কবিতার খাতা
সময় – অরুণ মিত্র।
সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল।
কখনও তাকে ইন্দ্রধনুর রঙে রাঙানো হল,
কখনও হাসিতে উছলে তোলা হল
বা চাপা কান্নায় কাঁপানো হল,
কখনও-বা তাকে হৃদয়ে হৃদয়ে
বাজানো হল।
সৌরভ বিষাদের আভা কৌতুক
উজ্জ্বল পথ ধ্যানের সুষমা ধূপছায়া,
কত রকম।
চোখ নাক কান খুলেই রাখো,
বোধহয় দৃ্শ্যের চূড়ান্তে আসা গেসে।
এবার সময়ের গলায় দাঁত বসেছে,
লোভের দাঁত।
দ্যাখো এবার কী হয়!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। অরুণ মিত্র।
সময় – অরুণ মিত্র | সময় কবিতা | অরুণ মিত্রের কবিতা | বাংলা কবিতা
সময়: অরুণ মিত্রের সময়, জীবন ও দর্শনের অসাধারণ কাব্যভাষা
অরুণ মিত্রের “সময়” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা সময়, জীবন, দর্শন ও অস্তিত্বের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল। / কখনও তাকে ইন্দ্রধনুর রঙে রাঙানো হল, / কখনও হাসিতে উছলে তোলা হল / বা চাপা কান্নায় কাঁপানো হল” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে সময়ের সাথে মানুষের নানা সম্পর্ক, নানা খেলা। অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় সময়, জীবন, দর্শন ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে। “সময়” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা সময়ের সাথে মানুষের সম্পর্ক ও সময়ের চূড়ান্ত রূপকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
অরুণ মিত্র: সময় ও জীবনের কবি
অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯০৯ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। শান্তিনিকেতনে কিছুদিন শিক্ষালাভ করেন এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম পৃথিবী’ (১৯৫২) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অন্ধকার থেকে’, ‘একটি ঘাসের নাম’, ‘শুধু রাতের শব্দ’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় সময়, জীবন, দর্শন, প্রকৃতি ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ২০০০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। “সময়” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা সময়ের সাথে মানুষের সম্পর্ক ও সময়ের চূড়ান্ত রূপকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
সময় কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“সময়” শিরোনামটি অত্যন্ত সরল অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। সময় — জীবন, ইতিহাস, পরিবর্তন, সব কিছু। কবি এই শিরোনামে সময়কে কেন্দ্র করে তাঁর দর্শন উপস্থাপন করেছেন। সময়কে নিয়ে নানা খেলা, নানা রূপ, শেষ পর্যন্ত সময়ের চূড়ান্ত রূপ — লোভের দাঁত।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল। / কখনও তাকে ইন্দ্রধনুর রঙে রাঙানো হল, / কখনও হাসিতে উছলে তোলা হল / বা চাপা কান্নায় কাঁপানো হল, / কখনও-বা তাকে হৃদয়ে হৃদয়ে / বাজানো হল।” প্রথম স্তবকে কবি সময়ের সাথে মানুষের নানা সম্পর্কের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল। কখনও তাকে ইন্দ্রধনুর রঙে রাঙানো হল। কখনও হাসিতে উছলে তোলা হল বা চাপা কান্নায় কাঁপানো হল। কখনও-বা তাকে হৃদয়ে হৃদয়ে বাজানো হল।
‘সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মানুষ সময়কে নিয়ে নানা খেলা করে। সময়কে সুন্দর করে সাজায়, সময়কে আনন্দে ভরিয়ে তোলে, সময়কে কান্নায় কাঁপায়, সময়কে প্রেমে বাজায়। এই সবই সময়ের সাথে মানুষের সম্পর্কের নানা রূপ।
‘ইন্দ্রধনুর রঙে রাঙানো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ইন্দ্রধনু — রংধনু, সাত রঙের সমাহার। সময়কে রংধনুর রঙে রাঙানো মানে সময়কে সুন্দর করে তোলা, আনন্দময় করে তোলা, স্মৃতিময় করে তোলা।
