কবিতার খাতা
- 25 mins
তোমাকে – জীবনানন্দ দাশ।
মাঠের ভিড়ে গাছের ফাঁকে দিনের রৌদ্র অই :
কুলবধূর বহিরাশ্রয়িতার মতন অনেক উড়ে
হিজল গাছে জামের বনে হলুদ পাখির মতো
রূপসাগরের পার থেকে কি পাখনা বাড়িয়ে
বাস্তবিকই রৌদ্র এখন? সত্যিকারের পাখি?
কে যে কোথায় কার হৃদয়ে কখন আঘাত করে।
রৌদ্রবরন দেখেছিলাম কঠিন সময়-পরিক্রমার পথে—
নারীর, —তবু ভেবেছিলাম বহিঃপ্রকৃতির।
আজকে সে-সব মীনকেতনের সাড়ার মতো, তবু
অন্ধকারের মহাসনাতনের থেকে চেয়ে
আশ্বিনের এই শীত স্বাভাবিক ভোরের বেলা হলে
বলে: ‘আমি রোদ কি ধুলো পাখি না সেই নারী?’
পাতা পাথর মৃত্যু কাজের ভূকন্দরের থেকে আমি শুনি ;
নদী শিশির পাখি বাতাস কথা বলে ফুরিয়ে গেলে পরে
শান্ত পরিচ্ছন্নতা এক এই পৃথিবীর প্রাণে
সফল হতে গিয়েও তবু বিষণ্ণতার মতো।
যদিও পথ আছে—তবু কোলাহলে শূন্য আলিঙ্গনে
নায়ক সাধক রাষ্ট্র সমাজ ক্লান্ত হয়ে পড়ে ;
প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো—
কী এক বিরাট অবক্ষয়ের মানবসাগরে।
তবুও তোমায় জেনেছি, নারি, ইতিহাসের শেষে এসে; মানবপ্রতিভার
রূঢ়তা ও নিষ্ফলতার অধম অন্ধকারে
মানবকে নয়, নারী, শুধু তোমাকে ভালোবেসে
বুঝেছি নিখিল বিষ কী রকম মধুর হতে পারে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জীবনানন্দ দাশ।
তোমাকে – জীবনানন্দ দাশ | তোমাকে কবিতা | জীবনানন্দ দাশের কবিতা | বাংলা কবিতা
তোমাকে: জীবনানন্দ দাশের নারী, প্রকৃতি ও সত্তার অন্বেষণের কবিতা
জীবনানন্দ দাশের “তোমাকে” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা নারী, প্রকৃতি, সময় ও সত্তার এক গভীর দার্শনিক অন্বেষণ। “মাঠের ভিড়ে গাছের ফাঁকে দিনের রৌদ্র অই” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক জটিল চিন্তাজগৎ, যেখানে রৌদ্র, পাখি, নারী, সময় সবকিছু মিশে গিয়ে এক অসাধারণ কাব্যিক বুনন তৈরি করেছে। জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তার কবিতায় প্রকৃতি, নিসর্গ, জীবন-মৃত্যু, সময় ও ইতিহাসচেতনার গভীর প্রকাশ ঘটে। “তোমাকে” তার একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা যা নারী ও প্রকৃতির মধ্য দিয়ে সত্তার অন্বেষণ করেছে।
জীবনানন্দ দাশ: রূপসী বাংলার কবি
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ. করার পর তিনি দীর্ঘদিন অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ প্রভৃতি। তার কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতি, নিসর্গ, জীবন-মৃত্যু, সময় ও ইতিহাসচেতনার গভীর প্রকাশ। তিনি ১৯৫৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
তোমাকে কবিতার বিশ্লেষণ
কবিতার মূল সুর ও বিষয়বস্তু
“তোমাকে” কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো নারী, প্রকৃতি ও সত্তার অন্বেষণ। কবি শুরুতে মাঠের ভিড়ে গাছের ফাঁকে দিনের রৌদ্র দেখেছেন। সেই রৌদ্রকে তিনি কুলবধূর বহিরাশ্রয়িতার সাথে তুলনা করেছেন — অনেক উড়ে হিজল গাছে, জামের বনে হলুদ পাখির মতো দেখা যায়। তিনি প্রশ্ন করেন — এই রৌদ্র কি বাস্তবিকই রৌদ্র? নাকি সত্যিকারের পাখি? কে যে কোথায় কার হৃদয়ে কখন আঘাত করে। তিনি বলেছেন — রৌদ্রবরণ দেখেছিলেন কঠিন সময়-পরিক্রমার পথে — নারীর, তবু ভেবেছিলেন বহিঃপ্রকৃতির। আজকে সে-সব মীনকেতনের সাড়ার মতো। তবু অন্ধকারের মহাসনাতন থেকে চেয়ে আশ্বিনের এই শীত স্বাভাবিক ভোরের বেলা বলে: ‘আমি রোদ না ধুলো না পাখি না সেই নারী?’ তিনি পাতা, পাথর, মৃত্যু, কাজের ভূকন্দর থেকে শোনেন। নদী, শিশির, পাখি, বাতাস কথা বলে ফুরিয়ে গেলে পরে শান্ত পরিচ্ছন্নতা এক এই পৃথিবীর প্রাণে সফল হতে গিয়েও তবু বিষণ্ণতার মতো। যদিও পথ আছে, তবু কোলাহলে শূন্য আলিঙ্গনে নায়ক, সাধক, রাষ্ট্র, সমাজ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো — কী এক বিরাট অবক্ষয়ের মানবসাগরে। তবুও তোমায় জেনেছেন, নারী, ইতিহাসের শেষে এসে। মানবপ্রতিভার রূঢ়তা ও নিষ্ফলতার অধম অন্ধকারে মানবকে নয়, নারী, শুধু তোমাকে ভালোবেসে বুঝেছেন নিখিল বিষ কী রকম মধুর হতে পারে।
কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক বিশ্লেষণ
“তোমাকে” কবিতাটির ভাষা চিত্রময়, গভীর দার্শনিক তাৎপর্যময়। জীবনানন্দ দাশ তার অনন্য শৈলীতে নারী, প্রকৃতি ও সত্তার জটিল সম্পর্ককে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প ও প্রতীকগুলো: ‘মাঠের ভিড়ে গাছের ফাঁকে দিনের রৌদ্র’ — প্রকৃতির সাধারণ দৃশ্য, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ; ‘কুলবধূর বহিরাশ্রয়িতা’ — নারীর স্বাধীনতা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক; ‘হিজল গাছে, জামের বনে হলুদ পাখি’ — বাংলার প্রকৃতির চিত্র; ‘রূপসাগরের পার’ — রূপকথার জগতের প্রতীক; ‘পাখনা বাড়িয়ে’ — স্বাধীনতা, উড়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক; ‘রৌদ্রবরন’ — রৌদ্রের রঙ, আলোর প্রতীক; ‘কঠিন সময়-পরিক্রমার পথ’ — জীবনের কঠিন পথের প্রতীক; ‘মীনকেতনের সাড়া’ — মীনকেতন অর্থ মাছের পতাকা, সম্ভবত কামদেবের পতাকা, প্রেমের প্রতীক; ‘অন্ধকারের মহাসনাতন’ — চিরন্তন অন্ধকারের প্রতীক; ‘আশ্বিনের শীত স্বাভাবিক ভোর’ — শরতের ভোর, পরিবর্তনের সময়; ‘পাতা পাথর মৃত্যু কাজের ভূকন্দর’ — পৃথিবীর গভীর স্তর, অতীতের প্রতীক; ‘নদী শিশির পাখি বাতাস কথা বলে ফুরিয়ে গেলে’ — প্রকৃতির ধ্বনি থেমে গেলে; ‘শান্ত পরিচ্ছন্নতা’ — নিরিবিলি অবস্থার প্রতীক; ‘বিষণ্ণতার মতো’ — জীবনের ব্যর্থতার প্রতীক; ‘কোলাহলে শূন্য আলিঙ্গন’ — অর্থহীন ব্যস্ততার প্রতীক; ‘নায়ক সাধক রাষ্ট্র সমাজ ক্লান্ত’ — মানুষের সব প্রচেষ্টার ব্যর্থতার প্রতীক; ‘আত্মবোধের দ্বীপ’ — নিজের অস্তিত্বের প্রতীক; ‘অবক্ষয়ের মানবসাগর’ — পতনের সমুদ্রের প্রতীক; ‘ইতিহাসের শেষে এসে’ — সময়ের শেষ প্রান্তে; ‘মানবপ্রতিভার রূঢ়তা ও নিষ্ফলতার অধম অন্ধকার’ — মানবসভ্যতার ব্যর্থতার প্রতীক; ‘নিখিল বিষ’ — বিশ্বের সমস্ত বিষ, কষ্টের প্রতীক।
কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ও চিত্রকল্প
রৌদ্র, পাখি ও নারীর দ্বন্দ্ব
কবিতার শুরুতে কবি রৌদ্র দেখেছেন মাঠের ভিড়ে, গাছের ফাঁকে। সেই রৌদ্রকে তিনি কুলবধূর বহিরাশ্রয়িতার সাথে তুলনা করেছেন। কুলবধূ মানে সধবা নারী, যিনি ঘরের বাইরে যেতে পারেন না। বহিরাশ্রয়িতা মানে বাইরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সেই রৌদ্র আবার হিজল গাছে, জামের বনে হলুদ পাখির মতো দেখা যায়। কবি প্রশ্ন করেন — এই রৌদ্র কি বাস্তবিকই রৌদ্র? নাকি সত্যিকারের পাখি? পরে তিনি রৌদ্রবরণ নারী দেখেছিলেন, কিন্তু ভেবেছিলেন বহিঃপ্রকৃতির। শেষে সেই নারী নিজেই প্রশ্ন করে — “আমি রোদ না ধুলো না পাখি না সেই নারী?” এই দ্বন্দ্বের মাধ্যমে কবি দেখাতে চেয়েছেন — নারী, প্রকৃতি ও সত্তা কখনো পৃথক নয়, তারা একে অপরের সাথে মিশে আছে।
‘কঠিন সময়-পরিক্রমার পথে রৌদ্রবরন নারী’
