কবিতার শুরুতে এক পাহাড়ী অপরাহ্ণের বর্ণনা পাওয়া যায়। কালো মাটির পাহাড়ের পেছনে সূর্য যখন অস্তমিত, তখন রেস্ট হাউসের ঢালু পথে বিভার সঙ্গে কবির একঝলক দেখা হয়। সেই প্রথম দেখাতেই কবি অনুভব করেন যে, পাহাড়ের এই আদিম ও বিশাল পটভূমিতে বিভার সৌন্দর্য এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রকৃতির বিশালতা যখন মানুষের রূপের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়, তখন সেই সৌন্দর্য সহ্য করা বা ব্যাখ্যা করা সাধারণ মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কবি এখানে বিভাকে দেখছেন প্রকৃতিরই একটি অংশ হিসেবে।
রেস্ট হাউসের নিঃসঙ্গ ছাদে কাটানো সেই রাতটি ছিল কবির জন্য এক বিভ্রমের মতো। চাঁদের ম্লান ছায়ায় পাহাড়গুলো যখন শরীরী হয়ে ওঠে, তখন কবির সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে কেবল বিভারই বিচরণ। এক অলৌকিক দৃশ্যে কবি দেখেন, বিভা পাহাড়ী পথ বেয়ে উঠে আসছেন এবং ঝর্নার জলে স্নান করছেন। এখানে নারীর শরীর ও পাহাড়ের শরীর সমার্থক হয়ে উঠেছে। বিভার অনাবৃত রূপের সামনে কবির বিস্ময় ঠিক প্রথমবার পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতার মতো—যেখানে কোনো অশ্লীলতা নেই, আছে কেবল এক অপার্থিব সুন্দরের প্রতি নিবিড় অবলোকন। বিভাও এখানে নির্লজ্জ নন, বরং তিনি প্রকৃতির মতোই স্বতঃস্ফূর্ত। অজ্ঞাত ঝর্নার শব্দ আর হিমেল হাওয়া কবিকে বিমূঢ় করে দেয়, যা আসলে পরম সুন্দরের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক ধরণের আচ্ছন্নতা।
কবিতার সবচেয়ে নাটকীয় ও যন্ত্রণাদায়ক অংশ হলো কবির প্রস্থান। কথা ছিল সকালে দেখা হবে, কিন্তু কবি মাঝরাতেই চুপিচুপি পাহাড় ছেড়ে চলে আসেন। কেন এই পলায়ন? কবি নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন—এটি কি কাপুরুষতা? নাকি সত্যের মুখোমুখি হওয়ার ভয়? আসলে শিল্পী যখন কোনো চরম বা পরম সুন্দরের স্পর্শ পান, তখন তিনি তাকে ‘ভোগ’ করার চেয়ে তার ‘স্মৃতি’কে আগলে রাখতেই বেশি পছন্দ করেন। বিভার শারীরিক আকর্ষণ, তাঁর বুকের ঝর্নার শব্দ বা বন্যহরিণীর মতো চঞ্চলতা কবিকে তীব্রভাবে টেনেছিল। কিন্তু কবি জানতেন, সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে চিরকাল ঘর করা হয়তো সম্ভব নয়, তাকে স্পর্শ করলে হয়তো তার অলৌকিকতা হারিয়ে যাবে।
কবির এই প্রস্থান আসলে সৌন্দর্যের অমরত্ব রক্ষার এক কৌশল। তিনি বিভাকে রক্ত-মাংসের মানবী হিসেবে না রেখে, তাঁর হৃদয়ে এক চিরন্তন ছবি হিসেবে গেঁথে নিতে চেয়েছেন। তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন পাহাড়ের অপরাহ্ণের সেই শেষ আলো আর বিভার স্নিগ্ধ কণ্ঠস্বরে বলা সেই দুটি শব্দ: ‘আমি বিভা’। এই পরিচয়টুকুই কবির জন্য যথেষ্ট। কবিরা অনেক সময় বাস্তবতাকে তুচ্ছ করে নিজের ‘অস্থির পৃথিবীতে’ ফিরে আসেন কেবল সেই শিল্পবোধকে অক্ষুণ্ণ রাখতে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘একজন বিভা’ কবিতাটি প্রাপ্তির চেয়েও অপ্রাপ্তির মহিমাকে বড় করে দেখায়। সৌন্দর্যের খুব কাছে গিয়েও তাকে স্পর্শ না করে ফিরে আসাটাই এখানে প্রেমের চরম সার্থকতা।
একজন বিভা – অসীম সাহা | অসীম সাহার কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | পাহাড়, প্রেম ও কবির পালানোর কবিতা | বিভার নামে চিঠির অসাধারণ কাব্যভাষা
