কবিতার খাতা
মা-র কাছে ফেরা -রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।
ওখানে ভীষণ খরায় ফসলের চরাচরে পাখা মেলে বোসেছে এক
বন্ধ্যার বাজপাখি, তার ঠোঁটের বিষ আমার রক্তের শহরে ঢুকেছে
শত্রুসেনারা যেমন বিজয়গর্বে ঢোকে পরাধীন দেশের ভিতর।
মা, এই পরাধীন শরীরে কোথাও মুক্ত আকাশ নেই, মাঠ নেই –
রক্তে মাংসে খরার পতাকা উড়িয়ে রেখেছে ভিন্ন শাসক সেনারা।
কতদিন ঘুমোই না মা ! সেই কবে কৈশোরের প্রথম সকালে
সংসারের গন্ধে ভেজা তোর সোঁদা বুকে মুখ লুকিয়ে নির্ভাবনায়
ঘুমিয়ে যেতাম স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের ঘোলা লোনা জলে
সেই কবে, কতদিন আগে – কিছুক্ষণ বুকে রাখ, বুকের শান্তিতে।
কতোদিন ঘুমোইনি, নিদ্রার মতো জেগে আছি নিদ্রিত চোখে
_ কতোদিন, সেই কতোদিন…
ওখানে অভাব, মারী, দীর্ঘশ্বাসে আগুনের বিপুল জলোচ্ছ্বাস,
দেবদারুর শীর্ণ পাতাগুলো ঝ’রে গেছে মাটির হৃদপিণ্ডে।
সারারাত পথের নির্জনতা সরিয়ে সরিয়ে মানুষের মৃত হাড়
কান্নার কঙ্কাল দেখে আমি আর কোনোদিন কবরের পাশে যাই নি
সড়কের জীবন্ত কবর এসে বুকের ভূমিতে জেগেছে
_ সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব।
জানালাগুলো এখোনো খুলিস নি মা?
কতোদিন আকাশ দেখিনি, অনায়াসে পাখা মেলে উড়ে যাওয়া
পাখিদের পালক ঝরে পড়া, রঙিন প্রজাপতি, নক্ষত্র, মেঘ
কতোদিন ঝড়ের পূর্বাভাসে সঞ্চিত কালো মেঘ দেখিনি।
এ-দুটো অনিদ্রায় পোড়া পাথর চোখে
তোর মাতৃত্বের চুমু দিয়ে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দে
কতোদিন ঘুমোই নি মা, কতোদিন ঘুমোই না…
মাকে নিয়ে কবিতা পড়তে ক্লিক করুন।
মা-র কাছে ফেরা – রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ | সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য
কবিতা: মা-র কাছে ফেরা (সম্পূর্ণ পাঠ)
ওখানে ভীষণ খরায় ফসলের চরাচরে পাখা মেলে বোসেছে এক বন্ধ্যার বাজপাখি, তার ঠোঁটের বিষ আমার রক্তের শহরে ঢুকেছে শত্রুসেনারা যেমন বিজয়গর্বে ঢোকে পরাধীন দেশের ভিতর। মা, এই পরাধীন শরীরে কোথাও মুক্ত আকাশ নেই, মাঠ নেই – রক্তে মাংসে খরার পতাকা উড়িয়ে রেখেছে ভিন্ন শাসক সেনারা। কতদিন ঘুমোই না মা ! সেই কবে কৈশোরের প্রথম সকালে সংসারের গন্ধে ভেজা তোর সোঁদা বুকে মুখ লুকিয়ে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে যেতাম স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের ঘোলা লোনা জলে সেই কবে, কতদিন আগে – কিছুক্ষণ বুকে রাখ, বুকের শান্তিতে। কতোদিন ঘুমোইনি, নিদ্রার মতো জেগে আছি নিদ্রিত চোখে _ কতোদিন, সেই কতোদিন… ওখানে অভাব, মারী, দীর্ঘশ্বাসে আগুনের বিপুল জলোচ্ছ্বাস, দেবদারুর শীর্ণ পাতাগুলো ঝ’রে গেছে মাটির হৃদপিণ্ডে। সারারাত পথের নির্জনতা সরিয়ে সরিয়ে মানুষের মৃত হাড় কান্নার কঙ্কাল দেখে আমি আর কোনোদিন কবরের পাশে যাই নি সড়কের জীবন্ত কবর এসে বুকের ভূমিতে জেগেছে _ সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব। জানালাগুলো এখোনো খুলিস নি মা? কতোদিন আকাশ দেখিনি, অনায়াসে পাখা মেলে উড়ে যাওয়া পাখিদের পালক ঝরে পড়া, রঙিন প্রজাপতি, নক্ষত্র, মেঘ কতোদিন ঝড়ের পূর্বাভাসে সঞ্চিত কালো মেঘ দেখিনি। এ-দুটো অনিদ্রায় পোড়া পাথর চোখে তোর মাতৃত্বের চুমু দিয়ে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দে কতোদিন ঘুমোই নি মা, কতোদিন ঘুমোই না…
