(কবি এই কবিতাটি লেখেন তাঁর স্ত্রী কবি মল্লিকা সেনগুপ্তর, ভয়ানক ব্যধি ক্যানসারে মৃত্যুর পর। কবিতাটি প্রকাশিত হয়
“দেশ” পত্রিকার সেপ্টেম্বর ২০১১-র সংখ্যায়।)
তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
কিন্তু তোমার আঁচলে নদীর আত্মজীবনী লেখা রইল |
বিছানার নীচ থেকে কয়েক লক্ষ কর্কট
বিছানা-সমেত তোমাকে তুলে নিয়ে চলেছে মহাকাশযানে |
ম়ৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে তাও তুমি কাজল পড়েছ,
কাজল ও কান্নার মাঝখানে তোমার মুখে এক চামচ জল
হ্যাঁ, আমি এক চামচ জল হয়ে
এক চামচ অন্তর্জলী হয়ে, এক চামচ অঞ্জলি হয়ে,
তোমার ভেতরে একটা পূর্ণিমায় ভেসে যাওয়া
বিমানবন্দরে আমি বসে থাকতে চেয়েছিলাম |
আমি বলেছিলাম এটা বিমানবন্দর নয়
এটা একটা গ্রাম, লোকে বিরহী বলে ডাকে
এখানেই আমরা জীবনে প্রথম চুম্বন করেচিলাম
তুমি ছিলে চাবুকের মত তেজি এবং সটান
বেতস পাতার মতো ফার্স্ট ইয়ার এবং সেনসুয়াল কাঠবেড়ালি
বৃষ্টিতে ভিজলে তোমাকে আন্তিগোনের মতো দেখাত |
আমি ছিলাম গাঙচিল,
দু’লাইন কাফকা পড়া অসংগঠিত আঁতেল |
তুমি যমুনার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
ডাক্তার তোমার হাতের শিরা খুঁজে পায়নি |
দোষ তোমার নয়, ডাক্তারের
এতবার তোমার শরীর ফুটো করেছিল ওরা
ইরাকের মৃত্তিকাও অতবার বার ফুটো করেনি আমেরিকা
কিন্তু তোমার ধমনী আসলে একটা নদীর আত্মজীবনী
তুমি তিস্তার একটা ঢেউ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
আমার মাছরাঙা সেই ঢেউয়ের ভেতর আটকে গেছে |
সেই মাছরাঙার ঠোঁটে তোমার সংসার
বোরো যেখানে নিউক্লিয়ার ফিজিক্স না পড়ে পড়ছে সাতটি তারার
. তিমির |
কিন্তু আমি নদীর পলিমাটি মেখে , হারে রে রে রে রে
একদিন শহরে ঢুকে পড়েছিলাম
কার্জন পার্কে শুয়ে কালপুরুষের সঙ্গে তর্ক করেছি
এসে দাঁড়ালেন বাত্সায়ন এবং নিৎসে
কালপুরুষ বলল, নাও, দুই মহান খচ্চর এসে গেছে,
যৌনতা এবং মৃত্যু
ওরা দুই সহোদর, কে তোমাকে বেছে নেয় সেটাই তোমার
. সেমিফাইনাল
ডব্লু, ডব্লু, ডব্লু ড্যাশ ডটকম |
রাত দুটোর এ্যাম্বুলেন্সের ভেতর বসে আমি তোমার
হাত দুটি ধরে বলেছিলাম, বলো কোথায় কষ্ট ?
তুমি বলেছিলে, কৃষ্ণচূড়ায়, পারমানবিক পলিমাটিতে
তোমার অসংখ্য জুঁইফুলে জ্বালা করছে |
হাত থেকে একটানে চ্যানেল খুলে ফেলে বললে,
আমাকে বাঁচাও, ভালবাসা, আমি বাঁচতে চাই |
পৃথিবীতে আমি একটু শিউলির গন্ধ পেতে পারি ?
আমার নাক থেকে রাইস টিউব সরিয়ে দাও |
আমি বললাম এটা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট,
এখানে কোনও শিউলি গাছ নেই |
তুমি বললে, ছেলেটা কোথায় গেল, কার সঙ্গে গেল ?
ওকে একটু দেখো,রাত করে বাড়ি ফিরো না |
নার্সিংহোমের বারান্দায় বসে আমি একা, একেবারে একা
‘দ্য এম্পারার অফ অল ম্যালাডিজ’ পড়ছিলাম |
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার, তুমি ঠিক বলেছ
অন্ধকারে দাবা খেলছেন সারা পৃথিবীর অনকোলজিস্ট
উল্টোদিকে এ্যান্টিচেম্বার ড্রাগ-মাফিয়ারা বসে আছে
মানুষের গভীরতম দুঃখ যাদের ব্যবসা |
তুমি আমাকে বারবার বলতে সিগারেট খেও না
আমি উড়িয়ে দিয়ে বলতাম, আমরা সবাই চিমনি সুইপার
আমরা কার্বনের সঙ্গে প্রণয় আর প্রণয়ের সঙ্গে
মেটাস্টেসিস বহন করে চলেছি |
কে একদিন রাস্তা থেকে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে আসবে
তার আগে আজ, এখনই, আমি প্রজাপতিদের সঙ্গে দৌড়তে চাই,
আজ, এখনই মিলন করতে চাই, আশিরনখ মিলন
দেবতা না চড়ুই, কে দেখে ফেলল, কিছু যায় আসে না |
মনে নেই আমরা একবার ভাঙা মসজিদে ঢুকেছিলাম
প্রচুর সাপের ভিতর আল্লা পা ছড়িয়ে বসে কাঁদছিলেন |
বললেন, আয় পৃথিবীতে যাদের কোনও জায়গা নেই
আমি তাদের জুন্নত এবং জাহানারার মাঝখানে
একটা বিকেল বাঁচিয়ে রেখেছি ভালবাসার জন্য
গাছ থেকে ছিড়ে আনা আপেলে কামড় দিবি বলে |
তুমি তমসার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
কিন্তু তোমার আঁচল ধরে টানছে ছেলের উচ্চমাধ্যমিক |
ছেলে বলছে, মা, আমাকে কুজ্ঝটিকা বানান বলে দিয়ে যাও
আইসিইউ-তে কেউ কুজ্ঝটিকা বানান বলতে পারে না |
ছেলের বাবা বসে আছে, মেডিক্যাল বোর্ড বসেছে বারোতলায়
যেন হাট বসেছে বক্সিগঞ্জে, পদ্মাপারে |
কে যেন বলল, আরে বেরিয়ে আসুন তো ফার্নেস থেকে,
এরা পিঁপড়ে ধরতে পারে না, কর্কট ধরবে ?
একটা পানকৌড়ি ডুব দিচ্ছে গগনবাবুর পুকুরে
কেমোথেরাপির পর তোমাকে গোয়ায় নিয়ে গিয়েছিলাম |
একটা কোঙ্কনি কবিকে বললে, ‘পানকৌড়ি দেখাও’,
একটা পর্তুগিজ গ্রামে গিয়ে কী দেখেছিলে আমাকে বলনি |
তুমি জলঢাকার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
যে বড় বড় টিপ পরতে তারা গাইছে, আমার মুক্তি আলোয় আলোয় |
তুমি সুবর্ণরেখার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
তোমার লিপস্টিক বলছে, আমাদের নিয়ে চলো আয়না |
তুমি রোরো নামে একটা চাইবাসার নদী ছেড়ে চলে যাচ্ছ
সে বলছে, মা দাঁড়াও, স্কুল থেকে এক্ষনি মার্কশিট তুলে আসছি |
তুমি ভল্গা নামে একটা নদীর অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ
পারস্যের রানি আতোসা তোমায় ডাকছে
পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর স্তন ছিল রানি আতোসার
কাটা হয়েছিল খড়গ দিয়ে, কেটেছিল এক গ্রিক ক্রিতদাস |
ইস্তানবুলের নদী বসফরাস ছেড়ে তুমি চলে যাচ্ছ
তোমার এক পা ইউরোপ, এক পা এশিয়া |
তুমি জিপসিদের হাটে তেজপাতা-মোড়ানো ওষুধ আনতে চলেছ
ইহুদি মেয়েরা তোমাকে নিয়ে গুহায় ঢুকে গেল |
জিপসিরাই পৃথিবীতে প্রথম ব্যথার ওষুধ কুড়িয়ে পেয়েছে
তোমার বিশ্বাস ছিল শেষ ওষুধটাও ওরাই কুড়িয়ে আনবে |
শেষ একটা ওষুধের জন্য গোটা মানবজাতি দাঁড়িয়ে আছে
যে সেটা কুড়িয়ে আনবে, সে বলবে, দাঁড়াও
আমি একটা আগুনের মধ্যে দিয়ে আসছি
বাবাকে বারণ করো হাসপাতালে বসে রাত জাগতে |
আমাকে য়দি কোনও ম্যাটাডোর বা মার্সিডিজ ধাক্কা না মারে
ভোর হওয়ার আগে আমি যে করে হোক শহরে ঢুকব |
এমন একটা অসুখ যার কোনও ‘আমরা ওরা’ নেই
ভিখিরি এবং প্রেসিডেন্টকে একই ড্রাগ নিতে হবে |
ডাক্তার, ভাল যদি নাই পারো এত সুঁচ ফোটালে কেন ?
সুঁচগুলো একবার নিজের পশ্চাতে ফুটিয়ে দেখলে হত না ?
তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ, সত্যি চলে যাচ্ছ—–
রোরো তোমার আঁচল ধরে আছে, আমি তোমার রোদ্দুর ।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকার।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে – সুবোধ সরকার | ক্যান্সার, প্রেম ও শোকের মহাকাব্যিক কবিতা বিশ্লেষণ
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি সুবোধ সরকারের একটি গভীর শোক, প্রেম, প্রতিবাদ ও দার্শনিক অভিজ্ঞতার মহাকাব্যিক রচনা। সুবোধ সরকার রচিত এই কবিতাটি তাঁর স্ত্রী ও কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের কর্কট রোগে (ক্যান্সার) মৃত্যুর পর লেখা একটি শোকগাথা, যা শোককে অতিক্রম করে জীবন, মৃত্যু, চিকিৎসাব্যবস্থা, প্রেম ও সৃষ্টির এক অনন্য কাব্যিক মহাকাব্যে পরিণত হয়েছে। “তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ/ কিন্তু তোমার আঁচলে নদীর আত্মজীবনী লেখা রইল |” — এই সূচনার মাধ্যমেই কবি মৃত্যুকে একটি নদীর অংশ ছেড়ে যাওয়ার মতো প্রাকৃতিক, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অসহনীয় একটি ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কেবল একটি শোকের কবিতা নয়; এটি একটি চিকিৎসা-বিরোধী কবিতা, একটি প্রেমের দলিল, একটি সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক প্যানোরামা এবং শেষ পর্যন্ত একটি মানবিক বিদ্রোহের উচ্চারণ। কবিতাটির ব্যাপ্তি, চিত্রকল্পের বৈচিত্র্য, এবং আবেগের তীব্রতা বাংলা সাহিত্যে তুলনাহীন। এটি বাংলা ভাষায় ক্যান্সার ও মৃত্যুকে নিয়ে লেখা সবচেয়ে শক্তিশালী, বহুমাত্রিক ও শিল্পসফল কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতার কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতাটি একটি দীর্ঘ, বহুস্তরীয়, মুক্তছন্দের কবিতা, যা একাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিত্র, স্মৃতি, রূপক ও কথোপকথনের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। কবিতাটির কেন্দ্রীয় ঘটনা হল কবিপত্নী মল্লিকা সেনগুপ্তের ক্যান্সারে মৃত্যু, এবং সেই যাত্রা ও তার পরবর্তী সময়ে কবির মানসিক অবস্থা। কবি বিভিন্ন রূপকের মাধ্যমে মৃত্যু ও বিচ্ছেদকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। প্রথমেই তিনি নদীর রূপক ব্যবহার করেছেন: “তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ” — অর্থাৎ, মল্লিকা গঙ্গার (জীবনের) একটি অংশ, কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁর ‘আঁচলে’ নদীর আত্মজীবনী লেখা রইল — তাঁর সৃষ্টি, তাঁর স্মৃতি রয়ে গেল। দ্বিতীয় চিত্রটি ভয়ঙ্কর: “বিছানার নীচ থেকে কয়েক লক্ষ কর্কট/ বিছানা-সমেত তোমাকে তুলে নিয়ে চলেছে মহাকাশযানে |”। ‘কর্কট’ এখানে দ্ব্যর্থক — একদিকে ক্যান্সার (কর্কট রোগ), অন্যদিকে কাঁকড়া (প্রাণী)। কয়েক লক্ষ কাঁকড়া/ক্যান্সার তাঁকে মহাকাশযানে (মৃত্যুর দিকে) নিয়ে যাচ্ছে। তারপর আসে কবিতার শিরোনামের চরণ: “মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে তাও তুমি কাজল পড়েছ,/ কাজল ও কান্নার মাঝখানে তোমার মুখে এক চামচ জল”। এই চিত্রটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী: মৃত্যুর আগেও নারীর সৌন্দর্য চর্চা (কাজল পরা), কিন্তু তা কান্নার সাথে মিশে আছে, এবং শেষ পানীয় হিসেবে এক চামচ জল। কবি নিজেকে সেই জল বলে পরিচয় দেন: “হ্যাঁ, আমি এক চামচ জল হয়ে/ এক চামচ অন্তর্জলী হয়ে, এক চামচ অঞ্জলি হয়ে,/ তোমার ভেতরে একটা পূর্ণিমায় ভেসে যাওয়া”। এরপর কবি তাদের প্রেমের স্মৃতিতে ফিরে যান: ‘বিমানবন্দর’ যা আসলে একটি ‘গ্রাম’, যেখানে তারা প্রথম চুম্বন করেছিল। তিনি মল্লিকাকে ‘চাবুকের মত তেজি’, ‘বেতস পাতার মতো ফার্স্ট ইয়ার’, ‘সেনসুয়াল কাঠবেড়ালি’, এবং ‘আন্তিগোনের মতো’ (গ্রিক ট্র্যাজেডির নারী চরিত্র) বলে বর্ণনা করেন। নিজেকে বলেন ‘গাঙচিল’ ও ‘দু’লাইন কাফকা পড়া অসংগঠিত আঁতেল’। কবি বারবার নদীর রূপক ফিরে আসেন: “তুমি যমুনার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ”, “তুমি তিস্তার একটা ঢেউ ছেড়ে চলে যাচ্ছ”, “তুমি সুবর্ণরেখার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ” — বিভিন্ন নদীর নামে মল্লিকার বিভিন্ন দিক বা পরিচয়কে নির্দেশ করা হয়েছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে: “ডাক্তার তোমার হাতের শিরা খুঁজে পায়নি”, “ইরাকের মৃত্তিকাও অতবার বার ফুটো করেনি আমেরিকা/ কিন্তু তোমার ধমনী আসলে একটা নদীর আত্মজীবনী”। এখানে যুদ্ধের (ইরাক) সাথে রোগীর দেহের উপর আক্রমণের তুলনা করা হয়েছে। কবি চিকিৎসাব্যবস্থাকে ‘ড্রাগ-মাফিয়া’ এবং ‘ব্যবসা’ বলে অভিহিত করেন। কবিতায় দার্শনিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক রেফারেন্সের প্রাচুর্য আছে: ‘কালপুরুষ’, ‘বাত্সায়ন’, ‘নিৎসে’, ‘কাফকা’, ‘আতোসা’ (পারস্যের রানি), ‘জিপসি’ ইত্যাদি। শেষের দিকে কবি একটি কাতর অনুরোধের কথা বলেন: “হাত থেকে একটানে চ্যানেল খুলে ফেলে বললে,/ আমাকে বাঁচাও, ভালবাসা, আমি বাঁচতে চাই |” এবং “পৃথিবীতে আমি একটু শিউলির গন্ধ পেতে পারি ?/ আমার নাক থেকে রাইস টিউব সরিয়ে দাও |” — এটি অসহায়ত্বের চূড়ান্ত প্রকাশ। কবিতাটি শেষ হয় পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে: “তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ, সত্যি চলে যাচ্ছ—–/ রোরো তোমার আঁচল ধরে আছে, আমি তোমার রোদ্দুর ।” ‘রোরো’ সম্ভবত তাদের সন্তান বা একটি নদী, এবং কবি নিজেকে ‘রোদ্দুর’ (সূর্যালোক) বলে ঘোষণা করেন — তিনি রয়ে গেছেন আলো হয়ে।
সুবোধ সরকারের কবিতার বৈশিষ্ট্য
সুবোধ সরকার (জন্ম ১৯৫৩) বাংলা সাহিত্যের একজন প্রগতিশীল, রাজনৈতিক সচেতন ও পরীক্ষামূলক কবি। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির জটিল সমন্বয়, ধ্বনিময় ও চিত্রময় ভাষার ব্যবহার, এবং দীর্ঘ, মহাকাব্যিক কাঠামোর প্রতি ঝোঁক। তিনি প্রায়শই চিকিৎসা, যুদ্ধ, প্রেম ও মৃত্যুর মতো বিষয়গুলোকে তাঁর কবিতায় উপস্থাপন করেন এক গভীর কাব্যিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর কবিতায় একটি বিদ্রোহী সুর ও শোকের গাম্ভীর্য একসাথে বাজে। মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতাটি তাঁর কবিতার সকল বৈশিষ্ট্যেরই চূড়ান্ত প্রকাশ: ব্যক্তিগত শোক, চিকিৎসাব্যবস্থার সমালোচনা, নদী ও প্রকৃতির রূপক, এবং একটি অমোঘ শিল্পসাফল্য।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর ও বিশদ আলোচনা
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতার রচয়িতা কে?
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতার রচয়িতা বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি সুবোধ সরকার।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু হলো কবিপত্নী মল্লিকা সেনগুপ্তের ক্যান্সারে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত গভীর শোক, প্রেমের স্মৃতি, চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি ক্রোধ, এবং মৃত্যু ও জীবন সম্পর্কিত দার্শনিক অন্বেষণ। কবিতাটি একইসাথে: ১) একটি শোকগাথা, যেখানে কবি প্রিয়তমার বিদায়কে নদীর অংশ ছেড়ে যাওয়ার মতো প্রাকৃতিক কিন্তু মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন; ২) একটি চিকিৎসা-বিরোধী কবিতা, যেখানে ক্যান্সার চিকিৎসার যন্ত্রণা, ডাক্তারদের অক্ষমতা, ওষুধ শিল্পের নৃশংসতা (‘ড্রাগ-মাফিয়া’) এর তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে; ৩) একটি প্রেমের দলিল, যেখানে দম্পতির যৌবনের স্মৃতি, প্রথম চুম্বন, এবং তাদের ব্যক্তিত্বের চিত্র (‘চাবুকের মত তেজি’, ‘গাঙচিল’) ফুটে উঠেছে; ৪) একটি সাংস্কৃতিক-দার্শনিক কবিতা, যেখানে গ্রিক পুরাণ (আন্তিগোনে), দর্শন (নিৎসে), সাহিত্য (কাফকা), ইতিহাস (রানি আতোসা) এর উল্লেখের মাধ্যমে মৃত্যু ও রোগের সার্বজনীনতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে; এবং ৫) একটি বিদ্রোহী কবিতা, যেখানে কবি মৃত্যুর বিরুদ্ধে, ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চিৎকার করেন (“আমাকে বাঁচাও, ভালবাসা, আমি বাঁচতে চাই”)। সর্বোপরি, কবিতাটি শোক থেকে জন্ম নেওয়া সৃষ্টিরও একটি উদাহরণ — মৃত্যু সত্ত্বেও ‘নদীর আত্মজীবনী’ (সৃষ্টি) রয়ে যায়।
সুবোধ সরকার কে?
সুবোধ সরকার (জন্ম ১৯৫৩) হলেন একজন ভারতীয় বাঙালি কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘হিজল ডালে চড়ে স্বর্গে যাবো’, ‘মৃতেরা পৃথিবী থেকে চলে যায়’, ‘সূর্য ইত্যাদি’ উল্লেখযোগ্য। তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে সক্রিয় এবং তাঁর কবিতায় যুদ্ধ, গণহত্যা, রোগ ও মৃত্যুর মতো কঠিন বিষয়গুলো নিপুণভাবে উঠে আসে। তিনি বহু সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতা কেন বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ?
এই কবিতাটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বাংলা সাহিত্যে শোক ও মৃত্যুকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল, বহুমাত্রিক ও শিল্পগুণে পূর্ণ একটি রচনা। প্রথমত, এটি একটি গভীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি (স্ত্রীর মৃত্যু) থেকে উৎসারিত, কিন্তু তা ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, কবিতাটি ক্যান্সার ও আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার একটি কাব্যিক ও সমালোচনামূলক ডকুমেন্টেশন — যা বাংলা কবিতায় বিরল। তৃতীয়ত, কবিতাটির রূপক ও চিত্রকল্পের সমৃদ্ধি অসাধারণ: নদী, মহাকাশযান, কাঁকড়া, কাজল, জল, চাবুক, কাঠবেড়ালি, মাছরাঙা, পূর্ণিমা — এগুলো শোক ও প্রেমের বিমূর্ত অনুভূতিকে স্পর্শযোগ্য করে তোলে। চতুর্থত, কবিতাটি দীর্ঘ ও মহাকাব্যিক, যা একটি সম্পূর্ণ মানসিক যাত্রাকে ধারণ করে — শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠক কবির সাথে কাঁদেন, রাগ করেন, স্মরণ করেন। পঞ্চমত, কবিতাটির ভাষা খুবই শক্তিশালী, কখনো কোমল (“এক চামচ জল”), কখনো বিদ্রূপাত্মক (“ড্রাগ-মাফিয়ারা”), কখনো তীব্র (“ইরাকের মৃত্তিকাও অতবার বার ফুটো করেনি আমেরিকা”)। এটি বাংলা কবিতায় একটি মাইলফলক রচনা।
সুবোধ সরকারের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো কী?
সুবোধ সরকারের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো: ১) রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতি গভীর দৃষ্টি, ২) ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও সার্বজনীন সমস্যার সমন্বয়, ৩) দীর্ঘ, মহাকাব্যিক কাঠামো ও মুক্তছন্দের ব্যবহার, ৪) ধ্বনি, ছন্দ ও চিত্রকল্পের নিপুণ প্রয়োগ, ৫) চিকিৎসা, যুদ্ধ, মৃত্যু ও শোকের মতো কঠিন বিষয়কে কবিতার বিষয়বস্তু করা, ৬) বিদ্রোহী, সমালোচনামূলক সুর, এবং ৭) সাহিত্যিক, দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক রেফারেন্সের প্রাচুর্য।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতা থেকে আমরা কী শিক্ষা লাভ করতে পারি?
এই কবিতা থেকে আমরা নিম্নলিখিত শিক্ষাগুলো লাভ করতে পারি: ১) মৃত্যু একটি নদীর অংশ ছেড়ে যাওয়ার মতো — এটি প্রাকৃতিক, কিন্তু ব্যক্তির জন্য তা গভীর শূন্যতা তৈরি করে। ২) রোগীর যন্ত্রণা কেবল শারীরিক নয়, মানসিক ও আত্মিকও — ‘কাজল পরা’ বা ‘শিউলির গন্ধ’ চাওয়ার মতো সাধারণ ইচ্ছাগুলোই সেই যন্ত্রণার প্রমাণ। ৩) আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা অনেক সময় যান্ত্রিক ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, যা রোগীর মানবিকতা উপেক্ষা করে (‘রাইস টিউব’, ‘সুঁচ ফোটানো’)। ৪) প্রেম ও স্মৃতি মৃত্যুকে অতিক্রম করে বেঁচে থাকে — ‘নদীর আত্মজীবনী’ যেমন রয়ে যায়। ৫) শোক থেকে সৃষ্টি সম্ভব — কবিতাটি নিজেই একটি সৃষ্টি, যা মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া। ৬) মৃত্যু ও যৌনতা (‘যৌনতা এবং মৃত্যু’) জীবনদর্শনের দুই মৌলিক সত্য, যা মানুষের ‘সেমিফাইনাল’। ৭) সবচেয়ে গভীর দুঃখও (‘ড্রাগ-মাফিয়ারা’) ব্যবসায় পরিণত হতে পারে — আমাদের সচেতন হতে হবে। ৮) শেষ পর্যন্ত, যারা চলে যায়, তারা আমাদের ‘রোদ্দুর’ হয়ে থাকেন — আলো ও উষ্ণতা দেন।
সুবোধ সরকারের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা ও রচনা কোনগুলো?
সুবোধ সরকারের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা ও রচনার মধ্যে রয়েছে: কাব্যগ্রন্থ: ‘হিজল ডালে চড়ে স্বর্গে যাবো’, ‘মৃতেরা পৃথিবী থেকে চলে যায়’, ‘সূর্য ইত্যাদি’, ‘কবিতা সংগ্রহ’। প্রবন্ধ: রাজনীতি, সমাজ ও সাহিত্য নিয়ে লেখা প্রবন্ধ সংকলন। তিনি ‘কালান্তর’, ‘দেশ’ ইত্যাদি পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতা পড়ার উপযুক্ত সময় কোনটি?
এই কবিতা পড়ার উপযুক্ত সময় হলো যখন কেউ গভীর শোক, মৃত্যু বা রোগ নিয়ে চিন্তা করছেন। বিশেষ করে যারা ক্যান্সার বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের সাথে যুদ্ধ করছেন বা করেছেন, তাদের জন্য এই কবিতা গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হবে। কবিতাটি দীর্ঘ ও জটিল, তাই পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ নিয়ে পড়া দরকার। একাকী, শান্ত পরিবেশে, সম্ভব হলে একাধিকবার পড়লে এর গভীরতা ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়। সাহিত্য, দর্শন বা চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রে আগ্রহী পাঠকদের জন্যও এই কবিতা বিশেষভাবে উপযোগী।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতা বর্তমান সমাজে কতটা প্রাসঙ্গিক?
বর্তমান সমাজে এই কবিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের বিশ্বে ক্যান্সার একটি প্রধান রোগ, এবং এর চিকিৎসা প্রক্রিয়া যন্ত্রণাদায়ক ও ব্যয়বহুল। চিকিৎসাব্যবস্থার যান্ত্রিকতা, কর্পোরেট হাসপাতাল, ওষুধ কোম্পানির লোভ (‘ড্রাগ-মাফিয়া’) এখনও একটি বড় সমস্যা। কবিতাটি রোগীর মানবিকতা, তাঁর সাধারণ ইচ্ছা (‘শিউলির গন্ধ’) ও যন্ত্রণার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আজকের দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। তাছাড়া, শোক ও মৃত্যু নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার যে সংস্কৃতি আজ বিকাশিত হচ্ছে, এই কবিতা তার একটি সাহসী উদাহরণ। কবিতাটি মৃত্যুকে রোমান্টিক করে না, বরং তার কঠোর বাস্তবতা ও যন্ত্রণাকে স্বীকার করে — যা আজকের মৃত্যু-বিমুখ সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়। সর্বোপরি, কবিতাটি প্রেম ও স্মৃতির শক্তি সম্পর্কে বলে, যা যেকোনো যুগেই প্রাসঙ্গিক।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতার গুরুত্বপূর্ণ পঙ্ক্তি বিশ্লেষণ ও তাৎপর্য
“তুমি গঙ্গার একটা অংশ ছেড়ে চলে যাচ্ছ/ কিন্তু তোমার আঁচলে নদীর আত্মজীবনী লেখা রইল |” – কবিতার সূচনা। গঙ্গা জীবন ও সভ্যতার প্রতীক। মল্লিকা সেই জীবনের একটি অংশ, কিন্তু তিনি চলে যাচ্ছেন। তাঁর ‘আঁচলে’ (পোশাক বা ব্যক্তিত্বে) নদীর আত্মজীবনী (তাঁর লেখা, সৃষ্টি, প্রভাব) রয়ে গেল।
“বিছানার নীচ থেকে কয়েক লক্ষ কর্কট/ বিছানা-সমেত তোমাকে তুলে নিয়ে চলেছে মহাকাশযানে |” – ‘কর্কট’ দ্ব্যর্থক: ক্যান্সার ও কাঁকড়া। রোগটি তাঁকে মহাকাশযানে (মৃত্যু/অজানা যাত্রায়) নিয়ে যাচ্ছে। এটি রোগের ভয়ঙ্কর রূপক।
“মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে তাও তুমি কাজল পড়েছ,/ কাজল ও কান্নার মাঝখানে তোমার মুখে এক চামচ জল” – শিরোনামের চরণ। মৃত্যুর আগেও সৌন্দর্য চর্চা — জীবনের প্রতি ভালোবাসা। ‘কাজল ও কান্নার মাঝখানে’ — জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। ‘এক চামচ জল’ শেষ পানীয় বা জীবনীশক্তি।
“হ্যাঁ, আমি এক চামচ জল হয়ে/ এক চামচ অন্তর্জলী হয়ে, এক চামচ অঞ্জলি হয়ে,/ তোমার ভেতরে একটা পূর্ণিমায় ভেসে যাওয়া” – কবি নিজেকে সেই জল বলছেন, যা অন্তর্জলী (অন্তিম জল/অশ্রু) এবং অঞ্জলি (উৎসর্গ)। তিনি তাঁর ভেতরে ‘পূর্ণিমায় ভেসে যাচ্ছেন’ — সম্পূর্ণতা ও আলোর মধ্যে বিলীন হচ্ছেন।
“ডাক্তার তোমার হাতের শিরা খুঁজে পায়নি/… ইরাকের মৃত্তিকাও অতবার বার ফুটো করেনি আমেরিকা” – চিকিৎসাব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা। ডাক্তাররা শিরা খুঁজে পায়নি (ইনজেকশন দিতে)। যুদ্ধের (ইরাক) সাথে রোগীর দেহে আক্রমণের তুলনা।
“কালপুরুষ বলল, নাও, দুই মহান খচ্চর এসে গেছে,/ যৌনতা এবং মৃত্যু” – ‘কালপুরুষ’ (গ্রিক পুরাণের Orion) এর মাধ্যমে দার্শনিক বক্তব্য: যৌনতা ও মৃত্যু মানুষের মৌলিক দুই শক্তি, ‘দুই সহোদর’।
“হাত থেকে একটানে চ্যানেল খুলে ফেলে বললে,/ আমাকে বাঁচাও, ভালবাসা, আমি বাঁচতে চাই |” – মল্লিকার মর্মান্তিক আকুতি। ‘চ্যানেল’ হয়তো ইনজেকশনের নল। তিনি বাঁচতে চান, প্রিয়ের কাছে সাহায্য চান।
“পৃথিবীতে আমি একটু শিউলির গন্ধ পেতে পারি ?/ আমার নাক থেকে রাইস টিউব সরিয়ে দাও |” – একটি সাধারণ, প্রাকৃতিক ইচ্ছা — শিউলির গন্ধ। কিন্তু হাসপাতালে ‘রাইস টিউব’ (খাওয়ার নল) তার নাকে, তাই গন্ধ পাওয়া অসম্ভব। এটি চিকিৎসার নির্মমতা ও রোগীর মানবিক ইচ্ছার দ্বন্দ্ব।
“ডাক্তার, ভাল যদি নাই পারো এত সুঁচ ফোটালে কেন ?/ সুঁচগুলো একবার নিজের পশ্চাতে ফুটিয়ে দেখলে হত না ?” – কবির সরাসরি, বিদ্রূপাত্মক প্রশ্ন চিকিৎসকদের প্রতি। যদি রোগীকে বাঁচাতে না পারো, তবে এত যন্ত্রণা দিলে কেন? নিজের দেহে সুঁচ ফুটিয়ে পরীক্ষা করলে কেমন লাগত?
“রোরো তোমার আঁচল ধরে আছে, আমি তোমার রোদ্দুর ।” – কবিতার সমাপ্তি। ‘রোরো’ সম্ভবত তাদের সন্তান বা একটি নদী, যে মায়ের আঁচল ধরে আছে। কবি নিজে ‘রোদ্দুর’ (সূর্যের আলো) — তিনি আলো হয়ে রয়েছেন, যে আলো চলে যাওয়া মানুষটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতার চিকিৎসা-সমালোচনা, শোক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতাটি সুবোধ সরকারের সাহিত্যিক ও মানবিক অবস্থানের একটি শক্তিশালী প্রকাশ। এটি নিম্নলিখিত দিকগুলো উন্মোচন করে:
১. চিকিৎসাব্যবস্থার কাব্যিক সমালোচনা: কবিতাটি আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার একটি গভীর সমালোচনা। কবি দেখিয়েছেন কীভাবে এই ব্যবস্থা রোগীর দেহকে একটি যুদ্ধক্ষেত্র বা যন্ত্রে পরিণত করে (‘ইরাকের মৃত্তিকা’, ‘সুঁচ ফোটানো’), যেখানে রোগীর মানবিক ইচ্ছা (‘শিউলির গন্ধ’) উপেক্ষিত হয়। ‘ড্রাগ-মাফিয়া’ ও ‘অনকোলজিস্ট’দের দাবা খেলা — এসব চিত্রে চিকিৎসা শিল্পের ব্যবসায়িক ও নির্মম দিকটি ফুটে উঠেছে। এটি বাংলা সাহিত্যে চিকিৎসা-বিষয়ক সমালোচনার একটি দুর্লভ ও সাহসী উদাহরণ।
২. শোকের বহুমাত্রিকতা: শোক এখানে শুধু কান্না নয়; এটি ক্রোধ (ডাক্তারদের প্রতি), স্মৃতি (প্রেমের দিনগুলোর), বিদ্রূপ (‘দুই মহান খচ্চর’), এবং দার্শনিক অন্বেষণ (‘যৌনতা এবং মৃত্যু’) এর সমন্বয়। কবি শোককে একটি সক্রিয়, সৃষ্টিশীল শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন এই কবিতার মাধ্যমে।
৩. নদীর রূপক: সমগ্র কবিতাজুড়ে নদীর (গঙ্গা, যমুনা, তিস্তা, সুবর্ণরেখা, ভল্গা, বসফরাস) রূপক ব্যবহৃত হয়েছে। মল্লিকা এইসব নদীর ‘একটা অংশ’ — অর্থাৎ, তিনি বহুমুখী, প্রবাহমান, জীবনদায়িনী। তাঁর মৃত্যু হল নদীর একটি অংশের শুকিয়ে যাওয়া, কিন্তু নদী তার গতিপথ চালিয়ে যায়। এটি মৃত্যু ও জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক।
৪. সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক আন্তঃপাঠ (Intertextuality): কবিতায় গ্রিক পুরাণ (আন্তিগোনে, কালপুরুষ), দর্শন (নিৎসে, বাত্সায়ন), সাহিত্য (কাফকা), ইতিহাস (রানি আতোসা), ভূগোল (বসফরাস) এর উল্লেখ আছে। এটি দেখায় যে মৃত্যু ও রোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; তা মানব সভ্যতা ও চিন্তার ইতিহাসের অংশ। মল্লিকার ট্র্যাজেডি আন্তিগোনে বা আতোসার ট্র্যাজেডির সাথে সমান্তরাল।
৫. প্রেম ও যৌনতার চিত্রণ: কবি প্রেমকে শুধু আবেগ নয়, একটি শারীরিক, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখিয়েছেন: ‘চাবুকের মত তেজি’, ‘সেনসুয়াল কাঠবেড়ালি’, ‘প্রথম চুম্বন’। যৌনতা ও মৃত্যুকে ‘দুই সহোদর’ বলা হয়েছে — উভয়ই জীবনশক্তির প্রকাশ, উভয়ই চূড়ান্ত।
৬. ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকের সম্মিলন: কবি ব্যক্তিগত শোককে রাজনৈতিক বক্তব্যে রূপান্তরিত করেছেন। ইরাক যুদ্ধের সাথে ক্যান্সার চিকিৎসার তুলনা, ড্রাগ-মাফিয়ার উল্লেখ — এগুলো দেখায় যে ব্যক্তির দুর্ভোগ বৃহত্তর ব্যবস্থার সাথে যুক্ত।
৭. কবিতার গঠন ও ভাষা: কবিতাটি মুক্তছন্দে, দীর্ঘ, খণ্ডিত কিন্তু সংযুক্ত চিত্রের সমাহার। ভাষা কখনো কাব্যিক (‘পূর্ণিমায় ভেসে যাওয়া’), কখনো চলিত (‘তুই’, ‘করবে’), কখনো চিকিৎসা পরিভাষা (‘ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট’, ‘কেমোথেরাপি’)। এই মিশ্রণ কবিতাকে জীবন্ত ও বাস্তবসম্মত করে তুলেছে।
কবিতাটির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এর গভীর মানবিকতা — এটি পড়লে পাঠক শুধু কবির শোকই অনুভব করে না, সেই সাথে রোগীর যন্ত্রণা, প্রেমের সৌন্দর্য, এবং জীবন-মৃত্যুর রহস্যের সম্মুখীন হয়। এটি বাংলা কবিতায় একটি অবিস্মরণীয় কীর্তি।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতা পড়ার সঠিক পদ্ধতি, বিশ্লেষণ কৌশল ও গভীর অধ্যয়ন
- কবিতাটি প্রথমে একবার সম্পূর্ণ পড়ুন, শুধু প্রবাহ ও আবেগ গ্রহণ করুন, বিশ্লেষণ নয়।
- দ্বিতীয়বার পড়ার সময় কবিতায় উল্লিখিত বিভিন্ন নদী (গঙ্গা, যমুনা, তিস্তা, সুবর্ণরেখা, ভল্গা, বসফরাস, রোরো) এর নাম নোট করুন এবং ভাবুন প্রতিটি নদী কীভাবে মল্লিকার একটি দিক বা পরিচয় নির্দেশ করছে।
- কবিতার প্রধান রূপকগুলো চিহ্নিত করুন: নদী, কর্কট (ক্যান্সার/কাঁকড়া), মহাকাশযান, কাজল, জল, চাবুক, কাঠবেড়ালি, মাছরাঙা, রোদ্দুর ইত্যাদি।
- চিকিৎসাব্যবস্থার সমালোচনা সংবলিত অংশগুলো (‘ডাক্তার তোমার হাতের শিরা খুঁজে পায়নি’, ‘ড্রাগ-মাফিয়ারা’, ‘সুঁচ ফোটালে কেন’) আলাদা করে পড়ুন এবং সেগুলোর সামাজিক তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করুন।
- কবিতায় উল্লিখিত সাংস্কৃতিক, দার্শনিক ও সাহিত্যিক রেফারেন্স (আন্তিগোনে, কালপুরুষ, নিৎসে, কাফকা, আতোসা, জিপসি) সম্পর্কে খোঁজ নিন। এগুলো কবিতার অর্থকে কীভাবে প্রসারিত করে?
- কবিতাটির কাঠামো বিশ্লেষণ করুন: এটি কীভাবে শুরু হয়, কীভাবে স্মৃতি, বর্তমান যন্ত্রণা, দার্শনিক প্রতিফলন ও শেষ বিদায়ের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়?
- শোক প্রকাশের বিভিন্ন পদ্ধতি দেখুন: সরাসরি বর্ণনা (‘চোখেও জল আসে’), রূপক (‘নদীর অংশ’), বিদ্রূপ (‘দুই মহান খচ্চর’), স্মৃতি (‘প্রথম চুম্বন’)।
- সুবোধ সরকারের অন্যান্য কবিতা বা বাংলা শোকগাথার ঐতিহ্যের (যেমন: জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ নয়, কিন্তু মাইকেল মধুসূদনের ‘বীরাঙ্গনা’ বা রবীন্দ্রনাথের স্মরণকবিতা) সাথে এই কবিতার তুলনা করুন।
- কবিতাটিকে একটি চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট বা একটি শোকসংগীত হিসেবে কল্পনা করুন — কোন দৃশ্যগুলো সবচেয়ে শক্তিশালী?
- শেষে, এই কবিতা পড়ে আপনার নিজের মৃত্যু, রোগ বা প্রিয়জনের হারানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে কী মনে পড়ল, তা নিয়ে কিছু লিখুন বা চিন্তা করুন।
সুবোধ সরকারের সাহিত্যকর্ম ও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা
- কাব্যগ্রন্থ: ‘হিজল ডালে চড়ে স্বর্গে যাবো’, ‘মৃতেরা পৃথিবী থেকে চলে যায়’, ‘সূর্য ইত্যাদি’, ‘কবিতা সংগ্রহ’, ‘যুদ্ধ ইত্যাদি’।
- প্রবন্ধ সংকলন: রাজনীতি, সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।
- সম্পাদনা: সাহিত্য পত্রিকা ‘কালান্তর’ এর সম্পাদকীয় দায়িত্ব।
- পুরস্কার: সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (নতুন দিল্লি), আনন্দ পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা প্রাপ্ত।
- শিক্ষকতা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক।
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতা নিয়ে শেষ কথা ও সারসংক্ষেপ
মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতাটি সুবোধ সরকারের কবিতাভুবনের, এবং সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের সমগ্র শোককাব্যের, একটি চূড়ান্ত উচ্চারণ, যা শিল্প, বেদনা, ক্রোধ ও প্রেমের এক অসামান্য সমন্বয় সাধন করেছে। এটি শুধু একটি কবিতা নয়; এটি একটি জীবনদর্শন, একটি প্রতিবাদপত্র, একটি প্রেমপত্র, এবং একটি বিদায়গাথা — সব একসাথে। কবি তাঁর স্ত্রী মল্লিকা সেনগুপ্তের ক্যান্সারে মৃত্যুর যন্ত্রণাময় যাত্রাকে এমন নিখুঁত, নির্মম কিন্তু সৌন্দর্য্যময়ভাবে চিত্রিত করেছেন যে পাঠক নিজেকে সেই হাসপাতালের কক্ষে, সেই অন্তিম মুহূর্তে উপস্থিত মনে করে। কবিতাটির শক্তি এর বহুমাত্রিকতায়: এটি যখন শোক করে, তখন তা ব্যক্তিগত সীমা পেরিয়ে সার্বজনীন হয়; যখন চিকিৎসাব্যবস্থার সমালোচনা করে, তখন তা রাজনৈতিক হয়ে ওঠে; যখন প্রেমের স্মৃতি বলে, তখন তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও জীবন্ত; যখন দার্শনিক প্রশ্ন তোলে, তখন তা গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত করে।
কবিতাটির কেন্দ্রীয় রূপক ‘নদী’ জীবনের প্রবাহ ও বহুত্বের প্রতীক। মল্লিকা গঙ্গা, যমুনা, তিস্তা, সুবর্ণরেখা — সব নদীরই একটি অংশ, অর্থাৎ তিনি ছিলেন বহুমুখী, প্রাণবন্ত, জীবনদায়ী। তাঁর মৃত্যু সেই নদীর একটি অংশ শুকিয়ে যাওয়া, কিন্তু নদীর ‘আত্মজীবনী’ (তাঁর সৃষ্টি, স্মৃতি) আঁচলে লেগে থাকা। কবিতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী মুহূর্তগুলো যখন মল্লিকার মানবিক, সাধারণ ইচ্ছাগুলো প্রকাশ পায়: ‘কাজল পরা’, ‘শিউলির গন্ধ পাওয়া’, ‘বাঁচতে চাওয়া’। এই ইচ্ছাগুলোর বিপরীতে দাঁড়ায় চিকিৎসাব্যবস্থার যান্ত্রিকতা: ‘রাইস টিউব’, ‘সুঁচ’, ‘ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট’। কবির বিদ্রূপাত্মক প্রশ্ন — “ডাক্তার, ভাল যদি নাই পারো এত সুঁচ ফোটালে কেন?” — আধুনিক চিকিৎসার নৈতিক সংকটের মুখোমুখি করে।
বর্তমান সময়ে, যখন চিকিৎসা আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও বাণিজ্যিকীকৃত হচ্ছে, এবং মানুষ মৃত্যু ও শোক নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে শিখছে, মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে কবিতার বার্তা আগের চেয়েও বেশি প্রয়োজনীয়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে রোগীর মানবিকতা, তাঁর সাধারণ ইচ্ছা ও যন্ত্রণা, চিকিৎসার প্রযুক্তিগত সাফল্যের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি আমাদের শেখায় যে শোক কেবল একটি আবেগ নয়, একটি সৃষ্টিশীল শক্তিও হতে পারে — যেমন এই কবিতাটি নিজেই শোক থেকে জন্ম নিয়েছে। সর্বোপরি, এটি আমাদের বলে যে যারা চলে যায়, তারা আমাদের ‘রোদ্দুর’ হয়ে থাকেন — আলো ও উষ্ণতা দিয়ে যান, যা আমাদের অন্ধকারেও পথ দেখায়। সুবোধ সরকারের এই কবিতা বাংলা কবিতায় একটি অমর কীর্তি, যা যুগ যুগ ধরে পাঠককে কাঁদাবে, ভাবাবে, এবং সম্ভবত, কিছু সান্ত্বনাও দেবে।
ট্যাগস: মৃত্যুর আগে তুমি কাজল পরেছিলে, সুবোধ সরকার, সুবোধ সরকারের কবিতা, মল্লিকা সেনগুপ্ত, ক্যান্সার কবিতা, শোকের কবিতা, চিকিৎসা সমালোচনা কবিতা, বাংলা আধুনিক কবিতা, মহাকাব্যিক কবিতা, বাংলা সাহিত্য