কবিতার খাতা
- 31 mins
বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা – শামসুর রাহমান।
নক্ষত্রপুজ্ঞের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়।
মমতা নামের প্লুত প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড়
ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে
শিউলি শৈশবে ‘পাখি সব করে রব’ ব’লে মদনমোহন
তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক। তুমি আর আমি,
অবিচ্ছিন্ন, পরস্পর মমতায় লীন
ঘুরেছি কাননে তাঁর নেচে নেচে, যেখানে কুসুম-কলি সবই
ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সংকেতে।
আজন্ম আমার সাথি তুমি,
আমাকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিলে গ’ড়ে পলে পলে,
তাইতো ত্রিলোক সুনন্দ জাহাজ হ’য়ে ভেড়ে
আমারই বন্দরে।
গলিত কাচের মতো জলে ফাৎনা দেখে দেখে রঙিন মাছের
আশায় চিকন ছিপ ধ’রে গেছে বেলা। মনে পড়ে, কাঁচি দিয়ে
নক্সা কাটা কাগজ এবং বোতলের ছিপি ফেলে
সেই কবে আমি ‘হাসিখুশি’র খেয়া বেয়ে
পৌঁছে গেছি রত্নদ্বীপে কস্পাস বিহনে।
তুমি আসো, আমার ঘুমের বাগানেও
সে কোন বিশাল
গাছের কোটর থেকে লাফাতে লাফাতে নেমে আসো,
আসো কাঠবিড়ালির রূপে,
ফুল্ল মেঘমালা থেকে চকিতে ঝাঁপিয়ে পড়ো ঐরাবত সেজে,
সুদূর পাঠশালার একান্নটি সতত সবুজ
মুখের মতোই দুলে দুলে ওঠো তুমি
বারবার কিম্বা টুকটুকে লঙ্কা-ঠোঁট টিয়ে হ’য়ে
কেমন দুলিয়ে দাও স্বপ্নময়তায় চৈতন্যের দাঁড়।
আমার এ অভিগোলকের মধ্যে তুমি আঁখিতারা।
যুদ্ধের আগুনে,
মারীর তাণ্ডবে,
প্রবল বর্ষায়
কি অনাবৃষ্টিতে,
বারবনিতার
নূপুর নিক্কনে,
বনিতার শান্ত
বাহুর বন্ধনে,
ঘৃণায় ধিক্কারে,
নৈরাজ্যের এলো-
ধাবাড়ি চিৎকারে,
সৃষ্টির ফাল্গুনে
হে আমার আঁখিতারা তুমি উন্মীলিত সর্বক্ষণ জাগরণে।
তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার?
উনিশ শো’ বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাজ্ঞলি
বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।
সে-ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন হ’লে আমার সত্তার দিকে
কতো নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।
এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি,
এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস!
তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,
বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমান।
বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা – শামসুর রাহমান | বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতা | শামসুর রাহমানের কবিতা | বাংলা কবিতা
বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা: শামসুর রাহমানের ভাষা, স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের অসাধারণ কাব্যভাষা
শামসুর রাহমানের “বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা ভাষা, স্বাধীনতা, অস্তিত্ব ও ইতিহাসের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর সম্পর্কের কথা, কবির সঙ্গে তাঁর ভাষা বর্ণমালার সম্পর্ক। শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষদের একজন। তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতার গভীর প্রকাশ ঘটে। “বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও ভাষার দুঃখিনী অবস্থার এক মর্মস্পর্শী চিত্র এঁকেছে।
শামসুর রাহমান: আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ
শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘আমি অনাহারী’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতার গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। “বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও ভাষার দুঃখিনী অবস্থার এক মর্মস্পর্শী চিত্র এঁকেছে।
বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ণমালা — ভাষার মূল উপাদান, বাংলা ভাষার বর্ণসমূহ। কিন্তু কবি একে ‘আমার দুঃখিনী’ বলে সম্বোধন করেছেন। বর্ণমালা এখানে শুধু বর্ণ নয়, এটি একটি জীবন্ত সত্তা, একটি প্রিয়জন, একটি নারী যে দুঃখিনী — দুঃখী। শিরোনামেই কবি ভাষার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা ও ভাষার বর্তমান দুঃখিনী অবস্থার প্রতি তাঁর বেদনা প্রকাশ করেছেন।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়। / মমতা নামের প্লুত প্রদেশের শ্যামলিমা তোমাকে নিবিড় / ঘিরে রয় সর্বদাই। কালো রাত পোহানোর পরের প্রহরে / শিউলি শৈশবে ‘পাখি সব করে রব’ ব’লে মদনমোহন / তর্কালঙ্কার কী ধীরোদাত্ত স্বরে প্রত্যহ দিতেন ডাক। তুমি আর আমি, / অবিচ্ছিন্ন, পরস্পর মমতায় লীন / ঘুরেছি কাননে তাঁর নেচে নেচে, যেখানে কুসুম-কলি সবই / ফোটে, জোটে অলি ঋতুর সংকেতে।” প্রথম স্তবকে কবি বর্ণমালার সাথে তাঁর শৈশবের সম্পর্কের কথা বলেছেন। বর্ণমালা তাঁর সত্তায় নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছে। মমতা নামের প্রদেশের শ্যামলিমা তাকে ঘিরে রয়েছে। তিনি শৈশবের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন — ‘পাখি সব করে রব’ — মদনমোহন তর্কালঙ্কারের প্রাথমিক শিক্ষার বইয়ের সেই পরিচিত লাইন। তিনি বলেছেন — তুমি আর আমি অবিচ্ছিন্ন, পরস্পর মমতায় লীন হয়ে কাননে ঘুরেছি নেচে নেচে।
নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকার তাৎপর্য
নক্ষত্রপুঞ্জ — অসংখ্য তারা। জ্বলজ্বলে পতাকা — উজ্জ্বল পতাকা। বর্ণমালা তাঁর সত্তায় এভাবেই বিরাজমান — অসংখ্য তারার মতো উজ্জ্বল, পতাকার মতো গৌরবময়। এটি ভাষার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রকাশ।
মমতা নামের প্লুত প্রদেশের শ্যামলিমার তাৎপর্য
মমতা — স্নেহ, ভালোবাসা। প্লুত প্রদেশ — সিক্ত অঞ্চল। শ্যামলিমা — সবুজিমা। বর্ণমালা স্নেহের সিক্ত অঞ্চলের সবুজিমায় আবৃত। অর্থাৎ ভাষা স্নেহ, ভালোবাসা ও সজীবতায় পরিপূর্ণ।
শৈশবের স্মৃতি ও ‘পাখি সব করে রব’-এর তাৎপর্য
‘পাখি সব করে রব’ — মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’ বইয়ের প্রথম লাইন। এটি বাংলার প্রতিটি শিশুর শৈশবের প্রথম পাঠ। কবি বলেছেন — সেই শৈশবে তিনি এই লাইন শুনতেন। বর্ণমালা তখন থেকেই তাঁর সাথে আছে।
অবিচ্ছিন্ন, পরস্পর মমতায় লীন হওয়ার তাৎপর্য
তিনি বলেছেন — তুমি আর আমি অবিচ্ছিন্ন, পরস্পর মমতায় লীন হয়ে কাননে ঘুরেছি। অর্থাৎ তিনি আর বর্ণমালা এক সত্তা, অবিচ্ছেদ্য। তারা একসাথে শৈশবের কাননে ঘুরেছে, ফুল ফোটা দেখেছে, মৌমাছি দেখেছে।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আজন্ম আমার সাথি তুমি, / আমাকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিলে গ’ড়ে পলে পলে, / তাইতো ত্রিলোক সুনন্দ জাহাজ হ’য়ে ভেড়ে / আমারই বন্দরে।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি বর্ণমালাকে আজন্ম সাথি বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি বলেছেন — বর্ণমালা তাঁকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিল গড়ে পলে পলে। তাই ত্রিলোক সুনন্দ জাহাজ হয়ে ভেড়ে তাঁরই বন্দরে।
আজন্ম সাথির তাৎপর্য
আজন্ম — জন্ম থেকে। বর্ণমালা তাঁর জন্ম থেকে সাথি। তিনি যখন প্রথম কথা শিখেছেন, প্রথম লিখতে শিখেছেন, তখন থেকেই বর্ণমালা তাঁর সাথে আছে।
স্বপ্নের সেতুর তাৎপর্য