কবি পরিচিতি
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, যিনি মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে অকালপ্রয়াত হলেও বাংলা কবিতায় এক অনন্য স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর কবিতায় প্রেম, বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্যবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমকালীন বাস্তবতার গভীর প্রতিফলন ঘটেছে। ‘ভালো আছি ভালো থেকো’, ‘জাতির পিতা’, ‘হাতের মুঠোয় স্বপ্ন’, ‘পাঁচ টাকা দূরত্বে তুমি এখন’, ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ – তাঁর অমর সৃষ্টি। ‘মা-র কাছে ফেরা’ কবিতাটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা, যেখানে তিনি মায়ের স্মৃতি, শৈশবের নিরাপত্তা, বর্তমানের যন্ত্রণা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে এক অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন। রুদ্রর কবিতা সাধারণ মানুষের জীবনের খুব কাছের, অত্যন্ত সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী, কিন্তু একই সাথে প্রতিবাদী ও শক্তিশালী।
শিরোনামের তাৎপর্য
“মা-র কাছে ফেরা” শিরোনামটি অত্যন্ত আবেগময়, স্নিগ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ফেরা’ মানে ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন। কবি এখানে মায়ের কাছে ফিরে আসার কথা বলেছেন। কিন্তু এই ফিরে আসা কি শারীরিক? নাকি মানসিক? কবি হয়তো শৈশবের সেই নিরাপদ জগতে ফিরে যেতে চান, যেখানে মায়ের বুক ছিল এক নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু তিনি কি সত্যিই ফিরতে পারেন? শিরোনামটি পড়লেই মনে হয়, এটি একটি আকুতি, একটি আর্তি, একটি আবেদন। কবি যেন মাকে ডাকছেন – মা, আমি ফিরে আসতে চাই। শিরোনামটির মধ্যে এক ধরনের বিষণ্ণতা, এক ধরনের আশা ও এক ধরনের হাহাকার মিশে আছে।
কবিতার মূল বিষয়বস্তু
এই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো মায়ের স্মৃতি, শৈশবের নিরাপত্তা, বর্তমানের যন্ত্রণা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। কবি এখানে তাঁর মাকে সম্বোধন করে কথা বলেছেন। তিনি প্রথমে বলেছেন – ওখানে (সম্ভবত গ্রামের বাড়ি, মায়ের কাছে) ভীষণ খরা, বন্ধ্যার বাজপাখি বসেছে ফসলের চরাচরে। তার ঠোঁটের বিষ তাঁর রক্তের শহরে ঢুকেছে, শত্রুসেনাদের মতো। তাঁর এই শরীর পরাধীন, কোথাও মুক্ত আকাশ নেই, মাঠ নেই। রক্তে-মাংসে খরার পতাকা উড়িয়ে রেখেছে ভিন্ন শাসক সেনারা।
দ্বিতীয় স্তবকে তিনি বলেছেন – তিনি কতদিন ঘুমোন না! সেই কৈশোরের প্রথম সকালে মায়ের সোঁদা বুকে মুখ লুকিয়ে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে যেতেন স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের ঘোলা লোনা জলে। সেই কবে, কতদিন আগে। তিনি মাকে অনুরোধ করছেন – কিছুক্ষণ বুকে রাখো, বুকের শান্তিতে। তিনি কতদিন ঘুমোননি, নিদ্রার মতো জেগে আছেন নিদ্রিত চোখে – কতদিন, সেই কতদিন…
তৃতীয় স্তবকে তিনি বলেছেন – ওখানে অভাব, মারী, দীর্ঘশ্বাসে আগুনের বিপুল জলোচ্ছ্বাস, দেবদারুর শীর্ণ পাতাগুলো ঝরে গেছে মাটির হৃদপিণ্ডে।
চতুর্থ স্তবকে তিনি বলেছেন – সারারাত পথের নির্জনতা সরিয়ে সরিয়ে মানুষের মৃত হাড়, কান্নার কঙ্কাল দেখে তিনি আর কোনোদিন কবরের পাশে যাননি। সড়কের জীবন্ত কবর এসে বুকের ভূমিতে জেগেছে – সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব।
পঞ্চম স্তবকে তিনি মাকে প্রশ্ন করেছেন – জানালাগুলো এখনও খোলোনি মা? তিনি কতদিন আকাশ দেখেননি, পাখি উড়তে দেখেননি, পাখিদের পালক ঝরে পড়া, রঙিন প্রজাপতি, নক্ষত্র, মেঘ – কতদিন ঝড়ের পূর্বাভাসে সঞ্চিত কালো মেঘ দেখেননি।
ষষ্ঠ স্তবকে তিনি শেষ অনুরোধ জানিয়েছেন – এই দুটো অনিদ্রায় পোড়া পাথর চোখে মায়ের মাতৃত্বের চুমু দিয়ে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে। তিনি কতদিন ঘুমোননি মা, কতদিন ঘুমোন না…
কবিতার শৈলীগত ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ
কবিতাটি মুক্তছন্দে রচিত। এটি ছয়টি স্তবকে বিভক্ত, প্রতিটি স্তবকের দৈর্ঘ্য ভিন্ন। প্রথম স্তবকে পাঁচ লাইন, দ্বিতীয় স্তবকে ছয় লাইন, তৃতীয় স্তবকে তিন লাইন, চতুর্থ স্তবকে চার লাইন, পঞ্চম স্তবকে পাঁচ লাইন, ষষ্ঠ স্তবকে চার লাইন। এই কাঠামো কবিতাকে এক ধরনের বৈচিত্র্য দিয়েছে। কবিতার ভাষা অত্যন্ত শক্তিশালী, চিত্রকল্পে পরিপূর্ণ ও বেদনাদায়ক। ‘বন্ধ্যার বাজপাখি’, ‘ঠোঁটের বিষ’, ‘পরাধীন শরীর’, ‘খরার পতাকা’, ‘সংসারের গন্ধে ভেজা তোর সোঁদা বুক’, ‘স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের ঘোলা লোনা জল’, ‘নিদ্রার মতো জেগে আছি নিদ্রিত চোখে’, ‘অভাব, মারী, দীর্ঘশ্বাসে আগুনের বিপুল জলোচ্ছ্বাস’, ‘দেবদারুর শীর্ণ পাতা’, ‘মানুষের মৃত হাড়’, ‘কান্নার কঙ্কাল’, ‘সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব’, ‘অনিদ্রায় পোড়া পাথর চোখ’, ‘মাতৃত্বের চুমু’ – এই চিত্রকল্পগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ও হৃদয়বিদারক। কবিতার শেষ লাইনটি – “কতোদিন ঘুমোই নি মা, কতোদিন ঘুমোই না…” – বাংলা কবিতার অন্যতম আবেগঘন ও স্মরণীয় পংক্তি।
প্রথম স্তবকের বিশ্লেষণ
“ওখানে ভীষণ খরায় ফসলের চরাচরে পাখা মেলে বোসেছে এক বন্ধ্যার বাজপাখি” – ‘ওখানে’ সম্ভবত গ্রামের বাড়ি, মায়ের কাছে। সেখানে ভীষণ খরা, ফসলের মাঠে বসেছে এক বন্ধ্যার বাজপাখি। বন্ধ্যা – যে সন্তান জন্ম দিতে পারে না। বাজপাখি – শিকারি পাখি। একটি বন্ধ্যা শিকারি পাখি বসেছে ফসলের মাঠে – অর্থাৎ উৎপাদনশীলতার জায়গায় এক ধ্বংসাত্মক শক্তি বসেছে।
“তার ঠোঁটের বিষ আমার রক্তের শহরে ঢুকেছে” – সেই বাজপাখির ঠোঁটের বিষ কবির রক্তের শহরে (শরীরে, মনে) ঢুকেছে। এই বিষ তাকে গ্রাস করছে।
“শত্রুসেনারা যেমন বিজয়গর্বে ঢোকে পরাধীন দেশের ভিতর।” – একটি শক্তিশালী উপমা। শত্রুসেনারা যেমন বিজয়ী হয়ে পরাধীন দেশে ঢোকে, তেমনি সেই বিষ তাঁর ভেতরে ঢুকেছে। তিনি এখন পরাধীন – তাঁর শরীর পরাধীন।
“মা, এই পরাধীন শরীরে কোথাও মুক্ত আকাশ নেই, মাঠ নেই – রক্তে মাংসে খরার পতাকা উড়িয়ে রেখেছে ভিন্ন শাসক সেনারা।” – তিনি মাকে ডাকছেন। তাঁর এই পরাধীন শরীরে কোথাও মুক্ত আকাশ নেই, মাঠ নেই – অর্থাৎ তাঁর জীবনে কোনো স্বাধীনতা নেই। তাঁর রক্তে-মাংসে খরার পতাকা উড়িয়ে রেখেছে ভিন্ন শাসক সেনারা। অর্থাৎ তাঁর নিজের শরীরেই অন্য শক্তি রাজত্ব করছে।
দ্বিতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ
“কতদিন ঘুমোই না মা !” – একটি আর্তনাদ। তিনি মাকে জানাচ্ছেন – তিনি কতদিন ঘুমোননি! এই অনিদ্রা তাঁর যন্ত্রণার প্রতীক।
“সেই কবে কৈশোরের প্রথম সকালে সংসারের গন্ধে ভেজা তোর সোঁদা বুকে মুখ লুকিয়ে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে যেতাম স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের ঘোলা লোনা জলে” – একটি অত্যন্ত স্নিগ্ধ ও সুন্দর স্মৃতিচারণ। কৈশোরের প্রথম সকালে তিনি মায়ের সোঁদা বুকে (সদ্য প্রসূতি মায়ের স্তনের গন্ধযুক্ত বুক) মুখ লুকিয়ে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে যেতেন। সেই ঘুম ছিল স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের ঘোলা লোনা জলের মতো – শান্ত, গভীর, অসীম।
“সেই কবে, কতদিন আগে – কিছুক্ষণ বুকে রাখ, বুকের শান্তিতে।” – তিনি মাকে অনুরোধ করছেন – কিছুক্ষণ বুকে রাখো, বুকের শান্তিতে। তিনি সেই শৈশবের নিরাপত্তা, সেই মায়ের সান্নিধ্য ফিরে চান।
“কতোদিন ঘুমোইনি, নিদ্রার মতো জেগে আছি নিদ্রিত চোখে _ কতোদিন, সেই কতোদিন…” – তিনি ঘুমোননি, কিন্তু নিদ্রার মতো জেগে আছেন – অর্থাৎ তিনি ঘুম আর জেগে থাকার মাঝামাঝি এক অবস্থায় আছেন। নিদ্রিত চোখে তিনি জেগে আছেন। এই দ্বন্দ্ব তাঁর যন্ত্রণাকে আরও গভীর করে।
তৃতীয় স্তবকের বিশ্লেষণ
“ওখানে অভাব, মারী, দীর্ঘশ্বাসে আগুনের বিপুল জলোচ্ছ্বাস” – ‘ওখানে’ সম্ভবত গ্রাম, মায়ের অবস্থানের জায়গা। সেখানে অভাব, মহামারী, দীর্ঘশ্বাসে আগুনের বিপুল জলোচ্ছ্বাস – অর্থাৎ দুঃখ-কষ্টের ভয়াবহতা। ‘আগুনের জলোচ্ছ্বাস’ একটি অক্সিমোরন – আগুন আর জল একসাথে, যা অসম্ভব। কিন্তু কবি এখানে দুঃখের তীব্রতা বুঝিয়েছেন।
“দেবদারুর শীর্ণ পাতাগুলো ঝ’রে গেছে মাটির হৃদপিণ্ডে।” – দেবদারু গাছের পাতাগুলো ঝরে গেছে মাটির হৃদপিণ্ডে। মাটির হৃদপিণ্ড – পৃথিবীর মর্মস্থল। সেখানে পাতা ঝরে পড়া মানে প্রকৃতির শোক, প্রকৃতির মৃত্যু।
চতুর্থ স্তবকের বিশ্লেষণ
“সারারাত পথের নির্জনতা সরিয়ে সরিয়ে মানুষের মৃত হাড় কান্নার কঙ্কাল দেখে আমি আর কোনোদিন কবরের পাশে যাই নি” – তিনি সারারাত পথের নির্জনতা সরিয়ে সরিয়ে মানুষের মৃত হাড়, কান্নার কঙ্কাল দেখেছেন। এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে তিনি আর কোনোদিন কবরের পাশে যাননি – অর্থাৎ তিনি মৃত্যুকে এড়িয়ে চলেন, মৃত্যুর স্মৃতি তাঁকে পীড়া দেয়।
“সড়কের জীবন্ত কবর এসে বুকের ভূমিতে জেগেছে _ সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব।” – সড়কের জীবন্ত কবর – যে কবর পথের ধারে, যা জীবন্ত। তা এসে তাঁর বুকের ভূমিতে জেগেছে – অর্থাৎ তাঁর মনে এই মৃত্যুর স্মৃতি গেঁথে গেছে। তিনি একে বলেছেন ‘সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব’ – বহু মানুষের মৃত্যুর এক ভয়াবহ উৎসব।
পঞ্চম স্তবকের বিশ্লেষণ
“জানালাগুলো এখোনো খুলিস নি মা?” – তিনি মাকে প্রশ্ন করছেন – জানালাগুলো এখনও খোলোনি মা? জানালা খোলা মানে বাইরের পৃথিবীকে দেখা, আলো-বাতাস আসতে দেওয়া। মা কি এখনও জানালা খোলেননি? নাকি তিনি জানালা খুলতে পারেন না?
“কতোদিন আকাশ দেখিনি, অনায়াসে পাখা মেলে উড়ে যাওয়া পাখিদের পালক ঝরে পড়া, রঙিন প্রজাপতি, নক্ষত্র, মেঘ” – তিনি কতদিন আকাশ দেখেননি। তিনি দেখেননি পাখি ওড়া, তাদের পালক ঝরা, রঙিন প্রজাপতি, নক্ষত্র, মেঘ। অর্থাৎ তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন।
“কতোদিন ঝড়ের পূর্বাভাসে সঞ্চিত কালো মেঘ দেখিনি।” – তিনি ঝড়ের পূর্বাভাসে জমা হওয়া কালো মেঘও দেখেননি। অর্থাৎ তিনি প্রকৃতির কোনো রূপই দেখেন না।
ষষ্ঠ স্তবকের বিশ্লেষণ
“এ-দুটো অনিদ্রায় পোড়া পাথর চোখে তোর মাতৃত্বের চুমু দিয়ে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দে” – তাঁর এই দুটো চোখ অনিদ্রায় পোড়া পাথর হয়ে গেছে। তিনি মাকে অনুরোধ করছেন – তাঁর মাতৃত্বের চুমু দিয়ে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে। তিনি সেই শৈশবের মতো মায়ের স্নেহ চান, মায়ের চুমু চান।
“কতোদিন ঘুমোই নি মা, কতোদিন ঘুমোই না…” – শেষ লাইনে তিনি আবার সেই একই কথা বলেছেন। তিনি কতদিন ঘুমোননি মা, কতদিন ঘুমোন না… এই পুনরাবৃত্তি তাঁর যন্ত্রণার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। শেষে তিনটি বিন্দু – যা ইঙ্গিত করে তাঁর যন্ত্রণা শেষ নয়, অনন্তকাল চলবে।
প্রতীক ও চিত্রকল্পের বিশ্লেষণ
কবিতাটি বিভিন্ন প্রতীক ও চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ। প্রধান কয়েকটি প্রতীক হলো:
- বন্ধ্যার বাজপাখি: ধ্বংসাত্মক শক্তি, উৎপাদনশীলতা নাশকারী শক্তির প্রতীক।
- ঠোঁটের বিষ: ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রভাব, যা কবিকে গ্রাস করছে।
- পরাধীন শরীর: কবির নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রতীক, তাঁর স্বাধীনতা হরণের প্রতীক।
- খরার পতাকা: ধ্বংস, শোষণ, অত্যাচারের প্রতীক।
- ভিন্ন শাসক সেনারা: কবির শরীর ও মনে রাজত্ব করা নেতিবাচক শক্তির প্রতীক।
- মায়ের সোঁদা বুক: শৈশবের নিরাপত্তা, মাতৃস্নেহ, শান্তির প্রতীক।
- স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের ঘোলা লোনা জল: গভীর ঘুম, শান্তি, অসীমতার প্রতীক।
- নিদ্রার মতো জেগে থাকা, নিদ্রিত চোখে জেগে থাকা: ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি এক অস্বস্তিকর অবস্থার প্রতীক।
- অভাব, মারী, দীর্ঘশ্বাসে আগুনের বিপুল জলোচ্ছ্বাস: দুঃখ-কষ্ট, মহামারী, যন্ত্রণার তীব্রতার প্রতীক।
- দেবদারুর শীর্ণ পাতা: প্রকৃতির শোক, মৃত্যুর প্রতীক।
- মানুষের মৃত হাড়, কান্নার কঙ্কাল: মৃত্যু, বেদনা, শোকের প্রতীক।
- সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব: গণমৃত্যু, মহামারী, যুদ্ধের বিভীষিকার প্রতীক।
- জানালা: বাইরের পৃথিবীর সাথে সংযোগ, স্বাধীনতা, দৃষ্টির প্রতীক।
- অনিদ্রায় পোড়া পাথর চোখ: দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা, কষ্ট, অনিদ্রার প্রতীক।
- মাতৃত্বের চুমু: মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা, নিরাময়ের প্রতীক।
শৈশবের স্মৃতি ও বর্তমানের যন্ত্রণা
এই কবিতার মূল দ্বন্দ্ব হলো শৈশবের সুখস্মৃতি ও বর্তমানের যন্ত্রণার মধ্যে। প্রথম অংশে কবি শৈশবের সেই সুখের দিনগুলোর কথা স্মরণ করেছেন, যখন তিনি মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে যেতেন। সেই ঘুম ছিল স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের মতো গভীর ও শান্ত। কিন্তু বর্তমানে তিনি ঘুমাতে পারেন না। তাঁর চোখ অনিদ্রায় পোড়া পাথর হয়ে গেছে। তাঁর শরীর পরাধীন, তাঁর মনে রাজত্ব করছে ভিন্ন শাসক সেনারা। তিনি প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন, তিনি আকাশ দেখেন না, পাখি দেখেন না। তিনি কেবল দেখেন মানুষের মৃত হাড়, কান্নার কঙ্কাল, সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে তিনি মায়ের কাছে ফিরে যেতে চান – সেই শৈশবের নিরাপদ জগতে, সেই মায়ের সোঁদা বুকে।
ভাষা ও ছন্দ
কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত শক্তিশালী, চিত্রকল্পে পরিপূর্ণ ও বেদনাদায়ক। কবি এখানে সহজ-সরল বাংলা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু প্রতিটি শব্দই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ‘বন্ধ্যার বাজপাখি’, ‘ঠোঁটের বিষ’, ‘পরাধীন শরীর’, ‘খরার পতাকা’, ‘সংসারের গন্ধে ভেজা তোর সোঁদা বুক’, ‘স্বপ্নের নিরাকার সমুদ্রের ঘোলা লোনা জল’, ‘নিদ্রার মতো জেগে আছি নিদ্রিত চোখে’, ‘দেবদারুর শীর্ণ পাতা’, ‘মানুষের মৃত হাড়’, ‘কান্নার কঙ্কাল’, ‘সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব’, ‘অনিদ্রায় পোড়া পাথর চোখ’, ‘মাতৃত্বের চুমু’ – এই শব্দবন্ধগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী ও চিত্রকল্পময়। কবিতার ছন্দ মুক্তছন্দের, কিন্তু একটি অভ্যন্তরীণ লয় আছে যা পাঠককে প্রবাহিত করে। ‘কতোদিন’ শব্দটির পুনরাবৃত্তি কবিতার বেদনাকে আরও গভীর করে তুলেছে। শেষের তিনটি বিন্দু কবিতাকে একটি অনির্দিষ্ট, অনন্ত যন্ত্রণার ইঙ্গিত দিয়েছে।
সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা
এই কবিতাটি আজকের দিনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, যান্ত্রিকতা, নিঃসঙ্গতা মানুষকে শৈশবের সেই নিরাপদ জগতের কথা মনে করিয়ে দেয়। মানুষ আজ ঘুমাতে পারে না – অনিদ্রা আজ মহামারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ আজ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন – তারা আকাশ দেখে না, পাখি দেখে না। তারা দেখে কেবল দুঃখ-কষ্ট, মৃত্যু, ধ্বংস। তারা মায়ের কাছে ফিরে যেতে চায় – সেই নিরাপদ আশ্রয়ে, যেখানে কোনো ভয় নেই, কোনো যন্ত্রণা নেই। এই কবিতা তাই আজকের মানুষের মনোদশার এক সঠিক প্রতিফলন।
বাংলা সাহিত্যে কবিতাটির স্থান
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘মা-র কাছে ফেরা’ বাংলা সাহিত্যে মা-বিষয়ক কবিতার একটি অনন্য উদাহরণ। বাংলা সাহিত্যে মাকে নিয়ে অনেক কবিতা আছে, কিন্তু এই কবিতা আলাদা মাত্রা পেয়েছে শৈশবের স্মৃতি, বর্তমানের যন্ত্রণা ও মায়ের কাছে ফেরার আকুতি ফুটিয়ে তোলার কারণে। কবি এখানে শুধু মায়ের স্মৃতি তুলে আনেননি, তিনি তাঁর বর্তমান যন্ত্রণাকে মায়ের স্নেহের বিপরীতে স্থাপন করে এক অসাধারণ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছেন। তাঁর এই কবিতা বাংলা কবিতার অন্যতম আবেগঘন ও স্মরণীয় কবিতা হিসেবে বিবেচিত। শেষ লাইন – “কতোদিন ঘুমোই নি মা, কতোদিন ঘুমোই না…” – বাংলা কবিতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
উপসংহার
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘মা-র কাছে ফেরা’ একটি অসাধারণ আবেগঘন ও বেদনাদায়ক কবিতা। কবি এখানে মায়ের কাছে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। তিনি শৈশবের সেই সুখের দিনগুলোর কথা স্মরণ করেছেন, যখন তিনি মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে যেতেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি ঘুমাতে পারেন না। তাঁর চোখ অনিদ্রায় পোড়া পাথর হয়ে গেছে। তাঁর শরীর পরাধীন, তাঁর মনে রাজত্ব করছে ভিন্ন শাসক সেনারা। তিনি প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন, তিনি কেবল দেখেন মানুষের মৃত হাড়, কান্নার কঙ্কাল, সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তিনি মায়ের কাছে ফিরে যেতে চান – সেই নিরাপদ আশ্রয়ে, সেই মায়ের সোঁদা বুকে। তিনি মাকে অনুরোধ করছেন – তাঁর মাতৃত্বের চুমু দিয়ে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে। তিনি কতদিন ঘুমোননি মা, কতদিন ঘুমোন না… শেষের তিনটি বিন্দু তাঁর যন্ত্রণার অনন্তকালের ইঙ্গিত দেয়। কবিতাটি পড়লে মনে হয় – আমরাও কি মায়ের কাছে ফিরতে চাই না? আমরা কি শৈশবের সেই নিরাপদ জগতে ফিরতে চাই না? কিন্তু ফেরা কি সম্ভব?
প্রশ্নোত্তর
১. ‘মা-র কাছে ফেরা’ কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য কী?
শিরোনামটি অত্যন্ত আবেগময়, স্নিগ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ফেরা’ মানে ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন। কবি এখানে মায়ের কাছে ফিরে আসার কথা বলেছেন। কিন্তু এই ফিরে আসা কি শারীরিক? নাকি মানসিক? কবি হয়তো শৈশবের সেই নিরাপদ জগতে ফিরে যেতে চান, যেখানে মায়ের বুক ছিল এক নিরাপদ আশ্রয়। শিরোনামটি একটি আকুতি, একটি আর্তি, একটি আবেদন। কবি যেন মাকে ডাকছেন – মা, আমি ফিরে আসতে চাই।
২. “বন্ধ্যার বাজপাখি” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
বন্ধ্যা – যে সন্তান জন্ম দিতে পারে না। বাজপাখি – শিকারি পাখি। ‘বন্ধ্যার বাজপাখি’ একটি শক্তিশালী প্রতীক। এটি এমন এক শক্তির প্রতীক, যা উৎপাদনশীল নয়, কিন্তু ধ্বংসাত্মক। এটি ফসলের চরাচরে (উৎপাদনশীল জায়গায়) বসে আছে। এর ঠোঁটের বিষ কবির রক্তের শহরে ঢুকেছে। এটি কবির জীবনের ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতীক।
৩. “মা, এই পরাধীন শরীরে কোথাও মুক্ত আকাশ নেই, মাঠ নেই” – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
কবি তাঁর শরীরকে ‘পরাধীন’ বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর নিজের শরীরের ওপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁর শরীরে অন্য শক্তি রাজত্ব করছে। এই পরাধীন শরীরে কোথাও মুক্ত আকাশ নেই, মাঠ নেই – অর্থাৎ তাঁর জীবনে কোনো স্বাধীনতা নেই, কোনো প্রশস্ততা নেই, কোনো সুখ নেই। তিনি যেন এক কারাগারে বন্দী।
৪. “সংসারের গন্ধে ভেজা তোর সোঁদা বুকে মুখ লুকিয়ে নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে যেতাম” – এই চিত্রটির তাৎপর্য কী?
এটি একটি অত্যন্ত স্নিগ্ধ ও সুন্দর স্মৃতিচারণ। ‘সোঁদা বুক’ মানে সদ্য প্রসূতি মায়ের স্তনের গন্ধযুক্ত বুক। সেই বুকে মুখ লুকিয়ে তিনি নির্ভাবনায় (নিশ্চিন্তে) ঘুমিয়ে যেতেন। এটি শৈশবের নিরাপত্তা, মাতৃস্নেহ, শান্তির এক অপূর্ব চিত্র। এই স্মৃতি বর্তমানের যন্ত্রণার বিপরীতে স্থাপিত হয়েছে।
৫. “নিদ্রার মতো জেগে আছি নিদ্রিত চোখে” – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
এই পংক্তিটি একটি অক্সিমোরন। তিনি ঘুমোননি, কিন্তু নিদ্রার মতো জেগে আছেন – অর্থাৎ তিনি ঘুম আর জেগে থাকার মাঝামাঝি এক অবস্থায় আছেন। নিদ্রিত চোখে তিনি জেগে আছেন – অর্থাৎ তাঁর চোখ ঘুমন্ত, কিন্তু তিনি জেগে। এই দ্বন্দ্ব তাঁর যন্ত্রণাকে আরও গভীর করে।
৬. “দেবদারুর শীর্ণ পাতাগুলো ঝ’রে গেছে মাটির হৃদপিণ্ডে” – বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
দেবদারু গাছের পাতাগুলো ঝরে গেছে মাটির হৃদপিণ্ডে। মাটির হৃদপিণ্ড – পৃথিবীর মর্মস্থল। সেখানে পাতা ঝরে পড়া মানে প্রকৃতির শোক, প্রকৃতির মৃত্যু। এটি একটি শক্তিশালী চিত্রকল্প যা মৃত্যু ও শোকের গভীরতা বুঝিয়েছে।
৭. “সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব” – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
‘সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব’ – বহু মানুষের মৃত্যুর এক ভয়াবহ উৎসব। এটি যুদ্ধ, মহামারী, গণহত্যার প্রতীক। উৎসব সাধারণত আনন্দের, কিন্তু এখানে মৃত্যুই উৎসব – এটি এক ভয়াবহ ব্যঞ্জনা। কবি এই চিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা বা অন্য কোনো ভয়াবহ বিপর্যয়ের কথা বলতে পারেন।
৮. “জানালাগুলো এখোনো খুলিস নি মা?” – এই প্রশ্নের তাৎপর্য কী?
জানালা খোলা মানে বাইরের পৃথিবীকে দেখা, আলো-বাতাস আসতে দেওয়া। কবি মাকে প্রশ্ন করছেন – জানালাগুলো এখনও খোলোনি মা? অর্থাৎ তিনি মাকে জানতে চাইছেন – তুমি কি এখনও বাইরের পৃথিবীর সাথে সংযোগ রাখো? তুমি কি এখনও আলো-বাতাস আসতে দাও? নাকি তুমিও আমার মতো বন্দী?
৯. “এ-দুটো অনিদ্রায় পোড়া পাথর চোখে তোর মাতৃত্বের চুমু দিয়ে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দে” – বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
কবির চোখ দুটো অনিদ্রায় পোড়া পাথর হয়ে গেছে – অর্থাৎ তাঁর চোখ শুষ্ক, ক্লান্ত, পাথরের মতো। তিনি মাকে অনুরোধ করছেন – তাঁর মাতৃত্বের চুমু দিয়ে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে। তিনি সেই শৈশবের মতো মায়ের স্নেহ চান, মায়ের চুমু চান, যা তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে, তাঁকে শান্তি দেবে।
১০. “কতোদিন ঘুমোই নি মা, কতোদিন ঘুমোই না…” – শেষ লাইনের তাৎপর্য কী?
শেষ লাইনে কবি আবার সেই একই কথা বলেছেন। তিনি কতদিন ঘুমোননি মা, কতদিন ঘুমোন না… এই পুনরাবৃত্তি তাঁর যন্ত্রণার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। শেষে তিনটি বিন্দু – যা ইঙ্গিত করে তাঁর যন্ত্রণা শেষ নয়, অনন্তকাল চলবে। এটি একটি অসীম, অনন্ত, নিরন্তর যন্ত্রণার ইঙ্গিত।
ট্যাগস: মা-র কাছে ফেরা, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কবিতা, বাংলা কবিতা, মা-বিষয়ক কবিতা, শৈশবের স্মৃতি, অনিদ্রার কবিতা, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, প্রতিবাদী কবিতা, বাংলাদেশের কবিতা, বন্ধ্যার বাজপাখি, পরাধীন শরীর, মায়ের সোঁদা বুক, সম্মিলিত মৃত্যুর উৎসব, অনিদ্রায় পোড়া পাথর চোখ, মাতৃত্বের চুমু






