কবিতার শুরুতেই এক যুদ্ধবিধ্বস্ত বিমানবন্দরের চিত্রকল্প ফুটে উঠেছে। প্রিয়জনহীন শহরটি কবির চোখে ‘ভাঙা-পোড়ো এয়ারপোর্টের’ মতো নির্জন এবং জং ধরা লোহালক্করে ঠাসা। কবির অনুপস্থিতিতে প্রেমিকার জীবন কোনো রোমান্টিক নিঃসঙ্গতা নয়, বরং তা ‘ভৌতিক নির্জনতা’ এবং ‘তছনছ তারের জটিলতায়’ বন্দি। রানওয়ের ওপর জেগে থাকা জ্যোৎস্না এখানে মায়াবী নয়, বরং ‘গা ছম-ছম করা’। কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর অস্তিত্বই ছিল এই শহর বা এই জীবনের সুরক্ষার কবচ; তিনি নেই বলেই চারপাশের পরিচিত সব দৃশ্য এখন ধ্বংসস্তূপ ও প্রেত হাসির শব্দে পূর্ণ।
কবিতার দ্বিতীয় অংশে আমরা এক ধরণের সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয়ের ছবি দেখি। কবির অনুপস্থিতিতে সেই শহরে প্রতিদিনের ভোর শুরু হয় ‘দুর্ঘটনা’ দিয়ে। আত্মহত্যা, খুন এবং নিদারুণ সব দুঃসংবাদ সেখানে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ হলো ‘বিষণ্ণ সন্তান’-এর চিত্রায়ন। যার চশমার গ্লাস বারবার বদলে দিতে হয় এবং যে স্কুলে গিয়ে আর কোনোদিন ফিরে আসে না। এই যে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া এবং প্রতিদিনের জীবনে দুধের বোতলে ‘গুঁড়ো বিষ’ বা ফ্রিজের ভেতরে মরা ইঁদুরের উপস্থিতি—এসবই একটি চরম বিশৃঙ্খলা ও অভিশপ্ত জীবনের ইঙ্গিত দেয়।
কবিতার শেষ দিকে পরাবাস্তবতা তার চরম শিখরে পৌঁছায়। ঘর, বিছানা, সোফা—সবই যেন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। যে ঘর মানুষের আশ্রয়ের জায়গা, সেই ঘরের দরজা খুলে দিলে দেখা যায় ‘হু-হু শীতার্ত প্রান্তর’। বিছানা শুতে দেয় না, শাওয়ার খুললে পানির বদলে ঝরে রক্ত। এই চিত্রকল্পগুলো প্রমাণ করে যে, কবির অনুপস্থিতিতে প্রেমিকার চারপাশের বস্তুগত জগতও তার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। আয়নায় নিজের মুখ দেখতে গেলে সেখানে কেবল ‘বিভৎস চিড়’ ধরা পড়ে, যা আসলে ভেঙে যাওয়া ব্যক্তিত্ব বা অস্তিত্বের সংকটেরই প্রতিফলন।
কবির এই প্রস্থান বা না থাকা একটি শহরকে কীভাবে ‘মৃতশহর’ বানিয়ে দেয়, আবিদ আজাদ তা অত্যন্ত নিপুণভাবে এঁকেছেন। এখানে ভালোবাসা নেই বলেই ট্রাফিক পুলিশ ‘বাজপড়া তালগাছ’-এর মতো দাঁড়িয়ে থাকে এবং লেকের হাঁসগুলো মানুষের চোখ ঠুকরে খায়। প্রকৃতির এই হিংস্রতা আসলে কবির না থাকার ফলে তৈরি হওয়া শূন্যতারই নামান্তর।
পরিশেষে বলা যায়, ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’ কবিতাটি এক বিশাল দীর্ঘশ্বাসের নাম। এটি আমাদের শেখায় যে, নির্দিষ্ট কোনো মানুষের উপস্থিতিতেই আমাদের পৃথিবী ছন্দময় থাকে; তিনি সরে গেলে পরিচিত গণ্ডিটুকুও অচেনা ও আতঙ্কের হয়ে ওঠে।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না – আবিদ আজাদ | আবিদ আজাদের আধুনিক কবিতা | যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর ও প্রেমিকের অনুপস্থিতির ভৌতিক চিত্র | নাগরিক বিষাদ ও মৃত্যুর কবিতা
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না: আবিদ আজাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত নগরীর ভৌতিক চিত্রায়ণ, প্রেমিকের অনুপস্থিতিতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহর ও বিষন্নতার অসাধারণ কাব্য
আবিদ আজাদের “যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না” বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য, ভৌতিক ও নাগরিকবেদনাময় সৃষ্টি। “যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে যুদ্ধ শেষের ভাঙা-পোড়ো একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে প্রেমিকের অনুপস্থিতিতে এক শহরের ধ্বংসাত্মক, ভৌতিক ও মৃত্যুমুখর রূপ; যুদ্ধবিধ্বস্ত এয়ারপোর্ট, মরা শিউলি গাছ, জনশূন্য বুট, আত্মহত্যাকারী যুবক, হারিয়ে যাওয়া সন্তান, বিষমিশ্রিত দুধ, এবং শেষ পর্যন্ত আয়নার ফাটলে হারিয়ে যাওয়া এক নারীর আর্তনাদের এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। আবিদ আজাদ (জন্ম ১৯৭৪) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট আধুনিক কবি। তিনি নাগরিক জীবন, নিঃসঙ্গতা, নগরীর ভৌতিক রূপ, প্রেম ও বিচ্ছেদের জটিল মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখেন। তাঁর কবিতায় বাস্তবের কঠোর চিত্রের সঙ্গে স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের মিশ্রণ ঘটে। “যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি ‘আমি নেই’ শব্দটিকে এক ধ্বংসাত্মক মন্ত্রে পরিণত করেছেন, যেখানে প্রতিটি লাইন যেন এক একটি মৃত্যুচিহ্ন, আর শেষ পর্যন্ত পাঠক বুঝতে পারে — এই শহর বাস্তবেরও নয়, স্বপ্নেরও নয় — এটি এক প্রেমিকের অনুপস্থিতির সৃষ্ট ভৌতিক জগৎ।