‘হাসিতে উছলে তোলা’ ও ‘চাপা কান্নায় কাঁপানো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সময়কে হাসিতে ভরিয়ে তোলা — অর্থাৎ সময়কে আনন্দের করে কাটানো। সময়কে চাপা কান্নায় কাঁপানো — অর্থাৎ সময়কে বেদনার করে তোলা। মানুষ সময়কে নিজের অনুভূতি দিয়ে রাঙায়।
‘হৃদয়ে হৃদয়ে বাজানো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সময়কে হৃদয়ে হৃদয়ে বাজানো — অর্থাৎ প্রেমের সময়, প্রিয়জনের সাথে কাটানো সময়। সেই সময় হৃদয়ে হৃদয়ে বাজে, স্মৃতি হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“সৌরভ বিষাদের আভা কৌতুক / উজ্জ্বল পথ ধ্যানের সুষমা ধূপছায়া, / কত রকম।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি সময়ের বিভিন্ন রূপের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — সৌরভ, বিষাদের আভা, কৌতুক, উজ্জ্বল পথ, ধ্যানের সুষমা, ধূপছায়া — কত রকম।
সৌরভ, বিষাদের আভা, কৌতুকের তাৎপর্য
সময়ের রূপ কত রকম — কখনও সৌরভ (সুগন্ধ, আনন্দ), কখনও বিষাদের আভা (দুঃখের ছায়া), কখনও কৌতুক (হাস্যরস, মজা)। সময় এক রকম নয়, বহুরকম।
উজ্জ্বল পথ, ধ্যানের সুষমা, ধূপছায়ার তাৎপর্য
উজ্জ্বল পথ — জীবনের আলোকিত পথ। ধ্যানের সুষমা — ধ্যানের সৌন্দর্য, আধ্যাত্মিকতার সুষমা। ধূপছায়া — ধূপের ছায়া, সম্ভবত মন্দিরের গন্ধ, পূজার পরিবেশ। সময়ের রূপ এই সব কিছুকে ধারণ করে।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“চোখ নাক কান খুলেই রাখো, / বোধহয় দৃ্শ্যের চূড়ান্তে আসা গেসে। / এবার সময়ের গলায় দাঁত বসেছে, / লোভের দাঁত। / দ্যাখো এবার কী হয়!” তৃতীয় স্তবকে কবি সময়ের চূড়ান্ত রূপের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — চোখ, নাক, কান খুলেই রাখো। বোধহয় দৃশ্যের চূড়ান্তে আসা গেছে। এবার সময়ের গলায় দাঁত বসেছে — লোভের দাঁত। দ্যাখো এবার কী হয়!
‘চোখ নাক কান খুলেই রাখো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ইন্দ্রিয়গুলো খুলে রাখো — সব কিছু দেখো, শোনো, অনুভব করো। অর্থাৎ সচেতন থাকো, জাগ্রত থাকো। কারণ সময়ের চূড়ান্ত রূপ দেখার সময় এসেছে।
‘বোধহয় দৃ্শ্যের চূড়ান্তে আসা গেসে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সম্ভবত জীবনের শেষ পর্যায়, দৃশ্যের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছি। সব কিছু দেখার পর এখন শেষ দৃশ্য দেখার পালা।
‘এবার সময়ের গলায় দাঁত বসেছে, / লোভের দাঁত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। সময়ের গলায় দাঁত বসেছে — সময় এখন ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। সেই দাঁত লোভের দাঁত — সময় এখন লোভের সাথে গ্রাস করবে, ধ্বংস করবে। এটি মৃত্যুর প্রতীক, ধ্বংসের প্রতীক।
‘দ্যাখো এবার কী হয়!’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
এটি একটি চ্যালেঞ্জ, একটি সতর্কবার্তা। এখন দেখো কী হয় — সময় কী করে, কী পরিণতি হয়। কবি পাঠককে সতর্ক করেছেন, প্রস্তুত থাকতে বলেছেন।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“সময়” কবিতাটি সময়ের সাথে মানুষের সম্পর্ক ও সময়ের চূড়ান্ত রূপের এক অসাধারণ চিত্র। কবি প্রথমে বলেছেন — সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেছে। মানুষ সময়কে রঙিন করেছে, হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে, হৃদয়ে বাজিয়েছে। সময়ের রূপ নানা — সৌরভ, বিষাদ, কৌতুক, উজ্জ্বল পথ, ধ্যানের সুষমা, ধূপছায়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব কিছু শেষ হয়। এখন সময়ের গলায় দাঁত বসেছে — লোভের দাঁত। এখন দেখো কী হয়। এই শেষ পঙ্ক্তিটি একটি সতর্কবার্তা, একটি চ্যালেঞ্জ। সময় সব কিছু গ্রাস করবে, ধ্বংস করবে। কিন্তু তবুও আমরা চোখ-কান খুলে রাখি, দেখার জন্য প্রস্তুত থাকি।
সময় কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: সময় কবিতার লেখক কে?