“রৌদ্রবরন দেখেছিলাম কঠিন সময়-পরিক্রমার পথে— নারীর, —তবু ভেবেছিলাম বহিঃপ্রকৃতির” — এই পঙ্ক্তিতে কবি জীবনের কঠিন পথে এক নারীকে দেখেছেন, যার রং রৌদ্রের মতো। কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন এটি নারী নয়, প্রকৃতির অংশ। এটি নারী ও প্রকৃতির একাত্মতার ইঙ্গিত দেয়। জীবনানন্দের কবিতায় নারী ও প্রকৃতি প্রায়ই এক হয়ে যায় — যেমন বনলতা সেনও একই সঙ্গে নারী ও প্রকৃতি।
‘মীনকেতনের সাড়া’র তাৎপর্য
“আজকে সে-সব মীনকেতনের সাড়ার মতো” — মীনকেতন শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মীন অর্থ মাছ, কেতন অর্থ পতাকা। মীনকেতন হলো কামদেবের পতাকা, যাতে মাছের চিহ্ন থাকে। কামদেব প্রেমের দেবতা। তাই মীনকেতনের সাড়া মানে প্রেমের আহ্বান। কবি বলতে চান — আজকে সেসব (রৌদ্রবরন নারীর দেখা পাওয়া) প্রেমের আহ্বানের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু তা কি সত্যি? নাকি কল্পনা?
‘অন্ধকারের মহাসনাতন’ থেকে প্রশ্ন
“অন্ধকারের মহাসনাতনের থেকে চেয়ে আশ্বিনের এই শীত স্বাভাবিক ভোরের বেলা হলে বলে: ‘আমি রোদ কি ধুলো পাখি না সেই নারী?'” — অন্ধকারের মহাসনাতন মানে চিরন্তন অন্ধকার। সেই চিরন্তন অন্ধকার থেকে তাকিয়ে আশ্বিনের শীতল ভোরে সেই নারী প্রশ্ন করে — আমি কি রোদ? ধুলো? পাখি? নাকি সেই নারী? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এটি অস্তিত্বের রহস্যময়তা নির্দেশ করে।
পৃথিবীর শান্ত পরিচ্ছন্নতা ও বিষণ্ণতা
“নদী শিশির পাখি বাতাস কথা বলে ফুরিয়ে গেলে পরে শান্ত পরিচ্ছন্নতা এক এই পৃথিবীর প্রাণে সফল হতে গিয়েও তবু বিষণ্ণতার মতো” — প্রকৃতির সব ধ্বনি থেমে গেলে পৃথিবীর প্রাণে এক শান্ত পরিচ্ছন্নতা আসে। কিন্তু সেই পরিচ্ছন্নতা সফল হতে গিয়েও বিষণ্ণতার মতো। অর্থাৎ পৃথিবী তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে গিয়েও ব্যর্থ হয়, বিষণ্ণ হয়। এটি জীবনের ব্যর্থতার দার্শনিক চিন্তা।
নায়ক-সাধক-রাষ্ট্র-সমাজের ক্লান্তি
“যদিও পথ আছে—তবু কোলাহলে শূন্য আলিঙ্গনে নায়ক সাধক রাষ্ট্র সমাজ ক্লান্ত হয়ে পড়ে” — মানুষের পথ আছে, লক্ষ্য আছে, কিন্তু কোলাহলের শূন্য আলিঙ্গনে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নায়ক, সাধক, রাষ্ট্র, সমাজ — সবাই ক্লান্ত। এটি আধুনিক সভ্যতার ব্যর্থতার এক গভীর সমালোচনা।
‘আত্মবোধের দ্বীপ’ ও ‘অবক্ষয়ের মানবসাগর’
“প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো— কী এক বিরাট অবক্ষয়ের মানবসাগরে” — প্রতিটি মানুষ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো। চারপাশে বিরাট অবক্ষয়ের মানবসাগর। এই দ্বীপগুলো সাগরে বিচ্ছিন্ন, একে অপরের সাথে মিশতে পারে না। এটি মানুষের একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার প্রতীক।
শেষাংশের তাৎপর্য
“তবুও তোমায় জেনেছি, নারি, ইতিহাসের শেষে এসে; মানবপ্রতিভার রূঢ়তা ও নিষ্ফলতার অধম অন্ধকারে মানবকে নয়, নারী, শুধু তোমাকে ভালোবেসে বুঝেছি নিখিল বিষ কী রকম মধুর হতে পারে।” শেষাংশে কবি নারীকে সম্বোধন করেছেন। ইতিহাসের শেষে, মানবসভ্যতার সব ব্যর্থতার অন্ধকারে, তিনি নারীকে ভালোবেসে বুঝেছেন — নিখিল বিষও কত মধুর হতে পারে। অর্থাৎ পৃথিবীর সব কষ্ট, সব বিষ, সব ব্যর্থতা — নারীর ভালোবাসায় মধুর হয়ে ওঠে। এটি ভালোবাসার এক অসাধারণ উচ্চারণ।
তোমাকে কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: তোমাকে কবিতার লেখক কে?
