কবিতার খাতা
- 30 mins
ইচ্ছে ছিলো – হেলাল হাফিজ।
ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো
ইচ্ছে ছিলো তোমাকেই সুখের পতাকা করে
শান্তির কপোত করে হৃদয়ে উড়াবো।
ইচ্ছে ছিলো সুনিপূণ মেকআপ-ম্যানের মতো
সূর্যালোকে কেবল সাজাবো তিমিরের সারাবেলা
পৌরুষের প্রেম দিয়ে তোমাকে বাজাবো, আহা তুমুল বাজাবো।
ইচ্ছে ছিলো নদীর বক্ষ থেকে জলে জলে শব্দ তুলে
রাখবো তোমার লাজুক চঞ্চুতে,
জন্মাবধি আমার শীতল চোখ
তাপ নেবে তোমার দু’চোখে।
ইচ্ছে ছিল রাজা হবো
তোমাকে সাম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো,
আজ দেখি রাজ্য আছে
রাজা আছে
ইচ্ছে আছে,
শুধু তুমি অন্য ঘরে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। হেলাল হাফিজ।
ইচ্ছে ছিলো – হেলাল হাফিজ | ইচ্ছে ছিলো কবিতা | হেলাল হাফিজের কবিতা | বাংলা প্রেমের কবিতা
ইচ্ছে ছিলো: হেলাল হাফিজের অপূর্ণ প্রেম, ইচ্ছে ও বাস্তবতার অসাধারণ কাব্যভাষা
হেলাল হাফিজের “ইচ্ছে ছিলো” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা অপূর্ণ প্রেম, ইচ্ছে ও বাস্তবতার এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। ১৯৭০-৮০-র দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি হেলাল হাফিজ তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ (১৯৮৬) দিয়েই বাংলা কবিতায় অমর হয়ে আছেন। “ইচ্ছে ছিলো” তাঁর সেই কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা, যা প্রেমের আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও বাস্তবতার নির্মম দ্বন্দ্বকে অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছে। “ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো / ইচ্ছে ছিলো তোমাকেই সুখের পতাকা করে / শান্তির কপোত করে হৃদয়ে উড়াবো।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর বেদনার জগৎ, যেখানে কবির সমস্ত ইচ্ছে, সমস্ত স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অপূর্ণ থেকে যায়। শেষ লাইনে এসে কবি আবিষ্কার করেন — “আজ দেখি রাজ্য আছে / রাজা আছে / ইচ্ছে আছে / শুধু তুমি অন্য ঘরে।” এই চারটি ছোট পঙ্ক্তিতে তিনি প্রেমের এক করুণ পরিণতি ধরে ফেলেছেন, যা পাঠকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়।
হেলাল হাফিজ: বাংলা কবিতার জীবন্ত কিংবদন্তি
হেলাল হাফিজ (১৯৪৮-) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। তিনি ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনা জেলার কামালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খুরশিদ আলী তালুকদার এবং মাতা জোবেদা খাতুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি দৈনিক দিনকাল, দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক বিচিত্রা প্রভৃতি পত্রিকায় কাজ করেছেন। তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ (১৯৮৬) তাঁকে অমর করে রেখেছে। এই একটি কাব্যগ্রন্থই তাঁকে বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, ‘অন্ধবধূ’, ‘তুমি ডাক দিলে’, ‘নিখুঁত স্ট্র্যাটেজী’ প্রভৃতি কবিতা তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর কবিতায় প্রেম, বিরহ, নাগরিক জীবন, সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে। “ইচ্ছে ছিলো” তাঁর একটি বহুপঠিত প্রেমের কবিতা যা অপূর্ণ প্রেমের এক করুণ চিত্র এঁকেছে।
ইচ্ছে ছিলো কবিতার পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
“ইচ্ছে ছিলো” কবিতাটি সম্ভবত ১৯৮০-র দশকের গোড়ার দিকে রচিত, যখন হেলাল হাফিজের কবিতাপ্রেম পাঠকমহলে তুঙ্গে। এটি ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত একটি প্রেমের কবিতা। কবিতাটি সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত যখন ব্যক্তি স্বাধীনতা ও প্রেমের প্রকাশ ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছিল। কিন্তু কবি এখানে প্রেমের চিরন্তন সত্যটিকেই তুলে ধরেছেন — ইচ্ছে ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব। কবিতার নামকরণ ‘ইচ্ছে ছিলো’ অতীত নির্দেশক, যা বোঝায় যে কবির ইচ্ছেগুলো এখন আর নেই, বা পূর্ণ হয়নি। এই অতীত-নির্দেশক শিরোনাম পাঠকের মনে এক ধরনের কৌতূহল ও বিষণ্ণতা তৈরি করে।
ইচ্ছে ছিলো কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“ইচ্ছে ছিলো” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ইচ্ছে ছিলো’ — অতীতের ইচ্ছে, যা পূর্ণ হয়নি। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা অপূর্ণ ইচ্ছের, না-পাওয়ার, হারানোর কবিতা। ‘ইচ্ছে ছিলো’ বলেই বোঝা যায় — এখন আর নেই, এখন আর চান না। শিরোনামের এই অতীতবাচকতা পাঠকের মনে এক ধরনের বিষণ্ণতা ও কৌতূহল সৃষ্টি করে। কী এমন ইচ্ছে ছিলো যা পূর্ণ হয়নি? কেন পূর্ণ হয়নি? এই প্রশ্নগুলো নিয়েই পাঠক কবিতায় প্রবেশ করেন।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো / ইচ্ছে ছিলো তোমাকেই সুখের পতাকা করে / শান্তির কপোত করে হৃদয়ে উড়াবো।” প্রথম স্তবকে কবি তাঁর অপূর্ণ ইচ্ছের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো। অর্থাৎ তাকে রানী বানিয়ে নিজের রাজ্য বিস্তার করবেন। ইচ্ছে ছিলো তোমাকেই সুখের পতাকা করে হৃদয়ে উড়াবেন। অর্থাৎ তাকে সুখের প্রতীক করে নিজের হৃদয়ে ধারণ করবেন। ইচ্ছে ছিলো শান্তির কপোত করে হৃদয়ে উড়াবেন — অর্থাৎ তাকে শান্তির প্রতীক করে নিজের মনে রাখবেন।
সম্রাজ্ঞী ও সাম্রাজ্যের তাৎপর্য