সময় কবিতার লেখক অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০)। তিনি বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম পৃথিবী’ (১৯৫২) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় সময়, জীবন, দর্শন ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে।
প্রশ্ন ২: সময় কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
সময় কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো সময়ের সাথে মানুষের সম্পর্ক ও সময়ের চূড়ান্ত রূপ। কবি দেখিয়েছেন — মানুষ সময়কে নানা রূপে সাজায়, হাসায়, কাঁদায়, হৃদয়ে বাজায়। সময়ের রূপ নানা — সৌরভ, বিষাদ, কৌতুক, উজ্জ্বল পথ, ধ্যানের সুষমা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সময়ের গলায় লোভের দাঁত বসে, সময় সব গ্রাস করে।
প্রশ্ন ৩: ‘সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সময়কে নিয়ে অনেক মজা দেখা গেল’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি সময়ের সাথে মানুষের নানা খেলার কথা বলেছেন। মানুষ সময়কে নানা রূপে সাজায়, সময়কে নিজের অনুভূতি দিয়ে রাঙায়। এটি সময়ের সাথে মানুষের সম্পর্কের বহুরূপী চিত্র।
প্রশ্ন ৪: ‘কখনও-বা তাকে হৃদয়ে হৃদয়ে / বাজানো হল’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘কখনও-বা তাকে হৃদয়ে হৃদয়ে / বাজানো হল’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি প্রেমের সময়ের কথা বলেছেন। প্রিয়জনের সাথে কাটানো সময় হৃদয়ে হৃদয়ে বাজে, স্মৃতি হয়ে থাকে। সেই সময় সঙ্গীতের মতো, সুরের মতো।
প্রশ্ন ৫: ‘এবার সময়ের গলায় দাঁত বসেছে, / লোভের দাঁত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘এবার সময়ের গলায় দাঁত বসেছে, / লোভের দাঁত’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। সময়ের গলায় দাঁত বসেছে — সময় এখন ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। সেই দাঁত লোভের দাঁত — সময় এখন লোভের সাথে গ্রাস করবে, ধ্বংস করবে। এটি মৃত্যুর প্রতীক, ধ্বংসের প্রতীক।
প্রশ্ন ৬: ‘দ্যাখো এবার কী হয়!’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
‘দ্যাখো এবার কী হয়!’ — এই শেষ পঙ্ক্তিটি একটি চ্যালেঞ্জ, একটি সতর্কবার্তা। এখন দেখো কী হয় — সময় কী করে, কী পরিণতি হয়। কবি পাঠককে সতর্ক করেছেন, প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। এটি সময়ের চূড়ান্ত রূপের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান।
প্রশ্ন ৭: অরুণ মিত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯০৯ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম পৃথিবী’ (১৯৫২) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় সময়, জীবন, দর্শন, প্রকৃতি ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে।
ট্যাগস: সময়, অরুণ মিত্র, অরুণ মিত্রের কবিতা, সময় কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, সময়ের কবিতা, দর্শনের কবিতা