একজন বিভা: অসীম সাহার পাহাড়, প্রেম, কবির দ্বিধা ও পালানোর অসাধারণ কাব্যভাষা
অসীম সাহার “একজন বিভা” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, চিঠির আদলে লেখা ও গভীর মানসিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি। এটি প্রেম ও কবির সত্তার মধ্যে এক চিরন্তন সংঘাতের কাহিনি। “তোমাকে কথা দিয়েছিলাম বিভা, কাল সকালে তোমার সঙ্গে দেখা হবে।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া এই চিঠি-কবিতাটি ‘বিভা’ নামের এক নারীকে উদ্দেশ্য করে লেখা। কবি তাকে কথা দিয়েছিলেন, কিন্তু কথা রাখতে পারেননি। তিনি পাহাড়ের ঢালু খাঁড়ি বেয়ে চলে এসেছেন তার কাছ থেকে অনেক দূরে। তিনি বিভাকে জিজ্ঞাসা করছেন — তুমি কি আমাকে ভুল বুঝেছো? তুমি কি ভেবেছো কবিরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়? কবিদের বিশ্বাসের শিকড় থেকে মাটি সরে যাচ্ছে? কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়াই কবিদের একমাত্র স্বভাব? তিনি স্বীকার করছেন — বিভার বুকে তিনি পাহাড়ি ঝর্নার অজ্ঞাত শব্দ শুনেছিলেন, তার চোখে বন্যহরিণীর চঞ্চলতা দেখেছিলেন, তার সারা অঙ্গে উঁচু-নিচু পাহাড়ের উদ্ধত আবেগ পেয়েছিলেন। বিভা তাকে প্রাণপণ টেনেছিল — তারপরও তিনি পারেননি। তিনি চলে এসেছেন, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো আর বিভার স্নিগ্ধ কন্ঠস্বরে ঝংকৃত দুটি মাত্র শব্দ: ‘আমি বিভা’। অসীম সাহা একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রেম, দ্বিধা, পলায়নবাদ ও মানসিক জটিলতা চিত্রায়ণের জন্য পরিচিত। “একজন বিভা” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি পাহাড়, রেস্ট হাউস, ঝর্না, বন্যহরিণী, সী-বীচ — এইসব চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে প্রেম ও কবি-সত্তার দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
অসীম সাহা: প্রেম, দ্বিধা ও পলায়নবাদের কবি
অসীম সাহা একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রেম, দ্বিধা, পলায়নবাদ ও মানসিক জটিলতা চিত্রায়ণের জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় প্রেম প্রায়ই এক অসম্পূর্ণ, অধরা, অপ্রাপ্ত কিছু হয়ে থাকে। তিনি প্রেমের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন না এমন এক কবি-সত্তার চিত্র এঁকেছেন বারবার। ‘একজন বিভা’ কবিতাটি তার সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘একটি চুম্বন দাও’ (২০১৫), ‘তুমি’ (২০১৮), ‘একজন বিভা’ (২০২০), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০২২) ইত্যাদি।
অসীম সাহার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রেম ও পলায়নের দ্বন্দ্ব, চিঠির ফর্ম্যাটে কবিতা রচনা, পাহাড়-জঙ্গল-প্রকৃতির চিত্রকল্পের ব্যবহার, নারীদেহের সৌন্দর্য বর্ণনা, এবং শেষ পর্যন্ত ‘না-পারার’ স্বীকারোক্তি। ‘একজন বিভা’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি পাহাড়ি প্রেক্ষাপটে প্রেমের আমন্ত্রণ পেয়েও পালিয়ে যাওয়া এক কবির কাহিনি বলেছেন।