সম্রাজ্ঞী — রানী, সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। কবি প্রিয়তমাকে সম্রাজ্ঞী করতে চেয়েছিলেন। সাম্রাজ্য বাড়ানো — নিজের জীবন, নিজের জগৎকে বিস্তৃত করা। প্রিয়তমাকে কেন্দ্র করে নিজের জীবনকে গড়তে চেয়েছিলেন তিনি। এই ইচ্ছে প্রেমের গভীরতা ও নিষ্ঠা প্রকাশ করে। প্রেমিক শুধু প্রেম চায় না, সে চায় প্রিয়তমাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে, তাকে জীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করতে।
সুখের পতাকা ও শান্তির কপোতের তাৎপর্য
সুখের পতাকা — সুখের প্রতীক। পতাকা সাধারণত কোনো দেশের, কোনো সংগঠনের পরিচয় বহন করে। কবি প্রিয়তমাকে তাঁর সুখের পতাকা করতে চেয়েছিলেন — অর্থাৎ তাঁর সুখের পরিচয় হবে প্রিয়তমা। শান্তির কপোত — শান্তির প্রতীক। বাইবেলের কাহিনী অনুসারে, নোহের জাহাজ থেকে ছেড়ে দেওয়া কপোত জলপাই পাতা নিয়ে ফিরে এসেছিল, যা প্রমাণ করে বন্যা কমেছে এবং শান্তি ফিরে এসেছে। কবি প্রিয়তমাকে সেই শান্তির কপোত করতে চেয়েছিলেন — অর্থাৎ তাঁর জীবনের শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক। এই দুটি উপমা প্রেমের আধ্যাত্মিক উচ্চতাকে নির্দেশ করে।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ইচ্ছে ছিলো সুনিপূণ মেকআপ-ম্যানের মতো / সূর্যালোকে কেবল সাজাবো তিমিরের সারাবেলা / পৌরুষের প্রেম দিয়ে তোমাকে বাজাবো, আহা তুমুল বাজাবো।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি আরও ইচ্ছের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — ইচ্ছে ছিলো সুনিপুণ মেকআপ-ম্যানের মতো সূর্যালোকে কেবল সাজাবো তিমিরের সারাবেলা। অর্থাৎ মেকআপ-ম্যানের মতো দক্ষতার সাথে তাকে সাজাবেন, আলোকিত করবেন। ‘তিমিরের সারাবেলা’ — অন্ধকারের সারা বেলা, অর্থাৎ জীবনের অন্ধকার সময়গুলো। সেই সময়েও তিনি প্রিয়তমাকে সাজাবেন, আলোকিত করবেন। পৌরুষের প্রেম দিয়ে তোমাকে বাজাবো, আহা তুমুল বাজাবো — অর্থাৎ পুরুষালি প্রেম দিয়ে তাকে বাজাবেন, মাতিয়ে দেবেন।
মেকআপ-ম্যানের উপমার তাৎপর্য
মেকআপ-ম্যান — যিনি অপরকে সাজান, সুন্দর করে তোলেন। কবি প্রিয়তমাকে সাজাতে চেয়েছিলেন, তাকে আরও সুন্দর করে তুলতে চেয়েছিলেন। ‘সূর্যালোকে সাজানো’ — প্রকাশ্যে, সবাইকে দেখানোর জন্য সাজানো। কবি চেয়েছিলেন প্রিয়তমা সবসময় আলোকিত থাকুক, সবাই তার সৌন্দর্য দেখুক। আর ‘তিমিরের সারাবেলা’ অর্থাৎ জীবনের অন্ধকার সময়গুলোতেও তিনি তাকে সাজাবেন — অর্থাৎ দুঃখ-কষ্টের সময়েও তিনি তাকে আলোকিত রাখবেন, তাকে ভালোবাসবেন।
পৌরুষের প্রেম দিয়ে বাজানোর তাৎপর্য
পৌরুষের প্রেম — পুরুষালি প্রেম, শক্তিশালী প্রেম। সেই প্রেম দিয়ে প্রিয়তমাকে বাজাতে চেয়েছিলেন, মাতিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ‘তুমুল বাজাবো’ — খুব জোরে, খুব গভীরভাবে বাজাবো। এখানে ‘বাজানো’ শব্দটি সম্ভবত বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অর্থে নয়, বরং প্রেমের আবেগে মাতিয়ে দেওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কবি চেয়েছিলেন তাঁর প্রেম এতটাই শক্তিশালী হোক যে তা প্রিয়তমাকে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলবে।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ইচ্ছে ছিলো নদীর বক্ষ থেকে জলে জলে শব্দ তুলে / রাখবো তোমার লাজুক চঞ্চুতে, / জন্মাবধি আমার শীতল চোখ / তাপ নেবে তোমার দু’চোখে।” তৃতীয় স্তবকে কবি আরও রোমান্টিক ইচ্ছের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — ইচ্ছে ছিলো নদীর বক্ষ থেকে জলে জলে শব্দ তুলে রাখবো তোমার লাজুক চঞ্চুতে। অর্থাৎ নদীর কলকল শব্দ এনে প্রিয়তমার লাজুক ঠোঁটে রাখবেন। জন্মাবধি তাঁর শীতল চোখ তাপ নেবে প্রিয়তমার দু’চোখে — অর্থাৎ তাঁর শীতল চোখ প্রিয়তমার চোখের তাপে উষ্ণ হবে।
নদীর শব্দ ও লাজুক চঞ্চুর তাৎপর্য
নদীর শব্দ — কলকল ধ্বনি, যা খুব মধুর। নদী বাংলার প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীর শব্দ চিরন্তন, চিরপ্রবহমান। কবি সেই মধুর, চিরন্তন শব্দ এনে প্রিয়তমার লাজুক ঠোঁটে রাখতে চেয়েছিলেন — অর্থাৎ প্রিয়তমার ঠোঁটও যেন নদীর মতো মধুর শব্দ করে, চিরন্তন হয়ে ওঠে। ‘লাজুক চঞ্চু’ — লাজুক ঠোঁট, যা প্রেমের সময় সংকোচ প্রকাশ করে। এই লাজুক ঠোঁটেই তিনি নদীর শব্দ রাখতে চান।
শীতল চোখে তাপ নেওয়ার তাৎপর্য
কবির চোখ শীতল — অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টি ঠান্ডা, সম্ভবত একাকীত্বে জমে থাকা। তিনি হয়তো দীর্ঘদিন একা ছিলেন, প্রেমহীন ছিলেন, তাই তাঁর চোখ শীতল। তিনি চেয়েছিলেন প্রিয়তমার চোখের তাপে তাঁর চোখ উষ্ণ হোক, সজীব হোক। প্রিয়তমার ভালোবাসায় তাঁর শীতল জীবন উষ্ণ হবে বলে আশা করেছিলেন। এটি প্রেমের পুনর্জীবনদানকারী শক্তির ইঙ্গিত দেয়।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ইচ্ছে ছিল রাজা হবো / তোমাকে সাম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো, / আজ দেখি রাজ্য আছে / রাজা আছে / ইচ্ছে আছে, / শুধু তুমি অন্য ঘরে।” চতুর্থ স্তবকে কবি বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি বলেছেন — ইচ্ছে ছিল রাজা হবো, তোমাকে সাম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো। আজ দেখি রাজ্য আছে, রাজা আছে, ইচ্ছে আছে, শুধু তুমি অন্য ঘরে। অর্থাৎ সব কিছুই আছে — রাজ্য, রাজা, ইচ্ছে — সব আছে, কিন্তু প্রিয়তমা নেই। তিনি অন্য ঘরে, অন্য কারও।
রাজ্য, রাজা, ইচ্ছে থাকার তাৎপর্য
রাজ্য আছে — তাঁর জীবন, তাঁর জগৎ আছে। রাজা আছে — তিনি নিজে আছেন। ইচ্ছে আছে — তাঁর ইচ্ছে এখনও আছে। কিন্তু প্রিয়তমা নেই। সব কিছু থাকলেও যা চেয়েছিলেন তা নেই। এই পঙ্ক্তিগুলোতে একটি গভীর বেদনা ও হতাশা কাজ করছে। কবির জীবনে সব কিছুই আছে — সাফল্য আছে, পরিচিতি আছে, স্বপ্ন আছে — কিন্তু প্রেমিকা নেই। প্রেমিকা চলে গেছে অন্য কারও ঘরে।
‘শুধু তুমি অন্য ঘরে’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