বর্ণমালা তাঁকে স্বপ্নের সেতু দিয়েছিল — অর্থাৎ ভাষার মাধ্যমে তিনি স্বপ্ন দেখতে শিখেছেন, কল্পনা করতে শিখেছেন। সেই সেতু পলে পলে গড়ে উঠেছে — প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি শব্দে।
ত্রিলোক সুনন্দ জাহাজের তাৎপর্য
ত্রিলোক — তিন জগৎ। সুনন্দ — সুন্দর। জাহাজ — বিশাল জলযান। বর্ণমালার মাধ্যমেই তিনি ত্রিলোক সুনন্দ জাহাজে চড়ে নিজের বন্দরে ভিড়তে পেরেছেন। অর্থাৎ ভাষাই তাঁকে বিশ্বের সাথে পরিচিত করিয়েছে, নিজের অস্তিত্বে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“গলিত কাচের মতো জলে ফাৎনা দেখে দেখে রঙিন মাছের / আশায় চিকন ছিপ ধ’রে গেছে বেলা। মনে পড়ে, কাঁচি দিয়ে / নক্সা কাটা কাগজ এবং বোতলের ছিপি ফেলে / সেই কবে আমি ‘হাসিখুশি’র খেয়া বেয়ে / পৌঁছে গেছি রত্নদ্বীপে কস্পাস বিহনে।” তৃতীয় স্তবকে কবি শৈশবের আরও স্মৃতি মনে করেছেন। তিনি বলেছেন — গলিত কাচের মতো জলে ফাৎনা (ফেনা) দেখে দেখে রঙিন মাছের আশায় চিকন ছিপ ধরে গেছে বেলা। তিনি মনে করেন — কাঁচি দিয়ে নক্সা কাটা কাগজ, বোতলের ছিপি ফেলে তিনি ‘হাসিখুশি’র খেয়া বেয়ে পৌঁছে গেছেন রত্নদ্বীপে কস্পাস বিহনে।
গলিত কাচের মতো জলে ফাৎনা দেখার তাৎপর্য
গলিত কাচের মতো জল — স্বচ্ছ জল। ফাৎনা — ফেনা। তিনি জলের ফেনা দেখেছেন, রঙিন মাছের আশায় ছিপ ধরেছেন। এটি শৈশবের নির্দোষ আনন্দের চিত্র।
‘হাসিখুশি’র খেয়া ও রত্নদ্বীপের তাৎপর্য
‘হাসিখুশি’ — সম্ভবত কোনো শিশু পত্রিকা বা বই। খেয়া — নৌকা। তিনি ‘হাসিখুশি’র খেয়া বেয়ে রত্নদ্বীপে পৌঁছে গেছেন। অর্থাৎ পড়ার মাধ্যমে তিনি কল্পনার জগতে, রত্নদ্বীপে পৌঁছে গেছেন। কস্পাস বিহনে — সম্ভবত কোনো বিশেষ স্থান।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তুমি আসো, আমার ঘুমের বাগানেও / সে কোন বিশাল / গাছের কোটর থেকে লাফাতে লাফাতে নেমে আসো, / আসো কাঠবিড়ালির রূপে, / ফুল্ল মেঘমালা থেকে চকিতে ঝাঁপিয়ে পড়ো ঐরাবত সেজে, / সুদূর পাঠশালার একান্নটি সতত সবুজ / মুখের মতোই দুলে দুলে ওঠো তুমি / বারবার কিম্বা টুকটুকে লঙ্কা-ঠোঁট টিয়ে হ’য়ে / কেমন দুলিয়ে দাও স্বপ্নময়তায় চৈতন্যের দাঁড়।” চতুর্থ স্তবকে কবি স্বপ্নে বর্ণমালার আগমনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন — তুমি আমার ঘুমের বাগানেও আসো। কোনো বিশাল গাছের কোটর থেকে লাফাতে লাফাতে নেমে আসো কাঠবিড়ালির রূপে। ফুল্ল মেঘমালা থেকে চকিতে ঝাঁপিয়ে পড়ো ঐরাবত সেজে। সুদূর পাঠশালার একান্নটি সতত সবুজ মুখের মতো দুলে দুলে ওঠো। টুকটুকে লঙ্কা-ঠোঁট টিয়ে হয়ে দুলিয়ে দাও স্বপ্নময়তায় চৈতন্যের দাঁড়।
ঘুমের বাগানে আসার তাৎপর্য
ঘুমের বাগান — স্বপ্নের জগৎ। বর্ণমালা তাঁর স্বপ্নেও আসে। অর্থাৎ ভাষা তাঁর অচেতন মনের অংশ, স্বপ্নের জগতের অংশ।
কাঠবিড়ালি, ঐরাবত, টিয়ে রূপে আসার তাৎপর্য
কাঠবিড়ালি — চঞ্চল, লাফানো প্রাণী। ঐরাবত — ইন্দ্রের বাহন, শ্বেতহস্তী। টিয়ে — সবুজ টিয়া পাখি। বর্ণমালা বিভিন্ন রূপে তাঁর স্বপ্নে আসে — কখনও চঞ্চল কাঠবিড়ালি, কখনও মহিমান্বিত ঐরাবত, কখনও রঙিন টিয়ে। এটি ভাষার বহুরূপী সত্তার প্রকাশ।
পাঠশালার একান্নটি সবুজ মুখের তাৎপর্য
পাঠশালার একান্নটি সবুজ মুখ — সম্ভবত একান্নটি বর্ণ? বাংলা বর্ণমালায় ৫০টি বর্ণ (আসল সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে)। সবুজ মুখ — তাজা, জীবন্ত বর্ণ। বর্ণমালা সেই সবুজ মুখের মতো দুলে দুলে ওঠে তাঁর সামনে।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“আমার এ অভিগোলকের মধ্যে তুমি আঁখিতারা। / যুদ্ধের আগুনে, / মারীর তাণ্ডবে, / প্রবল বর্ষায় / কি অনাবৃষ্টিতে, / বারবনিতার / নূপুর নিক্কনে, / বনিতার শান্ত / বাহুর বন্ধনে, / ঘৃণায় ধিক্কারে, / নৈরাজ্যের এলো- / ধাবাড়ি চিৎকারে, / সৃষ্টির ফাল্গুনে / হে আমার আঁখিতারা তুমি উন্মীলিত সর্বক্ষণ জাগরণে।” পঞ্চম স্তবকে কবি বর্ণমালাকে তাঁর অভিগোলকের (জীবনের গোলকের) মধ্যে আঁখিতারা (চোখের তারা) বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি বলেন — যুদ্ধের আগুনে, মহামারীর তাণ্ডবে, প্রবল বর্ষায়, অনাবৃষ্টিতে, বারবনিতার নূপুরের শব্দে, বনিতার শান্ত বাহুর বন্ধনে, ঘৃণায়, ধিক্কারে, নৈরাজ্যের এলোমেলো চিৎকারে, সৃষ্টির ফাল্গুনে — সর্বক্ষণ, সব অবস্থায় তুমি আমার আঁখিতারা, উন্মীলিত, জাগ্রত।