একজন বিভা: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘একজন বিভা’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘বিভা’ — একটি নাম, সম্ভবত প্রিয় নারীর নাম। ‘একজন’ — অনির্দিষ্ট, কিন্তু বিশেষ। এটি একটি চিঠির ফর্ম্যাটে লেখা — যেখানে কবি ‘বিভা’ নামের এক নারীকে সম্বোধন করে বলছেন যে তিনি কথা রাখতে পারেননি, পালিয়ে এসেছেন।
কবিতার পটভূমি একটি পাহাড়ি রেস্ট হাউস। কবি বিভাকে কথা দিয়েছিলেন সকালে দেখা হবে। কিন্তু সূর্য ক্লান্ত পায়ে ডুবে গেলে, সন্ধ্যায় রেস্ট হাউসের ঢালু খাঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মাঝপথে এক ঝলক দেখা হয়। সারা রাত রেস্ট হাউসের ছাদে চাঁদের আলোয় তিনি বিভাকে দেখেছেন — তিনি খুব ক্লান্ত হয়ে পা টেনে টেনে উঠে এসেছেন, নীরবে শাওয়ার ছেড়ে অনাবৃত হয়ে স্নান করেছেন, লজ্জা পাননি। কবি তাকে অপলক দেখেছেন। কিন্তু কথা ছিলো, বিভা সকালে পাহাড়ের ওপার থেকে সূর্যকে সঙ্গী করে আসবে। কবি কথা দিয়েছিলেন — কিন্তু তিনি কথা রাখতে পারেননি। তিনি অনেক রাতে পাহাড়ের ঢালু খাঁড়ি বেয়ে চলে এসেছেন বিভার কাছ থেকে অনেক দূরে। তিনি জানেন, বিভা ভাববে — কবিরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়, কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়াই তাদের স্বভাব। তিনি স্বীকার করছেন — বিভার বুকে ঝর্নার শব্দ, চোখে বন্যহরিণীর চঞ্চলতা, অঙ্গে পাহাড়ের আবেগ, দেহের বাঁকে সী-বীচ — সব দেখেছেন। বিভা তাকে প্রাণপণ টেনেছে — তারপরও তিনি পারেননি। তিনি চলে এসেছেন, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো আর দুটি শব্দ: ‘আমি বিভা’।
একজন বিভা: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: তোমাকে কথা দিয়েছিলাম বিভা, কাল সকালে তোমার সঙ্গে দেখা হবে। অপরাহ্ণে কালো মাটির পাহাড়ের পেছনে সূর্য যখন খুব ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলে গেলো তখন আকাশ-ছোঁয়া রেস্ট হাউসের ঢালু খাড়ি বেয়ে নামতে নামতে মাঝপথে তোমার সঙ্গে দেখা হলো একঝলক; এই প্রথম আমি বুঝলাম, পাহাড়ের অবর্ণনীয় পটভূমিতে তুমি কতো সুন্দর হয়ে উঠতে পারো।
“তোমাকে কথা দিয়েছিলাম বিভা, কাল সকালে তোমার সঙ্গে দেখা হবে। / অপরাহ্ণে কালো মাটির পাহাড়ের পেছনে সূর্য যখন / খুব ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলে গেলো / তখন আকাশ-ছোঁয়া রেস্ট হাউসের ঢালু খাড়ি বেয়ে নামতে নামতে / মাঝপথে তোমার সঙ্গে দেখা হলো একঝলক; / এই প্রথম আমি বুঝলাম, পাহাড়ের অবর্ণনীয় পটভূমিতে / তুমি কতো সুন্দর হয়ে উঠতে পারো।”
প্রথম স্তবকে প্রতিশ্রুতি ও প্রথম দর্শন। কবি বিভাকে কথা দিয়েছিলেন — কাল সকালে দেখা হবে। কিন্তু সন্ধ্যায়, সূর্য ক্লান্ত পায়ে ডুবে গেলে, রেস্ট হাউসের ঢালু পথ বেয়ে নামতে নামতে মাঝপথে এক ঝলক দেখা হয়। এই প্রথম তিনি বুঝলেন — পাহাড়ের পটভূমিতে বিভা কত সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয় স্তবক: সারা রাত রেস্ট হাউসের নিঃসঙ্গ ছাদের উপরে মেঘের হালকা আবরণে ঢেকে থাকা চাঁদের স্নান ছায়ায় যখন দূরের শরীরী পাহাড়গুলো আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখলো, তখন আমি আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জুড়ে শুধু তুমি, শুধু তুমি, শুধু তোমাকেই দেখলাম; তুমি খুব ক্লান্ত হয়ে, ধীরে, পা টেনে টেনে উঠে এলে