তোমাকে কবিতার লেখক জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। তিনি বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ প্রভৃতি।
প্রশ্ন ২: তোমাকে কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
তোমাকে কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো নারী, প্রকৃতি ও সত্তার অন্বেষণ। কবি রৌদ্র, পাখি ও নারীর মধ্যে একটি জটিল সম্পর্ক দেখিয়েছেন। তিনি জীবনের কঠিন পথে রৌদ্রবরন নারী দেখেছিলেন, ভেবেছিলেন প্রকৃতি। শেষে সেই নারী প্রশ্ন করে — সে কি রোদ, ধুলো, পাখি, না সেই নারী? কবি মানবসভ্যতার ব্যর্থতা, মানুষের একাকীত্ব দেখেছেন। শেষে তিনি নারীকে ভালোবেসে বুঝেছেন — নিখিল বিষও মধুর হতে পারে।
প্রশ্ন ৩: ‘আমি রোদ কি ধুলো পাখি না সেই নারী?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘আমি রোদ কি ধুলো পাখি না সেই নারী?’ — এই প্রশ্নটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অন্ধকারের মহাসনাতন থেকে তাকিয়ে আশ্বিনের শীতল ভোরে এই প্রশ্ন ওঠে। নারী তার নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করছে — সে কি রোদ? ধুলো? পাখি? নাকি সেই নারী? এটি অস্তিত্বের রহস্যময়তা নির্দেশ করে। নারী, প্রকৃতি ও সত্তা কখনো পৃথক নয়, তারা একে অপরের সাথে মিশে আছে — এই ভাবনা এখানে ধরা পড়েছে।
প্রশ্ন ৪: ‘প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি মানুষের একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার কথা বলেছেন। প্রতিটি মানুষ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো। চারপাশে বিরাট অবক্ষয়ের মানবসাগর। এই দ্বীপগুলো সাগরে বিচ্ছিন্ন, একে অপরের সাথে মিশতে পারে না। মানুষ তার নিজের অস্তিত্ব নিয়ে একা, অন্যদের সাথে মিশতে পারে না সম্পূর্ণরূপে।
প্রশ্ন ৫: ‘মানবকে নয়, নারী, শুধু তোমাকে ভালোবেসে বুঝেছি নিখিল বিষ কী রকম মধুর হতে পারে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘মানবকে নয়, নারী, শুধু তোমাকে ভালোবেসে বুঝেছি নিখিল বিষ কী রকম মধুর হতে পারে’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার শেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কবি বলেছেন — ইতিহাসের শেষে, মানবসভ্যতার সব ব্যর্থতার অন্ধকারে, তিনি নারীকে ভালোবেসে বুঝেছেন যে নিখিল বিষও কত মধুর হতে পারে। অর্থাৎ পৃথিবীর সব কষ্ট, সব বিষ, সব ব্যর্থতা — নারীর ভালোবাসায় মধুর হয়ে ওঠে। এটি ভালোবাসার এক অসাধারণ উচ্চারণ।
প্রশ্ন ৬: জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ প্রভৃতি। তার কবিতায় প্রকৃতি, নিসর্গ, জীবন-মৃত্যু, সময় ও ইতিহাসচেতনার গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ১৯৫৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ট্যাগস: তোমাকে, জীবনানন্দ দাশ, জীবনানন্দ দাশের কবিতা, তোমাকে কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, রূপসী বাংলার কবি, বাংলা সাহিত্য, নারীর কবিতা, প্রকৃতির কবিতা