আঁখিতারার তাৎপর্য
আঁখিতারা — চোখের তারা, অত্যন্ত প্রিয়। বর্ণমালা তাঁর জীবনের অত্যন্ত প্রিয় বস্তু, যা তিনি সবসময় দেখেন, যা তাঁকে পথ দেখায়।
নানা পরিস্থিতিতে বর্ণমালার উপস্থিতির তাৎপর্য
যুদ্ধ, মহামারী, বর্ষা, অনাবৃষ্টি, বারবনিতার নূপুর, বনিতার বাহু, ঘৃণা, ধিক্কার, নৈরাজ্য, সৃষ্টির ফাল্গুন — সব অবস্থায় বর্ণমালা তাঁর সাথে আছে। অর্থাৎ ভাষা সবসময়, সব অবস্থায় মানুষের সাথে থাকে। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে ভাষাই মানুষের সঙ্গী।
ষষ্ঠ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার? / উনিশ শো’ বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাজ্ঞলি / বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী। / সে-ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন হ’লে আমার সত্তার দিকে / কতো নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।” ষষ্ঠ স্তবকে কবি বর্ণমালাকে উপড়ে নিলে কী থাকে — এই প্রশ্ন করেছেন। তিনি বলেছেন — উনিশ শো বাহান্নো (১৯৫২)র দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী। সেই ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন হলে তাঁর সত্তার দিকে কত নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।
১৯৫২ সালের রক্তিম পুষ্পাঞ্জলির তাৎপর্য
১৯৫২ — ভাষা আন্দোলনের বছর। রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি — শহীদদের রক্ত। বর্ণমালা সেই শহীদদের রক্ত বুকে নিয়ে গৌরবময়। অর্থাৎ আমাদের ভাষা শহীদদের রক্তে রঞ্জিত, তাই এর মূল্য অপরিসীম।
পাপড়ি ছিন্ন হলে হিংস্রতা ধেয়ে আসার তাৎপর্য
বর্ণমালার একটি পাপড়ি (একটি বর্ণ, একটি অধিকার) ছিন্ন হলে তাঁর সত্তার দিকে হিংস্রতা ধেয়ে আসে। অর্থাৎ ভাষার ওপর আক্রমণ মানে তাঁর অস্তিত্বের ওপর আক্রমণ। ভাষা রক্ষা করা মানে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা।
সপ্তম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি, / এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস! / তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো, / বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।” সপ্তম স্তবকে কবি বর্তমান অবস্থার কথা বলেছেন। তিনি বলেন — এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি, খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস। তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো। শেষে তিনি আবার বলেছেন — বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।
খেঙরার নোংরামি ও খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাসের তাৎপর্য
খেঙরা — নোংরা, অশ্লীল। খিস্তি-খেউড় — গালাগাল, অশ্লীল ভাষা। পৌষমাস — শীতের মাস। কবি বলেছেন — এখন বর্ণমালাকে নিয়ে চলছে নোংরামি, অশ্লীল ভাষার চর্চা। ভাষার অপব্যবহার, ভাষার প্রতি অসম্মান চলছে।
‘তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো’র তাৎপর্য
বর্ণমালার মুখের দিকে তাকানো যায় না — কারণ তাকে অপমানিত, দুঃখিনী দেখা যায়। ভাষার বর্তমান অবস্থা দেখে কবি লজ্জিত, বেদনাবিদ্ধ।