আকাশ-ছোঁয়া সেই রেস্ট হাইসে; আমি দেখলাম, নীরবে শাওয়ার ছেড়ে তুমি তোমার সম্পূর্ণ সৌন্দর্য অনাবৃত করে স্নান করলে; আমাকে দেখেও তুমি আবৃত করলে না তোমার শরীর তোমার স্পর্শহীন যুগল পৃথিবীর ওপর আমার চোখ চিরকালের জন্যে থমকে থাকলেও তুমি লজ্জা পেয়ে চকিতে সরালে না বেয়াড়া আঁচল; আমি আমার প্রথম পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতার মতো তোমাকেও অপলক চেয়ে চেয়ে দেখলাম। ঠাণ্ডা, হিমেল হাওয়ার তির্যক্ অনুভব শিরশির করে উঠলো গা, আর অজ্ঞাত ঝর্নার কলকল ধ্বনি আমাকে কেমন বিমূঢ় করে দিলো; আচ্ছন্নতার মধ্যে আমার দু’টো দিন কেমন করে কাটলো, আমি জানি না।
“সারা রাত রেস্ট হাউসের নিঃসঙ্গ ছাদের উপরে / মেঘের হালকা আবরণে ঢেকে থাকা চাঁদের স্নান ছায়ায় / যখন দূরের শরীরী পাহাড়গুলো আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখলো, / তখন আমি আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জুড়ে শুধু তুমি, / শুধু তুমি, শুধু তোমাকেই দেখলাম; / তুমি খুব ক্লান্ত হয়ে, ধীরে, পা টেনে টেনে উঠে এলে / আকাশ-ছোঁয়া সেই রেস্ট হাইসে; / আমি দেখলাম, নীরবে শাওয়ার ছেড়ে / তুমি তোমার সম্পূর্ণ সৌন্দর্য অনাবৃত করে স্নান করলে; / আমাকে দেখেও তুমি আবৃত করলে না তোমার শরীর / তোমার স্পর্শহীন যুগল পৃথিবীর ওপর / আমার চোখ চিরকালের জন্যে থমকে থাকলেও / তুমি লজ্জা পেয়ে চকিতে সরালে না বেয়াড়া আঁচল; / আমি আমার প্রথম পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতার মতো / তোমাকেও অপলক চেয়ে চেয়ে দেখলাম। / ঠাণ্ডা, হিমেল হাওয়ার তির্যক্ অনুভব / শিরশির করে উঠলো গা, / আর অজ্ঞাত ঝর্নার কলকল ধ্বনি / আমাকে কেমন বিমূঢ় করে দিলো; / আচ্ছন্নতার মধ্যে আমার দু’টো দিন কেমন করে কাটলো, / আমি জানি না।”
দ্বিতীয় স্তবকে প্রেমের চরম মুহূর্ত ও বিমূঢ়তার বর্ণনা। সারা রাত রেস্ট হাউসের ছাদে চাঁদের আলোয় পাহাড় তাকে আচ্ছন্ন করে রাখলো। তিনি তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জুড়ে শুধু বিভাকে দেখলেন। বিভা ক্লান্ত হয়ে পা টেনে টেনে উঠে এলো, নীরবে শাওয়ার ছেড়ে সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে স্নান করলো। কবিকে দেখেও সে শরীর আবৃত করলো না, লজ্জা পেয়ে আঁচল সরালো না। কবি প্রথম পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতার মতো বিভাকেও অপলক দেখলেন। হিমেল হাওয়া, ঝর্নার ধ্বনি তাকে বিমূঢ় করে দিলো। দু’দিন কীভাবে কাটলো, তিনি জানেন না — এটি প্রেমের মাদকতার অসাধারণ প্রকাশ।
তৃতীয় স্তবক: কথা ছিলো, তুমি খুব সকালে পাহাড়ের ওপার থেকে সূর্যকে সঙ্গী করে চলে আসবে আমার কাছে, আমার এই নিঃসঙ্গ রেস্ট হাউসে। আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম; অথচ আমি আমার কথা রাখতে পারিনি বিভা। অনেক রাতে যখন পাহাড়গুলো ভালোবাসার আবেগে এক অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে দূর থেকে অভূতপূর্ব কোরাসের মতো ভেসে আসছে ঝিঁঝির ডাক, তখন আমি খুব চুপি চুপি পাহাড়ের ঢালু খাঁড়ি বেয়ে চলে এসেছি তোমার কাছ থেকে অনেক দূরে। তুমি কি আমাকে ভুল বুঝেছো বিভা? তুমি কি ভেবেছো কবিরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়? কবিদের বিশ্বাসের শিকড় থেকে মাটি সরে যাচ্ছে খুব দ্রুত? কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়াই কবিদের একমাত্র স্বভাব? আমি জানি, তুমি এ রকমই ভাববে।
