তোমার দিকে আসছি – হুমায়ুন আজাদ।

অজস্র জন্ম ধরে
আমি তোমার দিকে আসছি
কিন্তু পৌঁছুতে পারছি না।
তোমার দিকে আসতে আসতে
আমার এক একটা দীর্ঘ জীবন ক্ষয় হয়ে যায়
পাঁচ পঁয়সার মোম বাতির মত।

আমার প্রথম জন্মটা কেটে গিয়েছিলো
শুধু তোমার স্বপ্ন দেখে দেখে,
এক জন্ম আমি শুধু তোমার স্বপ্ন দেখেছি।
আমার দুঃখ,
তোমার স্বপ্ন দেখার জন্যে
আমি মাত্র একটি জন্ম পেয়েছিলাম।

আরেক জন্মে
আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পরেছিলাম তোমার উদ্দেশ্য।
পথে বেরিয়েই আমি পলি মাটির উপর আকাঁ দেখি
তোমার পায়ের দাগ
তার প্রতিটি রেখা
আমাকে পাগল করে তোলে।
ঐ আলতার দাগ,আমার চোখ,আর বুক আর স্বপ্নকে
এতো লাল করে তুলে,
যে আমি তোমাকে সম্পূর্ন ভুলে যাই
ঐ রঙ্গীন পায়ের দাগ প্রদক্ষীন করতে করতে
আমার ঐ জন্মটা কেটে যায়।
আমার দুঃখ !
মাত্র একটি জন্ম
আমি পেয়েছিলাম
সুন্দর কে প্রদক্ষীন করার।
আরেক জন্মে
তোমার কথা ভাবতেই-
আমার বুকের ভিতর থেকে সবচে দীর্ঘ
আর কোমল,আর ঠাণ্ডা নদীর মত
কি যেন প্রবাহিত হতে শুরু করে।
সেই দীর্ঘশ্বাসে তুমি কেঁপে উঠতে পারো ভেবে
আমি একটা মর্মান্তিক দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে
কাটিয়ে দেই সম্পুর্ন জন্মটা।
আমার দুঃখ ,আমার কোমলতম দীর্ঘশ্বাসটি ছিল
মাত্র এক জন্মের সমান দীর্ঘ
আমার ষোঁড়শ জন্মে
একটি গোলাপ আমার পথ রোধ করে,
আমি গোলাপের সিঁড়ি বেয়ে তোমার দিকে উঠতে থাকি-
উঁচুতে ! উঁচুতে !! আরো উঁচুতে !!!
আর এক সময় ঝড়ে যাই চৈত্রের বাতাসে।

আমার দু:খ মাত্র একটি জন্ম
আমি গোলাপের পাপঁড়ি হয়ে
তোমার উদ্দেশ্য ছড়িয়ে পরতে পেরেছিলাম।

এখন আমার সমস্ত পথ জুড়ে
টলমল করছে একটি অশ্রু বিন্দু।

ঐ অশ্রু বিন্দু পেরিয়ে এ জন্মে হয়তো
আমি তোমার কাছে পৌঁছুতে পারবনা;
তাহলে ,আগামী জন্ম গুলো আমি কার দিকে আসবো ?

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। হুমায়ুন আজাদের কবিতা।

কবিতার কথা –

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথাবিরোধী, মননশীল ও দ্রোহী কবি হুমায়ুন আজাদের ‘তোমার দিকে আসছি’ কবিতাটি প্রেমের এক পরম অধিবিদ্যক (Metaphysical) ও চিরন্তন দর্শন, অনন্তকালের আকুলতা এবং অলভ্য সৌন্দর্যকে ছোঁয়ার এক অন্তহীন মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবি এখানে প্রেম ও সৌন্দর্যকে কোনো লৌকিক বা এক-জীবনের সীমানায় বাঁধেননি। এখানে কাঙ্ক্ষিত ‘তুমি’ একই সাথে পরম প্রেম, বিশুদ্ধ সৌন্দর্য এবং এক অধরা পরমার্থ—যার দিকে কবি অজস্র জন্ম ধরে যাত্রা করেও কখনো চূড়ান্তভাবে পৌঁছাতে পারেন না।

কবিতার প্রারম্ভেই এক মহাজাগতিক ও অনন্ত যাত্রার চিত্র ফুটে ওঠে। কবি কোনো এক বিশেষ সত্তার দিকে কেবল এই জন্মেই নয়, বরং অজস্র জন্ম ধরে অবিরত হেঁটে আসছেন। কিন্তু নিয়তির এক নির্মম পরিহাসে তিনি কখনোই তাঁর সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। এই অনন্ত যাত্রাপথে তাঁর একেকটি দীর্ঘ মানবজীবন ক্ষয়ে যাচ্ছে ঠিক যেন এক সস্তা “পাঁচ পয়সার মোমবাতির মতো”। মোমবাতি যেমন নিজেকে পুড়িয়ে অন্ধকার দূর করতে করতে একসময় নিঃশেষে ফুরিয়ে যায়, কবির একেকটি জীবনও তেমনি প্রেমের অনলে পুড়ে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