শেষ পঙ্ক্তির পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য
‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ — শিরোনামের পুনরাবৃত্তি। কবি শুরুতে যেমন বলেছিলেন, শেষেও তেমন বলেছেন। কিন্তু এখন আমরা জানি কেন বর্ণমালা দুঃখিনী — কারণ তাকে অপমানিত হতে হচ্ছে, তার প্রতি অসম্মান চলছে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা” কবিতাটি ভাষার প্রতি এক গভীর ভালোবাসা ও ভাষার বর্তমান অবস্থার প্রতি তীব্র বেদনার প্রকাশ। কবি শৈশব থেকে বর্ণমালার সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা বলেছেন — কীভাবে তিনি বর্ণমালার মাধ্যমে শৈশব কাটিয়েছেন, স্বপ্ন দেখেছেন, কল্পনার জগতে পৌঁছেছেন। তিনি বর্ণমালাকে তাঁর আঁখিতারা বলেছেন, যা সব অবস্থায় তাঁর সাথে থাকে। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের রক্তের কথা স্মরণ করেছেন, যা বর্ণমালাকে মহীয়সী করেছে। কিন্তু বর্তমানে বর্ণমালার দুর্দশার কথা বলেছেন — তাকে নিয়ে চলছে নোংরামি, খিস্তি-খেউড়। তাই তিনি বর্ণমালাকে ‘দুঃখিনী’ বলে সম্বোধন করেছেন। এটি ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও ভাষার বর্তমান অবস্থার মধ্যে এক তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতার লেখক কে?
বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতার লেখক শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)। তিনি বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষদের একজন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘আমি অনাহারী’, ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ প্রভৃতি।
প্রশ্ন ২: বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও ভাষার বর্তমান দুর্দশার প্রতি বেদনা। কবি শৈশব থেকে বর্ণমালার সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা বলেছেন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের রক্তের কথা স্মরণ করেছেন, যা বর্ণমালাকে মহীয়সী করেছে। কিন্তু বর্তমানে বর্ণমালাকে নিয়ে চলছে নোংরামি, খিস্তি-খেউড় — তাই তিনি বর্ণমালাকে ‘দুঃখিনী’ বলে সম্বোধন করেছেন।
প্রশ্ন ৩: ‘উনিশ শো’ বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাজ্ঞলি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘উনিশ শো’ বাহান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাজ্ঞলি’ — ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের রক্তকে বোঝানো হয়েছে। ‘রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি’ অর্থ রক্তের অঞ্জলি। বর্ণমালা সেই শহীদদের রক্ত বুকে নিয়ে গৌরবময়, মহীয়সী। এটি ভাষার প্রতি আত্মত্যাগের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রশ্ন ৪: ‘এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘এখন তোমাকে নিয়ে খেঙরার নোংরামি’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি ভাষার বর্তমান দুর্দশার কথা বলেছেন। খেঙরা — নোংরা, অশ্লীল। খিস্তি-খেউড় — গালাগাল, অশ্লীল ভাষা। কবি বলেছেন — বর্তমানে ভাষাকে নিয়ে চলছে নোংরামি, অশ্লীলতার চর্চা। ভাষার অপব্যবহার, ভাষার প্রতি অসম্মান চলছে।
প্রশ্ন ৫: শামসুর রাহমান সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি। তিনি ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ২০০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ট্যাগস: বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা, শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের কবিতা, বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, ভাষা আন্দোলনের কবিতা, ১৯৫২ সালের কবিতা