“কথা ছিলো, তুমি খুব সকালে পাহাড়ের ওপার থেকে / সূর্যকে সঙ্গী করে চলে আসবে আমার কাছে, / আমার এই নিঃসঙ্গ রেস্ট হাউসে। / আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম; / অথচ আমি আমার কথা রাখতে পারিনি বিভা। / অনেক রাতে যখন পাহাড়গুলো ভালোবাসার আবেগে / এক অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে / দূর থেকে অভূতপূর্ব কোরাসের মতো ভেসে আসছে ঝিঁঝির ডাক, / তখন আমি খুব চুপি চুপি পাহাড়ের ঢালু খাঁড়ি বেয়ে / চলে এসেছি তোমার কাছ থেকে অনেক দূরে। / তুমি কি আমাকে ভুল বুঝেছো বিভা? / তুমি কি ভেবেছো কবিরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়? / কবিদের বিশ্বাসের শিকড় থেকে মাটি সরে যাচ্ছে খুব দ্রুত? / কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়াই কবিদের একমাত্র স্বভাব? / আমি জানি, তুমি এ রকমই ভাববে।”
তৃতীয় স্তবকে পালানোর স্বীকারোক্তি ও আত্মসমালোচনা। কথা ছিলো — বিভা সকালে পাহাড়ের ওপার থেকে সূর্যকে সঙ্গী করে আসবে। কবি কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কথা রাখতে পারেননি। অনেক রাতে, পাহাড়গুলো ঘুমিয়ে পড়লে, ঝিঁঝির ডাক ভেসে এলে — তিনি চুপি চুপি পাহাড়ের ঢালু পথ বেয়ে চলে এসেছেন বিভার কাছ থেকে অনেক দূরে। তিনি জানেন, বিভা তাকে ভুল বুঝবে। বিভা ভাববে — কবিরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়, তাদের বিশ্বাসের শিকড় থেকে মাটি সরে যাচ্ছে, কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়াই তাদের স্বভাব।
চতুর্থ স্তবক: তোমার বুকে আমি পাহাড়ি ঝর্নার এক অজ্ঞাত শব্দ শুনেছিলাম, তোমার চোখে দেখেছিলাম বন্যহরিণীর চঞ্চলতা; তোমার সারা অঙ্গে উঁচু-নিচু পাহাড়ের উদ্ধত আবেগ তুমি আমাকে তোমার দেহের বাঁকে বাঁকে দেখিয়েছো উজ্জ্বল সী-বীচ তুমি প্রাণপণ আমাকে টেনেছো তোমার দিকেই, তারপরও আমি পারিনি। আমি খুব গভীর রাতে তোমাকে কিছু না জানিয়েই আমার একাকী, অস্থির পৃথিবীতে চলে এসেছি সঙ্গে নিয়ে এসেছি অজস্র পাহাড়ের পটভূমিতে অপরাহ্ণের অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো, আর তোমার সেই স্নিগ্ধ কন্ঠস্বরে ঝংকৃত দু’টি মাত্র শব্দ: ‘আমি বিভা’।
“তোমার বুকে আমি পাহাড়ি ঝর্নার / এক অজ্ঞাত শব্দ শুনেছিলাম, / তোমার চোখে দেখেছিলাম বন্যহরিণীর চঞ্চলতা; / তোমার সারা অঙ্গে উঁচু-নিচু পাহাড়ের উদ্ধত আবেগ / তুমি আমাকে তোমার দেহের বাঁকে বাঁকে দেখিয়েছো উজ্জ্বল সী-বীচ / তুমি প্রাণপণ আমাকে টেনেছো তোমার দিকেই, / তারপরও আমি পারিনি। / আমি খুব গভীর রাতে তোমাকে কিছু না জানিয়েই / আমার একাকী, অস্থির পৃথিবীতে চলে এসেছি / সঙ্গে নিয়ে এসেছি অজস্র পাহাড়ের পটভূমিতে / অপরাহ্ণের অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো, / আর তোমার সেই স্নিগ্ধ কন্ঠস্বরে ঝংকৃত / দু’টি মাত্র শব্দ: ‘আমি বিভা’।”
চতুর্থ স্তবক — শেষ স্তবক — পুরো কবিতার চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি ও সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ। তিনি বিভার বুকে ঝর্নার শব্দ শুনেছিলেন, চোখে বন্যহরিণীর চঞ্চলতা দেখেছিলেন, সারা অঙ্গে পাহাড়ের আবেগ পেয়েছিলেন। বিভা তার দেহের বাঁকে বাঁকে তাকে সী-বীচ দেখিয়েছে। বিভা তাকে প্রাণপণ টেনেছে — ‘তারপরও আমি পারিনি’। তিনি গভীর রাতে কিছু না জানিয়েই চলে এসেছেন, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো আর বিভার স্নিগ্ধ কন্ঠস্বরে বলা দুটি শব্দ — ‘আমি বিভা’।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত। এটি একটি চিঠির ফর্ম্যাটে লেখা — ‘বিভা’ নামের এক নারীকে সরাসরি সম্বোধন করে। ভাষা অত্যন্ত সাবলীল, চিত্রাত্মক ও আবেগময়। অসীম সাহার নিজস্ব গদ্যছন্দ ও চিঠির স্টাইল এই কবিতায় প্রকট।
প্রতীক ব্যবহারে অসীম সাহা অত্যন্ত দক্ষ। ‘বিভা’ — নামটি ‘বিভা’ অর্থাৎ জ্যোতি, আলো, দীপ্তি — সম্ভবত প্রিয় নারীর প্রতীক। ‘কালো মাটির পাহাড়’ — রহস্যময়, গভীর, শক্ত প্রেমের প্রতীক। ‘ক্লান্ত পায়ে সূর্য’ — দিনের শেষ, সময়ের অবসানের প্রতীক। ‘রেস্ট হাউসের ঢালু খাঁড়ি’ — প্রেমের পথ, নামার ও ওঠার পথ, দ্বিধার প্রতীক। ‘এক ঝলক দেখা’ — অসম্পূর্ণ মিলন, অধরা প্রেমের প্রতীক। ‘পাহাড়ের পটভূমি’ — প্রকৃতির সৌন্দর্য, প্রেমের অনন্য প্রেক্ষাপটের প্রতীক। ‘নিঃসঙ্গ ছাদ ও চাঁদের আলো’ — একাকীত্ব ও রোমান্টিকতার প্রতীক। ‘শরীরী পাহাড়’ — প্রকৃতি ও নারীদেহের মিলনের প্রতীক। ‘শাওয়ার ছেড়ে অনাবৃত স্নান’ — সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, লজ্জাহীনতার প্রতীক। ‘প্রথম পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা’ — প্রথম প্রেমের বিস্ময় ও সৌন্দর্যের প্রতীক। ‘ঝর্নার ধ্বনি’ — প্রেমের অজানা, রহস্যময় ডাকের প্রতীক। ‘সূর্যকে সঙ্গী করে আসা’ — পূর্ণ মিলনের প্রতিশ্রুতির প্রতীক। ‘পাহাড়ের ভালোবাসার আবেগে জড়িয়ে ধরা’ — প্রকৃতির প্রেম, যা কবি পারেননি। ‘ঝিঁঝির ডাক’ — রাতের সঙ্গীত, একাকীত্বের প্রতীক। ‘কবিরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়’ — কবি-সত্তার আত্মসমালোচনার প্রতীক। ‘পাহাড়ি ঝর্নার অজ্ঞাত শব্দ’ — বিভার বুকের স্পন্দন, প্রেমের রহস্যের প্রতীক। ‘বন্যহরিণীর চঞ্চলতা’ — বিভার চোখের সৌন্দর্য, স্বাধীনতা, অধরা প্রকৃতির প্রতীক। ‘উঁচু-নিচু পাহাড়ের উদ্ধত আবেগ’ — বিভার শরীরের বক্ররেখা ও আবেগের প্রতীক। ‘সী-বীচ’ — সমুদ্র সৈকত, প্রেমের উন্মুক্ততা, মুক্তির প্রতীক। ‘অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো’ — দিনের শেষ, সম্পর্কের শেষ, ফুরিয়ে আসা সম্ভাবনার প্রতীক। ‘আমি বিভা’ — আত্মপরিচয়ের ঘোষণা, যা কবি সঙ্গে নিয়ে এসেছেন — শুধু এই দুটি শব্দ।
বিরোধাভাষ (Paradox) — ‘তোমাকে দেখেও তুমি আবৃত করলে না তোমার শরীর’ — সম্পূর্ণ উন্মুক্ততা ও আত্মসমর্পণ। ‘আমি আমার কথা রাখতে পারিনি’ — প্রতিশ্রুতি ও পালানোর দ্বন্দ্ব। ‘তুমি প্রাণপণ আমাকে টেনেছো, তারপরও আমি পারিনি’ — প্রেমের আমন্ত্রণ ও পালানোর চরম দ্বন্দ্ব।
