা দিতে বাধ্য হন) তাদের যন্ত্রণার কোনও ইতিহাস লেখা হয়নি।
প্রশ্ন ৯: ‘লব কুশ বনে ত্যাজিয়াছে রাম, পালন করেছে সীতা’ — এখানে রাম ও সীতার পালন ভূমিকা কেন আলাদা?
রাম সন্তানদের রেখে এসেছেন বনে, আর সীতা তাদের লালন পালন করেছেন। নারী যে সন্তান ধারণ ও বেড়ে তোলার প্রধান ভূমিকা নেয় — এ উদাহরণ সেটাই প্রমাণ করে।
প্রশ্ন ১০: ‘অর্ধনারীশ্বর’ প্রসঙ্গ টেনে নজরুল কী বোঝাতে চেয়েছেন?
শিবের অর্ধেক নারী ও অর্ধেক পুরুষ — প্রকৃত সাম্য ও পরিপূরকতার প্রতীক। পুরুষ ও নারী আলাদা সত্তা নয়, একটি অপরটির অঙ্গ।
প্রশ্ন ১১: ‘নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর’ — লাইনটির ব্যঙ্গাত্মক অর্থ কী?
পূর্বে নারী ছিলেন চাপা, এখন পুরুষ নিজেদের অহংকার ও দাপটে নিজেরাই ‘চাপা’ (অর্থাৎ ভারাক্রান্ত, অহংভারে অসহায়) হয়ে পড়ছেন।
প্রশ্ন ১২: ‘যুগের ধর্ম এই — পীড়ন করিলে সে পীড়া এসে পীড়া দেবে তোমাকেই’ — সামাজিক বার্তা কী এখানে?
যারা নারীকে নিপীড়িত করে (শারীরিক বা মানসিক), শেষ পর্যন্ত সেই পীড়াই তাদের ফিরে এসে ধ্বংস করে। সাম্যের যুগে কেউ বন্দি থাকবে না।
প্রশ্ন ১৩: ‘মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী ভেঙ্গে ফেল ও শিকল’ — নারীদের উদ্দেশ্যে এ কী ধরনের আহ্বান?
এটি সরাসরি বিপ্লবের ডাক। ঘোমটা, গয়না ও ‘শিকল’ — নারীর ওপর আরোপিত রীতিনীতি ও শারীরিক বন্ধনের সমালোচনা করে কবি তাদের স্বাধীন হতে বলেছেন।
প্রশ্ন ১৪: ‘ভেঙ্গে যমপুরী নাগিনীর মত আয় মা পাতাল ফুঁড়ি’ — এই প্রতীকের ইঙ্গিত কী?
মৃত্যুর জগৎ ভেঙে কবি নারীকে নাগিনীর মতো ফণা তুলে দাঁড়ানোর চিত্র এঁকেছেন। পুরাতন মৃত সমাজের কবর খুঁড়ে নতুন পৃথিবী তৈরির ডাক।
প্রশ্ন ১৫: কবিতার শেষ লাইন ‘যে দিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীর ও জয়’ — সমাপ্তির তাৎপর্য বোঝাও।
শেষ লাইনে নজরুল ঘোষণা করছেন — সেদিন দূর নয় যেদিন নারী ও পুরুষ যৌথভাবে সাম্যের জয়গান গাইবে। এই আশাবাদ কবিতাকে শুধু সমালোচনা নয়, ভবিষ্যতের নির্মাণের পথ দেখিয়েছে।
নারী: ইতিহাসের উপেক্ষিত অর্ধেকের পক্ষে কাজী নজরুল ইসলামের অমর ঘোষণা
কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতা শুধু বাংলা সাহিত্যই নয়, বরং নারীজাগরণের ইতিহাসের এক মাইলফলক। তিনি নারীকে আরাধ্য দেবী নয়, বরং সমাজের আসল অংশীদার ও সমান অধিকারভোগী সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। জ্ঞান, সঙ্গীত, কৃষি, শিল্প ও সংসারের প্রতিটি স্তরে নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কবি ইতিহাসের পক্ষপাতদুঃখী চোখ খুলে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে শেষের দিকে নারীকে স্বাধীনতার শপথ পাঠ করিয়েছেন — ‘ভেঙে ফেল শিকল, উড়াও ঘোমটা’।
আজ নারী আন্দোলনের সময়েও এই কবিতা তার তেজ ধরে রেখেছে। নজরুল কখনও পুরুষকে দুর্বল করেননি, বরং নারী ও পুরুষকে একসঙ্গে সাম্যের জয়গান গাইতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাই ‘নারী’ চিরকাল প্রাসঙ্গিক, তাগিদ বহুমাত্রিক ও কাব্যরূপে শ্রেষ্ঠ।
ট্যাগস: নারী, কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুলের সাম্যের গান, পুরুষ ও নারীর সমতা, নারী জাগরণ, আদি পাপ বিতর্ক, তাজমহলের প্রাণ, অর্ধনারীশ্বর, বাংলা কবিতায় নারী, বিদ্রোহী কবি
© Kobitarkhata.com – কবি: কাজী নজরুল ইসলাম | “সাম্যের গান গাই- আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!” | নারী ও পুরুষের চিরায়ত সাম্যের এক অমর দলিল।