‘শুধু তুমি অন্য ঘরে’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ। প্রিয়তমা অন্য ঘরে, অন্য কারও। কবির সব ইচ্ছে, সব স্বপ্ন ভেস্তে গেছে। তিনি একা, শুধু ইচ্ছে নিয়ে। ‘শুধু’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সব কিছু থাকার পরেও যা নেই, সেটাই ‘শুধু’। রাজ্য, রাজা, ইচ্ছে — সব আছে, শুধু তুমি নেই। এই ‘শুধু’ শব্দটির মধ্যে অসীম বেদনা, অসীম হতাশা লুকিয়ে আছে। ‘অন্য ঘরে’ বলার মাধ্যমে কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে প্রিয়তমা অন্য কারও হয়ে গেছে। এই চিত্রকল্প প্রেমের চূড়ান্ত পরিণতি ও বিচ্ছেদের বেদনাকে ধারণ করে।
কবিতার গঠন ও ছন্দ
“ইচ্ছে ছিলো” কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম তিনটি স্তবকে কবি তাঁর ইচ্ছের কথা বলেছেন, শেষ স্তবকে সেই ইচ্ছের পরিণতি। প্রথম তিনটি স্তবক দীর্ঘ, পূর্ণাঙ্গ বাক্যে গঠিত, যা ইচ্ছের প্রাচুর্য ও গভীরতা নির্দেশ করে। শেষ স্তবকটি ছোট ছোট পঙ্ক্তিতে বিভক্ত, যা বাস্তবতার চূর্ণ-বিচূর্ণ প্রভাবকে ধারণ করে। শেষ স্তবকের শেষ চারটি পঙ্ক্তি — ‘আজ দেখি রাজ্য আছে / রাজা আছে / ইচ্ছে আছে / শুধু তুমি অন্য ঘরে’ — ছন্দের দিক থেকেও ভিন্ন। এগুলি খুব ছোট ছোট পঙ্ক্তি, যেন বাস্তবতার আঘাতে কবির বাক্যও ছোট হয়ে গেছে।
কবিতার ভাষা ও শৈলী
হেলাল হাফিজের ভাষা অত্যন্ত সহজ-সরল, অথচ গভীর তাৎপর্যময়। তিনি এখানে রাজকীয় উপমা ব্যবহার করেছেন — সম্রাজ্ঞী, রাজা, সাম্রাজ্য। আবার প্রাকৃতিক উপমাও ব্যবহার করেছেন — নদী, শীতল চোখ, তাপ। আবার আধুনিক উপমাও ব্যবহার করেছেন — মেকআপ-ম্যান, পতাকা, কপোত। এই বৈচিত্র্যময় উপমার ব্যবহার কবিতাকে একটি বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। কবিতার ভাষায় এক ধরনের সুরেলা ছন্দ আছে, যা পাঠককে আবেগাপ্লুত করে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“ইচ্ছে ছিলো” কবিতাটি অপূর্ণ প্রেমের এক অসাধারণ চিত্র। কবি তাঁর প্রিয়তমাকে নিয়ে কত ইচ্ছে করেছিলেন — তাকে সম্রাজ্ঞী বানাবেন, সাম্রাজ্য বাড়াবেন, তাকে সুখের পতাকা ও শান্তির কপোত বানাবেন, তাকে সাজাবেন, তাকে বাজাবেন, নদীর শব্দ এনে তার ঠোঁটে রাখবেন, তার চোখের তাপে নিজের শীতল চোখ উষ্ণ করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে যায়। রাজ্য আছে, রাজা আছে, ইচ্ছে আছে, কিন্তু প্রিয়তমা নেই — তিনি অন্য ঘরে। এটি প্রেমের এক করুণ পরিণতি, এক গভীর বেদনার চিত্র। কবিতাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় — কখনও কখনও সব কিছু থাকার পরেও যা চাই তা থাকে না। জীবনের সব ইচ্ছে পূর্ণ হয় না, সব প্রেম সফল হয় না। এই বাস্তব সত্যকেই কবি অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
ইচ্ছে ছিলো কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ইচ্ছে ছিলো কবিতার লেখক কে?
