কবিতার খাতা
- 38 mins
দুঃসময়ের নোটবই – জয়দেব বসু।
দুঃসময়ের নোটবই – জয়দেব বসু | দুঃসময়ের নোটবই কবিতা | জয়দেব বসুর কবিতা | বাংলা কবিতা
দুঃসময়ের নোটবই: জয়দেব বসুর নগরায়ণ, গ্রামীণ বিচ্ছিন্নতা ও আত্মান্বেষণের অসাধারণ কাব্যভাষা
জয়দেব বসুর “দুঃসময়ের নোটবই” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা নগরায়ণ, গ্রামীণ বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক পরিবর্তন ও আত্মান্বেষণের এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। আধুনিক বাংলা কবিতার এই শক্তিমান কবি তাঁর কবিতায় গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, নগরায়ণ ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটান। “দুঃসময়ের নোটবই” কবিতাটি একটি আত্মজৈবনিক দলিলের মতো, যেখানে কবি নিজের জীবনের এক সংকটময় মুহূর্তে গ্রামে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু গ্রাম আর তাঁর জন্য অপেক্ষা করে নেই। কবিতাটি শুরু হয় — “তুমি রাজপথ ধরে ফিরে যাচ্ছো, দু’পাশে খেত। / কিন্তু আলপথ আর তোমার অপেক্ষায় নেই।” এই পঙ্ক্তি থেকেই বোঝা যায়, কবি তাঁর শিকড়ে ফিরতে চান, কিন্তু সেই শিকড় আর আগের মতো নেই। আলপথ, যা একসময় তাঁকে গ্রামে নিয়ে যেত, আজ আর তার জন্য অপেক্ষা করে নেই।
জয়দেব বসু এই কবিতায় শহুরে জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে শহুরে মানুষ ধান চিনতে ভুলে গেছে, গ্রাম চিনতে ভুলে গেছে। তাঁরা শুধু গাড়ি চেনে — মজুতদারের ট্রাক, শিল্পপতির ফোর্ড-আইকন, মল-মালিকদের ল্যান্সার, হিমঘর মালিকের স্যান্ট্রো, মধ্যবিত্তের অল্টো, নব্য রাজনীতিবিদদের ইন্ডিকা। কিন্তু এই সব গাড়ির কোনোটাই কবির জন্য নয়। তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, বৃষ্টিতে ভিজছেন, আর ভাবছেন — কী করে এমন হলো? কেন তিনি এত বিচ্ছিন্ন? কেন গ্রাম তাঁর চোখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে?
কবিতাটি একাধারে সামাজিক সমালোচনা, আবার একাধারে আত্মান্বেষণ। কবি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন — তিনি কি কখনও সত্যিই গ্রামে গিয়েছেন? পিকনিক পার্টি ছাড়া, ইউনিট বা জোনাল সম্মেলন ছাড়া তিনি কি একা গ্রামে রাত কাটিয়েছেন? উত্তর হল — না। তিনি কখনও আচমকা, একা-একা, লোকাল ট্রেন ধরে, রিকশা করে, দাঁড়িপাল্লায় মাপা ছেঁড়া পরোটা চিবিয়ে, রস মাখা মুড়ি খেয়ে, লাইন হোটেলের খাটিয়ায় শুয়ে একটি রাতও কাটাননি। এই স্বীকারোক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর সঙ্গে গ্রামের সম্পর্ক ছিল ভাসা-ভাসা, ছিল আনুষ্ঠানিক।
কবির সবচেয়ে বড় আত্মস্বীকারোক্তি হলো — “হতে পারে তুমি সৎ। কিন্তু, / তাতে আজ আর কিছু যায়-আসে না। / কারণ, শুধুমাত্র ‘অনুগত সৈনিক’ থাকতে চেয়ে / কারণ, শুধুমাত্র ‘ভালোমানুষ’ থাকতে চেয়ে / তুমি অসৎ-এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে গিয়েছো।” এই পঙ্ক্তিগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি বলছেন, তাঁর নীরবতা, তাঁর চুপ করে থাকা, শুধু ভালো মানুষ থাকতে চাওয়া — এগুলোই অসৎদের সংখ্যা বাড়িয়েছে। তিনি প্রশ্ন করার অধিকার ছিল, তিনি তা ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি পার্টিকে প্রশ্নাতীত থাকার অধিকার দিয়ে দিয়েছেন। এখন তাঁর আর কোনো মূল্য নেই, তিনি অপ্রাসঙ্গিক।
