কবিতার খাতা
ছেলের বাবা’র চিঠি- আর্যতীর্থ
চারনম্বর কম পেয়েছে বলে আজ ছেলেকে মারলে তুমি।
অথচ ,
একশো থেকে নিরানব্বই-য়ে নামলে যে-সব
মা’য়েরা প্রলয় ডেকে আনে সেই ভিড়ে
তুমি কক্ষনো ছিলে না।
জানি তোমরা মা ব্যাটা দুজনেই খেটেছিলে,
রাত বারোটা পঁয়তিরিশে হঠাৎ ঘুম ভেঙে পরশু দেখেছিলাম,
তখনো পাখি পড়ার মতো বুঝিয়ে চলেছো পাইথন।
সেই জন্যই কী তিরিশে ছাব্বিশে এই ভিসুভিয়াস হওয়া,
ছেলে নয়, বকলমে নম্বর কাটা গেছে তোমারই?
আমাদের শুরু থেকে একটা চুক্তি করা আছে।
ছেলে মেয়ের সামনে ঝগড়া নয়,
মতাম্তরের সব ঝড় ছাদে গিয়ে,
তোমার ফচকে দেওরটি এই নিয়ে টিপ্পনি করতে ছাড়েনি,
চিলেকোঠার চিলতে ঘরটার নামই দিয়েছিলো
‘ঝাড়ন-ঘর’।
তবে ওর জানার কথা নয়,
ছেলে মেয়ে আসবার আগে
ওই ছাদেই চুমু সহযোগে কবিতা পাঠের কথা।
আমার গলায় বীরেন তোমার কণ্ঠে নীরেন,
আমি তারাপদ তো তুমি মল্লিকা,
আকাশের পূর্ণ ইন্দু কতবার শুনেছে তোমার আমার পূর্ণেন্দুর ‘কথোপকথন’।
মনে আছে, তেমনই এক কবিতাঘন মুহূর্তে তুমি
অমলকান্তি পাঠের শেষে একটু থমকে
বলেছিলে ‘ আমাদের বাচ্চাগুলো চাইলে রোদ্দুর হোক,
ক্ষতি কী!’
তারপর অনেক বছর আর ব্যস্ততা পেরিয়ে আমরা এখন মুখ্যত মা বাবা,
কদাচিৎ মাঝরাতে আশ্লেষে ঝড় দরজা ভেঙে আসে।
পড়ানোতে আমি কাঁচা, এবং ফাঁকিবাজিতে অনুপ্রেরণা দিই ,
সেই অভিযোগে নিতান্ত দরকার না হলে
আমায় তোমার সিলেবাসের সাম্রাজ্যে ঢোকার অনুমতি নেই,
এ সংসারে শাসনের সারটি তুমিই,
আমি ছেলে-মেয়ের দুষ্টুমিতে সঙ্গত দেওয়া সঙ।
আমি দূর থেকে দেখি, মুগ্ধ হই,
কীভাবে পেশা সামলিয়ে তুমি দুটো খুদে মানুষকে
তিল তিল করে গড়ে তুলছো,
চ্যাটজিপিটি আর গুগল
রোজ সেই কাজে তোমার খিদমত খাটে।
কিন্তু আজ মাত্র চারটে নম্বরে তোমার
সাত রিখটার কম্পন দেখে একটু ঘাবড়িয়ে গেছি।
চড়টা নেমে আসার পরে ছেলের মুখে যে আহত বিস্ময় ছিলো,
তোমার রাগ সেটা আড়াল করেছে তোমার থেকে।
এভাবে একশোয় একশোর পেছনে ছুটলে
ও যে রোদ্দুর হতে ভুলে যাবে,
খালি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার উকিল আই পি এস-এর স্বপ্ন শিখবে।
এক্ষুণি ব্যাপারটা ঠিক করা প্রয়োজন।
আজ নাহয় পুঁচকেকে একটু সরি বললেই,
তাতে লাভ বই ক্ষতি তো নেই ।
তোমার ব্যাগে চিঠিটা ঢুকিয়ে গেলাম,
জানি না কখন পড়বে।
কত্তদিন পরে লিখলাম ভাবো তো!
আশা করি সন্ধের মধ্যে মায়ে পোয়ে মিলেমিশে যাবে,
ইশশ ,
সেই সন্ধির সময় থাকতে পারলে বড় ভালো হতো।
সিলেবাসের বাইরে ওদের একটা বাউন্ডুলে মন থাক,
ওদের বাবার মতো,
যেখানে নম্বরে কাঁচকলা জোটে।
আর হ্যাঁ যদি সেই সন্ধিটা যায় ঘটে
তবে এখন থেকেই আর্জি জানিয়ে রাখলাম,
আজ মাঝরাতে যেন সেই ঝড়টা ওঠে।
বহুদিন দরজা ভাঙেনি সেই ঝড়ের দাপটে..
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আর্যতীর্থ ।





