কবিতার খাতা
দীঘির জলে কার ছায়া গো – হুমায়ূন আহমেদ।
দীঘির জলে কার ছায়া গো?
তোমার নাকি আমার?
তোমার কি আর মন চায় না
এই কথাটা জানার?
বন পারুলের ফুল ফুটেছে
সুবাস আসে ঘরে
সেই সুবাসে শরীর কাঁপে
মন যে কেমন করে।
সাঁঝের বেলায় নেমে আসে
মধ্যরাতের আঁধার।
আমি চলে যাই নদীর কাছে
সময় হলো কাঁদার।
নদীর জলে কার ছায়া গো
তোমার নাকি আমার?
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। হুমায়ূন আহমেদের কবিতা।
কবিতার কথা—
হুমায়ূন আহমেদ মূলত কথাশিল্পী হিসেবে বিশ্বনন্দিত হলেও তাঁর গদ্যের ভেতরে যে এক সহজাত কবিত্বময়তা ছিল, তার সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর রচিত গান ও কবিতাগুলোতে। ‘দীঘির জলে কার ছায়া গো’ কবিতাটি এক অদ্ভুত মায়াবী, বিষণ্ণ এবং আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির এক বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘জল’, ‘জোছনা’ এবং ‘প্রকৃতি’র সাথে মানুষের নিঃসঙ্গতার এক নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা। এই কবিতায় দীঘি, নদী, পারুল ফুল আর সাঁঝের আঁধার—সবই এক অমীমাংসিত বিরহের প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছে। এখানে প্রেম কেবল প্রাপ্তি নয়, বরং এক অজানা হাহাকার এবং নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক নিরন্তর চেষ্টা।
কবিতার শুরুতেই এক রহস্যময় প্রশ্নের অবতারণা করা হয়েছে—‘দীঘির জলে কার ছায়া গো? / তোমার নাকি আমার?’ এই প্রশ্নটি কেবল লৌকিক কোনো ছায়া দেখার কৌতূহল নয়, এটি আসলে আত্মপরিচয় এবং সম্পর্কের এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত। প্রেমে পড়লে মানুষ অনেক সময় নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে, প্রিয়তমার সত্তার সাথে নিজের সত্তাকে মিলিয়ে ফেলে। স্থির দীঘির জলে যে প্রতিবিম্ব ভেসে উঠছে, কবি বুঝতে পারছেন না সেটি তাঁর নিজের বিরহী রূপ, নাকি তাঁর অন্তরে গেঁথে থাকা প্রিয়তমার অবয়ব। এই যে ‘জানার মন চাওয়া’, এটি আসলে মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা যা দিয়ে সে তার ভালোবাসার গভীরতা মাপতে চায়। হুমায়ূন আহমেদের সহজ-সরল শব্দচয়ন এখানে এক অপার্থিব দ্যোতনা তৈরি করেছে।
কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে প্রকৃতির এক সংবেদনশীল আবেশ ফুটে উঠেছে। বনের পারুল ফুল ফুটেছে এবং তার সুবাস ঘরে এসে পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু এই সুবাস আনন্দ দেওয়ার বদলে এক ধরণের শারীরিক ও মানসিক ব্যাকুলতা তৈরি করছে। ‘সেই সুবাসে শরীর কাঁপে / মন যে কেমন করে’—এই পঙক্তি দুটি মানুষের জৈবিক ও মানসিক অনুভূতির এক অতি সূক্ষ্ম প্রকাশ। প্রকৃতি যখন তার পূর্ণ যৌবনে বিকশিত হয়, তখন নিঃসঙ্গ মানুষের হৃদয়ে এক ধরণের হাহাকার তৈরি হয়। প্রিয়জনের অনুপস্থিতিতে প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্যও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। পারুল ফুলের ঘ্রাণ এখানে উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে, যা মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা পুরনো স্মৃতি বা না-পাওয়া বেদনাকে জাগিয়ে তোলে।
কবিতার পরবর্তী অংশে সময়ের এক অদ্ভুত বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কবি বলছেন, ‘সাঁঝের বেলায় নেমে আসে / মধ্যরাতের আঁধার’। এটি একটি চমৎকার পরাবাস্তব চিত্রকল্প। সময়ের হিসেবে সন্ধ্যা হলেও কবির মনের ভেতরে যেন গভীর অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। যখন প্রিয়জন পাশে থাকে না, তখন গোধূলির আলোও অসহ্য মনে হয় এবং হৃদয়ে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা ও শূন্যতা অনুভূত হয়। এই মানসিক অন্ধকারের হাত থেকে মুক্তি পেতে কবি নদীর কাছে ছুটে যান। নদী এখানে বহমানতা এবং কান্নার প্রতীক। দীঘির জল যেমন স্থির, নদী তেমন নয়—নদী বয়ে চলে। কবি মনে করেন, তাঁর জমানো চোখের জল বিসর্জন দেওয়ার জন্য নদীই শ্রেষ্ঠ জায়গা। ‘সময় হলো কাঁদার’—এই উক্তিটি মানুষের চূড়ান্ত অসহায়ত্ব এবং সমর্পণের কথা বলে।
কবিতার সমাপ্তি ঘটে সেই প্রাথমিক প্রশ্নের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে, তবে এবার প্রেক্ষাপট বদলে গেছে। আগে ছিল দীঘি, এবার নদী। ‘নদীর জলে কার ছায়া গো / তোমার নাকি আমার?’ দীঘির স্থির জলে ছায়া দেখা সহজ, কিন্তু বহমান নদীর টলমল জলে ছায়া দেখা কঠিন। এটি জীবনের এক গভীর দর্শনকে নির্দেশ করে—সময় বয়ে যায়, জীবন বদলে যায়, কিন্তু মানুষের সেই আদি ও অকৃত্রিম বিরহটি অপরিবর্তিত থাকে। নদীর ঢেউয়ে ভেঙে যাওয়া ছায়ার মতো মানুষের সম্পর্কগুলোও অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। কবি এখানে নিজের একাকীত্বকে প্রকৃতির বিশালতার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, ‘দীঘির জলে কার ছায়া গো’ কবিতাটি হুমায়ূন আহমেদের চিরচেনা সেই ‘হিমু’ বা ‘নিভৃতচারী’ মানুষের মনের প্রতিচ্ছবি। এটি এমন এক কবিতা যা পাঠ করলে এক ধরণের ঘোরের সৃষ্টি হয়। সাদামাটা শব্দের বুননে এত গভীর বিষণ্ণতা ফুটিয়ে তোলা কেবল হুমায়ূন আহমেদের পক্ষেই সম্ভব। আপনার ডায়েরির পাতায় এই কবিতাটি এক স্নিগ্ধ ও মরমী আবহের সৃষ্টি করবে। এটি আমাদের শেখায় যে, প্রকৃতি ও প্রেম মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ—একটি জাগলে অন্যটিও স্পন্দিত হয়।