কবিতার শেষ অংশে তিনি দেখান — কেউ তাঁর দিকে তাকানোর সময় নেই। চাষি ভাবছে কবে মরবে, বস্তিবাসী চলে যাচ্ছে শহরের শেষ প্রান্তে, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের শিকল জড়িয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ির গায়ে। তিন পুরুষের সংসার হারিয়ে যাচ্ছে। সময় নেই কারো। আর তিনি শুধু নিজের থেকে পালাচ্ছেন, নিজের অতীত থেকে। শেষ পঙ্ক্তিটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক — “তোমাকে করুণা করাও এখন অবান্তর।”
জয়দেব বসু: গ্রামীণ জীবনের কবি
জয়দেব বসু বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর কবিতায় গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, নগরায়ণ ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল জীবনবোধ ও গ্রামীণ বাংলার চিরায়ত রূপ ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর কবিতার ভাষা এতটাই স্বাভাবিক যে তা সরাসরি পাঠকের হৃদয়ে প্রবেশ করে। “বাসনা”, “বসন্ত-উৎসব”, “দুঃসময়ের নোটবই” তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতা। জয়দেব বসুর কবিতা পাঠককে ভাবায়, আন্দোলিত করে এবং নিজের ভেতরে তাকাতে বাধ্য করে। তিনি বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
দুঃসময়ের নোটবই কবিতার পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
“দুঃসময়ের নোটবই” কবিতাটি সম্ভবত একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে রচিত। এই সময়ে বাংলায় নগরায়ণের গতি ছিল অত্যন্ত দ্রুত। গ্রাম থেকে মানুষ শহরমুখী হচ্ছিল, কৃষি জমি শিল্পকারখানায় রূপান্তরিত হচ্ছিল, গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছিল। শহুরে মানুষ গ্রাম ভুলতে শুরু করেছিল। এই প্রেক্ষাপটে কবি তাঁর নিজের জীবন ও অবস্থান নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারেন, তিনিও সেই শহুরে মানুষদের একজন, যারা গ্রামকে ভুলে গেছে। এই উপলব্ধি থেকেই এই কবিতার জন্ম।
কবিতার শিরোনাম ‘দুঃসময়ের নোটবই’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একটি ডায়েরির মতো, যেখানে কবি তাঁর সংকটময় সময়ের অভিজ্ঞতা, তাঁর চিন্তা-ভাবনা লিপিবদ্ধ করেছেন। এই নোটবই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নয়, এটি সমগ্র শহুরে বাঙালির দুঃসময়ের নোটবই।
দুঃসময়ের নোটবই কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“দুঃসময়ের নোটবই” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘দুঃসময়’ — খারাপ সময়, সংকটের সময়, বিপর্যয়ের সময়। ‘নোটবই’ — ডায়েরি, স্মৃতির খাতা, আত্মলিপি। কবি তাঁর এই দুঃসময়ের অভিজ্ঞতা, তাঁর চিন্তা-ভাবনা, তাঁর আত্মদ্বন্দ্ব এই নোটবইতে লিপিবদ্ধ করেছেন। শিরোনামেই ইঙ্গিত — এই কবিতা আত্মান্বেষণের, সমাজ পর্যালোচনার, সংকটের সময়ের এক গভীর দলিল। এটি শুধু কবির ব্যক্তিগত দুঃসময় নয়, এটি সমগ্র শহুরে বাঙালির দুঃসময়ের প্রতিনিধিত্ব করে।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তুমি রাজপথ ধরে ফিরে যাচ্ছো, دو’পাশে খেত। / কিন্তু আলপথ আর তোমার অপেক্ষায় নেই।” প্রথম স্তবকে কবি নগরবাসীর গ্রামে ফেরার চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলেছেন — তুমি রাজপথ ধরে ফিরে যাচ্ছো, দু’পাশে খেত। কিন্তু আলপথ আর তোমার অপেক্ষায় নেই।
‘রাজপথ ধরে ফিরে যাচ্ছো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
রাজপথ — বড় রাস্তা, শহরের রাস্তা, পাকা রাস্তা। তিনি শহর থেকে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন এই রাজপথ ধরে। কিন্তু আলপথ — ছোট পথ, কাঁচা পথ, গ্রামের পথ — আর তার জন্য অপেক্ষা করে নেই। এই আলপথই একসময় তাঁকে গ্রামের অন্তরালে, গ্রামের হৃদয়ে নিয়ে যেত। এখন সেই পথ আর নেই। গ্রামও নেই। শহুরে মানুষ আজ গ্রামে ফিরতে চাইলেও ফিরতে পারে না, কারণ গ্রাম আর আগের মতো নেই।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“চারপাশ দিয়ে হু-হু করে চলে যাচ্ছে গাড়ি / মজুতদারের ট্রাক, জমি খুঁজতে আসা শিল্পপতির ফোর্ড- আইকন, / মল- মালিকদের ল্যান্সার, হিমঘর মালিকের স্যান্ট্রো, / মাইনে বাড়া মধ্যবিত্তের অল্টো,আর / সদ্য তৃণমূলে যোগ দেওয়া বেনোজলদের ইন্ডিকা। / এর একটিও তোমার জন্য নয়।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি গাড়ির বহর বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — চারপাশ দিয়ে হু-হু করে চলে যাচ্ছে গাড়ি — মজুতদারের ট্রাক, জমি খুঁজতে আসা শিল্পপতির ফোর্ড-আইকন, মল-মালিকদের ল্যান্সার, হিমঘর মালিকের স্যান্ট্রো, মাইনে বাড়া মধ্যবিত্তের অল্টো, আর সদ্য তৃণমূলে যোগ দেওয়া বেনোজলদের ইন্ডিকা। এর একটিও তোমার জন্য নয়।
গাড়িগুলোর তাৎপর্য
প্রতিটি গাড়ি একটি শ্রেণির প্রতীক। মজুতদারের ট্রাক — কালোবাজারি ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের প্রতীক। শিল্পপতির ফোর্ড-আইকন — বড় শিল্পপতিদের প্রতীক, যারা গ্রামের জমি কিনে নিচ্ছে। মল-মালিকদের ল্যান্সার — শপিং মলের মালিক, ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রতিনিধি। হিমঘর মালিকের স্যান্ট্রো — কৃষি পণ্য মজুত করে দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের প্রতীক। মধ্যবিত্তের অল্টো — শহুরে মধ্যবিত্ত, যারা নিজেদের স্বপ্ন পূরণে ব্যস্ত। বেনোজলদের ইন্ডিকা — নব্য রাজনীতিবিদ, যারা দলে যোগ দিয়ে সুবিধা নিচ্ছে। এই সব গাড়ি ছুটে চলেছে, কিন্তু কবির জন্য কোনো গাড়ি নেই। তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, বৃষ্টিতে ভিজছেন, আর এই গাড়িগুলো দেখছেন।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ভেজা অ্যাসফল্টে আজ আর কেউ ধান শোঁকাতে দেয়নি। / বৃষ্টি পড়ছে গুঁড়ি- গুঁড়ি, তুমি রুমালে চশমা মুছছো, পরছো, / আর ভাবছো: কী করে এমন হলো? / دو’পাশে যতদূর চোখ যায় ধানক্ষেত; অথবা আদৌ ধান কি না / তুমি ঠিক মতো জানো না। শহর তোমাকে ধান চিনতে শেখায়নি। / অথচ বাতাস বইছে শোঁ-শোঁ এই বাতাস রাজপথ অতিক্রম করে / ছুটে যাচ্ছে গ্রামের দিকে: ছাত্র-আন্দোলন করা তুমি জানো: / গ্রাম আছে, এই বাংলাতেই আছে: কিন্তু دو’পাশে কোনো গ্রামই আজ আর তুমি দেখতে পাচ্ছো না। / গ্রাম তোমার চোখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। / কেন? তুমি ভাবছো: কী করে এমন হলো?” তৃতীয় স্তবকে কবি তাঁর দ্বিধা ও প্রশ্নের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — ভেজা অ্যাসফল্টে আজ আর কেউ ধান শোঁকাতে দেয়নি। বৃষ্টি পড়ছে গুঁড়ি-গুঁড়ি, তুমি রুমালে চশমা মুছছো, পরছো, আর ভাবছো: কী করে এমন হলো? دو’পাশে যতদূর চোখ যায় ধানক্ষেত; অথবা আদৌ ধান কি না তুমি ঠিক মতো জানো না। শহর তোমাকে ধান চিনতে শেখায়নি। অথচ বাতাস বইছে শোঁ-শোঁ — এই বাতাস রাজপথ অতিক্রম করে ছুটে যাচ্ছে গ্রামের দিকে। ছাত্র-আন্দোলন করা তুমি জানো: গ্রাম আছে, এই বাংলাতেই আছে: কিন্তু دو’পাশে কোনো গ্রামই আজ আর তুমি দেখতে পাচ্ছো না। গ্রাম তোমার চোখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। কেন? তুমি ভাবছো: কী করে এমন হলো?
‘ধান শোঁকানো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ধান শোঁকানো — ধানের গন্ধ নেওয়া, ধানের সৌন্দর্য উপভোগ করা, গ্রামের জীবনের সাথে যুক্ত হওয়া। আজ আর কেউ তাকে ধানের গন্ধ নিতে দেয় না। গ্রামের মানুষও তাকে ধানের কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না।
‘শহর তোমাকে ধান চিনতে শেখায়নি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শহরে বড় হওয়া মানুষ গ্রাম চেনে না, ধান চেনে না, ফসল চেনে না। তারা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা ধান দেখলেও চিনতে পারে না — এটা কি সত্যিই ধান, নাকি অন্য কিছু? এই অজ্ঞতা শহুরে মানুষের এক বড় অভিশাপ।
‘গ্রাম তোমার চোখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গ্রাম এখন আর তাকে দেখা দেয় না। সে গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গ্রাম তার জন্য আর নেই। গ্রাম এখন শুধু কল্পনায় আছে, বাস্তবে নেই।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“(ইউনিট বা জোনাল সম্মেলন ছাড়া) / পিকনিক পার্টির সঙ্গে ছাড়া তুমি কখনো গ্রামে যাওনি। / আচমকা, একা-একা, লোকাল ট্রেন ধরে, রিকশা করে, / দাঁড়িপাল্লায় মাপা ছেঁড়া পরোটা চিবিয়ে, / রস মাখা মুড়ি খেয়ে, লাইন হোটেলের খাটিয়ায় শুয়ে, / একটি রাতও কাটেনি তোমার। / আজ আর হলফ করে বলা যাচ্ছে না,বৃষ্টি না অশ্রু— ঠিক কোনটা বারংবার / আবছা করে দিচ্ছে তোমার চোখ; / রাজপথ ধরে তুমি পিছিয়ে যাচ্ছোই তো যাচ্ছো……. / আর, ভাবছো: কেন? কী করে?” চতুর্থ স্তবকে কবি তাঁর গ্রামবিমুখতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — ইউনিট বা জোনাল সম্মেলন ছাড়া, পিকনিক পার্টির সঙ্গে ছাড়া তুমি কখনো গ্রামে যাওনি। আচমকা, একা-একা, লোকাল ট্রেন ধরে, রিকশা করে, দাঁড়িপাল্লায় মাপা ছেঁড়া পরোটা চিবিয়ে, রস মাখা মুড়ি খেয়ে, লাইন হোটেলের খাটিয়ায় শুয়ে, একটি রাতও কাটেনি তোমার। আজ আর হলফ করে বলা যাচ্ছে না — বৃষ্টি না অশ্রু — ঠিক কোনটা বারংবার আবছা করে দিচ্ছে তোমার চোখ। রাজপথ ধরে তুমি পিছিয়ে যাচ্ছোই তো যাচ্ছো……. আর, ভাবছো: কেন? কী করে?
‘একটি রাতও কাটেনি তোমার’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি স্বীকার করছেন — তিনি কখনও একা, সাদামাটাভাবে গ্রামে রাত কাটাননি। সব সময় দলবল নিয়ে, অনুষ্ঠান করে গেছেন। গ্রামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আনুষ্ঠানিক, ছিল পিকনিকের সম্পর্ক। গ্রামের আসল জীবন, আসল মানুষ, আসল দুঃখ-কষ্ট — এসব তিনি কখনও অনুভব করেননি।
পঞ্চম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“হতে পারে তুমি সৎ। কিন্তু, / তাতে আজ আর কিছু যায়-আসে না। / (কারণ, শুধুমাত্র ‘অনুগত সৈনিক’ থাকতে চেয়ে) / কারণ, শুধুমাত্র ‘ভালোমানুষ’ থাকতে চেয়ে / তুমি অসৎ-এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে গিয়েছো। / পার্টি তোমাকে প্রশ্ন করার অধিকার দিয়েছিলো, / আর তুমি স্বেচ্ছায় পার্টিকে দিয়েছিলে প্রশ্নাতীত থাকার অধিকার। / এখন নিতান্ত দয়াবশত তোমাকে চাপ না-দিয়ে / চারপাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে মজুতদার, শিল্পপতি, / মল- মালিক,আলুর বন্ড আর / বেনোজলদের গাড়ি। (বেনোজল এল-সি-এস-এর গাড়ি) / কোনো আমলেই যাদের কোনো ক্ষতি হয়নি, / হবেও না।” পঞ্চম স্তবকে কবি তাঁর নীরবতার দায় স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন — হতে পারে তুমি সৎ। কিন্তু, তাতে আজ আর কিছু যায়-আসে না। কারণ, শুধুমাত্র ‘অনুগত সৈনিক’ থাকতে চেয়ে, শুধুমাত্র ‘ভালোমানুষ’ থাকতে চেয়ে তুমি অসৎ-এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে গিয়েছো। পার্টি তোমাকে প্রশ্ন করার অধিকার দিয়েছিলো, আর তুমি স্বেচ্ছায় পার্টিকে দিয়েছিলে প্রশ্নাতীত থাকার অধিকার। এখন নিতান্ত দয়াবশত তোমাকে চাপ না-দিয়ে চারপাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে মজুতদার, শিল্পপতি, মল-মালিক, আলুর বন্ড আর বেনোজলদের গাড়ি। কোনো আমলেই যাদের কোনো ক্ষতি হয়নি, হবেও না।
‘তুমি অসৎ-এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে গিয়েছো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শুধু ভালো মানুষ থাকতে চেয়ে, চুপ করে থেকে তিনি অসৎদের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। তাঁর নীরবতা অসৎদের উৎসাহ দিয়েছে। তিনি যখন অন্যায় দেখেও চুপ করে থেকেছেন, তখন সেই অন্যায় আরও বাড়তে পেরেছে। তাঁর ‘ভালো মানুষ’ থাকার এই ইচ্ছাই পরোক্ষে অসৎদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
ষষ্ঠ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“ডানা ভিজে যায় বলে বৃষ্টিতে পাখিরা ওড়ে না। / কিন্তু এখন একটি উড়ছে, দেখতে পাচ্ছো?” ষষ্ঠ স্তবকে কবি পাখির উড়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — ডানা ভিজে যায় বলে বৃষ্টিতে পাখিরা ওড়ে না। কিন্তু এখন একটি উড়ছে, দেখতে পাচ্ছো?
পাখি উড়ার তাৎপর্য
এই পাখি সম্ভবত ব্যতিক্রম — যে বৃষ্টিতেও উড়ছে। এটি আশার প্রতীক, সাহসের প্রতীক। এটি সেই মানুষদের প্রতীক, যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও এগিয়ে চলে, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে। কিন্তু কবি কি তা দেখতে পাচ্ছেন? তিনি কি সেই পাখি দেখতে পাচ্ছেন?
সপ্তম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“পা আর মাটির মাঝখানে ঢুকে গেছে একটা ভেজা পাতা, / হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। / এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে বার করে নেওয়া যায়। / কিন্তু তুমি সেটাও পারছো না। / মনের মধ্যে ঝড় তোমায় ক্রমাগত পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।” সপ্তম স্তবকে কবি তাঁর দুর্বলতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — পা আর মাটির মাঝখানে ঢুকে গেছে একটা ভেজা পাতা, হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে বার করে নেওয়া যায়। কিন্তু তুমি সেটাও পারছো না। মনের মধ্যে ঝড় তোমায় ক্রমাগত পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
‘মনের মধ্যে ঝড়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মনের মধ্যে ঝড় — অশান্তি, দ্বিধা, অনিশ্চয়তা, আত্মদ্বন্দ্ব। এই ঝড় তাঁকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি এগোতে পারছেন না, থামতেও পারছেন না। তিনি স্থির হতে পারছেন না।
অষ্টম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“পিছিয়ে যাচ্ছো, পালিয়ে যাচ্ছো, কাদের থেকে? / কাকে ভয়? কেউ তোমাকে তাড়া করছে না, / তোমার মতো অপ্রাসঙ্গিককে তাড়া করার সময় / কারো হাতেই এখন নেই। / চুক্তিচাষ করতে করতে চাষি এখন ভাবছে কবে সে মরবে, / পাকা দেওয়ালের বস্তিবাসী চলে যাচ্ছে শহরের শেষ প্রান্তে, / পলিথিন ছাওয়া ঝোপড়া বানাবে বলে। / ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের শিকল জড়িয়ে যাচ্ছে / বসতবাড়ির গায়ে। / একই ছাদের নীচে তিন-পুরুষ বাস করা কোনো সংসার / আর কেউ কখনও খুঁজে পাবে না। / সময় নেই, কারো সময় নেই তোমার দিকে তাকাবার, / তোমাকে তাড়া করবার।” অষ্টম স্তবকে কবি সমাজের বাস্তবতা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — পিছিয়ে যাচ্ছো, পালিয়ে যাচ্ছো, কাদের থেকে? কাকে ভয়? কেউ তোমাকে তাড়া করছে না। তোমার মতো অপ্রাসঙ্গিককে তাড়া করার সময় কারো হাতেই এখন নেই। চুক্তিচাষ করতে করতে চাষি এখন ভাবছে কবে সে মরবে। পাকা দেওয়ালের বস্তিবাসী চলে যাচ্ছে শহরের শেষ প্রান্তে, পলিথিন ছাওয়া ঝোপড়া বানাবে বলে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের শিকল জড়িয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ির গায়ে। একই ছাদের নীচে তিন-পুরুষ বাস করা কোনো সংসার আর কেউ কখনও খুঁজে পাবে না। সময় নেই, কারো সময় নেই তোমার দিকে তাকাবার, তোমাকে তাড়া করবার।
‘তোমার মতো অপ্রাসঙ্গিক’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবি নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করছেন। তাঁর কোনো গুরুত্ব নেই এই সমাজে। তিনি আজ এমন অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন যে কেউ তাঁর দিকে তাকানোর সময় পায় না।
নবম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তুমি শুধু পালাচ্ছো নিজের থেকে, / নিজের অতীত থেকে: / তোমাকে করুণা করাও এখন অবান্তর।” নবম স্তবকে কবি শেষ বক্তব্য পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন — তুমি শুধু পালাচ্ছো নিজের থেকে, নিজের অতীত থেকে। তোমাকে করুণা করাও এখন অবান্তর।
‘তোমাকে করুণা করাও এখন অবান্তর’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য
এখন তাঁর অবস্থা এতই খারাপ যে তাঁকে করুণা করাও অর্থহীন। তিনি নিজের কাছেই হারিয়ে গেছেন। তাঁর অস্তিত্ব এতটাই নিষ্প্রভ, এতটাই অর্থহীন যে তাঁকে নিয়ে ভাবাও সময়ের অপচয়।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“দুঃসময়ের নোটবই” কবিতাটি নগরায়ণ, গ্রামীণ বিচ্ছিন্নতা ও আত্মান্বেষণের এক অসাধারণ চিত্র। কবি প্রথমে বলেছেন — তিনি রাজপথ ধরে ফিরে যাচ্ছেন, কিন্তু আলপথ আর তার জন্য অপেক্ষা করে নেই। চারপাশে নানা গাড়ি ছুটছে, কিন্তু কোনোটাই তার জন্য নয়। তিনি ধান চিনতে পারেন না, শহর তাকে শেখায়নি। গ্রাম তার চোখ থেকে সরে গেছে। তিনি কখনও একা গ্রামে যাননি, রাত কাটাননি। তিনি সৎ ছিলেন, কিন্তু চুপ করে থেকে অসৎদের বাড়িয়েছেন। তিনি প্রশ্ন করার অধিকার ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি অপ্রাসঙ্গিক। তিনি নিজের থেকে পালাচ্ছেন। তাঁকে করুণা করাও অবান্তর।
দুঃসময়ের নোটবই কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: দুঃসময়ের নোটবই কবিতার লেখক কে?
দুঃসময়ের নোটবই কবিতার লেখক জয়দেব বসু। তিনি বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, নগরায়ণ ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে।
প্রশ্ন ২: দুঃসময়ের নোটবই কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
দুঃসময়ের নোটবই কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো নগরায়ণ, গ্রামীণ বিচ্ছিন্নতা ও আত্মান্বেষণ। কবি শহর থেকে গ্রামে ফিরতে চান, কিন্তু গ্রাম তাকে গ্রহণ করে না। তিনি ধান চিনতে পারেন না, গ্রাম চেনেন না। তাঁর নীরবতা অসৎদের বাড়িয়েছে। তিনি এখন অপ্রাসঙ্গিক।
প্রশ্ন ৩: ‘শহর তোমাকে ধান চিনতে শেখায়নি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘শহর তোমাকে ধান চিনতে শেখায়নি’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি শহুরে মানুষের গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন। শহরে বড় হওয়া মানুষ গ্রাম চেনে না, প্রকৃতি চেনে না, ধান চেনে না। তারা ধান দেখলেও চিনতে পারে না — এটা কি সত্যিই ধান, নাকি অন্য কিছু?
প্রশ্ন ৪: ‘গ্রাম তোমার চোখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘গ্রাম তোমার চোখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে’ — গ্রাম এখন আর তাকে দেখা দেয় না। সে গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গ্রাম তার জন্য আর নেই। গ্রাম এখন শুধু কল্পনায় আছে, বাস্তবে নেই।
প্রশ্ন ৫: ‘তুমি অসৎ-এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে গিয়েছো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘তুমি অসৎ-এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে গিয়েছো’ — শুধু ভালো মানুষ থাকতে চেয়ে, চুপ করে থেকে তিনি অসৎদের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। তাঁর নীরবতা অসৎদের উৎসাহ দিয়েছে। তিনি যখন অন্যায় দেখেও চুপ করে থেকেছেন, তখন সেই অন্যায় আরও বাড়তে পেরেছে।
প্রশ্ন ৬: ‘তোমাকে করুণা করাও এখন অবান্তর’ — শেষ পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
‘তোমাকে করুণা করাও এখন অবান্তর’ — এখন তাঁর অবস্থা এতই খারাপ যে তাঁকে করুণা করাও অর্থহীন। তিনি নিজের কাছেই হারিয়ে গেছেন। তাঁর অস্তিত্ব এতটাই নিষ্প্রভ, এতটাই অর্থহীন যে তাঁকে নিয়ে ভাবাও সময়ের অপচয়।
প্রশ্ন ৭: জয়দেব বসু সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন۔
জয়দেব বসু বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, নগরায়ণ ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলেন। ‘বাসনা’, ‘বসন্ত-উৎসব’, ‘দুঃসময়ের নোটবই’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতা।
ট্যাগস: দুঃসময়ের নোটবই, জয়দেব বসু, জয়দেব বসুর কবিতা, দুঃসময়ের নোটবই কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, নগরায়ণের কবিতা, গ্রামীণ বিচ্ছিন্নতার কবিতা, আত্মান্বেষণের কবিতা
তুমি রাজপথ ধরে ফিরে যাচ্ছো, দু’পাশে খেত।
কিন্তু আলপথ আর তোমার অপেক্ষায় নেই।
চারপাশ দিয়ে হু-হু করে চলে যাচ্ছে গাড়ি
মজুতদারের ট্রাক, জমি খুঁজতে আসা শিল্পপতির ফোর্ড- আইকন,
মল- মালিকদের ল্যান্সার, হিমঘর মালিকের স্যান্ট্রো,
মাইনে বাড়া মধ্যবিত্তের অল্টো,আর
সদ্য তৃণমূলে যোগ দেওয়া বেনোজলদের ইন্ডিকা।
এর একটিও তোমার জন্য নয়।
ভেজা অ্যাসফল্টে আজ আর কেউ ধান শোঁকাতে দেয়নি।
বৃষ্টি পড়ছে গুঁড়ি- গুঁড়ি, তুমি রুমালে চশমা মুছছো, পরছো,
আর ভাবছো: কী করে এমন হলো?
দু’পাশে যতদূর চোখ যায় ধানক্ষেত; অথবা আদৌ ধান কি না
তুমি ঠিক মতো জানো না। শহর তোমাকে ধান চিনতে শেখায়নি।
অথচ বাতাস বইছে শোঁ-শোঁ এই বাতাস রাজপথ অতিক্রম করে
ছুটে যাচ্ছে গ্রামের দিকে: ছাত্র-আন্দোলন করা তুমি জানো:
গ্রাম আছে, এই বাংলাতেই আছে: কিন্তু
দু’পাশে কোনো গ্রামই আজ আর তুমি দেখতে পাচ্ছো না।
গ্রাম তোমার চোখ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।
কেন? তুমি ভাবছো: কী করে এমন হলো?
(ইউনিট বা জোনাল সম্মেলন ছাড়া)
পিকনিক পার্টির সঙ্গে ছাড়া তুমি কখনো গ্রামে যাওনি।
আচমকা, একা-একা, লোকাল ট্রেন ধরে, রিকশা করে,
দাঁড়িপাল্লায় মাপা ছেঁড়া পরোটা চিবিয়ে,
রস মাখা মুড়ি খেয়ে, লাইন হোটেলের খাটিয়ায় শুয়ে,
একটি রাতও কাটেনি তোমার।
আজ আর হলফ করে বলা যাচ্ছে না,বৃষ্টি না অশ্রু— ঠিক কোনটা বারংবার
আবছা করে দিচ্ছে তোমার চোখ;
রাজপথ ধরে তুমি পিছিয়ে যাচ্ছোই তো যাচ্ছো…….
আর, ভাবছো: কেন? কী করে?
হতে পারে তুমি সৎ। কিন্তু,
তাতে আজ আর কিছু যায়-আসে না।
(কারণ, শুধুমাত্র ‘অনুগত সৈনিক’ থাকতে চেয়ে)
কারণ, শুধুমাত্র ‘ভালোমানুষ’ থাকতে চেয়ে
তুমি অসৎ-এর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়ে গিয়েছো।
পার্টি তোমাকে প্রশ্ন করার অধিকার দিয়েছিলো,
আর তুমি স্বেচ্ছায় পার্টিকে দিয়েছিলে প্রশ্নাতীত থাকার অধিকার।
এখন নিতান্ত দয়াবশত তোমাকে চাপ না-দিয়ে
চারপাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে মজুতদার, শিল্পপতি,
মল- মালিক,আলুর বন্ড আর
বেনোজলদের গাড়ি। (বেনোজল এল-সি-এস-এর গাড়ি)
কোনো আমলেই যাদের কোনো ক্ষতি হয়নি,
হবেও না।
ডানা ভিজে যায় বলে বৃষ্টিতে পাখিরা ওড়ে না।
কিন্তু এখন একটি উড়ছে, দেখতে পাচ্ছো?
পা আর মাটির মাঝখানে ঢুকে গেছে একটা ভেজা পাতা,
হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে।
এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে বার করে নেওয়া যায়।
কিন্তু তুমি সেটাও পারছো না।
মনের মধ্যে ঝড় তোমায় ক্রমাগত পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
পিছিয়ে যাচ্ছো, পালিয়ে যাচ্ছো, কাদের থেকে?
কাকে ভয়? কেউ তোমাকে তাড়া করছে না,
তোমার মতো অপ্রাসঙ্গিককে তাড়া করার মতো সময়
কারো হাতেই এখন নেই।
চুক্তিচাষ করতে করতে চাষি এখন ভাবছে কবে সে মরবে,
পাকা দেওয়ালের বস্তিবাসী চলে যাচ্ছে শহরের শেষ প্রান্তে,
পলিথিন ছাওয়া ঝোপড়া বানাবে বলে।
ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের শিকল জড়িয়ে যাচ্ছে
বসতবাড়ির গায়ে।
একই ছাদের নীচে তিন-পুরুষ বাস করা কোনো সংসার
আর কেউ কখনও খুঁজে পাবে না।
সময় নেই, কারো সময় নেই তোমার দিকে তাকাবার,
তোমাকে তাড়া করবার।
তুমি শুধু পালাচ্ছো নিজের থেকে,
নিজের অতীত থেকে:
তোমাকে করুণা করাও এখন অবান্তর।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জয়দেব বসু।






