কবিতার খাতা
- 31 mins
দূরে আছো দূরে – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।
তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে-
উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ,
পরস্পর খুঁড়ে খুঁড়ে নিভৃতি খুঁজেছি।
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্ত খোঁজে লোকে
আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ,
পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী।
শরীরের তীব্রতম গভীর উল্লাসে
তোমার চোখের ভাষা বিস্ময়ে পড়েছি-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
জীবনের প’রে রাখা বিশ্বাসের হাত
কখন শিথিল হয়ে ঝ’রে গেছে পাতা।
কখন হৃদয় ফেলে হৃদপিন্ড ছুঁয়ে
বোসে আছি উদাসীন আনন্দ মেলায়-
তোমাকে পারিনি ছুঁতে- আমার তোমাকে,
ক্ষাপাটে গ্রীবাজ যেন, নীল পটভূমি
তছনছ কোরে গেছি শান্ত আকাশের।
অঝোর বৃষ্টিতে আমি ভিজিয়েছি হিয়া-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।
দূরে আছো দূরে – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ | বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
দূরে আছো দূরে কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর “দূরে আছো দূরে” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অমর প্রেমের কবিতা। ১৯৫৬ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত মাত্র ৩৪ বছরের স্বল্প জীবনে বাংলা কবিতাকে অফুরান সম্পদ দিয়ে যাওয়া এই কবির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি “দূরে আছো দূরে” কবিতাটি প্রেমের গভীরতা, না-পাওয়ার বেদনা ও সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতার এক শক্তিশালী কাব্যিক দলিল। “তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই” এই পঙ্ক্তিটি কবিতায় চারবার পুনরাবৃত্ত হয়ে প্রেমের অসম্পূর্ণতার এক গভীর সত্যকে ধারণ করেছে। দূরে আছো দূরে কবিতাটি শুধু প্রেমের কবিতা নয়, এটি অস্তিত্বের গভীরে লুকিয়ে থাকা একাকীত্ব ও বেদনারও এক অসাধারণ প্রকাশ।
দূরে আছো দূরে কবিতার ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি, যিনি মাত্র ৩৪ বছর বয়সে অকালপ্রয়াত হয়েছেন। তার কবিতায় প্রেম, দ্রোহ, সাম্যবাদী চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ গভীরভাবে ধরা দিয়েছে। সত্তর ও আশির দশকে তার কবিতা বাংলা কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। “দূরে আছো দূরে” কবিতাটি তার শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতাগুলোর একটি। এই কবিতাটি সম্ভবত আশির দশকের শেষভাগে বা নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে রচিত। দূরে আছো দূরে কবিতায় কবির নিজস্ব জীবনদর্শন ফুটে উঠেছে—প্রেম শুধু পাওয়ার নাম নয়, না-পাওয়ার মধ্যেও এক গভীর সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতায় সাধারণত সাম্যবাদী চেতনা ও শোষিতের পক্ষে কথা বলার প্রবণতা দেখা গেলেও এই কবিতাটি তার ব্যতিক্রমী এক সৃষ্টি—যেখানে তিনি সম্পূর্ণরূপে প্রেমিক কবি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। দূরে আছো দূরে কবিতাটি তার শিল্পসত্তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
