কবিতার খাতা
যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো? – শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো।
এতো কালো মেখেছি দু হাতে
এতোকাল ধরে!
কখনো তোমার ক’রে, তোমাকে ভাবিনি।
এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে
চাঁদ ডাকে : আয় আয় আয়
এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে
চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয়
যেতে পারি
যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাবো?
সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো
যাবো
কিন্তু, এখনি যাবো না
তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো
একাকী যাবো না, অসময়ে।।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা।
কবিতার কথা-
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো?‘ কবিতাটি আত্মোপলব্ধি, জীবনের প্রতি গভীর টান, পাপবোধ থেকে মুক্তি এবং মানবিক সম্পর্কের যৌথ দায়বদ্ধতার এক অনন্য কাব্যিক দলিল। চরম হতাশা ও মৃত্যুর প্ররোচনার মুখে দাঁড়িয়েও কবি কীভাবে জীবনের বেঁচে থাকার শক্তিকে আঁকড়ে ধরেছেন, এখানে তারই এক বলিষ্ঠ প্রকাশ ঘটেছে।
কবিতার প্রারম্ভেই কবি এক তীব্র আত্মোপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। তিনি বুঝতে পারেন, অতীত জীবনের গ্লানি ও পঙ্কিলতা ঝেড়ে ফেলে এবার ঘুরে দাঁড়ানোই সঠিক পথ। এতদিন ধরে তিনি নিজের দুই হাতে প্রচুর “কালো” বা পাপ-অন্ধকার মেখেছেন। কাউকে আপন বলে দাবি করলেও, কখনোই তাকে নিঃস্বার্থভাবে অনুভব করেননি বা ভালোবাসেননি—এমন এক প্রবঞ্চনা ও আত্মগ্লানির অনুশোচনা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কণ্ঠে।
পরবর্তী চরণে কবি জীবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর এক সম্মোহনী ও প্রলুব্ধকর আহ্বানের রূপ এঁকেছেন। কোনো গভীর খাদের পাশে রাতের আঁধারে দাঁড়ালে চাঁদের আলো যেমন ডেকে বলে “আয় আয়”, কিংবা গঙ্গার তীরে গভীর নিশুতিতে দাঁড়ানো মানুষের সামনে চিতাকাঠের আগুন প্রলুব্ধ করে সংহারের দিকে—কবি সেই পরম বিচ্ছেদের ডাক শুনতে পান। মৃত্যুমুখী এই প্ররোচনা বা প্রলোভন কবিকে জীবনের ইতি টানতে প্রলুব্ধ করে।
তবে কবি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে মৃত্যুর সেই প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানেন, শেষ করে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে; চাইলেই তিনি যেকোনো দিকে বা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারেন। কিন্তু তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন—”কেন যাবো?”। জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে জীবনের পরম মায়ায় ফিরে আসার কারণ হিসেবে কবি তাঁর সন্তানের মুখখানি তুলে ধরেছেন। সন্তানের মুখে একটি স্নেহের চুমো খাওয়ার যে অফুরন্ত আনন্দ ও দায়বদ্ধতা, তা তাঁকে মৃত্যুর প্ররোচনা থেকে ফিরিয়ে আনে বাস্তবতার সতেজ ভূমিতে।
সমাপ্তির চরণে কবিতাটি এক যৌথ জীবনদর্শন ও সামাজিক চেতনার পূর্ণতা পায়। কবি চলে যাবেন ঠিকই, কারণ মৃত্যু এক স্বাভাবিক পরিণতি; কিন্তু তা অসময়ে বা একা একা নয়। জীবনকে ফেলে নিঃসঙ্গভাবে পালিয়ে যাওয়ার নাম জীবন নয়। কবি যা কিছু করবেন—জীবনের আনন্দ উদযাপন কিংবা অন্তিম যাত্রা—সবকিছুই পরিজন, সমাজ ও চেনা মানুষদের সঙ্গে নিয়ে, সঠিক সময়ে ও পূর্ণতা নিয়ে করবেন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় মূলত এই কবিতায় প্রাহ্নিক হতাশা, অবক্ষয় ও মৃত্যুর ডাককে অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত জীবন, সন্তানস্নেহ এবং পারস্পরিক ভালোবাসার বিজয়গাথা ঘোষণা করেছেন।