আবিদ আজাদ: নাগরিক বিষাদ ও নিঃসঙ্গতার কবি
আবিদ আজাদ ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কবিতার ধারার একজন উল্লেখযোগ্য কবি। তাঁর কবিতায় নাগরিক জীবন, নিঃসঙ্গতা, শহরের ভৌতিক রূপ, প্রেম ও বিচ্ছেদের জটিল মনস্তত্ত্ব, এবং বাস্তবের সঙ্গে স্বপ্নের সংমিশ্রণ গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বাড়ি ফেরার দিন নাই’, ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’, ‘অন্ধকারে একটি সাদা বিড়াল’ ইত্যাদি।
আবিদ আজাদের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিক বিষাদ, শহরের ভৌতিক রূপায়ণ, প্রেমিকের অনুপস্থিতির ধ্বংসাত্মক প্রভাব, মৃত্যুর প্রতীকের ব্যবহার, এবং বাস্তব ও অবাস্তবের মাঝামাঝি এক স্বপ্নিল জগৎ সৃষ্টি। ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি একটি শহরকে এত ভয়ঙ্কর ও মৃত্যুময় করে তুলেছেন যে তা যেন এক দুঃস্বপ্নের রাজ্য।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি এক নেতিবাচক ঘোষণা — ‘আমি নেই’ শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতের অনুপস্থিতিরও ঘোষণা। ‘আমি থাকবো না’ মানে এই শহরে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই শিরোনামটি পুরো কবিতার ওপর এক ধরনের অভিশাপের মতো কাজ করে — যে শহরে ‘আমি’ নেই, সেই শহর ধ্বংসের মুখে, সেই শহরে বেঁচে থাকা এক প্রকার মৃত্যুর সমান।
কবিতাটি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের পটভূমিতে রচিত — হয়তো কোনো বাস্তব যুদ্ধ, হয়তো প্রেমিকের চলে যাওয়ার সৃষ্ট মানসিক যুদ্ধ। কবিতায় বারবার ফিরে আসে যুদ্ধের চিহ্ন — এয়ারপোর্ট, মিলিটারি ভ্যান, উল্টে থাকা ট্রলি, হেলমেট, বুট, ট্রাফিক, ধ্বংসস্তূপ।
কবি শুরুতে বলছেন — যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না, সে শহরে যুদ্ধ শেষের ভাঙা-পোড়ো একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি। তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে স্কার্ট পরা বুড়ি-বার্মিজ মহিলার মতো ভৌতিক নির্জনতা।
তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ ঝুলে থাকবে তছনছ তারের জটিলতা। লতাগুল্মময় ক্রেনের কংকাল, জং পড়া লোহালক্কর আর হিংস্র ঘাসের মধ্যে ধু-ধু করবে তোমার জীবন।
ভয়ার্ত সব মিলিটারি ভ্যান আর উল্টে থাকা ট্রলির পাশে ক্ষত-বিক্ষত একটা চাঁদ ওঠা রানওয়ের মতো তুমি মুখ লুকিয়ে রাখবে গা ছম-ছম করা জ্যোৎস্নায়।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে জনহীন কোন পেট্রোল পাম্পের দেয়াল ঘেঁষে একটা মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকবে তুমি। তোমাকে ঘিরে হা-হা করবে নিদাঘ রাত। দেখবে পর্যুদস্ত একটা হেলমেটের ফাটল দিয়ে দিয়ে মাথা তুলছে একগুচ্ছ সবুজ তৃণ।
শুনবে ধ্বংস্তুপের মধ্যে অর্ধডোবা সূর্যাস্তের মতো আগুনলাগা বিলুপ্তপ্রায় লাউঞ্জ থেকে ভেসে আসছে প্রেত হাসির শব্দ। তোমাকে ঘিরে নামবে এক জোড়া জনশূন্য বুটের স্তব্ধতা।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে প্রতিদিন দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হবে তোমার ভোর। সকাল সাতটা থেকে অনবরত টেলিফোন আসতে থাকবে ‘সান স্ট্রোকে’র সংবাদ।
তোমার পাশের সাততলা জানলা থেকে লাফিয়ে পড়বে কোঁকড়া চুলের যুবক। একদিন গলায় খুর চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়বেন সেই বুড়ো সবুজ রঙের গলাবন্ধ পরে স্টিক হাতে যিনি মর্নিংওয়াকে বেরুতেন রোজ।
একটি কিশোরী তার আব্বার রেজর থেকে লুকিয়ে নেবে ব্লেড। গভীর জ্যোৎস্নাঙ্কিত স্ট্রীটের মাথায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়বে কালো রঙের একটি গাড়ি।
