কবিতার খাতা
মহান নেতৃবৃন্দ – বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত “চাচা
আপন বাঁচা”-র ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ;
যদিও নিজেকে সে তুলতে চায় সে মাচায়,
ভুলে যায়, যারা গতকাল ছিল মিত্র
এখনো পচছে খাঁচায়…
কিন্তু সে বেপরোয়া ।
“আগে নিজে বাঁচো, তবে আকাশ ছোঁয়া
পাহাড়ে উঠবে ।” বলেছেন নাকি লেনিন :
বেনামে স্তালিন, স্বপ্নে মাও সে তুং :
“জাহান্নামে যে যাবে, তাকে যেতে দিন—
আবার আসবে বদলা নেবার দিন ।
মহান নেতৃবৃন্দ! যে মরে মরুক, আপনারা
সুখে বাঁচুন ।।”
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
কবিতার কথা –
কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহান নেতৃবৃন্দ’ কবিতাটি রাজনৈতিক ভণ্ডামি, সুবিধাবাদ, আদর্শের বাণিজ্যিকীকরণ এবং তথাকথিত গণনেতাদের চরম আত্মকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে এক তীব্র শ্লেষাত্মক ও ক্ষুরধার রাজনৈতিক চপেটাঘাত। কবি এখানে তাঁর স্বভাবসুলভ ধারালো লেখনীর মাধ্যমে সেই সমস্ত সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতাদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন, যারা মুখে বড় বড় বৈপ্লবিক আদর্শ ও জনগণের অধিকারের বুলি আওড়ালেও অন্তরে কেবল নিজেদের আখের গোছানো এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার নোংরা খেলায় মত্ত থাকে। সাধারণ মানুষের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে কীভাবে এই নেতারা নিজেদের ক্ষমতার মাচায় চড়েন, কবিতাটিতে মূলত সেই নির্মম ও রূঢ় বাস্তবতাকে তুলে ধরা হয়েছে।
কবিতার প্রারম্ভেই কবি তথাকথিত এক একজন ‘মহান নেতা’র আসল চারিত্রিক রূপটি অত্যন্ত নগ্নভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। কবি বলছেন, এই সমস্ত নেতাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো অস্তিত্বটাই আসলে “চাচা আপন বাঁচা” নামক চরম স্বার্থপরতার এক একটি ধ্রুপদী চলচ্চিত্র বা জীবন্ত উদাহরণ। এরা মুখে সাম্য ও বিপ্লবের কথা বলে নিজেদের সাধারণ মানুষের চেয়ে উঁচুতে, এক অনন্য সম্মানের ‘মাচায়’ তুলতে চায়। কিন্তু তারা অত্যন্ত সুবিধাজনকভাবে ভুলে যায় যে, যাদের রক্ত, শ্রম আর ত্যাগের বিনিময়ে তারা আজ এই ক্ষমতার চেয়ারে বসেছে, সেই সাধারণ কর্মী বা গতকালের পরম মিত্ররা এখনো অন্ধ খাঁচায় বন্দি হয়ে ধুঁকে ধুঁকে পচছে। কিন্তু এই সুযোগসন্ধানী নেতারা ক্ষমতার মোহে এতটাই অন্ধ ও বেপরোয়া যে, অতীতের ত্যাগী সহযোদ্ধাদের এই করুণ দশা তাদের বিবেককে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করে না।
কবিতার মধ্যভাগে কবি এক চমৎকার ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক পরিহাসের সৃষ্টি করেছেন। এই সুবিধাবাদী নেতারা নিজেদের কাপুরুষতা ও স্বার্থপরতাকে ঢাকতে বিশ্ববিপ্লবের মহানায়কদের বাণীকে নিজেদের মতো করে বিকৃত করে। তারা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে প্রচার করে—আগে নিজে বাঁচো, তারপর না হয় আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ে উঠবে। আর এই চরম সুবিধাবাদী তত্ত্বটিকে জায়েজ করতে তারা অবলীলায় কখনো লেনিন, বেনামে স্তালিন, কিংবা স্বপ্নে মাও সেতুং-এর মতো মহান সাম্যবাদী নেতাদের নাম জড়িয়ে দেয়। অথচ এই মহান বিপ্লবীরা সারাজীবন আত্মত্যাগ ও শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলে গেছেন। নেতারা নিজেদের স্বার্থে এই আদর্শগুলোকে স্রেফ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং চরম নির্মমতায় ঘোষণা করে যে, “জাহান্নামে যে যাবে, তাকে যেতে দিন—আবার আসবে বদলা নেবার দিন।” অর্থাৎ, ক্ষমতার হাতবদলের এই খেলায় সাধারণ মানুষ মরল নাকি বাঁচল, তাতে এই নেতাদের কিচ্ছু আসে যায় না।
শেষ চরণে এসে কবিতাটি এক চরম ক্ষোভ, ঘৃণা ও তীব্র বিদ্রূপের রূপ ধারণ করে পূর্ণতা পায়। কবি সমাজ ও রাষ্ট্রের এই ভণ্ড শাসকদের ‘মহান নেতৃবৃন্দ’ বলে সম্বোধন করে এক চরম উপহাসের সুরে বলেছেন—যে মরে মরুক, দেশের সাধারণ মানুষ না খেয়ে কিংবা শোষণের শিকার হয়ে ধ্বংস হয়ে যাক, তাতে আপনাদের কিচ্ছু ভাবার দরকার নেই; আপনারা শুধু নিজেদের ক্ষমতা আর বিলাসিতা নিয়ে সুখে শান্তিতে বেঁচে থাকুন। এই চরণের ভেতরের তীব্র হাহাকার ও ক্রোধ মূলত শোষিত জনতার ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই প্রতিধ্বনি।
সামগ্রিকভাবে, ‘মহান নেতৃবৃন্দ’ কবিতাটি কোনো ধরণের জটিল পঙ্ক্তি বা আলাদা স্তবক উদ্ধৃত না করে এক গতিময়, ধারালো ও সাবলীল প্রবাহে বুর্জোয়া ও ভণ্ড রাজনীতির আসল রূপকে ফুটিয়ে তোলে। কবি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, যে রাজনীতিতে মানুষের চেয়ে নেতার ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তা কখনো জনগণের মুক্তি আনতে পারে না। আদর্শের বুলি আউড়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা এই ‘মহান’ নেতাদের আসল ভণ্ডামি ধরে ফেলে প্রকৃত মানবিক ও অধিকার সচেতন সমাজ গড়ে তোলার এক পরোক্ষ ও শক্তিশালী আহ্বান এই কবিতার প্রতিটি ছত্রে মিশে আছে।