শেষের ‘আমি বিভা’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্পর্শকাতর সমাপ্তি। কবি বিভার কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছিলেন — ঝর্নার শব্দ, বন্যহরিণীর চঞ্চলতা, পাহাড়ের আবেগ, সী-বীচ — কিন্তু সব ছেড়ে এসেছেন। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন শুধু অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো আর দুটি শব্দ — ‘আমি বিভা’। এটি বিভার আত্মপরিচয়ের ঘোষণা, যা কবির হৃদয়ে থেকে গেছে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“একজন বিভা” অসীম সাহার এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে প্রেম ও কবি-সত্তার চিরন্তন দ্বন্দ্বকে এক অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবি বিভাকে কথা দিয়েছিলেন। পাহাড়ের রেস্ট হাউসে সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি। সন্ধ্যায় এক ঝলক দেখা — তিনি বুঝলেন পাহাড়ের পটভূমিতে বিভা কত সুন্দর। সারা রাত চাঁদের আলোয় তিনি বিভাকে দেখেছেন — তিনি অনাবৃত হয়ে স্নান করেছেন, লজ্জা পাননি। কবি প্রথম পাহাড় দেখার মতো বিভাকে অপলক দেখেছেন। কিন্তু কথা ছিলো — বিভা সকালে সূর্যকে সঙ্গী করে আসবে। কবি কথা দিয়েছিলেন — তিনি রাখতে পারেননি। অনেক রাতে তিনি চুপি চুপি চলে এসেছেন দূরে। তিনি জানেন, বিভা ভাববে — কবিরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়, কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়াই তাদের স্বভাব। তিনি স্বীকার করেন — বিভা তাকে প্রাণপণ টেনেছিল, তারপরও তিনি পারেননি। তিনি চলে এসেছেন, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো আর দুটি শব্দ — ‘আমি বিভা’।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — কবিরা প্রেমের চরম সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়। তারা পাহাড়ের মতো প্রকাণ্ড প্রেমকে দেখে মুগ্ধ হয়, কিন্তু তাকে বুকের মধ্যে ধারণ করতে পারে না। তারা পালায়। সঙ্গে নিয়ে যায় শুধু স্মৃতি, কিছু শব্দ, কিছু আলোর রেখা। কিন্তু সেই ‘আমি বিভা’ শব্দদুটি হয়ত সারা জীবন তাদের তাড়াবে।
অসীম সাহার কবিতায় প্রেম, পলায়ন ও কবি-সত্তার দ্বন্দ্ব
অসীম সাহার কবিতায় প্রেম, পলায়ন ও কবি-সত্তার দ্বন্দ্ব একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘একজন বিভা’ কবিতায় এই ধারণাগুলোকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে একজন কবি প্রেমের চরম মুহূর্তে এসেও পালিয়ে যান, কীভাবে তিনি নিজেকে ‘কাপুরুষ’ বলে আত্মসমালোচনা করেন, কীভাবে তিনি প্রেমের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন কিন্তু তাকে ধারণ করতে পারেন না, এবং কীভাবে তিনি শুধু স্মৃতি ও কিছু শব্দ নিয়ে ফিরে আসেন।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে অসীম সাহার ‘একজন বিভা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের প্রেম ও পলায়নের মনস্তত্ত্ব, চিঠির ফর্ম্যাটে কবিতা রচনার কৌশল, পাহাড়-প্রকৃতির চিত্রকল্পের ব্যবহার, এবং কবি-সত্তার আত্মসমালোচনা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
একজন বিভা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘একজন বিভা’ কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক অসীম সাহা। তিনি একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘একটি চুম্বন দাও’ (২০১৫), ‘তুমি’ (২০১৮), ‘একজন বিভা’ (২০২০), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (২০২২) ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘বিভা’ নামের অর্থ কী?
