শেষ চুম্বন – তসলিমা নাসরিন | বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ ও সংগ্রহ
শেষ চুম্বন কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ গাইড ও বিশ্লেষণ
তসলিমা নাসরিনের “শেষ চুম্বন” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি সাহসী, মনস্তাত্ত্বিক ও নারীবাদী রচনা যা আকস্মিক শারীরিক সম্পর্ক, নারীর স্মৃতি ও অনুভূতির জটিলতা এবং সমাজের প্রচলিত সম্পর্কের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। “ধরা যাক মেয়েটির নাম মেয়ে আর ছেলেটির নাম ছেলে।/সেই যে কোত্থেকে উড়ে এসে ছেলেটি হঠাৎ চুমু খেয়েছিল,/হঠাৎ মেয়েটিকে অবাক করে অবশ করে” – এই সরাসরি ও সাহসী শুরুর লাইনগুলি কবিতার মূল থিম—অপ্রত্যাশিত শারীরিক অভিজ্ঞতা, তার টেকসই প্রভাব এবং নারীর স্বাধীন অনুভূতির জগৎ—উপস্থাপন করে। তসলিমা নাসরিনের এই কবিতায় একজন নারীর মনে এক আকস্মিক চুম্বনের গভীর প্রভাব, শৈশব স্মৃতির সাথে তার সংযোগ এবং স্বামীর সাথে দৈনন্দিন সম্পর্ক থেকে একান্ত অনুভূতির বিচ্ছিন্নতা মূর্ত হয়েছে। কবিতা “শেষ চুম্বন” পাঠকদের মনে নারীর যৌনতা, স্মৃতির শক্তি এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্বাধীন মূল্যায়নের গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
কবি তসলিমা নাসরিনের সাহিত্যিক পরিচিতি
তসলিমা নাসরিন (জন্ম: ২৫ আগস্ট, ১৯৬২) বাংলাদেশী-ভারতীয় কবি, ঔপন্যাসিক ও নারীবাদী লেখিকা। তিনি বাংলা সাহিত্যে নারীবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজের প্রচলিত ধারণার সমালোচনার জন্য খ্যাত এবং তাঁর সাহসী, স্পষ্টবাদী লেখনীর জন্য প্রশংসিত ও বিতর্কিত। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নারীর যৌনতা ও দেহের মুক্ত আলোচনা, ধর্মীয় ও সামাজিক নিপীড়নের তীব্র সমালোচনা, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নারীর স্বায়ত্তশাসনের জোরালো প্রকাশ। “শেষ চুম্বন” কবিতায় তাঁর নারীর অন্তর্জগৎ অনুসন্ধান, শারীরিক অভিজ্ঞতার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিশ্লেষণ এবং প্রচলিত সম্পর্কের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিশেষ শৈলী লক্ষণীয়। তসলিমা নাসরিনের ভাষা অত্যন্ত স্পষ্ট, সাহসী ও আবেগময়। তাঁর রচনাবলি বাংলা সাহিত্যে নারীবাদী চিন্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শেষ চুম্বন কবিতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট
তসলিমা নাসরিন রচিত “শেষ চুম্বন” কবিতাটি বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রচিত, যখন দক্ষিণ এশীয় সমাজে নারীর যৌনতা, দৈহিক স্বায়ত্তশাসন ও সম্পর্কের ধরন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছিল। কবি এক নারীর মনে এক আকস্মিক, নামহীন চুম্বনের স্থায়ী প্রভাবের গল্প বলেছেন, যা প্রচলিত বিবাহ ও সামাজিক সম্পর্কের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। “মেয়েটি জানেনা, সে রাতে আর কোথাও চুমু খাওয়ার কেউ ছিল না বলে/ছেলেটি চুমু খেয়েছিল, হাতের কাছে যাকে পেয়েছিল খেয়েছিল” – এই লাইন দিয়ে কবি পুরুষের আকস্মিক যৌন আচরণের নৈরাজ্যময় প্রকৃতি তুলে ধরেছেন। কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে নারীবাদী কবিতা, যৌনতা বিষয়ক কবিতা এবং মনস্তাত্ত্বিক কবিতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কবিতার সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ও শৈলীগত বিশ্লেষণ
“শেষ চুম্বন” কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত গদ্যছন্দের কাছাকাছি, কথ্য ও বর্ণনামূলক। কবি তসলিমা নাসরিন কবিতাটিকে একটি গল্প বলার শৈলীতে রচনা করেছেন, যেখানে ধীরে ধীরে ঘটনা ও অনুভূতির স্তরগুলি উন্মোচিত হয়। কবিতার গঠন একটি মানসিক যাত্রার মতো: বর্তমানের আকস্মিক চুম্বন → শৈশব স্মৃতিতে ফেরা → বর্তমানের স্বামীর সাথে সম্পর্কের বিশ্লেষণ → চুম্বনের প্রতীকী প্রভাব। “ছেলেটির চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে ছেলেটির চুম্বন,/চুম্বনের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে মেয়েটির কৈশোর।” – এই চরণে কবি একটি শক্তিশালী রূপক তৈরি করেছেন। কবিতায় ব্যবহৃত ভাষা সরল কিন্তু গভীর মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ।
কবিতার প্রধান থিম ও বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ
- আকস্মিক শারীরিক অভিজ্ঞার স্থায়ী প্রভাব: একটি অনামা চুম্বনের গভীর মানসিক প্রভাব
- নারীর স্মৃতি ও অনুভূতির স্বায়ত্তশাসন: নারীর নিজস্ব অনুভূতি সংরক্ষণের অধিকার
- শৈশব স্মৃতি ও বর্তমানের সংযোগ: মার্বেল চোখের ছেলে ও লাটিম ঘোরানো ছেলের সমীকরণ
- বিবাহিত জীবন ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দ্বন্দ্ব: স্বামীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক বনাম ব্যক্তিগত স্মৃতি
- পুরুষের আকস্মিক যৌন আচরণের প্রকৃতি: “হাতের কাছে যাকে পেয়েছিল খেয়েছিল”
- স্মৃতির শক্তি ও প্রতীকী বৃদ্ধি: চুম্বন → কৈশোর → স্বপ্ন → হিরের মতো আলোর ক্রমবিকাশ
- নারীর দৈহিক স্বায়ত্তশাসন: “শুধু চুমুটা খেও না” – নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ
- অনুভূতির প্রতীকী মূল্য: “ওই চুমু তার হাতের মুঠোয় গোটা একটা জগত দেয়”
কবিতার কাঠামোগত বিশ্লেষণ
| পর্ব |
লাইন |
মূল বিষয় |
সাহিত্যিক কৌশল |
| প্রথম পর্ব |
১-১২ |
আকস্মিক চুম্বনের বর্ণনা ও তাৎক্ষণিক প্রভাব |
বর্ণনামূলক, প্রত্যক্ষ বর্ণনা |
| দ্বিতীয় পর্ব |
১৩-২৩ |
ছেলের চোখের বর্ণনা ও শৈশব স্মৃতি |
চিত্রকল্প, স্মৃতিচারণ |
| তৃতীয় পর্ব |
২৪-৩২ |
শৈশবের ছেলে ও বর্তমান ছেলের সমীকরণ |
প্রশ্নোত্তর, আত্ম-সংলাপ |
| চতুর্থ পর্ব |
৩৩-৪২ |
ছেলের মনোভাব বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য ভুলে যাওয়া |
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, অনুমান |
| পঞ্চম পর্ব |
৪৩-৫১ |
স্বামীর সাথে সম্পর্ক ও চুম্বনের স্মৃতি সংরক্ষণ |
বৈপরীত্য, সীমানা নির্ধারণ |
| ষষ্ঠ পর্ব |
৫২-৬০ |
চুম্বনের প্রতীকী বৃদ্ধি ও আলোর রূপক |
রূপক, প্রতীকবাদ |
কবিতায় ব্যবহৃত প্রধান প্রতীক ও রূপকসমূহ
- শেষ চুম্বন: একমাত্র সত্যিকারের চুম্বন, শেষ অর্থে চূড়ান্ত ও সেরা
- মেয়ে ও ছেলে: সার্বজনীন প্রতীক, নির্দিষ্ট পরিচয়হীনতা
- চুরমার করে চুমু: সম্পূর্ণ গ্রাস, ভেঙে ফেলা, পুনর্গঠন
- এক ঘর আলোয়: বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত, আলোকিত কিন্তু সীমাবদ্ধ পরিসর
- মার্বেল চোখ: শিশুসুলভ নির্মলতা, খেলনার মতো ঝকঝকে কিন্তু শীতল
- হুড়মুড় করে কৈশোর: আকস্মিকভাবে না আসা যৌবন, বিলম্বিত আবেগ
- ঘুরন্ত লাটিম
| নারীর দৈহিক স্বায়ত্তশাসন |
সীমানা নির্ধারণ, ব্যক্তিগত সীমানা |
| সপ্তাহান্তের সঙ্গম |
দায়িত্বমূলক যৌনতা |
বিবাহিত জীবনের রুটিন |
| হাতের মুঠোয় গোটা জগত |
শক্তি ও পরিপূর্ণতা |
অনুভূতির পরিপূর্ণতা |
| এক ঝাঁক কৈশোর |
যৌবনের পুনর্জন্ম |
আবেগের পুনরুজ্জীবন |
| হিরের মতো আলো |
মূল্যবান ও চিরস্থায়ী |
স্মৃতির দীর্ঘস্থায়ীতা |
| ঝাপসা হয়ে যাওয়া |
অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া |
বাস্তব ব্যক্তির গুরুত্ব হ্রাস |
শেষ চুম্বন কবিতার নারীবাদী ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য
তসলিমা নাসরিনের “শেষ চুম্বন” কবিতায় কবি নারীর অনুভূতি ও স্মৃতির স্বায়ত্তশাসন, দৈহিক অভিজ্ঞার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং প্রচলিত সম্পর্কের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। “শুধু চুমুটা খেও না” – এই সরল কিন্তু শক্তিশালী উক্তি নারীর দৈহিক সীমানা নির্ধারণের অধিকারের প্রকাশ। কবি দেখিয়েছেন যে একটি আকস্মিক, নামহীন চুম্বন নারীর মনে কীভাবে শৈশব স্মৃতি, কৈশোরের অনুভূতি এবং স্বপ্নের জগৎ সক্রিয় করতে পারে, যা তার দৈনন্দিন বিবাহিত জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কবিতাটি পাঠককে নারীর অভ্যন্তরীণ জগতের জটিলতা, শারীরিক অভিজ্ঞার গভীর প্রভাব এবং অনুভূতির স্বাধীন মূল্যায়ন সম্পর্কে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
কবিতার ভাষাগত ও শৈল্পিক বিশেষত্ব
“শেষ চুম্বন” কবিতায় তসলিমা নাসরিন যে শৈল্পিক দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন তা বাংলা কবিতার সাহসী বিষয়বস্তু ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত গদ্যময় কিন্তু কবিতার আবেগ ও ছন্দ বজায় রেখেছে। কবি ধীরে ধীরে ঘটনার স্তর উন্মোচন করেছেন, যেন পাঠক ধাপে ধাপে মেয়েটির মনে প্রবেশ করছেন। “ছেলেটির চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে ছেলেটির চুম্বন,/চুম্বনের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে মেয়েটির কৈশোর।/কৈশোরের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে কৈশোরের স্বপ্ন।” – এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির রূপক কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ, যা দেখায় কীভাবে একটি সামান্য শারীরিক অভিজ্ঞা নারীর সমগ্র মানসিক জগৎকে রূপান্তরিত করতে পারে।
শেষ চুম্বন কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
শেষ চুম্বন কবিতার লেখক কে?
শেষ চুম্বন কবিতার লেখক বাংলাদেশী-ভারতীয় কবি ও নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তিনি বাংলা সাহিত্যে নারীবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজের প্রচলিত ধারণার সমালোচনার জন্য খ্যাত এবং তাঁর সাহসী, স্পষ্টবাদী লেখনীর জন্য প্রশংসিত ও বিতর্কিত।
শেষ চুম্বন কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
শেষ চুম্বন কবিতার মূল বিষয় হলো একজন নারীর মনে এক আকস্মিক, অনামা চুম্বনের গভীর ও স্থায়ী প্রভাব, শৈশব স্মৃতির সাথে তার সংযোগ, বিবাহিত জীবনের দৈনন্দিন সম্পর্ক থেকে এই অভিজ্ঞতার বিচ্ছিন্নতা, এবং নারীর অনুভূতি ও স্মৃতির স্বায়ত্তশাসন। কবিতাটি নারীর যৌনতা, স্মৃতির শক্তি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মূল্য নিয়ে গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান করে।
তসলিমা নাসরিনের কবিতার বিশেষত্ব কী?
তসলিমা নাসরিনের কবিতার বিশেষত্ব হলো নারীর যৌনতা ও দেহের মুক্ত আলোচনা, ধর্মীয় ও সামাজিক নিপীড়নের তীব্র সমালোচনা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নারীর স্বায়ত্তশাসনের জোরালো প্রকাশ, সাহসী ও স্পষ্টবাদী ভাষা, এবং সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস। তাঁর কবিতা নারীবাদী চিন্তার শক্তিশালী হাতিয়ার।
কবিতায় “শেষ চুম্বন” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
“শেষ চুম্বন” বলতে দুটি অর্থ বোঝানো হয়েছে: প্রথমত, এটি সেই চুম্বন যা সর্বশেষ ঘটেছে (যদিও কবিতায় বর্ণিত একমাত্র চুম্বন); দ্বিতীয়ত ও প্রধানত, এটি “চূড়ান্ত” বা “সেরা” চুম্বন—যে চুম্বনের তুলনা অন্য কোনও চুম্বনের সাথে হয় না। এটি একটি এমন অভিজ্ঞতা যা সমস্ত পূর্ববর্তী বা পরবর্তী অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে যায়, নারীর মনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
“শুধু চুমুটা খেও না” – এই উক্তির তাৎপর্য কী?
এই উক্তির গভীর তাৎপর্য হলো নারীর দৈহিক ও মানসিক সীমানা নির্ধারণের অধিকার। মেয়েটি স্বামীকে দৈহিক সম্পর্কের অনুমতি দিচ্ছে কিন্তু চুম্বন—যা একটি অন্তরঙ্গ, আবেগময় অভিব্যক্তি—তা অস্বীকার করছে। কারণ সে চুম্বনের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে চায়, তাকে দৈনন্দিন সম্পর্কের অংশ হতে দিতে চায় না। এটি নারীর ব্যক্তিগত অনুভূতি সংরক্ষণের অধিকারের শক্তিশালী প্রকাশ।
কবিতায় শৈশব স্মৃতি (লাটিম, মার্বেল) কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শৈশব স্মৃতি (লাটিম ঘোরানো, মার্বেল চোখ) গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি দেখায় যে আকস্মিক চুম্বন মেয়েটির মনে শৈশবের নির্মল, আনন্দময় স্মৃতিগুলি সক্রিয় করে দেয়। ছেলেটির চোখ শৈশবের মার্বেলের মতো ঝকঝকে, এবং সে শৈশবে লাটিম ঘোরাত—এসব স্মৃতি বর্তমান অভিজ্ঞতাকে অতীতের সাথে যুক্ত করে, তাকে গভীরতর ও বহুমাত্রিক করে তোলে। এটি দেখায় যে শারীরিক অভিজ্ঞতা শুধু বর্তমানের নয়, অতীতের স্মৃতির সাথেও সংযুক্ত হয়।
তসলিমা নাসরিনের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা কোনগুলো?
তসলিমা নাসরিনের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে “নির্বাচিত কলম”, “অপেক্ষা”, “আমার কিছু যায় আসে না”, “শ্রাবণ রাতে যদি”, “কবিতা”, “নারীর মুখ”, “স্বাধীনতা”, “লজ্জা” প্রভৃতি। তাঁর উপন্যাস “লজ্জা” বিশেষভাবে আলোচিত।
এই কবিতাটি কোন সাহিত্যিক ধারার অন্তর্গত?
এই কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের নারীবাদী কবিতা, মনস্তাত্ত্বিক কবিতা, যৌনতা বিষয়ক কবিতা, সামাজিক সমালোচনামূলক কবিতা এবং আধুনিক কবিতার ধারার অন্তর্গত। এটি গদ্যছন্দে রচিত বর্ণনামূলক কবিতারও উদাহরণ।
কবিতার শেষের দিকে “হিরের মতো আলো” ও “ঝাপসা হয়ে যাওয়া” এর অর্থ কী?
“হিরের মতো আলো” হলো সেই স্বপ্ন ও স্মৃতির আলো যা চুম্বনের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়েছে—মূল্যবান, চিরস্থায়ী, উজ্জ্বল। “ঝাপসা হয়ে যাওয়া” হলো ছেলেটির আসল পরিচয়, তার আকস্মিক নেশা, তার ভুলে যাওয়া—এই সবই সেই আলোর সামনে তুচ্ছ ও অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, অভিজ্ঞতা ও তার থেকে জন্ম নেওয়া স্বপ্নগুলি আসল ব্যক্তি ও ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কবিতার শিক্ষণীয় দিক
- নারীর অনুভূতি ও স্মৃতির স্বায়ত্তশাসনের গুরুত্ব
- শারীরিক অভিজ্ঞার গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বোঝা
- ব্যক্তিগত সীমানা নির্ধারণের অধিকারের স্বীকৃতি
- অতীত স্মৃতি ও বর্তমান অভিজ্ঞতার মধ্যে সংযোগ উপলব্ধি
- সম্পর্কের বিভিন্ন মাত্রা (দৈহিক, আবেগময়) পৃথক করে দেখা
- অনুভূতি ও স্মৃতির প্রতীকী মূল্য বোঝা
- নারীর যৌনতা ও দৈহিকতার জটিলতা মেনে নেওয়া
সম্পর্কিত কবিতা পড়ার সুপারিশ
- “চুম্বন” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- “প্রথম চুম্বন” – জীবনানন্দ দাশ
- “নারীর শরীর” – মল্লিকা সেনগুপ্ত
- “যৌনতা” – শক্তি চট্টোপাধ্যায়
- “স্মৃতি” – পূর্ণেন্দু পত্রী
- “স্বাধীন নারী” – সুফিয়া কামাল
ট্যাগস: শেষ চুম্বন, তসলিমা নাসরিন, তসলিমা নাসরিন কবিতা, বাংলা কবিতা, নারীবাদী কবিতা, যৌনতা কবিতা, মনস্তাত্ত্বিক কবিতা, সামাজিক কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, নারী কবিতা, চুম্বন কবিতা, বাংলা সাহিত্য, কবিতা সংগ্রহ, কবিতা বিশ্লেষণ
ধরা যাক মেয়েটির নাম মেয়ে আর ছেলেটির নাম ছেলে।
সেই যে কোত্থেকে উড়ে এসে ছেলেটি হঠাৎ চুমু খেয়েছিল,
হঠাৎ মেয়েটিকে অবাক করে অবশ করে,
কোনও প্রেম ছাড়া, কাল দেখা হচ্ছে বা পরশু আসছি ছাড়া,
সেই যে গভীর করে চুমু খেয়েছিল, সেই যে চুরমার করে, টুকরো টুকরো করে,
সেই যে ভেঙে, ছিঁড়ে,
এক ঘর আলোয়,
সেই যে মেয়েটিকে আচমকা ডুবিয়ে ভাসিয়ে চুমু খেয়েছিল,
ছেলেটির তারপর থেকে দেখা নেই আর।
মেয়েটি জানে না ছেলেটি কে, কোথায় বাড়ি, শুধু চোখদুটো দেখেছিল,
চোখদুটোয় দুটো মার্বেল ছিল, যেন ছোটবেলার খেলার মাঠে পড়ে থাকা দুটো ঝকঝকে মার্বেল,
এত হুড়মুড় করে কৈশোর আসেনি দীর্ঘদিন,
কারও চোখের চাওয়ায় উতল হাওয়াও এত ছিল না কোনওদিন..
হঠাৎ চমকে উঠে মেয়েটি বলে, ছেলেটি কি সেই ছেলে?
নিজেকেই তারপর বারবার বলে, ছেলেটি তো সেই ছেলে যে ছেলে ঘুরন্ত লাটিম এনে হাতের তালুতে দিত প্রতিদিন! যতক্ষণ লাটিম ঘুরতো তালুতে, মনে হতো পুরো জগত তার হাতের মুঠোয়।
মেয়েটির শিরশির করতো শরীর, ছেলেটি মুগ্ধ চোখে দেখতো, খেলার মাঠে পড়ে থাকা
মার্বেলদুটো থেকে আলো ছিটকে এসে পড়তো সেই চোখে,
দুটো মার্বেল চোখ ছিল সেই মুগ্ধ চোখে।
ছেলেটি তবে কি সেই খেলার মাঠের ছেলে, এই চুমু খাওয়া ছেলে?
ছেলেটি তবে কি ঘুরন্ত লাটিম ছেলে? এই হঠাৎ আচমকা চুমু খাওয়া ছেলে?
কোনওদিন আবার আসবে কি না সে, আবার চুমু খাবে না কি না, মেয়েটি জানে না।
মেয়েটি জানেনা, সে রাতে আর কোথাও চুমু খাওয়ার কেউ ছিল না বলে
ছেলেটি চুমু খেয়েছিল, হাতের কাছে যাকে পেয়েছিল খেয়েছিল,
ঝড়বৃষ্টির রাতে, নির্জন রাতে, সাত পাঁচ না ভেবেই খেয়েছিল।
পরদিন নেশা কেটে গেলে ছেলেটি ভুলেও গেছে খেয়েছিল।
মেয়েটির স্বামী এসে সপ্তাহান্তের সঙ্গম সেরে যায়, স্বামী চুমু খেতে গেলে মুখ ঠোঁট সরিয়ে নেয় মেয়ে, এই শরীর দিচ্ছি নাও, সঙ্গমে সারাদিন মেতে থাকো, সারারাত থাকো, চুল থেকে পায়ের নখ অবধি চাখো চোষো, শুধু চুমুটা খেও না।
শেষ চুম্বনের স্মৃতি টুকু বাঁচিয়ে রাখে মেয়ে।
ওই চুমু তার হাতের মুঠোয় গোটা একটা জগত দেয়।
ওই চুমু তাকে এক ঝাঁক কৈশোর দেয়,
ছেলেটির চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে ছেলেটির চুম্বন,
চুম্বনের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে মেয়েটির কৈশোর।
কৈশোরের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে থাকে কৈশোরের স্বপ্ন।
স্বপ্নগুলো হিরের মতো, ঠিকরে বেরোতে থাকে আলো। সেই আলোয় ঝাপসা হয়ে যেতে থাকে
মার্বেল চোখের ছেলে, তার প্রতিরাতের নেশা, তার যাকে তাকে চুমু খাওয়া,
তার ভুলে যাওয়া, তার না আসা।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। তসলিমা নাসরিন।