দূরে আছো দূরে কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক বিশ্লেষণ
“দূরে আছো দূরে” কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত চিত্রময়, গভীর ও আবেগঘন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এখানে সহজ-সরল ভাষায় এক অসাধারণ কাব্যিক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছেন। কবিতাটির গঠন পাঁচটি স্তবকে বিভক্ত, কিন্তু স্তবকগুলোর দৈর্ঘ্য সমান নয়। দূরে আছো দূরে কবিতাটিতে পুনরাবৃত্তির ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। “তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই”—এই পঙ্ক্তিটি কবিতায় চারবার ফিরে এসেছে। এই পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে এক আচারিক মর্যাদা দিয়েছে। এটি যেন কোনো মন্ত্র, কোনো প্রার্থনা, যা বারবার উচ্চারিত হয় কবির অন্তর থেকে। কবির ভাষায় একটি বিশেষ ধরনের বিষণ্ণ অভিমান ও প্রতিবাদী সুর মিশে আছে। “যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্ত খোঁজে লোকে / আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ / পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী”—এই লাইনটিতে কবি প্রেমের বিনিময়ে পাওয়া বেদনার কথা বলেছেন। দূরে আছো দূরে কবিতায় কবির এই ভাষাশৈলী তাকে বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দূরে আছো দূরে কবিতায় প্রেমের ধারণা ও না-পাওয়ার বেদনা
“দূরে আছো দূরে” কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রেমের গভীরতা ও না-পাওয়ার বেদনা। কবি বলেছেন, “তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে”—অর্থাৎ প্রিয়াকে তিনি ছুঁতে পারেননি, শুধু তার দেহ নয়, তার আসল সত্তাটিকেও। “উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ”—শারীরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তিনি সুখ কুড়িয়েছেন, কিন্তু তা সম্পূর্ণ ছিল না। “পরস্পর খুঁড়ে খুঁড়ে নিভৃতি খুঁজেছি”—দুজনে পরস্পরকে খুঁড়ে খুঁড়ে নিভৃতি খুঁজেছেন, কিন্তু পাননি। দূরে আছো দূরে কবিতায় এই না-পাওয়ার বেদনাই প্রধান সুর। “যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্ত খোঁজে লোকে / আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ / পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী”—প্রিয়াও তাকে পেয়েছেন অসুখ, পেয়েছেন কিনারাহীন আগুনের নদী। এই আগুন ভালোবাসার আগুন, যা একইসঙ্গে শুদ্ধিকারী ও ধ্বংসকারী। দূরে আছো দূরে কবিতায় এই প্রেমের ধারণা কবিতাটিকে দিয়েছে গভীর দার্শনিক মাত্রা।
দূরে আছো দূরে কবিতায় দেহ ও আত্মার দ্বন্দ্ব
দূরে আছো দূরে কবিতায় দেহ ও আত্মার এক গভীর দ্বন্দ্ব লক্ষ্যণীয়। কবি বলেছেন, “শরীরের তীব্রতম গভীর উল্লাসে / তোমার চোখের ভাষা বিস্ময়ে পড়েছি”—শরীরের গভীর উল্লাসের মধ্য দিয়েও তিনি প্রিয়ার চোখের ভাষা পড়েছেন। কিন্তু তবুও তিনি ছুঁতে পারেননি প্রিয়ার আসল সত্তা। “জীবনের প’রে রাখা বিশ্বাসের হাত / কখন শিথিল হয়ে ঝ’রে গেছে পাতা”—সম্পর্কের বিশ্বাসের হাত একদিন শিথিল হয়ে গেছে, ঝরে গেছে পাতার মতো। “কখন হৃদয় ফেলে হৃদপিন্ড ছুঁয়ে / বোসে আছি উদাসীন আনন্দ মেলায়”—হৃদয়কে ফেলে তিনি শুধু হৃদপিন্ড ছুঁয়ে বসে আছেন উদাসীন আনন্দ মেলায়। দূরে আছো দূরে কবিতায় এই দেহ ও আত্মার দ্বন্দ্ব কবিতাটিকে দিয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা।
দূরে আছো দূরে কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহার
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ দূরে আছো দূরে কবিতায় কয়েকটি অসাধারণ চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। প্রথম চিত্রকল্পটি হলো ‘ঝিনুক ও মুক্তা’—যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্তা খোঁজে লোকে, তেমনি তাকে খুলেই প্রিয়া পেয়েছেন অসুখ। দ্বিতীয় চিত্রকল্পটি হলো ‘কিনারাহীন আগুনের নদী’—এটি প্রেমের আগুনের প্রতীক, যার কোনো কিনারা নেই, যা চিরন্তন ও সর্বগ্রাসী। তৃতীয় চিত্রকল্পটি হলো ‘ক্ষাপাটে গ্রীবাজ’—সম্ভবত কোনো পাখির নাম, যা নীল পটভূমিতে উড়ে বেড়ায়। চতুর্থ চিত্রকল্পটি হলো ‘শান্ত আকাশ তছনছ করা’—প্রেম এসে তার শান্ত আকাশকে তছনছ করে দিয়েছে। পঞ্চম চিত্রকল্পটি হলো ‘অঝোর বৃষ্টিতে হিয়া ভিজানো’—কবি তার হৃদয় ভিজিয়েছেন অঝোর বৃষ্টিতে, যা সম্ভবত কান্নার প্রতীক। দূরে আছো দূরে কবিতায় এই পাঁচটি চিত্রকল্পের মধ্য দিয়েই কবি তার প্রেমের সমগ্র দর্শন ব্যক্ত করেছেন।
দূরে আছো দূরে কবিতার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
দূরে আছো দূরে কবিতাটি শুধু প্রেমের কবিতা নয়, এটি এক সংবেদনশীল মানুষের মনস্তত্ত্বের অসাধারণ দলিল। কবি বলেছেন, “উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ”—এই ‘ছেনে ছেনে’ শব্দটি ভাঙাচোরা মানসিকতার ইঙ্গিত দেয়। তিনি সুখ কুড়িয়েছেন, কিন্তু তা সম্পূর্ণ ছিল না। “পরস্পর খুঁড়ে খুঁড়ে নিভৃতি খুঁজেছি”—খুঁড়ে খুঁড়ে নিভৃতি খোঁজার মধ্যে এক ধরনের হাহাকার আছে। তারা পরস্পরকে খুঁড়েছেন, কিন্তু শান্তি পাননি। “জীবনের প’রে রাখা বিশ্বাসের হাত / কখন শিথিল হয়ে ঝ’রে গেছে পাতা”—বিশ্বাসের হাত শিথিল হয়ে যাওয়া মানে সম্পর্কের মৃত্যু। দূরে আছো দূরে কবিতায় কবির এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব কবিতাটিকে দিয়েছে গভীর মানবিক মাত্রা।
দূরে আছো দূরে কবিতায় রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর নিজস্বতা
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার চিত্রকল্পনির্ভরতা ও সংগীতময়তা। তিনি কখনো কৃত্রিমতা বা আড়ম্বরতা পছন্দ করতেন না। তার কবিতার শব্দগুলো সাধারণ, দৈনন্দিন জীবনের শব্দ; কিন্তু তিনি সেই সাধারণ শব্দ দিয়েই অসাধারণ অনুভূতি তৈরি করেন। দূরে আছো দূরে কবিতাটিতেও তার এই নিজস্বতার পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে কোনো সংস্কৃত শব্দের বাহুল্য নেই, কোনো জটিল দার্শনিকতার ছড়াছড়ি নেই। আছে শুধু সহজ-সরল ভাষায় বলা এক প্রেমিক হৃদয়ের গল্প। এই সরলতাই কবিতাটিকে ক্লাসিকে পরিণত করেছে। আরেকটি বিষয় হলো, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে প্রেম ও বিরহের দ্বন্দ্ব। তার অধিকাংশ কবিতায় প্রেমিক ‘আমি’ সক্রিয়, আবেগপ্রবণ ও আকুল। দূরে আছো দূরে কবিতাটিতেও সেই আকুলতা প্রবলভাবে বিদ্যমান।
দূরে আছো দূরে কবিতার ভাষাগত বৈশিষ্ট্য
দূরে আছো দূরে কবিতাটির ভাষা অত্যন্ত চিত্রময়, সংগীতময় ও আবেগঘন। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এখানে প্রমিত বাংলা ব্যবহার করেছেন, তবে কিছু স্থানে আঞ্চলিক ও কথ্যভাষার প্রভাবও লক্ষ্যণীয়। বাক্যগুলো ছোট, তীব্র ও লক্ষ্যভেদী। প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয় থেকে সরাসরি নির্গত। কবিতাটিতে বিরামচিহ্নের ব্যবহার অত্যন্ত শিল্পসম্মত। অনেক জায়গায় তিনি ড্যাস ব্যবহার করে অর্থের গভীরতা বাড়িয়েছেন—”তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে-“। এই ড্যাস অসম্পূর্ণতার বোধকে আরও তীব্র করেছে। “তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই”—এই পুনরাবৃত্ত পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় সুর। দূরে আছো দূরে কবিতায় এই শিল্পিত ভাষাপ্রয়োগই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী করে তুলেছে।
দূরে আছো দূরে কবিতার দার্শনিক তাৎপর্য
দূরে আছো দূরে কবিতাটি নিছক প্রেমের কবিতা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। কবি এখানে বোঝাতে চেয়েছেন, প্রকৃত প্রেম কখনো সম্পূর্ণ হয় না। সব প্রেমেই কিছু না কিছু অসম্পূর্ণ থেকে যায়। “তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে”—এই লাইনটির মধ্যে দিয়ে কবি বলেছেন, আমরা প্রিয়ার দেহ ছুঁতে পারি, কিন্তু তার আত্মাকে ছুঁতে পারি না। আমরা তার বাহ্যিক রূপ দেখি, কিন্তু তার অন্তরকে দেখি না। এই অসম্পূর্ণতাই প্রেমকে চিরন্তন করে তোলে। দূরে আছো দূরে কবিতায় কবি বলেছেন, “ক্ষাপাটে গ্রীবাজ যেন, নীল পটভূমি / তছনছ কোরে গেছি শান্ত আকাশের”—প্রেম এসে তার শান্ত আকাশকে তছনছ করে দিয়েছে। এই তছনছ করার মধ্যেই প্রেমের শক্তি নিহিত। প্রেম ধ্বংস করে আবার নতুন করে গড়ে তোলে। দূরে আছো দূরে কবিতায় এই দার্শনিক ভাবনা কবিতাটিকে দিয়েছে গভীরতা ও মহিমা।
দূরে আছো দূরে কবিতার সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা
প্রায় চার দশক আগে লেখা হলেও দূরে আছো দূরে কবিতাটি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান যান্ত্রিক, দ্রুতগামী জীবনে সম্পর্ক ক্রমশ ভঙ্গুর হচ্ছে। মানুষ যত বেশি সংযুক্ত হচ্ছে, তত বেশি বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে দূরে আছো দূরে কবিতাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রেমের গভীরতা আজও অপরিবর্তিত। না-পাওয়ার বেদনা আজও একই রকম। দূরে আছো দূরে কবিতাটি আধুনিক পাঠককে শেখায়, প্রেম শুধু পাওয়ার নাম নয়, না-পাওয়ার মধ্যেও এক গভীর সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। এটি আজকের যুবসমাজের জন্য এক অনন্য বার্তা। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অকালপ্রয়াণের পরও তার কবিতা আজও পাঠকের হৃদয়ে জাগরুক। দূরে আছো দূরে কবিতাটি তার সেই চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতারই উদাহরণ।
দূরে আছো দূরে কবিতায় পুনরাবৃত্তির শিল্প
দূরে আছো দূরে কবিতার অন্যতম প্রধান শৈলীগত বৈশিষ্ট্য হলো পুনরাবৃত্তির ব্যবহার। “তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই”—এই পঙ্ক্তিটি কবিতায় চারবার ফিরে এসেছে। প্রথম স্তবকের শেষে, তৃতীয় স্তবকের শেষে এবং পঞ্চম স্তবকের শেষে এটি পুনরাবৃত্ত হয়েছে। এই পুনরাবৃত্তি কবিতাটিকে এক আচারিক মর্যাদা দিয়েছে। এটি যেন কোনো মন্ত্র, কোনো প্রার্থনা, যা বারবার উচ্চারিত হয় কবির অন্তর থেকে। প্রতিবার এই পুনরাবৃত্তির সাথে নতুন অর্থ যুক্ত হয়েছে। প্রথমবার এটি এসেছে দেহের সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দ্বিতীয়বার এসেছে চোখের ভাষা পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে, তৃতীয়বার এসেছে প্রিয়ার আসল সত্তা ছুঁতে না পারার গভীর বেদনা হিসেবে। দূরে আছো দূরে কবিতায় এই পুনরাবৃত্তির শিল্পই কবিতাটিকে দিয়েছে অনন্য কাব্যিক মাত্রা।
দূরে আছো দূরে কবিতায় ‘ক্ষাপাটে গ্রীবাজ’ রহস্য
দূরে আছো দূরে কবিতার সবচেয়ে রহস্যময় ও আলোচিত পঙ্ক্তি হলো “ক্ষাপাটে গ্রীবাজ যেন, নীল পটভূমি”। ‘ক্ষাপাটে গ্রীবাজ’ কী? এটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন এটি কোনো পাখির নাম, কেউ মনে করেন এটি কবির সৃষ্ট একটি শব্দ, যা তার নিজস্ব কাব্যভাষার পরিচয় বহন করে। গ্রীবাজ শব্দের সঙ্গে গ্রীবার সম্পর্ক আছে—ঘাড় বা গলা। ক্ষাপাটে শব্দের অর্থ হয়তো ক্ষত বা আঘাত। তাই ক্ষাপাটে গ্রীবাজ বলতে কবি বুঝিয়েছেন আহত ঘাড়—যেমন পাখির আহত ঘাড় নীল আকাশে উড়ে বেড়ায়। এই রহস্যময়তা দূরে আছো দূরে কবিতার সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দূরে আছো দূরে কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
দূরে আছো দূরে কবিতার লেখক কে?
“দূরে আছো দূরে” কবিতার লেখক বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। তিনি ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯১ সালের ২১ জুন মাত্র ৩৪ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ: ‘উপদ্রুত উপকূল’, ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’, ‘মানুষের মানচিত্র’, ‘ছবির দেশে মৃত্যু নেই’, ‘হৃদয়ের যত কথা’, ‘জাতির শরীরে আজ’, ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ প্রভৃতি। তিনি মরণোত্তর বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৯২) ও একুশে পদকে (২০১২) ভূষিত হন।
দূরে আছো দূরে কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
“দূরে আছো দূরে” কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রেমের গভীরতা ও না-পাওয়ার বেদনা। কবি বারবার বলেছেন, তিনি প্রিয়ার আসল সত্তাকে ছুঁতে পারেননি। দেহের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তিনি সুখ কুড়িয়েছেন, কিন্তু তা সম্পূর্ণ ছিল না। প্রেমের বিনিময়ে তিনি পেয়েছেন অসুখ, পেয়েছেন কিনারাহীন আগুনের নদী। সম্পর্কের বিশ্বাসের হাত একদিন শিথিল হয়ে গেছে, ঝরে গেছে পাতার মতো। দূরে আছো দূরে কবিতায় এই না-পাওয়ার বেদনাই প্রধান সুর।
“তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই”—এই লাইনটির তাৎপর্য কী?
দূরে আছো দূরে কবিতার এই লাইনটির গভীর তাৎপর্য রয়েছে। ‘তোমার তোমাকে’ বলতে কবি প্রিয়ার আসল সত্তাকে বুঝিয়েছেন, তার দেহ নয়, তার আত্মাকে। কবি বলেছেন, তিনি প্রিয়ার দেহ ছুঁতে পেরেছেন, কিন্তু তার আত্মাকে ছুঁতে পারেননি। এটি প্রেমের এক গভীর সত্যকে নির্দেশ করে—আমরা প্রিয়ার বাহ্যিক রূপ দেখি, কিন্তু তার অন্তরকে দেখি না। এই অসম্পূর্ণতাই প্রেমকে চিরন্তন করে তোলে।
“যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্ত খোঁজে লোকে / আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ / পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী”—এই লাইনগুলোর তাৎপর্য কী?
দূরে আছো দূরে কবিতার এই লাইনগুলোতে কবি প্রেমের বিনিময়ে পাওয়া বেদনার কথা বলেছেন। ঝিনুক যেমন খুলে মুক্তা খোঁজে লোকে, তেমনি তাকে খুলেই প্রিয়া পেয়েছেন অসুখ। এই ‘অসুখ’ ভালোবাসার অসুখ। ‘কিনারাহীন আগুনের নদী’ ভালোবাসার আগুনের প্রতীক, যার কোনো কিনারা নেই, যা চিরন্তন ও সর্বগ্রাসী। এই আগুন একইসঙ্গে শুদ্ধিকারী ও ধ্বংসকারী।
“ক্ষাপাটে গ্রীবাজ যেন, নীল পটভূমি / তছনছ কোরে গেছি শান্ত আকাশের”—এই লাইনগুলোর তাৎপর্য কী?
দূরে আছো দূরে কবিতার এই লাইনগুলো জটিল ও বহুস্তরীয়। ‘ক্ষাপাটে গ্রীবাজ’ সম্ভবত কোনো পাখির নাম, যা নীল পটভূমিতে উড়ে বেড়ায়। কবি বলেছেন, প্রেম এসে তার শান্ত আকাশকে তছনছ করে দিয়েছে—ঠিক যেমন পাখি উড়ে গেলে আকাশে দাগ ফেলে যায়। এই তছনছ করার মধ্যেই প্রেমের শক্তি নিহিত। প্রেম ধ্বংস করে আবার নতুন করে গড়ে তোলে।
দূরে আছো দূরে কবিতায় ‘ক্ষাপাটে গ্রীবাজ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ক্ষাপাটে গ্রীবাজ’ দূরে আছো দূরে কবিতার সবচেয়ে রহস্যময় শব্দ। এটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন এটি কোনো পাখির নাম, কেউ মনে করেন এটি কবির সৃষ্ট একটি শব্দ, যা তার নিজস্ব কাব্যভাষার পরিচয় বহন করে। গ্রীবাজ শব্দের সঙ্গে গ্রীবার সম্পর্ক আছে—ঘাড় বা গলা। ক্ষাপাটে শব্দের অর্থ হয়তো ক্ষত বা আঘাত। তাই ক্ষাপাটে গ্রীবাজ বলতে কবি বুঝিয়েছেন আহত ঘাড়—যেমন পাখির আহত ঘাড় নীল আকাশে উড়ে বেড়ায়।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতা কী কী?
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে রয়েছে: ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’, ‘হে আমার বিষণ্ণ সুন্দর’, ‘অভিমানের খেয়া’, ‘পৃথিবী যা চায়’, ‘জাতির শরীরে আজ’, ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘আমি ঈশ্বর আমি শয়তান’, ‘উপদ্রুত উপকূল’, ‘মানুষের মানচিত্র’, ‘ছবির দেশে মৃত্যু নেই’, ‘হৃদয়ের যত কথা’, ‘ফিরে চাই স্বর্ণগ্রাম’, ‘একটি ফটোগ্রাফ’, ‘সেই একলা কবিতা’ প্রভৃতি।
ট্যাগস: দূরে আছো দূরে, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা, বাংলা কবিতা, প্রেমের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, বাংলাদেশের কবিতা, আশির দশকের কবিতা, না-পাওয়ার কবিতা, বিরহের কবিতা, দূরে আছো দূরে কবিতা বিশ্লেষণ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর শ্রেষ্ঠ কবিতা, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি






