কবিতার খাতা
- 41 mins
বর্ষণমালা – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
১.
এক পশলা বৃষ্টি খেয়ে বেড়াতে বেরুলো ছটফটে
কিশোরী নদীটি
সরল কদমগাছের দিকে চোখ টিপে বললো, যাবি?
আকাশ একটু একটু করে নেমে আসছে, আবার উঠছে।
আবার নামছে
কলাগাছের ছেড়া পাতায় কে যেন বাজাচ্ছে বাঁশি
ও বাঁশিওয়ালা, তুমি একবার ফুরুস ফুলগুলোকে কাঁদাবে না?
পেঁপেগাছের পিঁপড়ে ঝাঁপ দিল মহাশূন্যে
মাটি থেকে সাত ইঞ্চি উঁচু দিয়ে ঘর্ঘরিয়ে ছুটে
গেল একটা রথ
রাস্তাটা একটু রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ালো
লিচু গাছের নতুন পাতারা পায়ের ধুলো নিচ্ছে
পুরনো পাতাদের
ডানায় পতাকা উড়িয়ে কোঁচ বক নদীটিকে বললো,
চল না কল্যাণেশ্বরীর মেলায়
নিমফুলের মৌমাছি ভুলে গেছে ঘর গেরস্থালির কথা
দিনের আলোয় একটা সাদা পাচা উড়ে গেল রাত্রির দেশে
তিনটে কাঠচাঁপা বন্দি করে রেখেছে রাজপুত্রের মতন
এক টুকরো রোদ
ও বাঁশিওয়ালা, তুমি একবার তোমার বন্ধুর ঘুম ভাঙাবে না?
২.
সেদিনও ছিল আকাশ ভাঙা বৃষ্টিময় সন্ধে
তোমার বুক মাদক ছিল, মৃদু ঘামের গন্ধ
নরম চাঁদ, দুখানি চাঁদ, গোলাপি রঙা বৃন্ত
চক্ষে ধাঁধা, জিহ্বা তবু ভুল করেনি চিনতে
এসেছিলে কি নিরাভরণ নদীর মতো তন্বী
বুকে ছিল কি সুধা? হায়রে ক্ষুধার্তের মন নেই
প্রথম নারী, তোমার চাঁদে আমার সেই স্পর্শ
অমৃত নয়, ঘামের নুন, তাই কেঁপেছি হর্ষে
৩.
দৌড়োতে দৌড়াতে লাল মাটির প্রান্তর ভরা
বৃষ্টি সঙ্গে নিয়ে
বারান্দায় উঠে এলে তুমি
কে সেখানে বসে আছে
বেতের চেয়ারে, ওষ্ঠে সিগারেট
ভেজা শাড়ি লেপ্টে গেছে তোমার বাতাবি-নিতম্বে
সরস্বতী মূর্তির মতন কোমর
নাভিতে মেঘের ঘ্রাণ
সেই লোকটির হাতে কলম, কোলে একটি বাঁধানো খাতা
সে হয়তো কবিতা লিখছিল, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল
সাত লক্ষ কল্পনার সুতো
সরস্বতীর বন্দনা ছেড়ে সে দেখছে তোমাকে
তোমার ঊরুর ডৌল
সমস্ত বৃষ্টিময় দেশ ভরে গেল রভস গন্ধে
সেই পুরুষটির জাদুদণ্ডে জ্বলে উঠলো দাবানল
কলম আর খাতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে উঠে এলো
তোমার কাছে দয়া চাইছে যেন, আলিঙ্গনে উদ্যত
এক শরীরের নিঃসঙ্গতা অন্য শরীরের নিঃসঙ্গতাকে।
গরলের মতো পান করতে চায়
ইতিহাস তখন স্তব্ধ হয়ে থাকে অন্তরীক্ষে
দেবতারা হাততালি দেয়, সন্ন্যাসীরা মুখ নিচু করে কাঁদে
বাঁশিওয়ালা তার বাঁশি বাজিয়ে আরও বৃষ্টিকে ডাকে
কয়েকটা শালিক শুধু দেখে গেল মেঝেতে গড়ানো
সেই না-লেখা কবিতা
৪.
বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে একা
বকুল ফুলের মতন বৃষ্টি, ঝরেছে বকুল, বৃষ্টি বকুল
ঝাপসা বাতাসে একটি ঝলক অচেনা নিজেকে দেখা
৫.
বেলা যায়, বেলা যায়, শোনোনি সন্ন্যাসী?
পাহাড় শিখর থেকে গড়ানো পাথর যেন, ক্ষয়ে আসে দিন
ধারাস্নানে সুষুপ্ত পৃথিবী
খেয়া ঘাটে কেউ নেই, একা একা নৌকোখানি দোলে
ফিরে এসো হে সন্ন্যাসী, তোমার দু পায়ে এত ক্ষত
আর কত দূর যাবে? জীবন ফুরিয়ে এলে তবু কোনো
পথ বাকি থাকে?
জীবনই জীবন-সত্য, তার ওপারে আর কিছু নেই
ফিরে এসো, হে সন্ন্যাসী, বাসনার মধ্যে ফিরে এসো
সাজ খোলো, ছোট ছোট দুঃখে কাঁদো, শিশুটিকে
কোলে তুলে নাও
ফিরে এসো, হে সন্ন্যাসী, কত ক্ষমা চাওয়া বাকি আছে
জীবন ফুরিয়ে এলো, খেয়াঘাটে নৌকোখানি একা একা দোলে
৬.
সুন্দর শুধু ব্যথা দেয়, শুধু বুক মোচড়ায়
সুন্দর নরম ডানায় আগুন ঝরায়
সুন্দর যেন হঠাৎ বৃষ্টি, অলীকের মতো তৃষ্ণা ছড়ায়
সুন্দর চায় গোপন অশ্রু, পূজারীকে পায়ে ঠেলে চলে যায়
সুন্দর আরও সুন্দরতর হয়ে আলেয়ার মতন ঘোরায়
সুন্দর তার নরম ডানায় আগুন ছড়ায়…
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
বর্ষণমালা – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | বর্ষণমালা কবিতা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | বর্ষার কবিতা | প্রেম ও প্রকৃতির কবিতা
বর্ষণমালা: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বৃষ্টি, প্রেম ও নিসর্গের অসাধারণ কাব্যভাষা
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “বর্ষণমালা” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও বহুমাত্রিক শ্রেষ্ঠ কবিতা। “এক পশলা বৃষ্টি খেয়ে বেড়াতে বেরুলো ছটফটে / কিশোরী নদীটি / সরল কদমগাছের দিকে চোখ টিপে বললো, যাবি?” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে বর্ষার প্রকৃতি, প্রেমের শিহরণ, নিসর্গের নানা চিত্র, সন্ন্যাসীর ফিরে আসার আহ্বান, এবং সুন্দরের বেদনার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের একজন প্রধান বাংলা কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, নগরজীবন, এবং অস্তিত্বগত চেতনা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। “বর্ষণমালা” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি বৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃতি, প্রেম, শরীর, নিসর্গ, এবং জীবনের গভীর সত্যকে একসঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: প্রেম, প্রকৃতি ও নগরজীবনের কবি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর জেলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আধুনিক বাংলা কবিতায় এক নতুন ধারার সূচনা করেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘একা এবং কয়েকজন’ (১৯৫৮), ‘অভিযানের পরে’ (১৯৬১), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৭১), ‘আমার প্রেমের কবিতা’ (১৯৮৫), ‘বর্ষণমালা’ (১৯৯০), ‘স্মৃতির শহর’ (২০০০) ইত্যাদি। তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, শিশুসাহিত্য সহ অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র ‘কাকাবাবু’, ‘শারদা’, ‘নীললোহিত’ বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রেমের গভীর উপলব্ধি, প্রকৃতির সংবেদনশীল চিত্রায়ন, নগরজীবনের নির্মম বাস্তবতা, এবং সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় জটিল অনুভূতি প্রকাশের দক্ষতা। ‘বর্ষণমালা’ তাঁর সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
বর্ষণমালা: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘বর্ষণমালা’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘বর্ষণ’ — বৃষ্টি, ‘মালা’ — মালা, স্তবগুচ্ছ। এটি বৃষ্টির একাধিক স্তবকের সমাহার — বৃষ্টির নানা রূপ, বৃষ্টির নানা অনুভূতি।
কবিতাটি ছয়টি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে বৃষ্টি-ভেজা প্রকৃতির চিত্র — কিশোরী নদী, কদমগাছ, কলাগাছের ছেঁড়া পাতায় বাঁশি, পেঁপেগাছের পিঁপড়ে, রথ, লিচু গাছের নতুন পাতা, কোঁচ বক, নিমফুলের মৌমাছি, সাদা পাচা, কাঠচাঁপা, বাঁশিওয়ালা।
দ্বিতীয় স্তবকে প্রেমের শিহরণ — আকাশ ভাঙা বৃষ্টিময় সন্ধে, বুকের মাদকতা, মৃদু ঘামের গন্ধ, নরম চাঁদ, গোলাপি রঙা বৃন্ত, প্রথম নারীর স্পর্শ, ঘামের নুন।
তৃতীয় স্তবকে কবি ও প্রেমিকার মিলন — লাল মাটির প্রান্তর, বারান্দায় প্রেমিকা, ভেজা শাড়ি, সরস্বতী মূর্তির মতো কোমর, নাভিতে মেঘের ঘ্রাণ। কবি কলম ও খাতা ছুঁড়ে ফেলে প্রেমিকার কাছে যায় — এক শরীরের নিঃসঙ্গতা অন্য শরীরের নিঃসঙ্গতাকে পান করতে চায়। ইতিহাস স্তব্ধ, দেবতারা হাততালি দেয়, সন্ন্যাসীরা মুখ নিচু করে কাঁদে, বাঁশিওয়ালা আরও বৃষ্টি ডাকে।
চতুর্থ স্তবকে বকুল গাছের তলায় একা দাঁড়িয়ে থাকার চিত্র — বকুল ফুলের মতো বৃষ্টি, ঝাপসা বাতাসে অচেনা নিজেকে দেখা।
পঞ্চম স্তবকে সন্ন্যাসীর ফিরে আসার আহ্বান — বেলা যায়, পাহাড় শিখর থেকে গড়ানো পাথরের মতো দিন ক্ষয় হয়। খেয়াঘাটে কেউ নেই, নৌকো একা দোলে। কবি সন্ন্যাসীকে ফিরে আসতে বলেন — জীবনই জীবন-সত্য, তার ওপারে আর কিছু নেই। ছোট ছোট দুঃখে কাঁদতে, শিশুটিকে কোলে তুলে নিতে বলেন।
ষষ্ঠ স্তবকে সুন্দরের বেদনার কথা — সুন্দর শুধু ব্যথা দেয়, শুধু বুক মোচড়ায়। সুন্দর নরম ডানায় আগুন ঝরায়। সুন্দর গোপন অশ্রু চায়, পূজারীকে পায়ে ঠেলে চলে যায়। সুন্দর আরও সুন্দরতর হয়ে আলেয়ার মতো ঘোরায়।
বর্ষণমালা: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: বৃষ্টি-ভেজা প্রকৃতির নৃত্যগীত
“এক পশলা বৃষ্টি খেয়ে বেড়াতে বেরুলো ছটফটে / কিশোরী নদীটি / সরল কদমগাছের দিকে চোখ টিপে বললো, যাবি? / আকাশ একটু একটু করে নেমে আসছে, আবার উঠছে। / আবার নামছে / কলাগাছের ছেড়া পাতায় কে যেন বাজাচ্ছে বাঁশি / ও বাঁশিওয়ালা, তুমি একবার ফুরুস ফুলগুলোকে কাঁদাবে না? / পেঁপেগাছের পিঁপড়ে ঝাঁপ দিল মহাশূন্যে / মাটি থেকে সাত ইঞ্চি উঁচু দিয়ে ঘর্ঘরিয়ে ছুটে / গেল একটা রথ / রাস্তাটা একটু রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ালো / লিচু গাছের নতুন পাতারা পায়ের ধুলো নিচ্ছে / পুরনো পাতাদের / ডানায় পতাকা উড়িয়ে কোঁচ বক নদীটিকে বললো, / চল না কল্যাণেশ্বরীর মেলায় / নিমফুলের মৌমাছি ভুলে গেছে ঘর গেরস্থালির কথা / দিনের আলোয় একটা সাদা পাচা উড়ে গেল রাত্রির দেশে / তিনটে কাঠচাঁপা বন্দি করে রেখেছে রাজপুত্রের মতন / এক টুকরো রোদ / ও বাঁশিওয়ালা, তুমি একবার তোমার বন্ধুর ঘুম ভাঙাবে না?”
প্রথম স্তবকে কবি বৃষ্টি-ভেজা প্রকৃতির জীবন্ত চিত্র এঁকেছেন। ‘এক পশলা বৃষ্টি খেয়ে বেড়াতে বেরুলো ছটফটে / কিশোরী নদীটি’ — নদীকে কিশোরী রূপক দিয়েছেন। ‘সরল কদমগাছের দিকে চোখ টিপে বললো, যাবি?’ — কদমগাছের সঙ্গে নদীর কথোপকথন। ‘আকাশ একটু একটু করে নেমে আসছে, আবার উঠছে। / আবার নামছে’ — বৃষ্টির সময় আকাশের নড়াচড়া। ‘কলাগাছের ছেড়া পাতায় কে যেন বাজাচ্ছে বাঁশি’ — প্রকৃতির সংগীত। ‘ও বাঁশিওয়ালা, তুমি একবার ফুরুস ফুলগুলোকে কাঁদাবে না?’ — বাঁশিওয়ালাকে প্রশ্ন। ‘পেঁপেগাছের পিঁপড়ে ঝাঁপ দিল মহাশূন্যে’ — পিঁপড়ের উল্লাস। ‘মাটি থেকে সাত ইঞ্চি উঁচু দিয়ে ঘর্ঘরিয়ে ছুটে / গেল একটা রথ’ — কল্পনার রথ। ‘রাস্তাটা একটু রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ালো’ — রাস্তার সরে দাঁড়ানো। ‘লিচু গাছের নতুন পাতারা পায়ের ধুলো নিচ্ছে / পুরনো পাতাদের’ — নতুন পাতা পুরোনো পাতার প্রতি শ্রদ্ধা। ‘ডানায় পতাকা উড়িয়ে কোঁচ বক নদীটিকে বললো, / চল না কল্যাণেশ্বরীর মেলায়’ — কোঁচ বকের নদীকে মেলায় যাওয়ার আহ্বান। ‘নিমফুলের মৌমাছি ভুলে গেছে ঘর গেরস্থালির কথা’ — মৌমাছির বিভোর অবস্থা। ‘দিনের আলোয় একটা সাদা পাচা উড়ে গেল রাত্রির দেশে’ — সময়ের উল্টে যাওয়া। ‘তিনটে কাঠচাঁপা বন্দি করে রেখেছে রাজপুত্রের মতন / এক টুকরো রোদ’ — রোদের সঙ্গে কাঠচাঁপা ফুলের খেলা। ‘ও বাঁশিওয়ালা, তুমি একবার তোমার বন্ধুর ঘুম ভাঙাবে না?’ — শেষে আবার বাঁশিওয়ালাকে প্রশ্ন।
দ্বিতীয় স্তবক: প্রেমের শিহরণ ও প্রথম স্পর্শ
“সেদিনও ছিল আকাশ ভাঙা বৃষ্টিময় সন্ধে / তোমার বুক মাদক ছিল, মৃদু ঘামের গন্ধ / নরম চাঁদ, দুখানি চাঁদ, গোলাপি রঙা বৃন্ত / চক্ষে ধাঁধা, জিহ্বা তবু ভুল করেনি চিনতে / এসেছিলে কি নিরাভরণ নদীর মতো তন্বী / বুকে ছিল কি সুধা? হায়রে ক্ষুধার্তের মন নেই / প্রথম নারী, তোমার চাঁদে আমার সেই স্পর্শ / অমৃত নয়, ঘামের নুন, তাই কেঁপেছি হর্ষে”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি প্রেমের শিহরণের কথা বলছেন। ‘আকাশ ভাঙা বৃষ্টিময় সন্ধে’ — বৃষ্টিভেজা সন্ধে। ‘তোমার বুক মাদক ছিল, মৃদু ঘামের গন্ধ’ — প্রেমিকার বুকের মাদকতা ও ঘামের গন্ধ। ‘নরম চাঁদ, দুখানি চাঁদ, গোলাপি রঙা বৃন্ত’ — স্তনের রূপক। ‘চক্ষে ধাঁধা, জিহ্বা তবু ভুল করেনি চিনতে’ — চোখ ধাঁধিয়ে গেলেও জিহ্বা চিনতে ভুলেনি। ‘এসেছিলে কি নিরাভরণ নদীর মতো তন্বী’ — প্রেমিকা নদীর মতো অনাবরণ এসেছিল। ‘বুকে ছিল কি সুধা? হায়রে ক্ষুধার্তের মন নেই’ — বুকে সুধা ছিল কি? ক্ষুধার্তের মন সুধা চায় না। ‘প্রথম নারী, তোমার চাঁদে আমার সেই স্পর্শ / অমৃত নয়, ঘামের নুন, তাই কেঁপেছি হর্ষে’ — প্রথম নারীর সেই স্পর্শ অমৃত নয়, ঘামের নুন, তাই আনন্দে কেঁপেছি।
তৃতীয় স্তবক: কবি ও প্রেমিকার মিলন, নিঃসঙ্গতার পরস্পর স্পর্শ
“দৌড়োতে দৌড়াতে লাল মাটির প্রান্তর ভরা / বৃষ্টি সঙ্গে নিয়ে / বারান্দায় উঠে এলে তুমি / কে সেখানে বসে আছে / বেতের চেয়ারে, ওষ্ঠে সিগারেট / ভেজা শাড়ি লেপ্টে গেছে তোমার বাতাবি-নিতম্বে / সরস্বতী মূর্তির মতন কোমর / নাভিতে মেঘের ঘ্রাণ / সেই লোকটির হাতে কলম, কোলে একটি বাঁধানো খাতা / সে হয়তো কবিতা লিখছিল, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল / সাত লক্ষ কল্পনার সুতো / সরস্বতীর বন্দনা ছেড়ে সে দেখছে তোমাকে / তোমার ঊরুর ডৌল / সমস্ত বৃষ্টিময় দেশ ভরে গেল রভস গন্ধে / সেই পুরুষটির জাদুদণ্ডে জ্বলে উঠলো দাবানল / কলম আর খাতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে উঠে এলো / তোমার কাছে দয়া চাইছে যেন, আলিঙ্গনে উদ্যত / এক শরীরের নিঃসঙ্গতা অন্য শরীরের নিঃসঙ্গতাকে। / গরলের মতো পান করতে চায় / ইতিহাস তখন স্তব্ধ হয়ে থাকে অন্তরীক্ষে / দেবতারা হাততালি দেয়, সন্ন্যাসীরা মুখ নিচু করে কাঁদে / বাঁশিওয়ালা তার বাঁশি বাজিয়ে আরও বৃষ্টিকে ডাকে / কয়েকটা শালিক শুধু দেখে গেল মেঝেতে গড়ানো / সেই না-লেখা কবিতা”
তৃতীয় স্তবকে কবি প্রেমিকার আগমন ও কবির প্রেমে পড়ার চিত্র এঁকেছেন। ‘দৌড়োতে দৌড়াতে লাল মাটির প্রান্তর ভরা / বৃষ্টি সঙ্গে নিয়ে / বারান্দায় উঠে এলে তুমি’ — বৃষ্টি সঙ্গে নিয়ে প্রেমিকা বারান্দায় উঠে এলেন। ‘কে সেখানে বসে আছে / বেতের চেয়ারে, ওষ্ঠে সিগারেট’ — কবি বসে ছিলেন। ‘ভেজা শাড়ি লেপ্টে গেছে তোমার বাতাবি-নিতম্বে’ — ভেজা শাড়ি নিতম্বে লেপ্টে গেছে। ‘সরস্বতী মূর্তির মতন কোমর / নাভিতে মেঘের ঘ্রাণ’ — সরস্বতীর মতো কোমর, নাভিতে মেঘের ঘ্রাণ। ‘সেই লোকটির হাতে কলম, কোলে একটি বাঁধানো খাতা / সে হয়তো কবিতা লিখছিল, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল / সাত লক্ষ কল্পনার সুতো’ — কবি কবিতা লিখছিলেন, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ‘সরস্বতীর বন্দনা ছেড়ে সে দেখছে তোমাকে / তোমার ঊরুর ডৌল’ — সরস্বতীর বন্দনা ছেড়ে প্রেমিকার ঊরু দেখছেন। ‘সমস্ত বৃষ্টিময় দেশ ভরে গেল রভস গন্ধে’ — বৃষ্টিময় দেশ রভস (উত্তেজনা) গন্ধে ভরে গেল। ‘সেই পুরুষটির জাদুদণ্ডে জ্বলে উঠলো দাবানল’ — কবির জাদুদণ্ডে দাবানল জ্বলে উঠলো। ‘কলম আর খাতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে উঠে এলো / তোমার কাছে দয়া চাইছে যেন, আলিঙ্গনে উদ্যত’ — কলম-খাতা ছুঁড়ে ফেলে তিনি প্রেমিকার কাছে এলেন, আলিঙ্গনে উদ্যত। ‘এক শরীরের নিঃসঙ্গতা অন্য শরীরের নিঃসঙ্গতাকে। / গরলের মতো পান করতে চায়’ — এক শরীরের নিঃসঙ্গতা অন্য শরীরের নিঃসঙ্গতাকে পান করতে চায়। ‘ইতিহাস তখন স্তব্ধ হয়ে থাকে অন্তরীক্ষে / দেবতারা হাততালি দেয়, সন্ন্যাসীরা মুখ নিচু করে কাঁদে’ — ইতিহাস স্তব্ধ, দেবতারা হাততালি দেন, সন্ন্যাসীরা কাঁদেন। ‘বাঁশিওয়ালা তার বাঁশি বাজিয়ে আরও বৃষ্টিকে ডাকে’ — বাঁশিওয়ালা আরও বৃষ্টি ডাকে। ‘কয়েকটা শালিক শুধু দেখে গেল মেঝেতে গড়ানো / সেই না-লেখা কবিতা’ — শালিক দেখে গেল মেঝেতে গড়ানো না-লেখা কবিতা।
চতুর্থ স্তবক: বকুল গাছের তলায় একা নিজেকে দেখা
“বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে একা / বকুল ফুলের মতন বৃষ্টি, ঝরেছে বকুল, বৃষ্টি বকুল / ঝাপসা বাতাসে একটি ঝলক অচেনা নিজেকে দেখা”
চতুর্থ স্তবকে কবি একা দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখার কথা বলছেন। ‘বকুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে একা’ — বকুল গাছের তলায় একা দাঁড়িয়ে। ‘বকুল ফুলের মতন বৃষ্টি, ঝরেছে বকুল, বৃষ্টি বকুল’ — বকুল ফুলের মতো বৃষ্টি, বকুল ঝরছে, বৃষ্টি বকুল। ‘ঝাপসা বাতাসে একটি ঝলক অচেনা নিজেকে দেখা’ — ঝাপসা বাতাসে একটি ঝলকে অচেনা নিজেকে দেখা।
পঞ্চম স্তবক: সন্ন্যাসীর ফিরে আসার আহ্বান
“বেলা যায়, বেলা যায়, শোনোনি সন্ন্যাসী? / পাহাড় শিখর থেকে গড়ানো পাথর যেন, ক্ষয়ে আসে দিন / ধারাস্নানে সুষুপ্ত পৃথিবী / খেয়া ঘাটে কেউ নেই, একা একা নৌকোখানি দোলে / ফিরে এসো হে সন্ন্যাসী, তোমার দু পায়ে এত ক্ষত / আর কত দূর যাবে? জীবন ফুরিয়ে এলে তবু কোনো / পথ বাকি থাকে? / জীবনই জীবন-সত্য, তার ওপারে আর কিছু নেই / ফিরে এসো, হে সন্ন্যাসী, বাসনার মধ্যে ফিরে এসো / সাজ খোলো, ছোট ছোট দুঃখে কাঁদো, শিশুটিকে / কোলে তুলে নাও / ফিরে এসো, হে সন্ন্যাসী, কত ক্ষমা চাওয়া বাকি আছে / জীবন ফুরিয়ে এলো, খেয়াঘাটে নৌকোখানি একা একা দোলে”
পঞ্চম স্তবকে কবি সন্ন্যাসীর ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন। ‘বেলা যায়, বেলা যায়, শোনোনি সন্ন্যাসী?’ — বেলা যায়, শুনছেন না সন্ন্যাসী? ‘পাহাড় শিখর থেকে গড়ানো পাথর যেন, ক্ষয়ে আসে দিন’ — পাহাড় থেকে গড়ানো পাথরের মতো দিন ক্ষয় হয়। ‘ধারাস্নানে সুষুপ্ত পৃথিবী’ — ধারাস্নানে পৃথিবী সুষুপ্ত। ‘খেয়া ঘাটে কেউ নেই, একা একা নৌকোখানি দোলে’ — খেয়াঘাটে কেউ নেই, নৌকো একা দোলে। ‘ফিরে এসো হে সন্ন্যাসী, তোমার দু পায়ে এত ক্ষত / আর কত দূর যাবে?’ — ফিরে এসো, তোমার পায়ে এত ক্ষত, আর কত দূর যাবে? ‘জীবন ফুরিয়ে এলে তবু কোনো / পথ বাকি থাকে?’ — জীবন ফুরিয়ে এলেও কোনো পথ বাকি থাকে? ‘জীবনই জীবন-সত্য, তার ওপারে আর কিছু নেই’ — জীবনই জীবন-সত্য, তার ওপারে আর কিছু নেই। ‘ফিরে এসো, হে সন্ন্যাসী, বাসনার মধ্যে ফিরে এসো’ — ফিরে এসো, বাসনার মধ্যে ফিরে এসো। ‘সাজ খোলো, ছোট ছোট দুঃখে কাঁদো, শিশুটিকে / কোলে তুলে নাও’ — সাজ খোলো, ছোট ছোট দুঃখে কাঁদো, শিশুটিকে কোলে তুলে নাও। ‘ফিরে এসো, হে সন্ন্যাসী, কত ক্ষমা চাওয়া বাকি আছে’ — ফিরে এসো, কত ক্ষমা চাওয়া বাকি আছে। ‘জীবন ফুরিয়ে এলো, খেয়াঘাটে নৌকোখানি একা একা দোলে’ — জীবন ফুরিয়ে এলো, খেয়াঘাটে নৌকো একা দোলে।
ষষ্ঠ স্তবক: সুন্দরের বেদনা ও আগুন
“সুন্দর শুধু ব্যথা দেয়, শুধু বুক মোচড়ায় / সুন্দর নরম ডানায় আগুন ঝরায় / সুন্দর যেন হঠাৎ বৃষ্টি, অলীকের মতো তৃষ্ণা ছড়ায় / সুন্দর চায় গোপন অশ্রু, পূজারীকে পায়ে ঠেলে চলে যায় / সুন্দর আরও সুন্দরতর হয়ে আলেয়ার মতন ঘোরায় / সুন্দর তার নরম ডানায় আগুন ছড়ায়…”
ষষ্ঠ স্তবকে কবি সুন্দরের বেদনার কথা বলছেন। ‘সুন্দর শুধু ব্যথা দেয়, শুধু বুক মোচড়ায়’ — সুন্দর শুধু ব্যথা দেয়, বুক মোচড়ায়। ‘সুন্দর নরম ডানায় আগুন ঝরায়’ — সুন্দর নরম ডানায় আগুন ঝরায়। ‘সুন্দর যেন হঠাৎ বৃষ্টি, অলীকের মতো তৃষ্ণা ছড়ায়’ — সুন্দর হঠাৎ বৃষ্টির মতো, অলীক তৃষ্ণা ছড়ায়। ‘সুন্দর চায় গোপন অশ্রু, পূজারীকে পায়ে ঠেলে চলে যায়’ — সুন্দর গোপন অশ্রু চায়, পূজারীকে পায়ে ঠেলে চলে যায়। ‘সুন্দর আরও সুন্দরতর হয়ে আলেয়ার মতন ঘোরায়’ — সুন্দর আরও সুন্দরতর হয়ে আলেয়ার মতো ঘোরায়। ‘সুন্দর তার নরম ডানায় আগুন ছড়ায়…’ — সুন্দর তার নরম ডানায় আগুন ছড়ায়।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি ছয়টি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবক প্রকৃতির চিত্র, দ্বিতীয় স্তবক প্রেমের শিহরণ, তৃতীয় স্তবক কবি ও প্রেমিকার মিলন, চতুর্থ স্তবক একা নিজেকে দেখা, পঞ্চম স্তবক সন্ন্যাসীর ফিরে আসার আহ্বান, ষষ্ঠ স্তবক সুন্দরের বেদনা।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কিন্তু গভীর আবেগে পরিপূর্ণ। তিনি প্রতীক ব্যবহারে দক্ষ — ‘কিশোরী নদী’, ‘বাঁশিওয়ালা’, ‘সরস্বতী মূর্তি’, ‘নাভিতে মেঘের ঘ্রাণ’, ‘এক শরীরের নিঃসঙ্গতা অন্য শরীরের নিঃসঙ্গতা’, ‘না-লেখা কবিতা’, ‘সন্ন্যাসী’, ‘খেয়াঘাটের নৌকো’, ‘সুন্দরের নরম ডানায় আগুন’।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘ও বাঁশিওয়ালা’ — প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি। ‘ফিরে এসো হে সন্ন্যাসী’ — পঞ্চম স্তবকের পুনরাবৃত্তি। ‘সুন্দর’ — ষষ্ঠ স্তবকের পুনরাবৃত্তি।
শেষের ‘সুন্দর তার নরম ডানায় আগুন ছড়ায়…’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাপ্তি। সুন্দর শুধু ব্যথা দেয়, সুন্দর আগুন ছড়ায় — এটি সৌন্দর্যের দ্বন্দ্বের চিত্র।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“বর্ষণমালা” সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি বৃষ্টি-ভেজা প্রকৃতির জীবন্ত চিত্র এঁকেছেন — কিশোরী নদী, কদমগাছ, বাঁশিওয়ালা, পিঁপড়ে, রথ, কোঁচ বক, মৌমাছি, সাদা পাচা, কাঠচাঁপা। তারপর প্রেমের শিহরণের কথা বলেছেন — বৃষ্টিময় সন্ধে, বুকের মাদকতা, ঘামের গন্ধ, প্রথম স্পর্শ। তারপর কবি ও প্রেমিকার মিলনের চিত্র এঁকেছেন — লাল মাটির প্রান্তর, ভেজা শাড়ি, সরস্বতীর মতো কোমর, এক শরীরের নিঃসঙ্গতা অন্য শরীরের নিঃসঙ্গতাকে পান করা। ইতিহাস স্তব্ধ, দেবতারা হাততালি দেন, সন্ন্যাসীরা কাঁদেন। তারপর বকুল গাছের তলায় একা দাঁড়িয়ে অচেনা নিজেকে দেখার কথা বলেছেন। তারপর সন্ন্যাসীর ফিরে আসার আহ্বান — জীবনই জীবন-সত্য, তার ওপারে আর কিছু নেই। ছোট ছোট দুঃখে কাঁদো, শিশুটিকে কোলে তুলে নাও। শেষে সুন্দরের বেদনার কথা বলেছেন — সুন্দর শুধু ব্যথা দেয়, সুন্দর নরম ডানায় আগুন ঝরায়।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — বৃষ্টি শুধু প্রকৃতির ঘটনা নয়, এটি প্রেমের, স্মৃতির, নিঃসঙ্গতার, সন্ন্যাসের, সুন্দরের বেদনার প্রতীক। বৃষ্টি যেমন প্রকৃতিকে সজীব করে, তেমনি প্রেমকে সজীব করে। কিন্তু সেই প্রেমও ব্যথা দেয়, আগুন ছড়ায়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় বৃষ্টি, প্রেম ও প্রকৃতি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় বৃষ্টি একটি পুনরাবৃত্ত প্রতীক। তিনি বৃষ্টির মধ্যে প্রেম, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি, এবং সৌন্দর্যের বেদনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘বর্ষণমালা’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
তাঁর কবিতায় ‘বাঁশিওয়ালা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র — যে বৃষ্টি ডাকে, প্রকৃতিকে সজীব করে। ‘সন্ন্যাসী’ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র — যে বাসনা ত্যাগ করে চলে যায়, কিন্তু কবি তাকে ফিরে আসতে বলেন।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘বর্ষণমালা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের প্রকৃতি ও প্রেমের সম্পর্ক, প্রতীক ব্যবহারের কৌশল, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
বর্ষণমালা সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: বর্ষণমালা কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৪-২০১২)। তিনি বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের একজন প্রধান বাংলা কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘একা এবং কয়েকজন’, ‘অভিযানের পরে’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘আমার প্রেমের কবিতা’, ‘বর্ষণমালা’, ‘স্মৃতির শহর’।
প্রশ্ন ২: ‘এক শরীরের নিঃসঙ্গতা অন্য শরীরের নিঃসঙ্গতাকে। / গরলের মতো পান করতে চায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের দার্শনিক ব্যাখ্যা। প্রতিটি মানুষ একা, নিঃসঙ্গ। প্রেমে সেই নিঃসঙ্গতা অন্য নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মিলিত হয়। তারা পরস্পরের নিঃসঙ্গতা পান করে — অর্থাৎ গ্রহণ করে, মিলিত হয়।
প্রশ্ন ৩: ‘ইতিহাস তখন স্তব্ধ হয়ে থাকে অন্তরীক্ষে / দেবতারা হাততালি দেয়, সন্ন্যাসীরা মুখ নিচু করে কাঁদে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রেমের মিলনের মুহূর্ত এত মহিমান্বিত যে ইতিহাস স্তব্ধ হয়ে যায়, দেবতারা হাততালি দেন, সন্ন্যাসীরা (যারা বাসনা ত্যাগ করেছে) মুখ নিচু করে কাঁদে — কারণ তারা সেই প্রেম থেকে বঞ্চিত।
প্রশ্ন ৪: ‘সেই না-লেখা কবিতা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি যে কবিতা লিখছিলেন, প্রেমিকাকে দেখে তা অসমাপ্ত রেখে তিনি প্রেমিকার কাছে চলে গেলেন। সেই অসমাপ্ত, না-লেখা কবিতা মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে আছে। শালিক পাখি তা দেখে গেল।
প্রশ্ন ৫: ‘ফিরে এসো হে সন্ন্যাসী, বাসনার মধ্যে ফিরে এসো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সন্ন্যাসী বাসনা ত্যাগ করে চলে গেছেন। কবি তাঁকে ফিরে আসতে বলছেন — বাসনার মধ্যে ফিরে এসো। জীবনই জীবন-সত্য, তার ওপারে আর কিছু নেই। ছোট ছোট দুঃখে কাঁদো, শিশুটিকে কোলে তুলে নাও।
প্রশ্ন ৬: ‘সুন্দর শুধু ব্যথা দেয়, শুধু বুক মোচড়ায় / সুন্দর নরম ডানায় আগুন ঝরায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সুন্দর বস্তু, সুন্দর মানুষ শুধু আনন্দ দেয় না, তারা ব্যথাও দেয়। সুন্দর তার নরম ডানায় আগুন ঝরায় — অর্থাৎ সৌন্দর্য ধ্বংসও ডেকে আনে। এটি সৌন্দর্যের দ্বন্দ্বের চিত্র।
প্রশ্ন ৭: কবিতার ভাষাশৈলী ও প্রতীক ব্যবহার সম্পর্কে কী বলা যায়?
কবিতার ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কিন্তু গভীর আবেগে পরিপূর্ণ। তিনি প্রতীক ব্যবহারে দক্ষ — ‘কিশোরী নদী’, ‘বাঁশিওয়ালা’, ‘সরস্বতী মূর্তি’, ‘নাভিতে মেঘের ঘ্রাণ’, ‘এক শরীরের নিঃসঙ্গতা অন্য শরীরের নিঃসঙ্গতা’, ‘না-লেখা কবিতা’, ‘সন্ন্যাসী’, ‘খেয়াঘাটের নৌকো’, ‘সুন্দরের নরম ডানায় আগুন’।
প্রশ্ন ৮: ‘বর্ষণমালা’ শিরোনামের তাৎপর্য কী?
‘বর্ষণ’ — বৃষ্টি, ‘মালা’ — মালা, স্তবগুচ্ছ। এটি বৃষ্টির একাধিক স্তবকের সমাহার — বৃষ্টির নানা রূপ, বৃষ্টির নানা অনুভূতি।
প্রশ্ন ৯: কবিতায় বৃষ্টি কী প্রতীক?
বৃষ্টি প্রকৃতির সজীবতার প্রতীক, প্রেমের শিহরণের প্রতীক, নিঃসঙ্গতার প্রতীক, স্মৃতির প্রতীক, এবং সুন্দরের বেদনার প্রতীক। বৃষ্টি যেমন প্রকৃতিকে সজীব করে, তেমনি প্রেমকে সজীব করে।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — বৃষ্টি শুধু প্রকৃতির ঘটনা নয়, এটি প্রেমের, স্মৃতির, নিঃসঙ্গতার, সন্ন্যাসের, সুন্দরের বেদনার প্রতীক। বৃষ্টি যেমন প্রকৃতিকে সজীব করে, তেমনি প্রেমকে সজীব করে। কিন্তু সেই প্রেমও ব্যথা দেয়, আগুন ছড়ায়। এটি প্রকৃতি, প্রেম ও জীবনের গভীর সম্পর্কের এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
ট্যাগস: বর্ষণমালা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, বর্ষার কবিতা, প্রেম ও প্রকৃতির কবিতা, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় | কবিতার প্রথম লাইন: “এক পশলা বৃষ্টি খেয়ে বেড়াতে বেরুলো ছটফটে / কিশোরী নদীটি” | বর্ষা ও প্রেমের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






