অমন তাকাও যদি – শামসুর রাহমান | বাংলা প্রেমের কবিতা সংগ্রহ
কবিতা সম্পর্কে বিশদ বিশ্লেষণ
শামসুর রাহমানের “অমন তাকাও যদি” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক প্রেমের কবিতার একটি অনবদ্য ও উজ্জ্বল নিদর্শন। এই কবিতায় কবি প্রেমের তীব্র আকুতি, নিঃশর্ত সমর্পণ এবং এক অতিপ্রাকৃত ভালোবাসার মাত্রাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা পাঠকের হৃদয়ে দোলা দেয়। কবিতাটির মাধ্যমে প্রেম শুধুই একটি মানবিক অনুভূতি নয়, বরং একটি মহাজাগতিক ও দার্শনিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত হয়েছে।
কবিতার শিল্পসৌকর্য ও উপমাপ্রয়োগ
কবিতাটিতে শামসুর রাহমান তাঁর স্বকীয় কাব্যিক প্রতিভার অসামান্য প্রকাশ ঘটিয়েছেন। “একবিন্দু অনন্তের মতো চোখ মেলা”, “স্বেচ্ছায় সূর্যাস্ত হওয়া”, “নিঃশ্বাসে আন্দোলিত এক পবিত্র নিশান” – এরকম নানাবিদ উপমা, রূপক ও উৎপ্রেক্ষার মাধ্যমে তিনি ভালোবাসার জটিল ও অতিলৌকিক অনুভূতিকে মূর্ত করে তুলেছেন। তার ভাষা এখানে আধুনিক কিন্তু গভীরভাবে রোমান্টিক, যা বাংলা কবিতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
দার্শনিক ও আবেগিক স্তর
এই কবিতায় প্রেমকে চিত্রিত করা হয়েছে এক সর্বগ্রাসী ও বিপ্লবী শক্তি হিসেবে। প্রেমিক এখানে সমস্ত জাগতিক প্রতিপত্তি (“যশের মুকুট”), ধর্মীয় পুরস্কার (“বেহেস্তী আঙুর”, “হুরীর লালচ”) এমনকি নরক-স্বর্গের দ্বন্দ্বকেও (“নরকেও ভালোবাসা ম্যানিফেস্টো”) তুচ্ছজ্ঞান করে শুধুমাত্র প্রিয়ার দৃষ্টি ও সান্নিধ্যের জন্য। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ভালোবাসার গল্প নয়, বরং ভালোবাসাকে জীবন-মৃত্যু, স্বর্গ-নরকের ঊর্ধ্বে স্থাপনের এক সাহসী দার্শনিক অবস্থান।
ছন্দ ও গঠনশৈলী
কবিতাটি গদ্য কবিতার ঢঙে লেখা হলেও এর অন্তর্গত ছন্দ ও লয়ের একটি প্রবাহমানতা রয়েছে। দীর্ঘ শ্বাসবিশিষ্ট লাইনগুলি ভালোবাসার উদ্বেলতা ও আবেগের গভীরতাকে ধারণ করেছে। “প্রত্যহ”, “কস্মিনকালেও”, “নিশ্চিত” – শব্দগুলির স্থাপন কবিতাকে একটি অনন্য গাম্ভীর্য ও দৃঢ় প্রত্যয় দান করেছে।
কবি শামসুর রাহমান পরিচিতি
শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রগতিশীল আধুনিক কবি। তাকে বাংলা কাব্যজগতের ‘নাগরিক কবি’ বলা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, নাগরিক জীবন ও মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব তাঁর কবিতার প্রাণকেন্দ্র। তাঁর কবিতা কেবল বাংলাদেশেই নয়, সমগ্র বাংলাভাষী অঞ্চলেই বিপুল জনপ্রিয়তা ও স্বীকৃতি লাভ করেছে।
কবির সাহিত্যকর্ম ও কাব্যভাষা
শামসুর রাহমানের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ প্রভৃতি। তিনি গদ্যও লিখেছেন। তাঁর কবিতার ভাষা আধুনিক, চিত্ররূপময়, এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সমৃদ্ধ। শামসুর রাহমান বাংলা কবিতায় নতুন ইমেজ, নতুন চেতনা এবং নতুন শব্দবন্ধের সফল প্রয়োগকারী হিসেবে খ্যাত।
কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
অমন তাকাও যদি কবিতার কবি কে?
এই অনন্য প্রেমের কবিতাটির রচয়িতা বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আধুনিক কবিদের একজন, কবি শামসুর রাহমান।
কবিতাটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় কী?
কবিতাটির মূল প্রতিপাদ্য হল প্রেমের জন্য নিঃশর্ত, সর্বস্ব ত্যাগের এক অতিমানবিক আকাঙ্ক্ষা। কবি প্রিয়ার এক দৃষ্টির জন্য জাগতিক সকল মোহ, ধর্মীয় পুরস্কার ও স্বর্গ-নরকের বিচার পর্যন্ত পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত। এটি ভালোবাসাকে একটি বিপ্লবী, সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কবিতাটির বিশেষ শৈলীগত বৈশিষ্ট্য কী?