কবিতার মধ্যভাগে কবি তাঁর বিগত জন্মগুলোর বিচিত্র ও নান্দনিক অভিজ্ঞতার এক অপরূপ খতিয়ান তুলে ধরেছেন:

  • প্রথম জন্ম: কবির প্রথম জন্মটি কেটেছিল কেবলই সেই প্রিয়তমার অলীক ‘স্বপ্ন’ দেখে। কিন্তু এই পরম স্বপ্নের বিভোরতার মাঝেই কবির আফসোস—এত সুন্দর স্বপ্ন দেখার জন্য তিনি প্রকৃতির কাছ থেকে মাত্র একটি জন্ম পেয়েছিলেন!
  • পরবর্তী জন্ম: আরেক জন্মে তিনি ঘর ছেড়ে প্রিয়তমার সন্ধানে পথে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু পথে নেমেই তিনি পলিমাটির ওপর আঁকা দেখতে পান প্রিয়তমার রাঙা পায়ের আলতার দাগ। সেই সৌন্দর্যের প্রতিটি রেখা কবিকে এতটাই মোহিত ও উন্মাল করে তোলে যে, মূল গন্তব্যকে ভুলে গিয়ে তিনি কেবল সেই সুন্দর পায়ের দাগকে প্রদক্ষিণ (ঘুরে ঘুরে দেখা) করতে করতেই সম্পূর্ণ জন্মটি পার করে দেন। এখানেও কবির আফসোস—সৌন্দর্যকে বন্দনা করার জন্য তিনি মাত্র একটি জন্ম পেয়েছিলেন।
  • অন্য এক জন্ম: আরেক জন্মে প্রিয়তমার কথা ভাবতেই কবির বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘ, কোমল ও শীতল নদীর মতো তীব্র অনুভূতি বা দীর্ঘশ্বাস প্রবাহিত হতে শুরু করে। কিন্তু কবি আশঙ্কা করেন, তাঁর এই তীব্র দীর্ঘশ্বাসের কম্পনে যদি প্রিয়তমার মন কেঁপে ওঠে বা সে কষ্ট পায়! তাই পরম যত্নে এক মর্মান্তিক দীর্ঘশ্বাস নিজের বুকের অতলে চেপে রেখেই তিনি তাঁর সেই জন্মটি পার করে দেন।
  • ষোড়শ জন্ম: কবির ষোড়শ বা ষোলতম জন্মে তাঁর পথ আগলে দাঁড়ায় এক রক্তিম গোলাপ। তিনি সেই গোলাপের পাপড়ির সিঁড়ি বেয়ে আরও উঁচুতে, আরও বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের দিকে উঠতে থাকেন এবং পরিশেষে চৈত্রের উদাসী বাতাসে ঝরে যান।

এই প্রতিটি স্তবকে কবির চিরন্তন আর্তি প্রকাশ পায়—”আমার দুঃখ, মাত্র একটি জন্ম আমি পেয়েছিলাম…”। অর্থাৎ, প্রেমের একেকটি খণ্ড রূপ বা সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য একেকটি মানবজীবন বড্ড ছোট, বড্ড অপ্রতুল।

সমাপ্তির চরণে কবিতাটি বর্তমান জন্ম ও এক পরম দার্শনিক শূন্যতায় এসে থিতু হয়। কবি জীবনের এই প্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে দেখছেন, এখন তাঁর সমুখে কোনো গোলাপ বা আলতার দাগ নেই; বরং তাঁর সমস্ত পথ জুড়ে টলমল করছে একটি বিশাল ‘অশ্রুবিন্দু’। এই অশ্রু হতে পারে পূর্বজন্মের অপ্রাপ্তির বেদনা কিংবা বর্তমানের একাকীত্ব। কবি নিশ্চিত জানেন, এই দুস্তর অশ্রুর সাগর পেরিয়ে এই জন্মটাতেও তিনি তাঁর পরম আরাধ্য ‘তুমি’র কাছে পৌঁছাতে পারবেন না। আর এই পরম ব্যর্থতা থেকেই কবিতার সবচেয়ে অমোঘ ও আর্তনাদ ভরা প্রশ্নটি উৎসারিত হয়—”তাহলে, আগামী জন্ম গুলো আমি কার দিকে আসবো?”।

যদি এই জন্মেও পৌঁছানো না যায় এবং যদি এই আকাঙ্ক্ষাই একসময় ফুরিয়ে যায়, তবে আগামী জন্মগুলোতে বেঁচে থাকার বা পথ চলার আর কোনো অর্থই অবশিষ্ট থাকবে না। প্রেমের জন্য এই চিরন্তন আত্মত্যাগ, না-পাওয়ার আকুলতা এবং গন্তব্যহীন যাত্রার মাঝেই কবিতাটি এক গভীর, স্নিগ্ধ ও মায়াবী পূর্ণতা লাভ করে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x