‘বিভা’ শব্দের অর্থ জ্যোতি, আলো, দীপ্তি, আভা। নামটি প্রিয় নারীর সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতার প্রতীক।
প্রশ্ন ৩: ‘পাহাড়ের অবর্ণনীয় পটভূমিতে তুমি কতো সুন্দর হয়ে উঠতে পারো’ — লাইনটির গভীরতা কী?
পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিভার সৌন্দর্যকে আরও বর্ধিত করেছে। প্রকৃতি ও নারীর সৌন্দর্যের মেলবন্ধন — এই মূহুর্তে বিভা অপূর্ব সুন্দর লাগছে কবির কাছে।
প্রশ্ন ৪: ‘নীরবে শাওয়ার ছেড়ে তুমি তোমার সম্পূর্ণ সৌন্দর্য অনাবৃত করে স্নান করলে’ — কেন কবি এই দৃশ্যটি লিখেছেন?
এটি প্রেমের চরম আত্মসমর্পণের চিত্র। বিভা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে স্নান করছে — কোনও লজ্জা, কোনও বাধা নেই। এটি বিভার কবির প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণের প্রতীক।
প্রশ্ন ৫: ‘আমাকে দেখেও তুমি আবৃত করলে না তোমার শরীর’ — কেন?
বিভা লজ্জা পাননি। তিনি কবির সামনে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ছিলেন। এটি আত্মসমর্পণের চরম প্রকাশ — বিভা কবির কাছে কিছু লুকাননি।
প্রশ্ন ৬: ‘আমি আমার কথা রাখতে পারিনি বিভা’ — কেন?
কবি কথা দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বিভার কাছে যেতে পারেননি। তিনি পালিয়ে এসেছেন। এটি কবি-সত্তার চিরন্তন দ্বন্দ্ব — প্রেমের চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে ভয় পাওয়া।
প্রশ্ন ৭: ‘তুমি কি ভেবেছো কবিরা সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়?’ — লাইনটির আত্মসমালোচনা কী?
কবি নিজের সম্পর্কেই এই প্রশ্ন করছেন। তিনি জানেন, বিভা এটাই ভাববে। তিনি নিজেও মনে করেন — হয়ত কবিরা সত্যিই সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায়, পালিয়ে যায়। এটি একটি গভীর আত্মসমালোচনা।
প্রশ্ন ৮: ‘তুমি প্রাণপণ আমাকে টেনেছো তোমার দিকেই, তারপরও আমি পারিনি’ — লাইনটির বেদনা কোথায়?
বিভা প্রাণপণ চেষ্টা করেছে — কিন্তু কবি পারেননি। এটি একটি চরম ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। ভালোবাসার ডাকে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না কবির।
প্রশ্ন ৯: ‘সঙ্গে নিয়ে এসেছি অজস্র পাহাড়ের পটভূমিতে অপরাহ্ণের অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো, আর তোমার সেই স্নিগ্ধ কন্ঠস্বরে ঝংকৃত দু’টি মাত্র শব্দ: ‘আমি বিভা’ — কেন শুধু এই দুটি শব্দ?
কবি বিভার কাছ থেকে অনেক কিছু পেয়েছিলেন — কিন্তু তিনি সব ছেড়ে এসেছেন। সঙ্গে নিয়েছেন শুধু সূর্যের শেষ আলো (ফুরিয়ে আসা সম্ভাবনার প্রতীক) আর ‘আমি বিভা’ শব্দদুটি (বিভার আত্মপরিচয়ের ঘোষণা)। এটি এক চরম অনিশ্চয়তা ও অধরা প্রেমের প্রতীক।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — প্রেমের চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো সব সময় সম্ভব হয় না। অনেক সময় মানুষ প্রেমের ডাক পেয়েও পালায়। কবি-সত্তা, শিল্পী-সত্তা প্রায়ই বাস্তব প্রেমের চেয়ে তার স্মৃতি ও রূপককে বেশি মূল্য দেয়। আজকের দিনে, যখন সম্পর্কের চেয়ে স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, এই কবিতা প্রেম ও পলায়নের চিরন্তন দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে।
ট্যাগস: একজন বিভা, অসীম সাহা, অসীম সাহার কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, প্রেম ও পলায়নের কবিতা, পাহাড়ের কবিতা, চিঠির কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: অসীম সাহা | কবিতার প্রথম লাইন: “তোমাকে কথা দিয়েছিলাম বিভা, কাল সকালে তোমার সঙ্গে দেখা হবে” | পাহাড়, প্রেম ও কবির পালানোর অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন