কবিতার খাতা
- 41 mins
রক্তকরবী – জয়দেব বসু।
তোমার কথা শুনেছি কতবার
কত যে লোক বলে তোমার নাম,
আমি ছিলাম নির্বাপিত দেশে
আমি কি আর তোমায় চিনতাম!
পুরাণে বলে, লোককথায় বলে—
আসবে তুমি, কখনো, কোনোদিন
মুছিয়ে দেবে গেরস্থালি চোখ,
অনামিকায় ফোটাবে আশ্বিন।
পেরিয়ে গেছি মেঝেনদের দেশ,
পেরিয়ে গেছি কুষ্ঠে খশা গ্রাম,
জানো কি তুমি, অনেকে এখানেও
ফিসফিসিয়ে বলে তোমার নাম!
পেরিয়ে গেছি দস্যুদের তাঁবু,
পেরিয়ে গেছি ভগ্ন বন্দর
সেখানে রোজ বালিতে দোহা লেখে
বিলাপরত দু’জন অন্ধ।
তাদের থেকে তোমার নাম করে
টুকে নিয়েছি লুপ্ত প্রার্থনা,
না-হলে ঐ হতভাগ্যদের
মনোবিকার কখনো সারত না।
পেরিয়ে গেছি নিশানরাঙা পথ,
কোথায় আছো, কীভাবে আছো তুমি?
পায়ের নিচে দগ্ধ ধানখেত
পায়ের নিচে শীতল মালভূমি।
চেরাগ হাতে নানান দেশে যারা
ঘুরে বেড়ায়, সাত-সুলুক রাখে,
তারা বলেছে, ‘আমরা কেউ নই,
সেই মেয়েরা চিনতে পারে তাঁকে।’
যাদের হাত ফ্যাকাশে হয় ক্ষারে,
যাদের হাত চুলোতে স্যাঁকা হয়,
যাদের খুব কথা বলার সাধ
কথা বলতে যাদের আরো ভয়…
তাদের সাথে যখন দেখা হল
তখন ভীতু দৃষ্টি অনুসারে
মানচিত্রে পথ বসিয়ে আমি
একছুট্টে, তেরো-নদীর পারে—
মস্ত এক পাঁচিল পার হয়ে
পরের পর দরজা ঠেলে-ঠেলে
খুঁজে পেলাম—তোমাকে, নন্দিনী,
নিখোঁজ এই পাগলিদের সেলে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন।জয়দেব বসু।
রক্তকরবী – জয়দেব বসু | মিথ, সমাজ ও মানসিকতার অনুসন্ধানের কবিতা বিশ্লেষণ
রক্তকরবী কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন
রক্তকরবী কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রগতিশীল ও আধুনিকতাবাদী কবি জয়দেব বসুর একটি রূপকধর্মী, সমাজ-সমালোচনামূলক ও মনস্তাত্ত্বিক মহাকাব্যিক রচনা। জয়দেব বসু রচিত এই কবিতাটি কেবল একটি প্রথাগত প্রেম বা প্রকৃতির কবিতা নয়; এটি একটি গভীর দার্শনিক ও সামাজিক অনুসন্ধানের আখ্যান, যেখানে ‘রক্তকরবী’ (একটি ফুলের নাম, কিন্তু এখানে একটি রূপক) একটি অন্বেষিত, পৌরাণিক, কিন্তু অস্তিত্বহীন কিংবদন্তির মতো, যার সন্ধানে কবি এক যাত্রা করেছেন। “তোমার কথা শুনেছি কতবার/ কত যে লোক বলে তোমার নাম,/ আমি ছিলাম নির্বাপিত দেশে/ আমি কি আর তোমায় চিনতাম!” — এই সূচনার মাধ্যমেই কবি পাঠককে একটি গূঢ় রহস্যের মুখোমুখি দাঁড় করান। রক্তকরবী শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়: ‘রক্ত’ ও ‘করবী’ (একটি ফুল)। এটি একইসাথে রক্তের গাঢ় লাল রঙের প্রতীক এবং একটি কাঙ্ক্ষিত কিন্তু দুর্গম সৌন্দর্যের প্রতীক। কবিতাটি জয়দেব বসুর কাব্যপ্রতিভার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে তিনি লোককথা, সমকালীন সমাজের চিত্র ও ব্যক্তির মানসিক যাত্রাকে এক সূত্রে গেঁথেছেন। এটি বাংলা সাহিত্যে আধুনিক রূপক কবিতার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
রক্তকরবী কবিতার কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
রক্তকরবী কবিতাটি একটি যাত্রাকাহিনীর কাঠামোতে বিন্যস্ত। কবি ‘তোমাকে’ (রক্তকরবী) খুঁজে বেড়ানোর এক আখ্যান বর্ণনা করেছেন। প্রথম স্তবকে কবি বলছেন, তিনি ‘নির্বাপিত দেশে’ (নিভে যাওয়া, নির্জীব অঞ্চল) থাকতেন, সেখানে ‘রক্তকরবী’-র নাম শুনেছেন বহুবার, লোকের মুখে মুখে তার গল্প প্রচলিত, কিন্তু তিনি তাকে চিনতেন না। এটি এমন এক সত্তার প্রতি আকাঙ্ক্ষা, যা বহুল আলোচিত কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অজানা। দ্বিতীয় স্তবকে কবি পুরাণ ও লোককথার উল্লেখ করেন: “আসবে তুমি, কখনো, কোনোদিন/ মুছিয়ে দেবে গেরস্থালি চোখ,/ অনামিকায় ফোটাবে আশ্বিন।” — এখানে ‘গেরস্থালি চোখ’ বলতে দৈনন্দিন, সাধারণ জীবনযাপনের একঘেয়েমি ও ক্ষীণদৃষ্টি বোঝানো হয়েছে। রক্তকরবীর আগমন সেই দৃষ্টি মুছিয়ে দেবে, এবং ‘অনামিকা’ (আঙুল) তে ‘আশ্বিন’ (শরৎকাল) ফোটাবে — অর্থাৎ নতুন সৃষ্টি, প্রাণবন্ততা ও সৌন্দর্য নিয়ে আসবে। এরপর শুরু হয় কবির যাত্রার বর্ণনা। তিনি ‘মেঝেনদের দেশ’, ‘কুষ্ঠে খশা গ্রাম’, ‘দস্যুদের তাঁবু’, ‘ভগ্ন বন্দর’ — এসব বিপদসংকুল, পীড়িত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থান পেরিয়েছেন। প্রতিটি স্থানই সমাজের একটি বিশেষ চিত্র বা অবস্থার রূপক। ‘মেঝেন’ সম্ভবত কোনো উপজাতি বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ‘কুষ্ঠে খশা গ্রাম’ কুষ্ঠরোগী ও ‘খশা’ (শুষ্ক, অনুর্বর) গ্রাম — রোগ, দারিদ্র্য ও হতাশার প্রতীক। ‘দস্যুদের তাঁবু’ বলতে সমাজের শোষক বা হিংস্র গোষ্ঠী। ‘ভগ্ন বন্দর’ হলো বাণিজ্য, যোগাযোগ বা আশার ধ্বংসস্তূপ। এই ভগ্ন বন্দরে ‘বালিতে দোহা লেখে/ বিলাপরত দু’জন অন্ধ’ — এখানে ‘দোহা’ (দ্বিপদী কবিতা) লেখা এবং ‘অন্ধ’ ব্যক্তিদের বিলাপ এক ধরনের নিরর্থক কিন্তু আবেগী সৃজনশীলতার প্রতীক, যারা অন্ধ হয়েও বালিতে লিখছে। কবি বলেন, এই হতভাগ্যদের কাছ থেকে তিনি ‘টুকে নিয়েছি লুপ্ত প্রার্থনা’ — তাদের হারানো প্রার্থনা সংগ্রহ করেছেন, কারণ তাদের ‘মনোবিকার’ (মানসিক ব্যাধি) সারানোর জন্য রক্তকরবীর নামই একমাত্র ভরসা। এরপর কবি ‘নিশানরাঙা পথ’ (পতাকা-সজ্জিত পথ, সম্ভবত রাজনৈতিক বা আদর্শিক পথ) পেরিয়ে প্রশ্ন করেন, “কোথায় আছো, কীভাবে আছো তুমি?” এবং তার পথের বর্ণনা দেন: ‘দগ্ধ ধানখেত’ (পোড়া ধানের খেত, ক্ষুধা ও ধ্বংস) এবং ‘শীতল মালভূমি’ (উঁচু শীতল স্থান, নির্জনতা)। তিনি ‘চেরাগ হাতে’ (প্রদীপ হাতে) যারা ঘুরে বেড়ায় ও ‘সাত-সুলুক রাখে’ (গোপন রহস্য রাখে) এমন মানুষদের কথা বলেন, যারা বলে তারা কেউ নন, কিন্তু ‘সেই মেয়েরা চিনতে পারে তাঁকে’ — সম্ভবত সমাজের প্রান্তিক নারীরা রক্তকরবীকে চিনতে পারে। শেষের দিকে কবি ‘যাদের হাত ফ্যাকাশে হয় ক্ষারে’ (যারা রাসায়নিক বা শ্রমে হাত ফ্যাকাশে করে) এবং ‘যাদের হাত চুলোতে স্যাঁকা হয়’ (রান্নাঘরে কাজ করা নারী) — অর্থাৎ শ্রমজীবী ও গৃহিণী নারীদের কথা বলেন, যাদের ‘কথা বলার সাধ’ আছে কিন্তু ‘কথা বলতে ভয়’। এইসব মানুষের সাথে দেখা করে, তাদের ‘ভীতু দৃষ্টি অনুসারে’ (ভয়ে ভরা চোখের ইঙ্গিত অনুযায়ী) কবি মানচিত্রে পথ বসিয়ে ‘একছুট্টে, তেরো-নদীর পারে’ চলে যান। সেখানে ‘মস্ত এক পাঁচিল পার হয়ে/ পরের পর দরজা ঠেলে-ঠেলে’ শেষে খুঁজে পেয়েছেন ‘তোমাকে, নন্দিনী,/ নিখোঁজ এই পাগলিদের সেলে।’ — অর্থাৎ রক্তকরবীকে তিনি খুঁজে পেয়েছেন এক ‘পাগলিদের সেলে’ (পাগলাগারদে), আর তাকে ‘নন্দিনী’ (কন্যা) বলে সম্বোধন করেছেন। এই সমাপ্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: যে রক্তকরবীকে লোককথা ও পুরাণে উদ্ধারকর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, সে শেষ পর্যন্ত ‘নিখোঁজ পাগলিদের সেলে’ বন্দী। এটি সমাজের পাগলামি, উন্মাদনা বা মনস্তাত্ত্বিক কারাাগারের রূপক হতে পারে, যেখানে প্রকৃত সৌন্দর্য, মুক্তি বা সত্য বন্দী হয়ে আছে।
জয়দেব বসুর কবিতার বৈশিষ্ট্য
জয়দেব বসু (১৯০৯-১৯৬৯) বাংলা সাহিত্যের একজন প্রগতিশীল, আধুনিকতাবাদী ও রূপকপ্রিয় কবি। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপকও ছিলেন। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো জটিল রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার, সমাজ ও রাজনীতির প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, এবং একটি গদ্য-কাব্যের সান্নিধ্য। তিনি প্রায়শই পুরাণ, লোককথা ও সমকালীন বাস্তবতাকে একসাথে মেলাতেন। তাঁর কবিতায় একটি গভীর মানবিকতা ও নৈরাশ্যবোধও বিদ্যমান। রক্তকরবী কবিতাটি তাঁর এই সকল বৈশিষ্ট্যেরই পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ: এখানে রক্তকরবী একটি বহুমাত্রিক রূপক, কবির যাত্রা সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে, এবং সমাপ্তি একটি বিদ্রূপাত্মক ও মর্মন্তুদ সত্য উপস্থাপন করে।
রক্তকরবী কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর ও বিশদ আলোচনা
রক্তকরবী কবিতার রচয়িতা কে?
রক্তকরবী কবিতার রচয়িতা বাংলা সাহিত্যের প্রগতিশীল কবি ও অধ্যাপক জয়দেব বসু।
রক্তকরবী কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু হলো একটি আদর্শ, সৌন্দর্য বা মুক্তির প্রতীক (‘রক্তকরবী’)-র সন্ধানে এক যাত্রাকাহিনী, যা শেষ পর্যন্ত সমাজের সবচেয়ে পীড়িত, উন্মাদ বা বন্দী অবস্থায় (পাগলাগারদ) সেই প্রতীকের আবিষ্কারে গিয়ে শেষ হয়। কবিতাটি একইসাথে: ১) একটি ব্যক্তিগত অন্বেষণের আখ্যান, ২) সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও অবস্থানের (গ্রাম, দস্যু, শ্রমজীবী, গৃহিণী, অন্ধ, পাগল) একটি মানচিত্র, এবং ৩) একটি তীব্র সামাজিক সমালোচনা — যে সমাজে উদ্ধারকর্তা বা মুক্তির প্রতীক নিজেই কারাগারে বন্দী। রক্তকরবী হলো কবির কাঙ্ক্ষিত সেই ‘অন্য’ যা দৈনন্দিনতা (‘গেরস্থালি চোখ’) মুছে দিতে পারে, নতুন সৃজনশীলতা (‘আশ্বিন’) দিতে পারে। কিন্তু এই রক্তকরবী শুধু লোককথা ও পুরাণে বর্ণিত নয়; তার সন্ধানে কবিকে পাড়ি দিতে হয় রোগ, দারিদ্র্য, দস্যুতা, ধ্বংস ও নিরবতার দেশ। তিনি দেখেন কীভাবে নিপীড়িত মানুষ (অন্ধ, শ্রমজীবী, ভীতু নারী) রক্তকরবীর নাম বলে, তার উপর ভরসা রাখে। কিন্তু তাদের নির্দেশনা ও ভীতু দৃষ্টির সূত্র ধরে কবি যখন রক্তকরবীকে খুঁজে পান, তখন সে ‘পাগলিদের সেলে’ বন্দী। এর অর্থ হতে পারে: সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্য, মুক্তি বা সত্যগুলোকে সমাজই ‘পাগল’ বলে চিহ্নিত করে আটকে রেখেছে। অথবা, উদ্ধারের আশা নিজেই একটি পাগলামি, যা একটি সেলে (মানসিক বা শারীরিক কারাগার) বন্দী। সুতরাং, বিষয়বস্তু হল আশা ও বাস্তবতার, পুরাণ ও সত্যের, অন্বেষণ ও আবিষ্কারের এক জটিল দ্বন্দ্ব।
জয়দেব বসু কে?
জয়দেব বসু (১৯০৯-১৯৬৯) ছিলেন একজন বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘মরিচিকা’, ‘ধ্বংসলীলা’, ‘কল্পলতা’ উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর কবিতায় আধুনিক নগরজীবন, যুদ্ধ, মানবিক সংকট ও রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রকাশ পেত।
রক্তকরবী কবিতা কেন বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ?
এই কবিতাটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বাংলা কবিতায় রূপকের এক অদ্বিতীয় ব্যবহার উপস্থাপন করেছে। রক্তকরবী একটি ফুলের নাম হলেও এটি এখানে বহুস্তরীয় অর্থ ধারণ করেছে: এটি প্রেম, সৌন্দর্য, মুক্তি, বিপ্লব, আশা — সবকিছুরই প্রতীক হতে পারে। দ্বিতীয়ত, কবিতাটি একটি সম্পূর্ণ সমাজ-মানচিত্র অঙ্কন করেছে খুব অল্প শব্দে: মেঝেন, কুষ্ঠা, দস্যু, ভগ্ন বন্দর, অন্ধ, শ্রমজীবী, গৃহিণী, পাগল — এসব চরিত্র বা স্থান সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি ও পীড়নকে নির্দেশ করে। তৃতীয়ত, কবিতাটির সমাপ্তি অত্যন্ত বিস্ময়কর ও চিন্তা-উদ্দীপক: যে সত্তাকে খুঁজে বেড়ানো হচ্ছিল, সে শেষ পর্যন্ত ‘পাগলাগারদে’ আবিষ্কৃত হল। এটি পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং সমাজের ‘স্বাভাবিকতা’ ও ‘পাগলামি’ এর সংজ্ঞা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। চতুর্থত, কবিতাটি গদ্য-কবিতার সীমাকে অতিক্রম করে একটি মহাকাব্যিক যাত্রার অনুভূতি দেয়, যা বাংলা কবিতায় তখন তুলনামূলকভাবে নতুন ছিল। এটি জয়দেব বসুকে বাংলা আধুনিক কবিতায় এক স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছে।
জয়দেব বসুর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো কী?
জয়দেব বসুর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: ১) জটিল ও বহুমাত্রিক রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার, ২) সমাজ, রাজনীতি ও মানবিক সংকটের প্রতি গভীর দৃষ্টি, ৩) গদ্যের নৈকট্য কিন্তু কাব্যিক ঘনত্ব বজায় রাখা, ৪) পুরাণ, ইতিহাস ও সমকালীনতার সমন্বয়, ৫) একটি গাঢ় নৈরাশ্যবোধ বা ট্র্যাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, ৬) মানবমনের জটিলতা ও দ্বন্দ্বের অনুসন্ধান, এবং ৭) ভাষার প্রতি এক ধরনের নির্মোহ ও শিল্পসচেতন态度।
রক্তকরবী কবিতা থেকে আমরা কী শিক্ষা লাভ করতে পারি?
এই কবিতা থেকে আমরা নিম্নলিখিত শিক্ষাগুলো লাভ করতে পারি: ১) লোককথা ও পুরাণে বর্ণিত মুক্তি বা সৌন্দর্যের প্রতীক (‘রক্তকরবী’) কে খুঁজতে গেলে সমাজের কঠিন ও কুৎসিত রূপগুলোর (রোগ, দারিদ্র্য, শোষণ) মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ২) সমাজের নিপীড়িত মানুষেরা (অন্ধ, শ্রমিক, গৃহিণী) প্রায়শই সেই মুক্তির প্রতীকের উপর ভরসা রাখে, তাদের ‘লুপ্ত প্রার্থনা’ জাগিয়ে রাখে। ৩) কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় সেই প্রতীক বা আশা নিজেই সমাজের দ্বারা ‘পাগল’ আখ্যা পেয়ে কারাগারে বন্দী (‘পাগলিদের সেলে’)। এটি আমাদের সমাজ কীভাবে বিকল্প চিন্তা বা সৌন্দর্যকে ‘পাগলামি’ বলে দমন করে, তার একটি চিত্র। ৪) সত্য বা সৌন্দর্যের সন্ধানে যাত্রা ব্যক্তিগত নয়, সে যাত্রায় সমগ্র সমাজের চিত্র ফুটে ওঠে। ৫) ‘নন্দিনী’ (কন্যা) বলে সম্বোধন করার মধ্য দিয়ে কবি রক্তকরবীকে এক ধরনের মাতৃসুলভ বা সৃজনশীল শক্তির প্রতীক করেছেন, যা সমাজের গর্ভে লালিত কিন্তু কারাগারে আবদ্ধ। ৬) কবিতাটি আমাদের সমাজের ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’ এর সংজ্ঞা, এবং ‘পাগলাগারদ’ এর রূপক অর্থ নিয়ে ভাবতে শেখায়।
জয়দেব বসুর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা ও রচনা কোনগুলো?
জয়দেব বসুর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা ও রচনার মধ্যে রয়েছে: ‘মরিচিকা’, ‘ধ্বংসলীলা’, ‘কল্পলতা’, ‘উত্তরফাল্গুনী’, ‘শিলালিপি’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ। তিনি প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক রচনাও লিখেছেন। তাঁর কবিতাগুলো বাংলা আধুনিক কবিতার জটিল ধারার অন্তর্গত।
রক্তকরবী কবিতা পড়ার উপযুক্ত সময় কোনটি?
এই কবিতা পড়ার উপযুক্ত সময় হলো যখন কেউ সমাজ, দর্শন বা মনস্তত্ত্ব নিয়ে গভীর চিন্তা করছেন। কবিতাটি জটিল রূপকময়, তাই একাগ্রতা ও সময় নিয়ে পড়া দরকার। রাতের শান্ত পরিবেশে বা একাকী সময়ে পড়লে কবিতার গূঢ়ার্থ ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়। সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান বা মনস্তত্ত্বের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও এই কবিতা বিশেষভাবে শিক্ষণীয়।
রক্তকরবী কবিতা বর্তমান সমাজে কতটা প্রাসঙ্গিক?
বর্তমান সমাজে এই কবিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের বিশ্বেও আমরা বিভিন্ন ‘রক্তকরবী’ খুঁজি — হতে তা সামাজিক ন্যায়, রাজনৈতিক মুক্তি, ব্যক্তিগত শান্তি বা পরিবেশগত সুস্থতা। কিন্তু সেই খোঁজে আমাদের পাড়ি দিতে হয় ‘দগ্ধ ধানখেত’ (জলবায়ু সংকট), ‘দস্যুদের তাঁবু’ (লুটেরা পুঁজিবাদ), ‘ভগ্ন বন্দর’ (অব্যবস্থাপনা), এবং ‘কুষ্ঠে খশা গ্রাম’ (বৈষম্য ও রোগ)। আজও সমাজের ‘অন্ধ’রা (নির্যাতিত মানুষ) তাদের ‘দোহা’ (প্রতিবাদ বা শিল্প) লিখে যায়, এবং তারা ‘রক্তকরবী’র নাম বলে — একটি ভবিষ্যতের আশা করে। কিন্তু কবিতার চূড়ান্ত বার্তা আজও ভয়ংকরভাবে সত্য: যে সত্য বা সৌন্দর্য আমরা খুঁজি, তা হয়তো সমাজের ‘পাগলাগারদে’ বন্দী — মানসিক রোগের ক্লিনিকে, কারাগারে, বা সামাজিক ভিন্নমত দমনের ব্যবস্থায়। ‘পাগলিদের সেলে’ রক্তকরবীকে খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি আজকের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, রাজনৈtical বন্দী, বা ভিন্নচিন্তার দমননীতির সাথে সরাসরি মেলে। তাই কবিতাটি আজও আমাদের সচেতন করে: আমরা কী খুঁজছি, এবং কীভাবে সমাজ সেই খোঁজাকে ব্যাহত বা বন্দী করছে।
রক্তকরবী কবিতার গুরুত্বপূর্ণ পঙ্ক্তি বিশ্লেষণ ও তাৎপর্য
“তোমার কথা শুনেছি কতবার/ কত যে লোক বলে তোমার নাম,/ আমি ছিলাম নির্বাপিত দেশে/ আমি কি আর তোমায় চিনতাম!” – সূচনায় কবি রক্তকরবীর প্রচলিত খ্যাতি ও নিজের অজ্ঞতার কথা বলেছেন। ‘নির্বাপিত দেশ’ হলো নিভে যাওয়া, উদ্যমহীন জীবন বা সমাজ। সেখানে থেকেও তিনি রক্তকরবীর নাম শুনেছেন, কিন্তু চিনতে পারেননি। এটি অস্তিত্বহীন কিন্তু কথিত এক সত্তার প্রতি আকর্ষণ।
“পুরাণে বলে, লোককথায় বলে—/ আসবে তুমি, কখনো, কোনোদিন/ মুছিয়ে দেবে গেরস্থালি চোখ,/ অনামিকায় ফোটাবে আশ্বিন।” – পুরাণ ও লোককথায় রক্তকরবীর ভবিষ্যদ্বাণী। ‘গেরস্থালি চোখ’ দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি ও সংকীর্ণতা। রক্তকরবী তা মুছে দেবে। ‘অনামিকায় আশ্বিন ফোটানো’ বলতে একটি আঙুলে শরৎকালের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা — অর্থাৎ ব্যক্তিগত অঙ্গে নতুন সৃষ্টি ও প্রাণবন্ততা আনা।
“পেরিয়ে গেছি মেঝেনদের দেশ,/ পেরিয়ে গেছি কুষ্ঠে খশা গ্রাম” – কবির যাত্রার শুরু। ‘মেঝেনদের দেশ’ সম্ভবত একটি প্রান্তিক উপজাতির অঞ্চল। ‘কুষ্ঠে খশা গ্রাম’ রোগ ও অনুর্বরতায় পীড়িত গ্রাম। এগুলো সমাজের রোগ, দারিদ্র্য ও প্রান্তিকতার প্রতীক।
“জানো কি তুমি, অনেকে এখানেও/ ফিসফিসিয়ে বলে তোমার নাম!” – আশ্চর্যের বিষয়, এই পীড়িত অঞ্চলেও মানুষ রক্তকরবীর নাম ফিসফিসিয়ে বলে — অর্থাৎ নিপীড়িতরাও মুক্তির আশা রাখে।
“পেরিয়ে গেছি দস্যুদের তাঁবু,/ পেরিয়ে গেছি ভগ্ন বন্দর” – ‘দস্যুদের তাঁবু’ বলতে শোষক, লুণ্ঠনকারী গোষ্ঠী। ‘ভগ্ন বন্দর’ যোগাযোগ, বাণিজ্য বা আশার ধ্বংসস্তূপ।
“সেখানে রোজ বালিতে দোহা লেখে/ বিলাপরত দু’জন অন্ধ।” – ভগ্ন বন্দরে দুজন অন্ধ ব্যক্তি বালিতে ‘দোহা’ (দ্বিপদী কবিতা) লেখে ও বিলাপ করে। এটি এক ধরনের নিরর্থক কিন্তু আবেগী সৃজনশীলতা — যারা দেখতে পায় না তারাও শিল্প সৃষ্টি করে, কিন্তু তা বালিতে লেখা, তাই তা টিকবে না।
“তাদের থেকে তোমার নাম করে/ টুকে নিয়েছি লুপ্ত প্রার্থনা,/ না-হলে ঐ হতভাগ্যদের/ মনোবিকার কখনো সারত না।” – কবি সেই অন্ধদের কাছ থেকে রক্তকরবীর নামে করা ‘লুপ্ত প্রার্থনা’ (হারিয়ে যাওয়া প্রার্থনা) টুকে নিয়েছেন। তাদের ‘মনোবিকার’ (মানসিক ব্যাধি) সারানোর একমাত্র উপায় ছিল এই নাম উচ্চারণ। এটি দেখায় কীভাবে আশা বা বিশ্বাস মনস্তাত্ত্বিক রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।
“পেরিয়ে গেছি নিশানরাঙা পথ,/ কোথায় আছো, কীভাবে আছো তুমি?” – ‘নিশানরাঙা পথ’ পতাকা-সজ্জিত পথ, সম্ভবত রাজনৈতিক আন্দোলন বা আদর্শের পথ। কবি সরাসরি রক্তকরবীকে জিজ্ঞাসা করছেন তার অবস্থান ও অবস্থা।
“পায়ের নিচে দগ্ধ ধানখেত/ পায়ের নিচে শীতল মালভূমি।” – কবির চলার পথের বিবরণ: ‘দগ্ধ ধানখেত’ (পোড়া ধানের খেত) ক্ষুধা, ধ্বংস ও হতাশার প্রতীক; ‘শীতল মালভূমি’ উচ্চ, নির্জন ও শীতল স্থান — সম্ভবত একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতার প্রতীক।
“চেরাগ হাতে নানান দেশে যারা/ ঘুরে বেড়ায়, সাত-সুলুক রাখে,/ তারা বলেছে, ‘আমরা কেউ নই,/ সেই মেয়েরা চিনতে পারে তাঁকে।'” – ‘চেরাগ হাতে’ যারা ঘুরে বেড়ায় তারা হয়তো সন্ন্যাসী, ফকির বা সত্যান্বেষী। তারা ‘সাত-সুলুক’ (সাতটি তালা, গোপন রহস্য) রাখে। তারা দাবি করে যে তারা নিজেরা কেউ নন, কিন্তু ‘সেই মেয়েরা’ (সম্ভবত সমাজের সাধারণ, প্রান্তিক নারীরা) রক্তকরবীকে চিনতে পারে। এটি নারীর অন্তর্দৃষ্টি বা প্রান্তিকের জ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়।
“যাদের হাত ফ্যাকাশে হয় ক্ষারে,/ যাদের হাত চুলোতে স্যাঁকা হয়,/ যাদের খুব কথা বলার সাধ/ কথা বলতে যাদের আরো ভয়…” – শ্রমজীবী (যারা রাসায়নিক/ক্ষারে কাজ করে হাত ফ্যাকাশে করে) এবং গৃহিণী (যাদের হাত চুলায় সেঁকা লাগে) নারীদের কথা। তাদের কথা বলার ইচ্ছা আছে কিন্তু ভয়ও আছে — এটি নারীর দমিত কণ্ঠস্বরের প্রতীক।
“তাদের সাথে যখন দেখা হল/ তখন ভীতু দৃষ্টি অনুসারে/ মানচিত্রে পথ বসিয়ে আমি/ একছুট্টে, তেরো-নদীর পারে—“ – এই ভীতু নারীদের ‘দৃষ্টি’র ইঙ্গিত অনুসারে কবি মানচিত্রে পথ নির্ধারণ করেন এবং দ্রুত (‘একছুট্টে’) ‘তেরো-নদীর পারে’ চলে যান। ‘তেরো-নদীর পারে’ একটি পৌরাণিক বা কল্পিত দূরবর্তী স্থান, যেখানে রক্তকরবী থাকতে পারে।
“মস্ত এক পাঁচিল পার হয়ে/ পরের পর দরজা ঠেলে-ঠেলে/ খুঁজে পেলাম—তোমাকে, নন্দিনী,/ নিখোঁজ এই পাগলিদের সেলে।” – কবিতার চূড়ান্ত ও চমকপ্রদ সমাপ্তি। কবি একটি বিরাট প্রাচীর (‘মস্ত এক পাঁচিল’) পার হয়ে একের পর এক দরজা ঠেলে শেষে রক্তকরবীকে খুঁজে পান ‘পাগলিদের সেলে’ (পাগলাগারদে), এবং তাকে ‘নন্দিনী’ (কন্যা) বলে ডাকেন। এই আবিষ্কার গভীরভাবে বিদ্রূপাত্মক ও মর্মস্পর্শী: যে রক্তকরবীকে মুক্তিদাত্রী হিসেবে খোঁজা হচ্ছিল, সে নিজেই সবচেয়ে বন্দী অবস্থায় (‘নিখোঁজ’) পাগলাগারদে আবদ্ধ। এটি সমাজে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’ এর সংজ্ঞার উপর প্রশ্ন তোলে।
রক্তকরবী কবিতার সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য
রক্তকরবী কবিতাটি জয়দেব বসুর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি শক্তিশালী প্রকাশ। এটি নিম্নলিখিত দিকগুলো উন্মোচন করে:
১. সমাজের একটি সম্পূর্ণ মানচিত্র: কবি তাঁর যাত্রায় সমাজের প্রায় সব স্তরের প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র উপস্থাপন করেছেন: প্রান্তিক উপজাতি (মেঝেন), রোগগ্রস্ত গ্রাম (কুষ্ঠ), শোষক গোষ্ঠী (দস্যু), ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো (ভগ্ন বন্দর), প্রতিবাদী শিল্পী (অন্ধ দোহাকার), আদর্শবাদী সন্ন্যাসী (চেরাগ হাতে), শ্রমজীবী ও গৃহিণী নারী, এবং সর্বশেষে পাগলাগারদে বন্দী ব্যক্তিরা। এটি এক ধরনের সামাজিক এপিক।
২. ‘রক্তকরবী’ এর বহুমাত্রিকতা: রক্তকরবী এখানে কেবল একটি ফুল নয়। এটি হতে পারে: (ক) প্রেম বা সৌন্দর্যের প্রতীক, (খ) সামাজিক মুক্তি বা বিপ্লবের প্রতীক, (গ) মানসিক স্বাস্থ্য বা সারল্যের প্রতীক, (ঘ) একটি আদর্শ বা ইউটোপিয়ার প্রতীক, (ঙ) কবিতাই বা শিল্প নিজেই। এর বহুমুখীতাই কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে।
৩. পুরাণ ও বাস্তবতার সম্মিলন: কবি পুরাণ ও লোককথা (‘পুরাণে বলে, লোককথায় বলে’) থেকে শুরু করে কঠিন সামাজিক বাস্তবতা (‘কুষ্ঠে খশা গ্রাম’, ‘দগ্ধ ধানখেত’) পর্যন্ত নিয়ে গেছেন, এবং দেখিয়েছেন কীভাবে পুরাণের আশা বাস্তবের কাঠিন্যে হারিয়ে যায়, আবার বাস্তবের মানুষও পুরাণের আশা ধরে রাখে।
৪. নারীর ভূমিকা ও দৃষ্টি: কবিতায় নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ‘সেই মেয়েরা চিনতে পারে তাঁকে’ — এখানে সাধারণ নারীর অন্তর্দৃষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার, শ্রমজীবী ও গৃহিণী নারীদের ‘ভীতু দৃষ্টি’ই কবিকে সঠিক পথ দেখায়। শেষে রক্তকরবীকে ‘নন্দিনী’ (কন্যা) বলে সম্বোধন করা — এটিও নারীসুলভ সৃজনশীল শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা।
৫. ‘পাগলাগারদ’ এর রূপক: কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হল এর চূড়ান্ত আবিষ্কার: রক্তকরবী ‘পাগলিদের সেলে’। এটি একইসাথে: (ক) সমাজের দ্বারা ‘পাগল’ আখ্যাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রতি সমবেদনা, (খ) সমাজে প্রকৃত সত্য বা সৌন্দর্যকে ‘পাগলামি’ হিসেবে আটকে রাখার সমালোচনা, (গ) মানসিক রোগ বা বিকৃতি হিসেবে দেখা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি প্রশ্ন, এবং (ঘ) কবি বা শিল্পীর নিজের অবস্থান — যিনি হয়তো ‘পাগল’ বলে বিবেচিত হন কারণ তিনি ভিন্ন দেখেন।
৬. যাত্রাকাহিনী হিসেবে কবিতা: কবিতাটি একটি আধুনিক যাত্রাকাহিনী (Quest Narrative) এর কাঠামো অনুসরণ করে: একজন নায়ক (কবি) একটি কাঙ্ক্ষিত বস্তু (রক্তকরবী) এর সন্ধানে যাত্রা করেন, বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করেন, গাইড বা সংকেত পান, এবং শেষে গন্তব্যে পৌঁছান, কিন্তু গন্তব্যটি আশাতীত ও বিদ্রূপাত্মক হয়। এটি বাংলা কবিতায় এই ধরনের গঠনের একটি দুর্দান্ত উদাহরণ।
৭. ভাষা ও ছন্দ: কবিতাটি মুক্ত ছন্দে লেখা, কিন্তু একটি গদ্যময় গতিপ্রবাহ রয়েছে। ভাষা সরল কিন্তু চিত্রকল্পে জটিল। পুনরাবৃত্তি (‘পেরিয়ে গেছি’, ‘তোমার নাম’) একটি যাত্রার ছন্দ তৈরি করে।
কবিতাটির গভীরতা এতটাই যে একবার পড়ে বোঝা কঠিন। এটি বারবার পড়ার দাবি রাখে, এবং প্রতিবার নতুন অর্থ উন্মোচিত হতে পারে। জয়দেব বসু এই কবিতার মাধ্যমে বাংলা কবিতায় একটি অবিস্মরণীয় কীর্তি রেখে গেছেন।
রক্তকরবী কবিতা পড়ার সঠিক পদ্ধতি, বিশ্লেষণ কৌশল ও গভীর অধ্যয়ন
- কবিতাটি প্রথমে একবার সম্পূর্ণ পড়ুন এবং এর যাত্রাকাহিনীর সাধারণ গল্পটি বুঝুন: কবি কী খুঁজছেন, কী কী স্থান অতিক্রম করছেন, এবং শেষে কী পেলেন।
- দ্বিতীয়বার পড়ার সময় কবিতায় উল্লিখিত প্রতিটি স্থান বা গোষ্ঠীর (‘মেঝেনদের দেশ’, ‘কুষ্ঠে খশা গ্রাম’, ‘দস্যুদের তাঁবু’, ‘ভগ্ন বন্দর’, ‘অন্ধ’, ‘চেরাগ হাতে লোক’, ‘শ্রমজীবী নারী’, ‘পাগলাগারদ’) সামাজিক বা প্রতীকী অর্থ কী হতে পারে, তা ভাবুন।
- ‘রক্তকরবী’ শব্দটি নিজেই বিশ্লেষণ করুন। ‘রক্ত’ ও ‘করবী’ (একটি ফুল) — এই সমন্বয় কী বোঝায়? (রক্তের মতো লাল ফুল, ত্যাগ ও সৌন্দর্যের সমন্বয়, বিপদ বা জীবনীশক্তির প্রতীক ইত্যাদি)
- কবিতার শেষ দুই লাইন (‘নিখোঁজ এই পাগলিদের সেলে’) নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। কেন রক্তকরবী পাগলাগারদে? ‘পাগল’ শব্দটির প্রতি কবির attitude কী? এটি সমাজের কোন দিককে নির্দেশ করে?
- কবিতায় নারীর ভূমিকা কোথায় কোথায় এসেছে? (‘সেই মেয়েরা’, ‘হাত চুলোতে স্যাঁকা হয়’, ‘ভীতু দৃষ্টি’, ‘নন্দিনী’) — এসব থেকে কবির নারীদৃষ্টিভঙ্গি কী?
- পুরাণ ও লোককথার প্রতি কবির attitude কী? তিনি কি তাতে বিশ্বাস করেন, না সেটাকে সমালোচনার চোখে দেখেন?
- এই কবিতাকে একটি রাজনৈতিক রূপক হিসেবে পড়ার চেষ্টা করুন। রক্তকরবী যদি ‘বিপ্লব’ বা ‘মুক্তি’ হয়, তাহলে কবিতার বিভিন্ন অংশের অর্থ কী দাঁড়ায়?
- জয়দেব বসুর অন্যান্য কবিতা বা তাঁর যুগের অন্যান্য প্রগতিশীল কবিতার সাথে এই কবিতার তুলনা করুন।
- কবিতাটিকে একটি ছোট চলচ্চিত্র বা নাটকের স্ক্রিপ্ট হিসেবে কল্পনা করুন — প্রতিটি স্তবক একটি দৃশ্য। কীভাবে আপনি এটি দৃশ্যায়িত করবেন?
- শেষে, এই কবিতা পড়ে আপনার মনে যে প্রধান প্রশ্ন বা আবেগ জাগে, তা লিখে রাখুন বা আলোচনা করুন।
জয়দেব বসুর সাহিত্যকর্ম ও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা
- কাব্যগ্রন্থ: ‘মরিচিকা’, ‘ধ্বংসলীলা’, ‘কল্পলতা’, ‘উত্তরফাল্গুনী’, ‘শিলালিপি’।
- প্রবন্ধ ও গবেষণা: সাহিত্য সমালোচনা ও গবেষণামূলক রচনা।
- সম্পাদনা: সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা।
- শিক্ষকতা: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপনা।
রক্তকরবী কবিতা নিয়ে শেষ কথা ও সারসংক্ষেপ
রক্তকরবী কবিতাটি জয়দেব বসুর কবিতাজগতের একটি চূড়ান্ত উচ্চারণ, যা তাঁর দার্শনিক গভীরতা, সামাজিক দৃষ্টি ও শিল্পকুশলতার অনন্য নিদর্শন। এটি শুধু একটি কবিতা নয়; এটি একটি যুগ, একটি সমাজ ও এক মানবমনের এক জটিল রূপক আখ্যান। কবি একটি নাম, একটি প্রতীকের (‘রক্তকরবী’) সন্ধানে বেরিয়েছেন, যে প্রতীক পুরাণে বর্ণিত, লোকমুখে প্রচারিত, এবং নিপীড়িত মানুষের প্রার্থনায় জড়িত। কিন্তু এই সন্ধানে তাঁকে পার হতে হয়েছে রোগ, দারিদ্র্য, শোষণ, ধ্বংস ও ভয়ের দেশ। তিনি দেখেছেন কীভাবে অন্ধ কবিরা বালিতে দোহা লেখে, কীভাবে শ্রমজীবী নারীরা ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, কীভাবে সন্ন্যাসীরা গুপ্ত রহস্য ধরে রাখে। সবাই যেন রক্তকরবীর কথা জানে বা জানার দাবি করে, কিন্তু কেউই তাকে সরাসরি চিনিয়ে দিতে পারে না।
কবির যাত্রা শেষ হয় এক চমকপ্রদ ও মর্মান্তিক আবিষ্কারে: তিনি রক্তকরবীকে খুঁজে পেয়েছেন ‘নিখোঁজ এই পাগলিদের সেলে’ — পাগলাগারদে বন্দী অবস্থায়। এই সমাপ্তি কবিতাটিকে একটি গভীর সামাজিক সমালোচনায় উন্নীত করেছে। এটি বলছে: যে সৌন্দর্য, মুক্তি বা সত্য আমরা খুঁজি, সমাজ সেটাকেই ‘পাগলামি’ বলে চিহ্নিত করে, আটকে রাখে, লুকিয়ে রাখে। অথবা, আশা ও সৌন্দর্য নিজেই হয়তো এক ধরনের ‘পাগলামি’, যা সমাজের যুক্তিবাদী কাঠামোর মধ্যে ধরা দেয় না। ‘নন্দিনী’ (কন্যা) বলে সম্বোধনের মধ্য দিয়ে কবি এই রক্তকরবীকে এক স্নেহ ও মমতার বস্তু করেছেন — সে হয়তো আমাদেরই কল্পনার সন্তান, আমাদেরই মনের সৃষ্টি, যে আমাদেরই পাগলাগারদে বন্দী।
বর্তমান সময়ে, যখন সমাজে ভিন্নমত, মানসিক স্বাস্থ্য ও শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে ক্রমাগত বিতর্ক ও সংঘাত হচ্ছে, রক্তকরবী কবিতার বার্তা আগের চেয়েও বেশি জোরালো। আমরা আজও ‘রক্তকরবী’ খুঁজি — হতে তা ন্যায়, শান্তি বা সত্য। কিন্তু আমাদেরকেও পাড়ি দিতে হয় ‘দগ্ধ ধানখেত’ ও ‘ভগ্ন বন্দর’। এবং আমরা দেখি, যে সত্য বা সৌন্দর্য আমরা চাই, তাকে সমাজের ‘পাগলাগারদে’ বন্দী রাখা হয় — হয়তো মানসিক হাসপাতালে, হয়তো কারাগারে, হয়তো সামাজিক অসম্মানে। জয়দেব বসুর এই কবিতা তাই একটি সতর্কবার্তা ও একইসাথে এক গভীর মানবিক দলিল। এটি আমাদের শেখায় যে অনুসন্ধান কখনো শেষ হয় না, এবং যে সত্য আমরা খুঁজে পাই, তা আমাদেরই তৈরি কারাগারে আবিষ্কৃত হতে পারে। বাংলা কবিতায় রক্তকরবী চিরকালই তার রহস্যময়ী, রক্তলাল উপস্থিতি জানান দেবে।
ট্যাগস: রক্তকরবী, রক্তকরবী কবিতা, জয়দেব বসু, জয়দেব বসুর কবিতা, বাংলা আধুনিক কবিতা, রূপক কবিতা, সামাজিক কবিতা, পাগলাগারদ, যাত্রাকাহিনী, বাংলা সাহিত্য






