কবিতার খাতা
- 37 mins
সত্যবদ্ধ অভিমান – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ
আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি ?
শেষ বিকেলের সেই ঝুল বারান্দায়
তার মুখে পড়েছিল দুর্দান্ত সাহসী এক আলো
যেন এক টেলিগ্রাম, মুহূর্তে উন্মুক্ত করে
নারীর সুষমা
চোখে ও ভুরুতে মেশা হাসি, নাকি অভ্রবিন্দু ?
তখন সে যুবতীকে খুকি বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়–
আমি ডান হাত তুলি, পুরুষ পাঞ্জার দিকে
মনে মনে বলি,
যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো–
ছুঁয়ে দিই নীরার চিবুক
এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ
আমি কি এ হাতে আর কোনোদিন
পাপ করতে পারি ?
এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি–
এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায় ?
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে পড়ে ভীষণ জরুরী
কথাটাই বলা হয়নি
লঘু মরালীর মতো নারীটিকে নিয়ে যাবে বিদেশী বাতাস
আকস্মিক ভূমিকম্পে ভেঙ্গে যাবে সবগুলো সিঁড়ি
থমকে দাঁড়িয়ে আমি নীরার চোখের দিকে….
ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার,যেন মায়াপাশ
সত্যবদ্ধ অভিমান–চোখ জ্বালা করে ওঠে,
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে
এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি–
এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায় ?
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
সত্যবদ্ধ অভিমান – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা | বাংলা প্রেমের কবিতা
সত্যবদ্ধ অভিমান: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভালোবাসার এক অনন্য উচ্চারণ
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “সত্যবদ্ধ অভিমান” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অমর সৃষ্টি, যা ভালোবাসার পবিত্রতা, অঙ্গীকার ও অভিমানের এক অসাধারণ কাব্যিক রূপায়ণ। “এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?” — এই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে কবি ভালোবাসার এক উচ্চমার্গীয় ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে প্রিয়ার স্পর্শ একটি হাতকে পবিত্র করে তোলে, পাপ থেকে দূরে রাখে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২) বাংলা সাহিত্যের একজন কিংবদন্তি কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও সম্পাদক, যিনি ‘নীললোহিত’, ‘সনাতন পাঠক’, ‘নীল উপাধ্যায়’ প্রভৃতি ছদ্মনামেও লিখতেন। তার কবিতায় প্রেম, বিরহ, নিঃসঙ্গতা, জীবনদর্শন ও নাগরিক চেতনার এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে। “সত্যবদ্ধ অভিমান” তার একটি শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা, যেখানে তিনি নীরা নামক এক নারীর প্রতি ভালোবাসার মধ্য দিয়ে ভালোবাসার চিরন্তন সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২) বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, শিশুসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনী, আত্মজৈবনিক রচনা — সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি ‘নীললোহিত’, ‘সনাতন পাঠক’, ‘নীল উপাধ্যায়’ প্রভৃতি ছদ্মনামে লিখতেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ (১৯৫৮) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’, ‘হঠাৎ নীরার জন্য’, ‘পঞ্চাশটি কবিতা’, ‘সুনীলের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রভৃতি। তার কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো সহজ-সরল ভাষায় গভীর জীবনবোধ ও দার্শনিক চিন্তার প্রকাশ। তিনি ১৯৭২ সালে ‘নীল নির্জন’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। “সত্যবদ্ধ অভিমান” তার একটি বহুপঠিত প্রেমের কবিতা, যা ভালোবাসার পবিত্রতা ও অঙ্গীকারের এক অসাধারণ দলিল।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতার মূল সুর ও বিষয়বস্তু
“সত্যবদ্ধ অভিমান” কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো ভালোবাসার পবিত্রতা, অঙ্গীকার ও অভিমানের গভীর অনুভূতি। কবিতাটি শুরু হয় এক পবিত্র স্পর্শের স্মৃতি দিয়ে — “এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?” কবি জানতে চান, যে হাত নীরার মুখ ছুঁয়েছে, সেই হাতে কি আর পাপ করা সম্ভব? ভালোবাসা সেই হাতকে পবিত্র করে তুলেছে। তারপর তিনি স্মৃতিচারণ করেন — শেষ বিকেলের ঝুল বারান্দায়, নীরার মুখে পড়েছিল দুর্দান্ত সাহসী এক আলো, যেন এক টেলিগ্রাম, মুহূর্তে উন্মুক্ত করে নারীর সুষমা। সেই মুহূর্তে তিনি যুবতী নীরাকে ‘খুকি’ বলে ডাকতে চান। তিনি ডান হাত তুলে পুরুষ পাঞ্জার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলেন — “যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো”। তারপর ছুঁয়ে দেন নীরার চিবুক। দ্বিতীয় স্তবকে তিনি বলেন — “এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি– এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?” যে ওষ্ঠ একবার সত্যিকারের ভালোবাসার কথা বলেছে, সেই ওষ্ঠে আর মিথ্যে মানায় না। তারপর তিনি বলেন — সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে পড়ে ভীষণ জরুরী কথাটাই বলা হয়নি। নীরাকে নিয়ে যাবে বিদেশী বাতাস, লঘু মরালীর মতো। আকস্মিক ভূমিকম্পে ভেঙ্গে যাবে সবগুলো সিঁড়ি। থমকে দাঁড়িয়ে তিনি নীরার চোখের দিকে তাকান। ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ, সত্যবদ্ধ অভিমান — চোখ জ্বালা করে ওঠে, সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। শেষে আবার সেই প্রশ্ন — “এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি– এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?”
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক বিশ্লেষণ
“সত্যবদ্ধ অভিমান” কবিতাটির ভাষা সহজ-সরল অথচ গভীর তাৎপর্যময়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার অনন্য শৈলীতে প্রেমের অনুভূতিকে এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কবিতায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প ও প্রতীকগুলো: ‘হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ’ — প্রেমের প্রথম স্পর্শ, পবিত্রতার প্রতীক; ‘পাপ’ — ভালোবাসার পবিত্রতা ও তার নিষিদ্ধতার দ্বন্দ্ব; ‘শেষ বিকেলের ঝুল বারান্দা’ — প্রেমের স্মৃতির পটভূমি, নৈকট্যের স্থান; ‘দুর্দান্ত সাহসী এক আলো’ — নীরার মুখের অসাধারণ সৌন্দর্য, যা টেলিগ্রামের মতো মুহূর্তে নারীর সুষমা উন্মুক্ত করে; ‘টেলিগ্রাম’ — তাৎক্ষণিক বার্তা, দ্রুত সংবাদ, এখানে সৌন্দর্যের তাৎক্ষণিক উপলব্ধি; ‘নারীর সুষমা’ — নারীর সম্পূর্ণ সৌন্দর্য, তার রূপ-গুণের সমষ্টি; ‘অভ্রবিন্দু’ — অভ্র অর্থ মেঘ, বিন্দু অর্থ ফোঁটা, অর্থাৎ মেঘের ফোঁটার মতো সৌন্দর্য; ‘খুকি’ — স্নেহের সম্বোধন, যুবতীকে শিশুর মতো আদর করার আকাঙ্ক্ষা; ‘যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো’ — আত্মশুদ্ধির আহ্বান, ভালোবাসার যোগ্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা; ‘চিবুক ছোঁয়া’ — প্রেমের ঘনিষ্ঠতা, স্নেহের প্রকাশ; ‘ওষ্ঠ বলেছে ভালোবাসি’ — ভালোবাসার ঘোষণা, মৌখিক স্বীকারোক্তি; ‘মিথ্যে’ — সত্যের বিপরীত, ভালোবাসার সত্যতার প্রশ্ন; ‘লঘু মরালী’ — মরালী অর্থ রাজহাঁসী, লঘু অর্থ হালকা, অর্থাৎ হালকা রাজহাঁসীর মতো নারীকে বিদেশী বাতাস নিয়ে যাবে — প্রিয়ার হারানোর ভয়; ‘আকস্মিক ভূমিকম্পে ভেঙ্গে যাবে সবগুলো সিঁড়ি’ — বিপর্যয়ের প্রতীক, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা; ‘মায়াপাশ’ — মায়ার বন্ধন, ভালোবাসার টান; ‘সত্যবদ্ধ অভিমান’ — শিরোনাম ও মূল বক্তব্য, সত্যের সাথে বাঁধা অভিমান, যে অভিমান সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে; ‘চোখ জ্বালা করে ওঠে’ — আবেগের তীব্রতা, অভিমানের বেদনা।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতায় হাতের প্রতীকী তাৎপর্য
কবিতার শুরুতে কবি বলেছেন — “এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?” এখানে হাত শুধু একটি শারীরিক অঙ্গ নয়, এটি পবিত্রতা ও অপবিত্রতার দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু। যে হাত নীরার মুখ ছুঁয়েছে, সে হাত পবিত্র হয়ে গেছে। সেই হাতে আর পাপ করা সম্ভব নয়। কারণ ভালোবাসা হাতকে পবিত্র করে, ভালোবাসা হাতকে শুদ্ধ করে। এই ধারণার মধ্য দিয়ে কবি ভালোবাসার এক উচ্চমার্গীয় দর্শন উপস্থাপন করেছেন। ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, এটি একটি পবিত্রতা, একটি শুদ্ধি। প্রিয়াকে স্পর্শ করার মাধ্যমে হাত ধন্য হয়, পবিত্র হয়। এই পবিত্র হাতে আর পাপের স্থান নেই। এটি প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মতো — যেখানে সত্যকে স্পর্শ করলে মানুষ পবিত্র হয়।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতায় নীরা চরিত্রের তাৎপর্য
নীরা এই কবিতার কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র। তিনি একজন যুবতী, যার মুখে পড়েছিল ‘দুর্দান্ত সাহসী এক আলো’। কবি তাকে ‘খুকি’ বলে ডাকতে চান, অর্থাৎ তিনি তার মধ্যে শিশুর মতো নির্ভেজাল সৌন্দর্য দেখেন। নীরার মুখ ‘টেলিগ্রামের মতো মুহূর্তে উন্মুক্ত করে নারীর সুষমা’। অর্থাৎ তার সৌন্দর্য এত তীব্র যে তা মুহূর্তেই নারীর সম্পূর্ণ সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। তার চোখে ও ভুরুতে মেশা হাসি, যাকে কবি ‘অভ্রবিন্দু’ বলেছেন — মেঘের ফোঁটার মতো। কিন্তু নীরা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নন, তিনি ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। কবি তাকে ভালোবাসেন, তার মুখ ছুঁয়েছেন, তাকে ভালোবাসার কথা বলেছেন। কিন্তু কবির মনে হয়, তিনি ‘ভীষণ জরুরী কথাটাই বলা হয়নি’। কোন কথা? সম্ভবত ভালোবাসার গভীরতা, তার অঙ্গীকার, বা হয়তো ‘থেকো না’ — চলে না যাওয়ার অনুরোধ। নীরাকে নিয়ে যাবে ‘বিদেশী বাতাস’ — অর্থাৎ তিনি চলে যাবেন, হারিয়ে যাবেন। এই হারানোর ভয়ই কবিতাকে বেদনার্ত করে তুলেছে।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতায় যোগ্য হওয়ার আহ্বান
“যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো” — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কবি ডান হাত তুলে পুরুষ পাঞ্জার দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিজেকেই এই কথা বলেন। অর্থাৎ তিনি নিজেকে যোগ্য করে তোলার আহ্বান জানান। যোগ্য হওয়া মানে কী? সম্ভবত নীরার ভালোবাসার যোগ্য হওয়া। নীরা যখন এত সুন্দর, এত পবিত্র, তখন তাকে ভালোবাসার জন্যও যোগ্য হতে হবে। এই যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এটি ভালোবাসার একটি উচ্চমার্গীয় ধারণা — ভালোবাসা শুধু পাওয়া নয়, ভালোবাসার যোগ্য হয়ে ওঠাও একটি প্রক্রিয়া। কবি নিজেকে তৈরি করতে চান, নিজেকে শুদ্ধ করতে চান, যাতে তিনি নীরার ভালোবাসার যোগ্য হন। এই আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ভালোবাসাকে আরও উচ্চতর মাত্রা দিয়েছে।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতায় ওষ্ঠের প্রতীকী তাৎপর্য
“এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি– এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?” — এই পঙ্ক্তিতে ওষ্ঠ ভালোবাসার ঘোষণার মাধ্যম। যে ওষ্ঠ একবার সত্যিকারের ভালোবাসার কথা বলেছে, সেই ওষ্ঠে আর মিথ্যে মানায় না। কারণ ভালোবাসা সত্যের সাথে সম্পর্কিত। সত্যিকারের ভালোবাসা মিথ্যে সহ্য করতে পারে না। যে ওষ্ঠ ভালোবাসার সত্য উচ্চারণ করেছে, সেই ওষ্ঠ আর মিথ্যে বলতে পারে না। এটি ভালোবাসার আরেকটি উচ্চমার্গীয় ধারণা। ভালোবাসা মানুষকে সত্যের পথে নিয়ে যায়, মিথ্যা থেকে দূরে রাখে। ভালোবাসার ঘোষণা একটি অঙ্গীকার, একটি শপথ। সেই শপথের পর আর মিথ্যে সম্ভব নয়।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতায় সিঁড়ি ও ভূমিকম্পের প্রতীকী তাৎপর্য
“সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে পড়ে ভীষণ জরুরী কথাটাই বলা হয়নি” — সিঁড়ি দিয়ে নামা মানে প্রিয়ার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া, বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া। সেই সময় মনে পড়ে যে জরুরী কথাটি বলা হয়নি। কোন কথা? সম্ভবত ভালোবাসার গভীরতার কথা, অথবা ‘থেকো না’ — না যাওয়ার অনুরোধ। তারপর তিনি বলেন — “লঘু মরালীর মতো নারীটিকে নিয়ে যাবে বিদেশী বাতাস, আকস্মিক ভূমিকম্পে ভেঙ্গে যাবে সবগুলো সিঁড়ি”। বিদেশী বাতাস মানে অন্য কোনো আকর্ষণ, অন্য কোনো মানুষ, বা ভাগ্যের পরিহাস। নীরা চলে যাবে, হালকা রাজহাঁসীর মতো উড়ে যাবে। আর তখন ভেঙ্গে যাবে সব সিঁড়ি — অর্থাৎ ফিরে আসার পথ, সম্পর্কের সেতু সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এই আশঙ্কা কবিকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। তিনি নীরার চোখের দিকে তাকান — সম্ভবত শেষবারের মতো, বা হয়তো কোনো উত্তর খুঁজতে।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতায় শিরোনামের তাৎপর্য
কবিতার শিরোনাম ‘সত্যবদ্ধ অভিমান’ — অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সত্যবদ্ধ’ অর্থ সত্যের সাথে বাঁধা, সত্যকে আঁকড়ে ধরা। ‘অভিমান’ হলো প্রেমের এক গভীর অনুভূতি, যা ভালোবাসারই অংশ। অভিমান হয় তখনই যখন ভালোবাসা থাকে। অভিমান ছাড়া ভালোবাসা অসম্পূর্ণ। কিন্তু এখানে অভিমান ‘সত্যবদ্ধ’ — অর্থাৎ এটি সত্যের সাথে বাঁধা। এটি কোনো মিথ্যে অভিমান নয়, কোনো ছলনার অভিমান নয়। এটি সত্যের গভীর থেকে উঠে আসা অভিমান। এই অভিমান চোখ জ্বালা করে ওঠে, এত তীব্র এটি। কবি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এই অভিমান অনুভব করেন। এই শিরোনামে কবিতার পুরো ভাব ধরা পড়েছে — ভালোবাসার সত্যতা, তার অঙ্গীকার, আর সেই অঙ্গীকার থেকে জন্ম নেওয়া অভিমান।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতায় ‘ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার’
“ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ” — এই পঙ্ক্তিতে কবি ভালোবাসার সংজ্ঞা দিয়েছেন। ভালোবাসা একটি অঙ্গীকার, একটি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এটি সাধারণ অঙ্গীকার নয়, এটি ‘তীব্র’ — অত্যন্ত শক্তিশালী, গভীর। এটি ‘মায়াপাশ’ — মায়ার বন্ধন, যা মানুষকে জড়িয়ে রাখে, ছাড়তে দেয় না। এই অঙ্গীকার ও মায়াপাশ থেকেই জন্ম নেয় অভিমান। কারণ অঙ্গীকার ভাঙার ভয়, মায়াপাশ ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা — এই থেকেই অভিমান। কবি এই অভিমানের তীব্রতা অনুভব করেন — “চোখ জ্বালা করে ওঠে”। এটি ভালোবাসার গভীরতারই প্রমাণ।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতার লেখক কে?
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতার লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২)। তিনি বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও সম্পাদক, যিনি ‘নীললোহিত’, ‘সনাতন পাঠক’, ‘নীল উপাধ্যায়’ প্রভৃতি ছদ্মনামেও লিখতেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ (১৯৫৮) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’, ‘হঠাৎ নীরার জন্য’, ‘পঞ্চাশটি কবিতা’, ‘সুনীলের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রভৃতি। তিনি ১৯৭২ সালে ‘নীল নির্জন’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। “সত্যবদ্ধ অভিমান” তার একটি বহুপঠিত প্রেমের কবিতা।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো ভালোবাসার পবিত্রতা, অঙ্গীকার ও অভিমানের গভীর অনুভূতি। কবি বলেছেন, যে হাত নীরার মুখ ছুঁয়েছে, সেই হাতে আর পাপ করা সম্ভব নয় — ভালোবাসা হাতকে পবিত্র করে। যে ওষ্ঠ নীরাকে ভালোবাসার কথা বলেছে, সেই ওষ্ঠে আর মিথ্যে মানায় না — ভালোবাসা সত্যের সাথে সম্পর্কিত। কবি স্মৃতিচারণ করেন শেষ বিকেলের ঝুল বারান্দার কথা, যেখানে নীরার মুখে পড়েছিল দুর্দান্ত সাহসী এক আলো। তিনি নিজেকে যোগ্য করে তোলার আহ্বান জানান। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে পড়ে ভীষণ জরুরী কথাটাই বলা হয়নি। নীরাকে নিয়ে যাবে বিদেশী বাতাস, ভেঙ্গে যাবে সব সিঁড়ি। ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ, সত্যবদ্ধ অভিমান — চোখ জ্বালা করে ওঠে।
“এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?” — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?” — এই পঙ্ক্তিতে কবি ভালোবাসার পবিত্রতার ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন। যে হাত নীরার মুখ ছুঁয়েছে, সে হাত পবিত্র হয়ে গেছে। ভালোবাসা সেই হাতকে শুদ্ধ করেছে, পবিত্র করেছে। সেই হাতে আর পাপ করা সম্ভব নয়। কারণ পবিত্র হাতে পাপ লেগে থাকে না। এই ধারণার মধ্য দিয়ে কবি ভালোবাসার এক উচ্চমার্গীয় দর্শন উপস্থাপন করেছেন। ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, এটি একটি পবিত্রতা, একটি শুদ্ধি। প্রিয়াকে স্পর্শ করার মাধ্যমে হাত ধন্য হয়, পবিত্র হয়। এই পবিত্র হাতে আর পাপের স্থান নেই।
“যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো” — বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
“যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো” — এই পঙ্ক্তিতে কবি নিজেকে যোগ্য করে তোলার আহ্বান জানান। তিনি ডান হাত তুলে পুরুষ পাঞ্জার দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিজেকেই এই কথা বলেন। যোগ্য হওয়া মানে নীরার ভালোবাসার যোগ্য হওয়া। নীরা যখন এত সুন্দর, এত পবিত্র, তখন তাকে ভালোবাসার জন্যও যোগ্য হতে হবে। এই যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। এটি ভালোবাসার একটি উচ্চমার্গীয় ধারণা — ভালোবাসা শুধু পাওয়া নয়, ভালোবাসার যোগ্য হয়ে ওঠাও একটি প্রক্রিয়া। কবি নিজেকে তৈরি করতে চান, নিজেকে শুদ্ধ করতে চান, যাতে তিনি নীরার ভালোবাসার যোগ্য হন। এই আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ভালোবাসাকে আরও উচ্চতর মাত্রা দিয়েছে।
“এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি– এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?” — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি– এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?” — এই পঙ্ক্তিতে কবি ভালোবাসার সত্যতার ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছেন। যে ওষ্ঠ একবার সত্যিকারের ভালোবাসার কথা বলেছে, সেই ওষ্ঠে আর মিথ্যে মানায় না। কারণ ভালোবাসা সত্যের সাথে সম্পর্কিত। সত্যিকারের ভালোবাসা মিথ্যে সহ্য করতে পারে না। যে ওষ্ঠ ভালোবাসার সত্য উচ্চারণ করেছে, সেই ওষ্ঠ আর মিথ্যে বলতে পারে না। এটি ভালোবাসার আরেকটি উচ্চমার্গীয় ধারণা। ভালোবাসা মানুষকে সত্যের পথে নিয়ে যায়, মিথ্যা থেকে দূরে রাখে। ভালোবাসার ঘোষণা একটি অঙ্গীকার, একটি শপথ। সেই শপথের পর আর মিথ্যে সম্ভব নয়।
“ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ” — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ” — এই পঙ্ক্তিতে কবি ভালোবাসার সংজ্ঞা দিয়েছেন। ভালোবাসা একটি অঙ্গীকার, একটি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এটি সাধারণ অঙ্গীকার নয়, এটি ‘তীব্র’ — অত্যন্ত শক্তিশালী, গভীর। এটি ‘মায়াপাশ’ — মায়ার বন্ধন, যা মানুষকে জড়িয়ে রাখে, ছাড়তে দেয় না। এই অঙ্গীকার ও মায়াপাশ থেকেই জন্ম নেয় অভিমান। কারণ অঙ্গীকার ভাঙার ভয়, মায়াপাশ ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা — এই থেকেই অভিমান। ভালোবাসা যেমন সুন্দর, তেমনি কঠিনও বটে। এটি মানুষকে বাঁধে, কিন্তু সেই বাঁধনই ভালোবাসার সৌন্দর্য।
“সত্যবদ্ধ অভিমান” — এই শিরোনামের তাৎপর্য কী?
“সত্যবদ্ধ অভিমান” — এই শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সত্যবদ্ধ’ অর্থ সত্যের সাথে বাঁধা, সত্যকে আঁকড়ে ধরা। ‘অভিমান’ হলো প্রেমের এক গভীর অনুভূতি, যা ভালোবাসারই অংশ। অভিমান হয় তখনই যখন ভালোবাসা থাকে। অভিমান ছাড়া ভালোবাসা অসম্পূর্ণ। কিন্তু এখানে অভিমান ‘সত্যবদ্ধ’ — অর্থাৎ এটি সত্যের সাথে বাঁধা। এটি কোনো মিথ্যে অভিমান নয়, কোনো ছলনার অভিমান নয়। এটি সত্যের গভীর থেকে উঠে আসা অভিমান। এই অভিমান চোখ জ্বালা করে ওঠে, এত তীব্র এটি। কবি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এই অভিমান অনুভব করেন। এই শিরোনামে কবিতার পুরো ভাব ধরা পড়েছে — ভালোবাসার সত্যতা, তার অঙ্গীকার, আর সেই অঙ্গীকার থেকে জন্ম নেওয়া অভিমান।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২) বাংলা সাহিত্যের এক কিংবদন্তি কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও সম্পাদক। তিনি ‘নীললোহিত’, ‘সনাতন পাঠক’, ‘নীল উপাধ্যায়’ প্রভৃতি ছদ্মনামেও লিখতেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ (১৯৫৮) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি’, ‘হঠাৎ নীরার জন্য’, ‘পঞ্চাশটি কবিতা’, ‘সুনীলের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রভৃতি। তিনি ১৯৭২ সালে ‘নীল নির্জন’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তার কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো সহজ-সরল ভাষায় গভীর জীবনবোধ ও দার্শনিক চিন্তার প্রকাশ। তিনি ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। “সত্যবদ্ধ অভিমান” তার একটি বহুপঠিত প্রেমের কবিতা।
সত্যবদ্ধ অভিমান কবিতাটি আধুনিক পাঠকের জন্য কীভাবে প্রাসঙ্গিক?
“সত্যবদ্ধ অভিমান” কবিতাটি আজকের আধুনিক পাঠকের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: প্রথমত, এটি ভালোবাসার পবিত্রতার ধারণা প্রতিষ্ঠা করে, যা আজকের ভোগবাদী পৃথিবীতে খুব প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, এটি ভালোবাসাকে অঙ্গীকার ও দায়িত্ব হিসেবে দেখায়, যা আধুনিক সম্পর্কের জটিলতায় দিকনির্দেশনা দেয়। তৃতীয়ত, এটি অভিমানের গভীর তাৎপর্য বোঝায়, যা প্রেমের সম্পর্কের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। চতুর্থত, এটি সত্যের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করে, যা আধুনিক যুগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চমত, এটি আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানায়, যা নিজেকে উন্নত করার আকাঙ্ক্ষা জাগায়। ষষ্ঠত, এটি হারানোর ভয় ও প্রেমের তীব্রতা নিয়ে ভাবায়, যা প্রতিটি প্রেমিক-প্রেমিকার চিরন্তন অনুভূতি। সপ্তমত, এটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করায়।
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন কোনটি এবং কেন?
এই কবিতার অন্যতম সেরা লাইন: “এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?” অথবা “ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ, সত্যবদ্ধ অভিমান” — এই দুই লাইনের মধ্যে যেকোনো একটি সেরা বলা যায়। প্রথম লাইনটি সেরা হওয়ার কারণ: এটি ভালোবাসার পবিত্রতার এক অসাধারণ ধারণা প্রতিষ্ঠা করে, যা পুরো কবিতার ভিত্তি। দ্বিতীয় লাইনটি সেরা হওয়ার কারণ: এটি ভালোবাসার সংজ্ঞা ও শিরোনামের তাৎপর্য একসাথে ধারণ করে। তবে প্রথম লাইনটির সরলতা ও গভীরতা একে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে — “আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?” এই প্রশ্নটি ভালোবাসার পবিত্রতাকে চিরন্তন করে তোলে।
ট্যাগস: সত্যবদ্ধ অভিমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা, বাংলা কবিতা, বাংলা প্রেমের কবিতা, নীরা, সুনীলের শ্রেষ্ঠ কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, ভালোবাসার কবিতা, অভিমানের কবিতা, পবিত্র প্রেম, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত কবি, কৃত্তিবাস