একজন মানুষ শিরিষ গাছের ভিতরে টিপে ধরবে আরেকজন মানুষের গলা। পার্কের ঝরাপাতার উপর সারারাত ধরে শিশিরে ভিজে যাবে মৃত তরুণীর হাঁটুর ভাঁজ।
যে শহরে আমি নাই আমি থাকবো না সে শহরে চরম দুর্বোধ্যতম হয়ে বেড়ে ওঠবে তোমার বিষন্ন সন্তান। বার বার ক’রে বদলাতে হবে তার ঝাপসা চোখের চশমার গ্লাস।
তুমি তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে ভোরের ইস্কুলে। কিন্তু কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আর কোনদিন ফিরে আসবে না নীল হাফ প্যান্ট পরা তোমার ছেলে, আসবে না, আসবে না। তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে ইস্কুল বাড়ির সামনে, রাস্তার ওপারে।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে নিয়মিত দুধের বোতল দিয়ে যাবে গাড়ি, কিন্তু সে দুধে মেশানো থাকবে গুঁড়ো বিষ। তোমার ফ্রিজের ভিতরে মরে পরে থাকবে শাদা ইঁদুর।
তোমার ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় বসে থাকবে একটা তেলাপোকা, তার রঙ হবে মারাত্মক রকম লাল। তোমার ওয়ারড্রোবের ভিতর থেকে হ্যাঙ্গার শুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়বে মধ্য রাতে কাপড়-চোপড়।
তুমি পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে, ছুটে পালাবে, ছুটবে। ছুটতে ছুটতে ছুটতে তুমি নিচতলার জানালার একখন্ড পর্দার মতো আটকে যাবে বারবার।
তুমি উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাবে ঘুমের ভিতর, কিন্তু মৃতশহর শাণিত করে রাখবে তার সমস্ত রাস্তার বালি। তারার ভিতর থেকে সারারাত ধরে খ’সে পড়বে চূন।
হঠাৎ লক্ষ লক্ষ হাতের করতালি বেজে উঠবে আতংকিত মোড়ে মোড়ে। দেখবে শাদা ট্রাফিক দাঁড়িয়ে আছে বাজপড়া তাল গাছের মতো। তার হাত দু’টো ঝুলছে চাঁদহীন মরা ডালের মতো। চোখে লোমহর্ষক দুটো গর্তের ভিতর দিয়ে চলেছে বিষাক্ত পিঁপড়ের বাহিনী। তার মাথার ফাটলে গজিয়েছে একটা বটচারা। তোমার ভয়ার্ত চিৎকারে শুধু সেই মৃত ট্রাফিকের লাল হা-এর ভিতর থেকে উড়ে যাবে একটা বনটিয়া।
যে শহরে আমি থাকবো না সে শহরে লিফট তোমাকে নিয়ে নেমে যাবে পাতালে। তোমাকে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পার্কের ধারের খাদে ছিটকে পড়বে বাস। লেকের হাঁসগুলি গুগলির মতো ঠুকরে খাবে মানুষের চোখ।
আর খুব বিকাল বেলায় তুমি ক্লান্ত হয়ে, ক্লান্ত হয়ে, ক্লান্ত হয়ে ফিরবে ঘরে। কিন্তু তোমার ঘরের নিঃসঙ্গ দরোজা তোমাকে খুলে দিবে হু-হু শীতার্ত প্রান্তর।
তোমার সোফা তোমাকে বসতে দিবে না, পাঠিয়ে দেবে বিছানায়। কিন্তু বিছানা তোমাকে শুতে দেবে না, দাঁড় করিয়ে রাখবে হিমশীতল জানালায়।
তুমি বাথরুমে যাবে, শাওয়ার খুলে দিলে ঝরবে রক্ত। তুমি বেসিনে নুয়ে পড়বে, পানির ঝাপ্টা দিতেই মনে হবে কার গলা যেন পাটিয়ে দিচ্ছে যক্ষার ফুল।
তুমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, দেখবে বিভৎস চিড় ধ’রে আছে আয়নায়। সেই চিড় ধরা আয়নার ভিতরে তারপর ক্রমশঃ হারিয়ে যাবে তোমার আর্তনাদ। আর তোমার মনে হবে, আমি নেই।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: ভাঙা এয়ারপোর্ট ও ভৌতিক নির্জনতা
“যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে যুদ্ধ শেষের / ভাঙা-পোড়ো একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি / তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে স্কার্ট পরা বুড়ি- / বার্মিজ মহিলার মতো ভৌতিক নির্জনতা”
প্রথম স্তবকে কবি শহরের রূপ দিচ্ছেন। যুদ্ধ শেষের ভাঙা-পোড়ো এয়ারপোর্ট — এটি ধ্বংসের প্রতীক। ‘বেঁচে থাকবে তুমি’ — কিন্তু এই বেঁচে থাকা যেন মৃত্যুর মতো। ‘স্কার্ট পরা বুড়ি-বার্মিজ মহিলার মতো ভৌতিক নির্জনতা’ — এক অদ্ভুত, ভৌতিক উপমা। এই নির্জনতা যেন সজীব, যেন দাঁড়িয়ে থাকা এক ভূত।
দ্বিতীয় স্তবক: তারের জটিলতা, ক্রেনের কংকাল ও হিংস্র ঘাস
“তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ ঝুলে থাকবে তছনছ তারের জটিলতা / লতাগুল্মময় ক্রেনের কংকাল, জং পড়া লোহালক্কর আর হিংস্র / ঘাসের মধ্যে ধু-ধু করবে তোমার জীবন”
দ্বিতীয় স্তবকে শহরের ধ্বংসাবশেষের বর্ণনা। ‘তছনছ তারের জটিলতা’ — একসময় যে তারে বিদ্যুৎ বা যোগাযোগ চলত, এখন তা এলোমেলো ঝুলছে। ‘ক্রেনের কংকাল’ — নির্মাণের যন্ত্র এখন কংকাল। ‘হিংস্র ঘাস’ — প্রকৃতি ফিরে পাচ্ছে, কিন্তু তা হিংস্র। ‘ধু-ধু করা জীবন’ — শূন্যতা ও নীরবতা।
তৃতীয় স্তবক: মিলিটারি ভ্যান, উল্টে থাকা ট্রলি ও ক্ষত-বিক্ষত রানওয়ে
“ভয়ার্ত সব মিলিটারী ভ্যান আর উল্টে থাকা ট্রলির পাশে ক্ষত-বিক্ষত / একটা চাঁদ ওঠা রানওয়ের মতো / তুমি মুখ লুকিয়ে রাখবে গা ছম-ছম করা জ্যোৎস্নায়”
তৃতীয় স্তবকে যুদ্ধের চিহ্ন। ‘ভয়ার্ত মিলিটারি ভ্যান’ — সেনাবাহিনীর গাড়ি এখন ভীত। ‘উল্টে থাকা ট্রলি’ — উল্টে যাওয়া মালবাহী গাড়ি। ‘ক্ষত-বিক্ষত চাঁদ ওঠা রানওয়ে’ — রানওয়ে যেন মানুষের মতো ক্ষতবিক্ষত। তুমি মুখ লুকাবে ‘গা ছম-ছম করা জ্যোৎস্নায়’ — চাঁদের আলো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।
চতুর্থ স্তবক: মরা শিউলি গাছ ও জনশূন্য বুটের স্তব্ধতা
“যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে জনহীন কোন / পেট্রোল পাম্পের দেয়াল ঘেঁষে / একটা মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকবে তুমি / তোমাকে ঘিরে হা- হা করবে নিদাঘ রাত / দেখবে পর্যুদস্ত একটা হেলমেটের ফাটল দিয়ে দিয়ে মাথা / তুলছে একগুচ্ছ সবুজ তৃণ / শুনবে ধ্বংস্তুপের মধ্যে অর্ধডোবা সূর্যাস্তের মতো / আগুনলাগা বিলুপ্তপ্রায় লাউঞ্জ থেকে ভেসে আসছে / প্রেত হাসির শব্দ / তোমাকে ঘিরে নামবে এক জোড়া জনশূন্য বুটের স্তব্ধতা”
চতুর্থ স্তবকে আরও ভয়ঙ্কর চিত্র। ‘মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকা’ — বেঁচে থাকা ও মরা এক হয়ে গেছে। ‘হেলমেটের ফাটল দিয়ে সবুজ তৃণ মাথা তুলছে’ — ধ্বংসের ভেতর জীবন, কিন্তু তা ভয়ঙ্কর। ‘প্রেত হাসির শব্দ’ — ভূতের হাসি। ‘জনশূন্য বুটের স্তব্ধতা’ — কোনো সৈনিক নেই, কিন্তু তার বুট থেকে যায় — এক প্রকার উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির মাঝামাঝি অবস্থা।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবক: দুর্ঘটনার ভোর ও মৃত্যুর সংবাদ
“যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে প্রতিদিন / দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হবে তোমার ভোর / সকাল সাতটা থেকে অনবরত টেলিফোন আসতে থাকবে / ‘সান স্ট্রোকে’র সংবাদ / তোমার পাশের সাততলা জানলা থেকে লাফিয়ে পড়বে / কোঁকড়া চুলের যুবক / একদিন গলায় খুর চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়বেন সেই বুড়ো / সবুজ রঙ্গের গলাবন্ধ পরে স্টিক হাতে যিনি মর্নিংওয়াকে / বেরুতেন রোজ / একটি কিশোরী তার আব্বার রেজর থেকে লুকিয়ে নেবে ব্লেড / গভীর জ্যোৎস্নাঙ্কিত স্ট্রীটের মাথায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়বে / কালো রঙ্গের একটি গাড়ি / একজন মানুষ শিরিষ গাছের ভিতরে টিপে ধরবে আরেকজন মানুষের গলা / পার্কের ঝরাপাতার উপর সারারাত ধরে শিশিরে ভিজে যাবে / মৃত তরুণীর হাঁটুর ভাঁজ”
পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবকে মৃত্যুর ধারাবাহিক চিত্র। প্রতিদিন দুর্ঘটনা দিয়ে ভোর শুরু হয়। ‘সান স্ট্রোকে’র সংবাদ’ — রোদে পুড়ে মৃত্যুর খবর। যুবক লাফিয়ে পড়ে জানলা থেকে। বুড়ো গলায় খুর চালাতে চালাতে ঘুমিয়ে পড়ে। কিশোরী ব্লেড নেয়। কালো গাড়ি দাঁড়ায়। একজন আরেকজনের গলা টিপে ধরে। মৃত তরুণীর হাঁটুর ভাঁজ শিশিরে ভিজে যায়। একের পর এক মৃত্যু — যেন শহরটি মৃত্যুর কারখানা।
সপ্তম ও অষ্টম স্তবক: বিষন্ন সন্তান ও ফিরে না আসা ছেলে
“যে শহরে আমি নাই আমি থাকবো না সে শহরে চরম / দুর্বোধ্যতম হয়ে বেড়ে ওঠবে তোমার বিষন্ন সন্তান / বার বার ক’রে বদলাতে হবে তার ঝাপসা চোখের চশমার গ্লাস / তুমি তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে ভোরের ইস্কুলে / কিন্তু কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আর কোনদিন ফিরে আসবে না / নীল হাফ প্যা ন্ট পরা তোমার ছেলে, আসবে না , আসবে না / তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে ইস্কুল বাড়ির সামনে, রাস্তার ওপারে”
সপ্তম ও অষ্টম স্তবকে মাতৃবেদনার চিত্র। সন্তান ‘চরম দুর্বোধ্যতম’ হয়ে বেড়ে ওঠে — তাকে বোঝা যায় না। তার চোখের চশমার গ্লাস বারবার বদলাতে হয় — দৃষ্টি অস্পষ্ট। মা তাকে ইস্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে, কিন্তু ছেলে আর ফিরে আসে না। ‘আসবে না, আসবে না’ — এই পুনরাবৃত্তি এক চরম বেদনার প্রতিধ্বনি। মা দাঁড়িয়ে থাকে ইস্কুল বাড়ির সামনে, রাস্তার ওপারে।
নবম ও দশম স্তবক: বিষমিশ্রিত দুধ, তেলাপোকা ও ওয়ারড্রোবের কাপড়
“যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে নিয়মিত / দুধের বোতল দিয়ে যাবে গাড়ি / কিন্তু সে দুধে মেশানো থাকবে গুঁড়ো বিষ / তোমার ফ্রিজের ভিতরে মরে পরে থাকবে শাদা ইঁদুর / তোমার ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় বসে থাকবে একটা তেলাপোকা / তার রঙ হবে মারাত্মক রকম লাল / তোমার ওয়ারড্রোবের ভিতর থেকে হ্যাঙ্গার শুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়বে মধ্য রাতে কাপড়- / চোপড়”
নবম ও দশম স্তবকে গৃহস্থালির ভয়ঙ্কর রূপ। দুধ আসে, কিন্তু তাতে গুঁড়ো বিষ মেশানো। ফ্রিজে মরে থাকে সাদা ইঁদুর। আয়নায় বসে থাকে লাল তেলাপোকা। ওয়ারড্রোব থেকে কাপড় হ্যাঙ্গারসহ ঝাঁপিয়ে পড়ে মধ্য রাতে। সবকিছু যেন উল্টে যাচ্ছে, বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে।
একাদশ ও দ্বাদশ স্তবক: পালানোর চেষ্টা ও পর্দার মতো আটকে যাওয়া
“তুমি পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে / ছুটে পালাবে / ছুটবে / ছুটতে ছুটতে ছুটতে তুমি নিচতলার জানালার একখন্ড পর্দার / মতো আটকে যাবে বারবার / তুমি উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাবে ঘুমের ভিতর / কিন্তু মৃতশহর শাণিত করে রাখবে তার সমস্ত রাস্তার বালি”
একাদশ ও দ্বাদশ স্তবকে পালানোর চেষ্টা ও ব্যর্থতা। ‘পালাতে চাইবে’ তিনবার পুনরুক্তি — বেদনার তীব্রতা। ছুটে পালাবে, কিন্তু নিচতলার জানালার পর্দার মতো আটকে যাবে বারবার। ঘুমের ভিতরও পালাবে, কিন্তু মৃতশহর সব রাস্তার বালি শাণিত (তীক্ষ্ণ) করে রেখেছে।
ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ স্তবক: মৃত ট্রাফিক ও বনটিয়া উড়ে যাওয়া
“তারার ভিতর থেকে সারারাত ধরে খ’সে পড়বে চূন / হঠাৎ লক্ষ লক্ষ হাতের করতালি বেজে উঠবে আতংকিত মোড়ে মোড়ে / দেখেবে শাদা ট্রাফিক দাঁড়িয়ে আছে বাজপড়া তাল গাছের মতো / তার হাত দু’টো ঝুলছে চাঁদহীন মরা ডালের মতো / চোখে লোমহর্ষক দুটো গর্তের ভিতর দিয়ে চলেছে / বিষাক্ত পিঁপড়ের বাহিনী / তার মাথার ফাটলে গজিয়েচে একটা বটচারা / তোমার ভয়ার্ত চিৎকারে শুধু সেই মৃত ট্রাফিকের লাল / হা-এর ভিতর থেকে উড়ে যাবে একটা বনটিয়া”
ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ স্তবকে মৃত ট্রাফিকের ভয়ঙ্কর চিত্র। তারার ভিতর থেকে চূন খসে পড়ে। লক্ষ লক্ষ করতালি বেজে ওঠে আতঙ্কিত মোড়ে মোড়ে। সাদা ট্রাফিক (ট্রাফিক পুলিশ) দাঁড়িয়ে আছে বাজপড়া তাল গাছের মতো। তার হাত মরা ডালের মতো ঝুলছে। চোখের গর্ত দিয়ে বিষাক্ত পিঁপড়ের বাহিনী চলছে। মাথার ফাটলে গজিয়েছে বটচারা। তুমি চিৎকার করলে, সেই মৃত ট্রাফিকের লাল ‘হা’ (হাত থামানোর সংকেত) থেকে উড়ে যাবে একটা বনটিয়া (এক প্রকার পাখি)।
পঞ্চদশ ও ষোড়শ স্তবক: পাতালে নামা লিফট ও লেকের হাঁসের ঠোকরানো
“যে শহরে আমি থাকবো না সে শহরে / লিফট তোমাকে নিয়ে নেমে যাবে পাতালে / তোমাকে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো / পার্কের ধারের খাদে ছিটকে পড়বে বাস / লেকের হাঁসগুলি গুগলির মতো ঠুকরে খাবে মানুষের চোখ”
পঞ্চদশ ও ষোড়শ স্তবকে আরও ভয়ঙ্কর চিত্র। লিফট নেমে যায় পাতালে। বাস ছিটকে পড়ে খাদে। লেকের হাঁসগুলি ‘গুগলির মতো’ (গুগলি = গলার স্বরভঙ্গি বা কাঁকড়াবিশেষ) মানুষের চোখ ঠুকরে খায়। প্রাণীগুলোও হিংস্র হয়ে উঠেছে।
সপ্তদশ, অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ স্তবক: বাড়ি ফেরা, সোফা ও বিছানার প্রত্যাখ্যান
“আর খুব বিকাল বেলায় তুমি ক্লান্ত হ’য়ে / ক্লান্ত হ’য়ে / ক্লান্ত হ’য়ে / ফিরবে ঘরে / কিন্তু তোমার ঘরের নিঃসঙ্গ দরোজা / তোমাকে খুলে দিবে হু -হু শীতার্ত প্রান্তর / তোমার সোফা তোমাকে বসতে দিবে না / পাঠিয়ে দেবে বিছানায় / কিন্তু বিছানা তোমাকে শুতে দেবেনা / দাঁড় করিয়ে রাখবে হিমশীতল জানালায়”
সপ্তদশ, অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ স্তবকে বাড়ি ফেরার চিত্র, কিন্তু সেই বাড়িও আশ্রয় দেয় না। ‘ক্লান্ত হয়ে’ তিনবার পুনরুক্তি। ঘরের দরোজা খুলে দেয় ‘হু-হু শীতার্ত প্রান্তর’ — বরফের মরুভূমি। সোফা বসতে দেয় না, বিছানা শুতে দেয় না — দাঁড় করিয়ে রাখে হিমশীতল জানালায়। ঘরের আসবাবপত্র যেন শত্রুতে পরিণত হয়েছে।
বিংশ ও একবিংশ স্তবক: বাথরুমে রক্ত ও ড্রেসিং টেবিলের ফাটা আয়না
“তুমি বাথরুমে যাবে, শাওয়ার খুলে দিলে ঝরবে রক্ত / তুমি বেসিনে নুয়ে পড়বে, পানির ঝাপ্টা দিতেই মনে হবে / কার গলা যেন পাটিয়ে দিচ্ছে যক্ষার ফুল / তুমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, / দেখবে বিভৎস চিড় ধ’রে আছে আয়নায়”
বিংশ ও একবিংশ স্তবকে বাথরুম ও আয়নার চিত্র। শাওয়ার খুললে রক্ত ঝরে। বেসিনে পানি দিতেই মনে হয় — কার গলা যেন পাটিয়ে দিচ্ছে যক্ষার ফুল (যক্ষার ফুল মানে গলার প্রদাহের ফোলা)। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় বিভৎস চিড় ধরে আছে।
দ্বাবিংশ স্তবক: আয়নায় হারিয়ে যাওয়া আর্তনাদ ও ‘আমি নেই’ অনুভব
“সেই চিড় ধরা আয়নার ভিতরে তারপর ক্রমশঃ / হারিয়ে যাবে তোমার আর্তনাদ / আর তোমার মনে হবে , আমি নেই ।”
শেষ স্তবকে চূড়ান্ত বিপর্যয়। চিড় ধরা আয়নার ভিতর ক্রমশ হারিয়ে যাবে আর্তনাদ। আর মনে হবে — ‘আমি নেই’। এই ‘আমি নেই’ শুধু প্রেমিকের অনুপস্থিতি নয় — নিজের অস্তিত্বের বিলোপ। কবিতার শুরুতে ‘যে শহরে আমি নেই’ — সেই ‘আমি’ ছিল প্রেমিক। শেষে ‘আমি নেই’ — সেই ‘আমি’ হয়ে ওঠে নিজেই।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি গদ্যছন্দে রচিত, মুক্তছন্দে প্রবাহিত। লাইন দীর্ঘ, অনেক সময় এক লাইনে একাধিক চিত্র। এটি এক ধরনের ‘স্ট্রিম অফ কনশাসনেস’ ধারা — যেখানে এক চিত্র থেকে আরেক চিত্রে অনায়াসে চলে যাওয়া হয়।
প্রতীক ব্যবহার অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক। ‘ভাঙা এয়ারপোর্ট’ — ধ্বংসের প্রতীক। ‘স্কার্ট পরা বুড়ি-বার্মিজ মহিলা’ — ভৌতিক নির্জনতার প্রতীক। ‘ক্রেনের কংকাল’ — নির্মাণের মৃত্যু। ‘হিংস্র ঘাস’ — প্রকৃতির ফিরে আসা, কিন্তু তা হিংস্র। ‘ক্ষত-বিক্ষত রানওয়ে’ — যুদ্ধের ক্ষত। ‘মরা শিউলি গাছ’ — জীবন্মৃত। ‘হেলমেটের ফাটল দিয়ে তৃণ ওঠা’ — ধ্বংসের ভেতর জীবন। ‘প্রেত হাসি’ — মৃত্যুর হাসি। ‘জনশূন্য বুট’ — অনুপস্থিত সৈনিকের উপস্থিতি। ‘সান স্ট্রোক’ — প্রাকৃতিক মৃত্যু। ‘কালো গাড়ি’ — মৃত্যুর দূত। ‘শিরিষ গাছে গলা টিপে ধরা’ — হিংসা। ‘মৃত তরুণীর হাঁটুর ভাঁজে শিশির’ — মৃত্যুর ভেতর সৌন্দর্য। ‘বিষন্ন সন্তান’ — ভবিষ্যতের বিষাদ। ‘ফিরে না আসা ছেলে’ — হারানোর বেদনা। ‘দুধে গুঁড়ো বিষ’ — পবিত্র জিনিসের দূষণ। ‘লাল তেলাপোকা’ — মারণ রঙের পোকা। ‘ওয়ারড্রোবের কাপড় ঝাঁপিয়ে পড়া’ — জড় বস্তুর সজীবতা ও বিদ্রোহ। ‘পর্দার মতো আটকে যাওয়া’ — পালানোর ব্যর্থতা। ‘মৃত ট্রাফিকের লাল হা থেকে বনটিয়া উড়ে যাওয়া’ — শেষ সান্ত্বনা। ‘পাতালে নামা লিফট’ — নরকে যাওয়া। ‘হাঁসের চোখ ঠুকরে খাওয়া’ — হিংস্র প্রকৃতি। ‘সোফা ও বিছানার প্রত্যাখ্যান’ — ঘরের শত্রুতা। ‘শাওয়ারে রক্ত’ — বিশুদ্ধ জিনিসের কলুষতা। ‘চিড় ধরা আয়না’ — বাস্তবতার বিভক্ত। ‘আর্তনাদ হারিয়ে যাওয়া’ — নীরবতা।
পুনরাবৃত্তি শৈলী অত্যন্ত কার্যকর। ‘পালাতে চাইবে’ তিনবার, ‘ছুটবে’ ক্রমাগত, ‘ক্লান্ত হয়ে’ তিনবার, ‘আসবে না’ তিনবার — প্রতিটি পুনরাবৃত্তি আবেগকে তীব্র করে। ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’ — এই পঙ্ক্তিটি বারবার এসে এক অভিশাপের মতো কাজ করে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না” আবিদ আজাদের এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে প্রেমিকের অনুপস্থিতিতে এক শহরের ধ্বংসাত্মক, ভৌতিক ও মৃত্যুময় রূপ এঁকেছেন।
প্রথম থেকে চতুর্থ স্তবক — শহরের ধ্বংসাবশেষ ও ভৌতিক নির্জনতা। পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্তবক — মৃত্যুর ধারাবাহিক ঘটনা। সপ্তম ও অষ্টম স্তবক — সন্তান হারানোর বেদনা। নবম ও দশম স্তবক — গৃহস্থালির বিষাক্ততা। একাদশ ও দ্বাদশ স্তবক — পালানোর ব্যর্থতা। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ স্তবক — মৃত ট্রাফিক ও বনটিয়া। পঞ্চদশ ও ষোড়শ স্তবক — পাতাল ও হাঁসের ঠোকরানো। সপ্তদশ থেকে উনবিংশ স্তবক — ঘরে ফেরা ও আসবাবপত্রের প্রত্যাখ্যান। বিংশ ও একবিংশ স্তবক — বাথরুমের রক্ত ও ফাটা আয়না। দ্বাবিংশ স্তবক — আর্তনাদ হারিয়ে যাওয়া ও ‘আমি নেই’।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — কারো অনুপস্থিতি পুরো শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে; প্রেমিকের ‘আমি নেই’ একটি অভিশাপের মতো কাজ করে; যে শহরে ‘আমি নেই’ সেখানে সবকিছু মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়; সন্তান, বাড়ি, প্রকৃতি, আসবাবপত্র — সবকিছু শত্রুতে পরিণত হয়; পালানো অসম্ভব; এবং শেষ পর্যন্ত নিজের আর্তনাদও হারিয়ে যায়, আর মনে হয় — ‘আমি নেই’।
আবিদ আজাদের কবিতায় নাগরিক বিষাদ, প্রেম ও ধ্বংস
আবিদ আজাদের কবিতায় নাগরিক বিষাদ, প্রেম ও ধ্বংস একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’ কবিতায় প্রেমিকের অনুপস্থিতির ধ্বংসাত্মক শক্তি অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে ভাঙা এয়ারপোর্ট, মরা শিউলি গাছ, জনশূন্য বুট, দুর্ঘটনার ভোর, হারিয়ে যাওয়া সন্তান, বিষমিশ্রিত দুধ, মৃত ট্রাফিক, পাতালে নামা লিফট, এবং শেষ পর্যন্ত ফাটা আয়নায় হারিয়ে যাওয়া আর্তনাদ — সবকিছু মিলে এক ভৌতিক শহর তৈরি করে, যেখানে ‘আমি নেই’ একটি চিরন্তন সত্য হয়ে ওঠে।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাঠ্যক্রমে আবিদ আজাদের ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের আধুনিক কবিতার ধারা, নাগরিক বিষাদ, যুদ্ধের পরবর্তী ধ্বংসচিহ্ন, প্রেম ও বিচ্ছেদের মনস্তত্ত্ব, এবং আবিদ আজাদের স্বতন্ত্র কাব্যভাষা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’ পঙ্ক্তিটির পুনরাবৃত্তি, ‘মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকা’ চিত্রকল্প, ‘আসবে না আসবে না’ বেদনা, ‘পালাতে চাইবে’ পুনরুক্তি, এবং শেষের ‘আমি নেই’ অনুভব — এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের কাব্যবোধ, আধুনিক সংবেদনশীলতা ও ভাষাচেতনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না কবিতাটির রচয়িতা কে?
এই কবিতাটির রচয়িতা আবিদ আজাদ (জন্ম ১৯৭৪)। তিনি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট আধুনিক কবি। তিনি নাগরিক জীবন, নিঃসঙ্গতা, শহরের ভৌতিক রূপ, প্রেম ও বিচ্ছেদের জটিল মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বাড়ি ফেরার দিন নাই’, ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’, ‘অন্ধকারে একটি সাদা বিড়াল’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না’ — এই পঙ্ক্তিটি বারবার পুনরাবৃত্তি হওয়ার তাৎপর্য কী?
এই পঙ্ক্তিটি পুরো কবিতার মন্ত্র বা অভিশাপের মতো কাজ করে। ‘আমি নেই’ মানে শুধু বর্তমানের অনুপস্থিতি নয় — ‘আমি থাকবো না’ মানে ভবিষ্যতেও ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই ঘোষণাটি শহরের ওপর এক ধরনের অভিশাপ ফেলে। বারবার এই পঙ্ক্তিটি এসে পাঠককে মনে করিয়ে দেয় — এই ধ্বংস, এই মৃত্যু, এই বিষাদ সব কিছুর কারণ এই অনুপস্থিতি।
প্রশ্ন ৩: ‘মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকবে তুমি’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
শিউলি গাছ ফুল ফোটার জন্য পরিচিত। কিন্তু ‘মরা শিউলি গাছ’ মানে এমন একটি গাছ যা ফুল দেয় না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। ‘মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকা’ — এটি এক প্রকার জীবন্মৃত অবস্থা। তুমি বেঁচে আছ, কিন্তু তোমার বাঁচার কোনো অর্থ নেই, তুমি ফুল ফোটাতে পারো না — ঠিক মরা শিউলি গাছের মতো।
প্রশ্ন ৪: ‘তোমার ছেলে আর কোনদিন ফিরে আসবে না’ — সন্তান হারানোর এই দৃশ্যটি কবিতায় কী ভূমিকা রাখে?
এটি কবিতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যগুলোর একটি। মা সন্তানকে ইস্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসেন, কিন্তু সন্তান আর ফিরে আসে না। ‘নীল হাফ প্যান্ট পরা তোমার ছেলে’ — এই সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দৃশ্যটিকে আরও বাস্তব ও বেদনাদায়ক করে তোলে। ‘আসবে না, আসবে না’ — পুনরাবৃত্তি মায়ের অসহায়ত্ব ও বারবার আশা ভাঙার প্রতিধ্বনি। এই দৃশ্যটি শহরের ধ্বংসের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক মাত্রা দেখায়।
প্রশ্ন ৫: ‘দুধে মেশানো থাকবে গুঁড়ো বিষ’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
দুধ পবিত্র, নির্মল ও পুষ্টিকর খাদ্যের প্রতীক। কিন্তু এই শহরে দুধেও বিষ মেশানো থাকে। অর্থাৎ পবিত্র ও নির্মল জিনিসগুলিও দূষিত হয়ে গেছে। কোনো কিছুই নিরাপদ নয়। ফ্রিজে মরে থাকে সাদা ইঁদুর — আবার সাদা রঙ পবিত্রতার প্রতীক, কিন্তু তা মৃত্যুর সাথে মিশে গেছে।
প্রশ্ন ৬: ‘পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে’ — কেন তিনবার পুনরুক্তি?
তিনবার পুনরুক্তি পালানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে নির্দেশ করে। সে শুধু একবার পালাতে চায় না, বারবার চায়, তীব্রভাবে চায়। কিন্তু পরের লাইনেই দেখা যায় — সে ছুটে পালালেও নিচতলার জানালার পর্দার মতো আটকে যায় বারবার। এই বৈপরীত্য এক চরম অসহায়ত্ব ও বন্দিত্বের অনুভূতি তৈরি করে।
প্রশ্ন ৭: ‘লেকের হাঁসগুলি গুগলির মতো ঠুকরে খাবে মানুষের চোখ’ — লাইনটির ভয়াবহতা কোথায়?
হাঁস সাধারণত শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ পাখি। কিন্তু এখানে হাঁস ‘গুগলির মতো’ (গুগলি = এক প্রকার কাঁকড়া বা গলার স্বরভঙ্গি) মানুষের চোখ ঠুকরে খায়। অর্থাৎ প্রকৃতিও হিংস্র ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। শান্তিপ্রিয় প্রাণী এখন মাংসাশী ও নরখাদকে পরিণত হয়েছে। এটি শহরের অস্বাভাবিকতার চরম প্রকাশ।
প্রশ্ন ৮: ‘সোফা তোমাকে বসতে দিবে না, বিছানা তোমাকে শুতে দেবে না’ — ঘরের আসবাবপত্র কেন শত্রুতে পরিণত হলো?
সোফা ও বিছানা সাধারণত আরাম ও বিশ্রামের প্রতীক। কিন্তু এই শহরে সোফা বসতে দেয় না, বিছানা শুতে দেয় না। আসবাবপত্র যেন শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এটি শহরের এক চরম বিপর্যয়ের চিহ্ন — সবকিছু উল্টে গেছে, আরামের জিনিস যন্ত্রণা দেয়, বিশ্রামের জিনিস দাঁড় করিয়ে রাখে হিমশীতল জানালায়।
প্রশ্ন ৯: ‘শাওয়ার খুলে দিলে ঝরবে রক্ত’ — লাইনটির তাৎপর্য কী?
শাওয়ারে সাধারণত পানি ঝরে। কিন্তু এখানে শাওয়ার খুলে দিলে ঝরবে রক্ত। এটি এক ভয়ঙ্কর চিত্রকল্প। পানি — যা জীবন ও পবিত্রতার প্রতীক — তা রক্তে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ জীবনদায়ী উপাদানও এখন মৃত্যুদায়ী।
প্রশ্ন ১০: শেষ লাইনে ‘আমি নেই’ — কে নেই এবং এর তাৎপর্য কী?
শেষ লাইনে ‘আমি নেই’ বলতে বোঝায় — কবিতার শুরুতে ‘আমি’ ছিল প্রেমিক, যে শহরে নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ‘আমি’ হয়ে ওঠে নারী নিজেই। তার আর্তনাদ আয়নায় হারিয়ে যায়, এবং তার মনে হয় — ‘আমি নেই’। অর্থাৎ প্রেমিকের অনুপস্থিতি এত গভীর যে সে নিজের অস্তিত্বও হারিয়ে ফেলে। এটি চূড়ান্ত বিপর্যয় — নিজের ‘আমি’ বিলুপ্ত হওয়া।
প্রশ্ন ১১: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — কারো অনুপস্থিতি পুরো শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে; প্রেমিকের ‘আমি নেই’ একটি অভিশাপের মতো কাজ করে; যেখানে প্রিয়জন নেই, সেখানে সবকিছু মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়; সন্তান, বাড়ি, প্রকৃতি, আসবাবপত্র — সবকিছু শত্রুতে পরিণত হয়; পালানো অসম্ভব; এবং শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বও হারিয়ে যায়। এই কবিতাটি আজকের দিনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক — যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, নাগরিক নিঃসঙ্গতা, মানসিক অবসাদ, এবং অস্তিত্বের সংকট — সবকিছুই সময়োপযোগী ও চিরন্তন বিষয়।
ট্যাগস: যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না, আবিদ আজাদ, আবিদ আজাদের আধুনিক কবিতা, নাগরিক বিষাদ, যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর, প্রেমিকের অনুপস্থিতি, ভৌতিক নির্জনতা, বাংলা আধুনিক কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: আবিদ আজাদ | কবিতার প্রথম লাইন: “যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না সে শহরে যুদ্ধ শেষের ভাঙা-পোড়ো একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি” | প্রেমিকের অনুপস্থিতিতে ধ্বংস হওয়া শহর ও নাগরিক বিষাদের অমর কবিতা বিশ্লেষণ | আবিদ আজাদের আধুনিক কাব্যধারার অসাধারণ নিদর্শন