কবিতাটি গদ্যকবিতার মুক্ত ছন্দে লেখা, কিন্তু এর মধ্যে গভীর লয় ও অন্তমিল রয়েছে। অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক, উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পের ব্যবহার (যেমন: “স্বেচ্ছায় সূর্যাস্ত”, “নিঃশ্বাসে আন্দোলিত পবিত্র নিশান”) কবিতাকে একটি অতিলৌকিক মাত্রা দান করেছে। ভাষা আধুনিক, তাৎপর্যপূর্ণ ও আবেগে সিক্ত।
‘বেহেস্তী আঙুর’ ও ‘হুরীর লালচ’ বন্ধনী দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
এগুলি ধর্মীয় পরিভাষায় ইসলামিক স্বর্গ (জান্নাত) এর প্রতিশ্রুত সুখ ও ভোগের প্রতীক। কবি বলছেন, প্রিয়াকে দেখার আকাঙ্ক্ষা এতই তীব্র যে ঐশ্বরিকভাবে প্রতিশ্রুত এই সব সুখকেও তিনি সহজেই প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। এটি প্রেমের শক্তিকে ধর্মীয় পুরস্কারের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়।
‘নরকেও ভালোবাসা ম্যানিফেস্টো’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
এই পঙ্ক্তিটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী উচ্চারণগুলির একটি। এর মাধ্যমে কবি বলতে চেয়েছেন যে তাঁর এই ভালোবাসার দর্শন বা ঘোষণাপত্র (ম্যানিফেস্টো) এতটাই উজ্জ্বল, দৃঢ় ও মহান যে তা নরকের অন্ধকারকেও আলোকিত করতে পারে। ভালোবাসাই এখানে চূড়ান্ত সত্য, স্বর্গ বা নরক তার কাছে গৌণ।
শামসুর রাহমানের প্রেমের কবিতার বিশেষত্ব কী?
শামসুর রাহমানের প্রেমের কবিতা শুধুমাত্র হৃদয়াবেগের প্রকাশ নয়; তা দার্শনিক গভীরতা, নাগরিক চেতনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্বারা সমৃদ্ধ। তাঁর প্রেম ব্যক্তিগত হলেও তা সমাজ, সময় ও অস্তিত্বের প্রশ্নের সাথে জড়িত। “অমন তাকাও যদি” কবিতায় তা প্রেমের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের এক মহাকাব্যিক রূপ পেয়েছে।
এই কবিতা শামসুর রাহমানের কোন ধরনের কবিতার উদাহরণ?
এটি শামসুর রাহমানের গভীরভাবে রোমান্টিক ও দার্শনিক ধারার একটি উৎকৃষ্ট প্রেমের কবিতা। এটি কবির সেই সৃষ্টিকর্মের প্রতিনিধিত্ব করে যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি একটি সর্বজনীন ও মহাজাগতিক তাৎপর্য লাভ করে।
ট্যাগস: অমন তাকাও যদি, শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের কবিতা, বাংলা প্রেমের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, নাগরিক কবি, বাংলাদেশের কবিতা, ভালোবাসার কবিতা, বাংলা সাহিত্য, কবিতা সংগ্রহ, বাংলা কাব্য
অমন তাকাও যদি একবিন্দু অনন্তের মতো চোখ মেলে,
আমি বারবার
তোমার দিকেই ছুটে আসবো প্রত্যহ।
যেখানে তোমার দৃষ্টি নেই,
তোমার পায়ের ছাপ পড়ে না যেখানে কেনোদিন
সেখানে কী করে থাকি? তোমাকে দেখার জন্যে আমি
যশের মুকুট
ছুঁড়ে দেবো ধূলায় হেলায়, তাকাবো না ফিরে ভুলে
কস্মিনকালেও আর। মেনে নেবো হার, এই খর
মধ্যাহ্নেই হয়ে যাবো স্বেচ্ছায় সূর্যাস্ত; জেনে রাখো,
তোমাকে দেখার জন্যে বেহেস্তী আঙুর আর কয়েক ডজন
হুরীর লালচ আমি সামলাতে পারবো নিশ্চিত।
তোমার নিদ্রার ঢেউয়ে ঢেউয়ে যাবো বেয়ে ছিপ নৌকো
এবং লাফিয়ে প’ড়ে তোমার স্বপ্নের তটে আবিষ্কারকের
মতো দেবো পুঁতে
আমার নিঃশ্বাসে আন্দোলিত এক পবিত্র নিশান।
কখনো নিদ্রার রাজপথে, কখনো-বা জাগরণে
বাগানে কি পার্কে
সড়কে ট্রাফিক দ্বীপে, বাসে
গোলাপ শ্লোগান হাঁকে একরাশ, উড়ন্ত কপোত
অকস্মাৎ দিগ্বিদিক লুটোয় নিষিদ্ধ
ইস্তাহার হ’য়ে,
পড়ি, ‘নরকেও ভালোবাসা ম্যানিফেস্টো হিরন্ময়।
অমন দাঁড়াও যদি নিরিবিলি পা রেখে চৌকাঠে,
সমর্পণ করতে পারি আমার সমস্ত আয়ুষ্কাল
তোমারই আঁচলে।
যদি পাপ তোমার শরীর হ’য়ে নত নয়, হয় উন্মোচিত,
দ্বিধাহীন তাকে খাবো চুমো গাঢ়, বাঁধবো ব্যাকুল আলিঙ্গনে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শামসুর রাহমান।