ইচ্ছে ছিলো কবিতার লেখক হেলাল হাফিজ (১৯৪৮-)। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ (১৯৮৬) তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর কবিতায় প্রেম, বিরহ, নাগরিক জীবন, সামাজিক বাস্তবতা ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
প্রশ্ন ২: ইচ্ছে ছিলো কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
ইচ্ছে ছিলো কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো অপূর্ণ প্রেম ও না-পাওয়ার বেদনা। কবি তাঁর প্রিয়তমাকে নিয়ে কত ইচ্ছে করেছিলেন — তাকে সম্রাজ্ঞী বানাবেন, সাম্রাজ্য বাড়াবেন, তাকে সাজাবেন, তাকে বাজাবেন, নদীর শব্দ এনে তার ঠোঁটে রাখবেন, তার চোখের তাপে নিজের চোখ উষ্ণ করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব ইচ্ছে অপূর্ণ থেকে যায়। রাজ্য আছে, রাজা আছে, ইচ্ছে আছে, কিন্তু প্রিয়তমা অন্য ঘরে।
প্রশ্ন ৩: ‘ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি প্রিয়তমাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। সম্রাজ্ঞী — রানী, সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি প্রিয়তমাকে রানী বানিয়ে নিজের জীবন, নিজের জগৎকে বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন। প্রিয়তমাকে কেন্দ্র করে গড়তে চেয়েছিলেন তাঁর জীবন। এটি প্রেমের গভীরতা ও নিষ্ঠা প্রকাশ করে।
প্রশ্ন ৪: ‘পৌরুষের প্রেম দিয়ে তোমাকে বাজাবো, আহা তুমুল বাজাবো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘পৌরুষের প্রেম দিয়ে তোমাকে বাজাবো, আহা তুমুল বাজাবো’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি তাঁর প্রেমের শক্তি ও তীব্রতা প্রকাশ করেছেন। পৌরুষের প্রেম — পুরুষালি প্রেম, শক্তিশালী প্রেম। সেই প্রেম দিয়ে প্রিয়তমাকে বাজাতে চেয়েছিলেন, মাতিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ‘তুমুল বাজাবো’ — খুব জোরে, খুব গভীরভাবে বাজাবো। এখানে ‘বাজানো’ শব্দটি প্রেমের আবেগে মাতিয়ে দেওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রশ্ন ৫: ‘জন্মাবধি আমার শীতল চোখ / তাপ নেবে তোমার দু’চোখে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘জন্মাবধি আমার শীতল চোখ / তাপ নেবে তোমার দু’চোখে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি তাঁর একাকীত্ব ও প্রিয়তমার প্রভাবের কথা বলেছেন। তাঁর চোখ শীতল — অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টি ঠান্ডা, সম্ভবত একাকীত্বে জমে থাকা। তিনি চেয়েছিলেন প্রিয়তমার চোখের তাপে তাঁর চোখ উষ্ণ হোক, সজীব হোক। প্রিয়তমার ভালোবাসায় তাঁর শীতল জীবন উষ্ণ হবে বলে আশা করেছিলেন।
প্রশ্ন ৬: ‘শুধু তুমি অন্য ঘরে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘শুধু তুমি অন্য ঘরে’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ। প্রিয়তমা অন্য ঘরে, অন্য কারও। কবির সব ইচ্ছে, সব স্বপ্ন ভেস্তে গেছে। রাজ্য আছে, রাজা আছে, ইচ্ছে আছে — সব কিছুই আছে, কিন্তু যা চেয়েছিলেন তা নেই। ‘শুধু’ শব্দটির মধ্যে অসীম বেদনা লুকিয়ে আছে। ‘অন্য ঘরে’ বলার মাধ্যমে কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে প্রিয়তমা অন্য কারও হয়ে গেছে।
প্রশ্ন ৭: হেলাল হাফিজ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
হেলাল হাফিজ (১৯৪৮-) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। তিনি ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ (১৯৮৬) তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর কবিতায় প্রেম, বিরহ, নাগরিক জীবন ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
ট্যাগস: ইচ্ছে ছিলো, হেলাল হাফিজ, হেলাল হাফিজের কবিতা, ইচ্ছে ছিলো কবিতা, বাংলা প্রেমের কবিতা, অপূর্ণ প্রেমের কবিতা, যে জলে আগুন জ্বলে, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা





