কবিতার খাতা
- 24 mins
জনম দুখিনির ঘর – অরুণ মিত্র।
দুব্বার কয়েকটি ছোপ
ধানের গুচ্ছের একটু ছটা
কয়েকটা দোয়েল ফিঙে টুনটুনি
নরম হাসির আভা
দু-একজনের ঠোঁট আদর করার মতো খোলা
এই সব নিশানা ধরেই
এখানে ফিরেছি আমি।
দুরন্ত রোদের টিলা পেরিয়ে এলাম,
কুয়াশা প্রান্তর বনবাদাড়ের রাত
আমায় ঘোরায়নি আর,
অচেনা হাটুরে আনাগোনা ক্রমে ক্রমে মুছে গেছে,
নানান জিঞ্জাসাবাদ বিচিত্র ভাষার স্তূপ ঠেলে
এখন আমার কান শুদ্ধ এক ধ্বনিতে পেতেছি।
সেই পিদ্দিমের আলো দেখা যায়,
জন্মদুখিনির ঘর।
কবে আমি বড়ো হয়ে তাকে ছেড়ে চ’লে আসি
তবু তার আঁচলের হাওয়া আজও আমার নিভৃতে,
ঘুমের সময় যত গল্প ছিল আমাদের
অন্ধকার ভরাত যা সবই সে তো রূপকথার,
তবু দুঃখ ঘোচানোর গোপনীয়তা নিয়ে
গল্পের রাতের মধ্যে অভিভূত আমরা ঘুমোতাম।
তারপর একদিন বেরিয়েছি,
সন্ধ্যার সীমান্তজোড়া পাহাড় ডিঙিয়ে
কতদূর চ’লে গেছি,
বিভূঁই মনের মধ্যে পথ খুঁজে কতবার দিশেহারা,
রূপকথার কোনো দেশ দেখিনি তো।
আজ দুব্বা ধান পাখি দেখে
ভালোবাসার দু-একটা মুখ দেখে
এখানে ফিরেছি
পিদ্দিম জ্বলার একলা ঘর,
ওই আলো অন্ধকার আমার নাড়িতে বাজে,
আমার শ্রবণ একক স্বরের স্থিতি পায়ঃ
ভাঙাচোরা বুড়ি গলা
বিশুদ্ধ অতলস্পর্শ,
ঘরে ফিরতে বলে ডাকে।
সলতেটা নেভার পরও এই ডাক ঘুরতে ঘুরতে থাকবে
যতক্ষণ না আমি
রাত্তিরের গল্পগুলো মনে চেপে
আবার দাঁড়াব গিয়ে দুঃখের দুয়োরে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। অরুণ মিত্র।
জনম দুখিনির ঘর – অরুণ মিত্র | জনম দুখিনির ঘর কবিতা | অরুণ মিত্রের কবিতা | বাংলা কবিতা
জনম দুখিনির ঘর: অরুণ মিত্রের শৈশব, স্মৃতি ও মাতৃস্নেহের অসাধারণ কাব্যভাষা
অরুণ মিত্রের “জনম দুখিনির ঘর” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা শৈশব, স্মৃতি, মাতৃস্নেহ ও ফিরে আসার এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “দুব্বার কয়েকটি ছোপ / ধানের গুচ্ছের একটু ছটা / কয়েকটা দোয়েল ফিঙে টুনটুনি / নরম হাসির আভা / দু-একজনের ঠোঁট আদর করার মতো খোলা / এই সব নিশানা ধরেই / এখানে ফিরেছি আমি।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর নস্টালজিয়া, শৈশবের স্মৃতি ও মায়ের ঘরে ফিরে আসার আকুতি। অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় শৈশব, প্রকৃতি, স্মৃতি ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে। “জনম দুখিনির ঘর” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা শৈশবের স্মৃতি ও মাতৃস্নেহের এক অসাধারণ চিত্র।
অরুণ মিত্র: শৈশব ও স্মৃতির কবি
অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯০৯ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। শান্তিনিকেতনে কিছুদিন শিক্ষালাভ করেন এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম পৃথিবী’ (১৯৫২) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অন্ধকার থেকে’, ‘একটি ঘাসের নাম’, ‘শুধু রাতের শব্দ’, ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় শৈশব, প্রকৃতি, স্মৃতি ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ২০০০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। “জনম দুখিনির ঘর” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা শৈশবের স্মৃতি ও মাতৃস্নেহের এক অসাধারণ চিত্র।
জনম দুখিনির ঘর কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“জনম দুখিনির ঘর” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘জনম দুখিনি’ — জন্ম থেকেই দুঃখী। ‘ঘর’ — বাড়ি, আশ্রয়। শিরোনামে ইঙ্গিত — এই ঘর জন্ম থেকেই দুঃখের আশ্রয়। কিন্তু এই দুঃখের ঘরেই কবি ফিরে আসতে চান, কারণ এটাই তাঁর শেকড়, তাঁর শৈশবের স্মৃতি।
প্রথম স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“দুব্বার কয়েকটি ছোপ / ধানের গুচ্ছের একটু ছটা / কয়েকটা দোয়েল ফিঙে টুনটুনি / নরম হাসির আভা / দু-একজনের ঠোঁট আদর করার মতো খোলা / এই সব নিশানা ধরেই / এখানে ফিরেছি আমি। / দুরন্ত রোদের টিলা পেরিয়ে এলাম, / কুয়াশা প্রান্তর বনবাদাড়ের রাত / আমায় ঘোরায়নি আর, / অচেনা হাটুরে আনাগোনা ক্রমে ক্রমে মুছে গেছে, / নানান জিঞ্জাসাবাদ বিচিত্র ভাষার স্তূপ ঠেলে / এখন আমার কান শুদ্ধ এক ধ্বনিতে পেতেছি।” প্রথম স্তবকে কবি ফিরে আসার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — দুব্বার কয়েকটি ছোপ, ধানের গুচ্ছের একটু ছটা, কয়েকটা দোয়েল-ফিঙে-টুনটুনি, নরম হাসির আভা, দু-একজনের আদর করার মতো খোলা ঠোঁট — এই সব নিশানা ধরেই এখানে ফিরেছি আমি। দুরন্ত রোদের টিলা পেরিয়ে এলাম। কুয়াশা প্রান্তর, বনবাদাড়ের রাত আমায় ঘোরায়নি আর। অচেনা হাটুরে আনাগোনা ক্রমে ক্রমে মুছে গেছে। নানান জিঞ্জাসাবাদ, বিচিত্র ভাষার স্তূপ ঠেলে এখন আমার কান শুদ্ধ এক ধ্বনিতে পেতেছি।
দুব্বা, ধান, পাখির নিশানার তাৎপর্য
দুব্বা — এক প্রকার ঘাস, যা বাংলার গ্রামের চিরচিহ্ন। ধানের গুচ্ছ — শস্যের প্রতীক। দোয়েল, ফিঙে, টুনটুনি — বাংলার সাধারণ পাখি। এই সব কিছুই শৈশবের স্মৃতি, গ্রামের চিহ্ন। এই নিশানা ধরেই কবি ফিরে এসেছেন।
‘নরম হাসির আভা, দু-একজনের ঠোঁট আদর করার মতো খোলা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি মায়ের বা প্রিয়জনের মুখের ছবি। নরম হাসি, আদর করার মতো খোলা ঠোঁট — এটি স্নেহ, ভালোবাসার প্রতীক। এই স্মৃতি তাঁকে টেনে এনেছে।
‘দুরন্ত রোদের টিলা, কুয়াশা প্রান্তর, বনবাদাড়ের রাত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এগুলো জীবনের পথের প্রতীক। দুরন্ত রোদ — কষ্ট, পরিশ্রম। কুয়াশা প্রান্তর — অনিশ্চয়তা। বনবাদাড়ের রাত — বিপদ, অন্ধকার। এই সব কিছু পেরিয়ে তিনি এসেছেন।
‘কান শুদ্ধ এক ধ্বনিতে পেতেছি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
নানান জিঞ্জাসাবাদ, বিচিত্র ভাষার স্তূপ ঠেলে তিনি এখন এক ধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন — সেই ধ্বনি মায়ের ডাক, শৈশবের ডাক, ঘরে ফেরার ডাক।
দ্বিতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“সেই পিদ্দিমের আলো দেখা যায়, / জন্মদুখিনির ঘর। / কবে আমি বড়ো হয়ে তাকে ছেড়ে চ’লে আসি / তবু তার আঁচলের হাওয়া আজও আমার নিভৃতে, / ঘুমের সময় যত গল্প ছিল আমাদের / অন্ধকার ভরাত যা সবই সে তো রূপকথার, / তবু দুঃখ ঘোচানোর গোপনীয়তা নিয়ে / গল্পের রাতের মধ্যে অভিভূত আমরা ঘুমোতাম।” দ্বিতীয় স্তবকে কবি শৈশবের স্মৃতি মনে করেছেন। তিনি বলেছেন — সেই পিদ্দিমের আলো দেখা যায়, জন্মদুখিনির ঘর। কবে আমি বড় হয়ে তাকে ছেড়ে চলে এসেছি। তবু তার আঁচলের হাওয়া আজও আমার নিভৃতে। ঘুমের সময় যত গল্প ছিল আমাদের, অন্ধকার ভরাত যা সবই সে তো রূপকথার। তবু দুঃখ ঘোচানোর গোপনীয়তা নিয়ে গল্পের রাতের মধ্যে অভিভূত আমরা ঘুমোতাম।
পিদ্দিমের আলো ও জন্মদুখিনির ঘরের তাৎপর্য
পিদ্দিম — ছোট প্রদীপ। সেই প্রদীপের আলো দেখা যায়। এটি জন্মদুখিনির ঘরের আলো — মায়ের ঘরের আলো। এই আলো কবিকে টানে, ডাকে।
মায়ের আঁচলের হাওয়ার তাৎপর্য
কবি মাকে ছেড়ে চলে এসেছেন বহুদিন আগে। কিন্তু মায়ের আঁচলের হাওয়া আজও তাঁর নিভৃতে (একান্তে) আছে। অর্থাৎ মায়ের স্মৃতি, মায়ের স্নেহ আজও তাঁর মধ্যে বিদ্যমান।
গল্পের রাত ও রূপকথার তাৎপর্য
শৈশবে মা গল্প বলতেন, অন্ধকার ভরাতেন। সেই গল্প রূপকথার মতো মনে হলেও, তা দুঃখ ঘোচানোর গোপনীয়তা ধারণ করত। সেই গল্প শুনতে শুনতে তারা অভিভূত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন।
তৃতীয় স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“তারপর একদিন বেরিয়েছি, / সন্ধ্যার সীমান্তজোড়া পাহাড় ডিঙিয়ে / কতদূর চ’লে গেছি, / বিভূঁই মনের মধ্যে পথ খুঁজে কতবার দিশেহারা, / রূপকথার কোনো দেশ দেখিনি তো। / আজ দুব্বা ধান পাখি দেখে / ভালোবাসার দু-একটা মুখ দেখে / এখানে ফিরেছি / পিদ্দিম জ্বলার একলা ঘর, / ওই আলো অন্ধকার আমার নাড়িতে বাজে, / আমার শ্রবণ একক স্বরের স্থিতি পায়ঃ / ভাঙাচোরা বুড়ি গলা / বিশুদ্ধ অতলস্পর্শ, / ঘরে ফিরতে বলে ডাকে।” তৃতীয় স্তবকে কবি বেরিয়ে যাওয়া ও ফিরে আসার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — তারপর একদিন বেরিয়েছি। সন্ধ্যার সীমান্তজোড়া পাহাড় ডিঙিয়ে কতদূর চলে গেছি। বিভূঁই মনের মধ্যে পথ খুঁজে কতবার দিশেহারা হয়েছি। রূপকথার কোনো দেশ দেখিনি তো। আজ দুব্বা, ধান, পাখি দেখে, ভালোবাসার দু-একটা মুখ দেখে এখানে ফিরেছি। পিদ্দিম জ্বলার একলা ঘর — ওই আলো-অন্ধকার আমার নাড়িতে বাজে। আমার শ্রবণ একক স্বরের স্থিতি পায় — ভাঙাচোরা বুড়ি গলা, বিশুদ্ধ অতলস্পর্শ, ঘরে ফিরতে বলে ডাকে।
‘সন্ধ্যার সীমান্তজোড়া পাহাড় ডিঙিয়ে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সন্ধ্যার সীমান্তজোড়া পাহাড় — জীবনের সীমা অতিক্রম করা, বড় হয়ে ওঠা, পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়া। কবি এই পাহাড় ডিঙিয়ে বহু দূরে চলে গেছেন।
‘রূপকথার কোনো দেশ দেখিনি তো’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শৈশবে মায়ের গল্পে রূপকথার দেশের কথা শুনতেন। কিন্তু বড় হয়ে তিনি দেখেছেন — রূপকথার দেশ বলে কিছু নেই। বাস্তব পৃথিবী অন্য রকম।
‘পিদ্দিম জ্বলার একলা ঘর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের ঘর, যেখানে পিদ্দিম জ্বলে। এই ঘর একলা — মা একা, নাকি ঘর একলা? হয়তো মা নেই, কিন্তু ঘর আছে, পিদ্দিম জ্বলে।
‘ওই আলো অন্ধকার আমার নাড়িতে বাজে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের ঘরের আলো-অন্ধকার তাঁর নাড়িতে বাজে — অর্থাৎ তাঁর অস্তিত্বের গভীরে অনুভূত হয়। এটি রক্তের টান, শেকড়ের টান।
‘ভাঙাচোরা বুড়ি গলা / বিশুদ্ধ অতলস্পর্শ, / ঘরে ফিরতে বলে ডাকে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
এটি মায়ের ডাক। মায়ের গলা ভাঙাচোরা, বুড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ডাক বিশুদ্ধ, অতলস্পর্শ — অর্থাৎ গভীর থেকে আসে, হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি ডাকছেন ঘরে ফিরতে।
চতুর্থ স্তবকের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“সলতেটা নেভার পরও এই ডাক ঘুরতে ঘুরতে থাকবে / যতক্ষণ না আমি / রাত্তিরের গল্পগুলো মনে চেপে / আবার দাঁড়াব গিয়ে দুঃখের দুয়োরে।” চতুর্থ স্তবকে কবি এই ডাকের চিরন্তনতার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — সলতেটা নেভার পরও এই ডাক ঘুরতে ঘুরতে থাকবে। যতক্ষণ না আমি রাতের গল্পগুলো মনে চেপে আবার দাঁড়াব গিয়ে দুঃখের দুয়োরে।
‘সলতেটা নেভার পরও এই ডাক ঘুরতে ঘুরতে থাকবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সলতে নিভে গেলেও ডাক থামবে না। মায়ের ডাক, শেকড়ের ডাক চিরকাল থাকে। মা মারা গেলেও, ঘর ছেড়ে দিলেও ডাক থেকে যায়।
‘রাত্তিরের গল্পগুলো মনে চেপে / আবার দাঁড়াব গিয়ে দুঃখের দুয়োরে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
শৈশবের রাতের গল্পগুলো মনে করে কবি আবার দাঁড়াবেন দুঃখের দুয়োরে। ‘দুঃখের দুয়োর’ — সম্ভবত মায়ের ঘরের দরজা, যা দুঃখের হলেও প্রিয়। তিনি আবার সেই দরজায় দাঁড়াবেন, আবার ফিরে আসবেন।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“জনম দুখিনির ঘর” কবিতাটি শৈশবের স্মৃতি, মাতৃস্নেহ ও ফিরে আসার এক অসাধারণ চিত্র। কবি দুব্বা, ধান, পাখি, নরম হাসির আভা, আদর করার মতো ঠোঁট — এই নিশানা ধরে ফিরে এসেছেন নিজের শৈশবে, মায়ের ঘরে। তিনি দুরন্ত রোদ, কুয়াশা, বনবাদাড় পেরিয়ে এসেছেন। নানা ভাষা, নানা প্রশ্নের স্তূপ ঠেলে তিনি এখন এক ধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন — মায়ের ডাক। সেই পিদ্দিমের আলো দেখা যাচ্ছে — জন্মদুখিনির ঘর। তিনি ছেড়ে চলে এসেছিলেন, কিন্তু মায়ের আঁচলের হাওয়া আজও তাঁর নিভৃতে আছে। শৈশবের গল্পের রাতগুলো রূপকথার মতো মনে হলেও তা দুঃখ ঘোচানোর গোপনীয়তা ধারণ করত। তিনি বহু দূর চলে গেছেন, রূপকথার দেশ দেখতে পাননি। আজ তিনি ফিরে এসেছেন — দুব্বা, ধান, পাখি, ভালোবাসার মুখ দেখে। পিদ্দিম জ্বলার একলা ঘর তাঁকে ডাকছে। ভাঙাচোরা বুড়ি গলা ডাকছে — ঘরে ফিরতে। এই ডাক চিরকাল থাকবে, যতক্ষণ না তিনি আবার সেই দুঃখের দুয়োরে দাঁড়ান।
জনম দুখিনির ঘর কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: জনম দুখিনির ঘর কবিতার লেখক কে?
জনম দুখিনির ঘর কবিতার লেখক অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০)। তিনি বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম পৃথিবী’ (১৯৫২) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় শৈশব, প্রকৃতি, স্মৃতি ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে।
প্রশ্ন ২: জনম দুখিনির ঘর কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
জনম দুখিনির ঘর কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো শৈশবের স্মৃতি, মাতৃস্নেহ ও ফিরে আসার আকুতি। কবি দুব্বা, ধান, পাখি, নরম হাসির আভা — এই নিশানা ধরে ফিরে এসেছেন মায়ের ঘরে। তিনি মায়ের ডাক শুনতে পান, পিদ্দিমের আলো দেখতে পান। এই ডাক চিরকাল থাকবে, যতক্ষণ না তিনি আবার সেই ঘরে ফিরে যান।
প্রশ্ন ৩: ‘এই সব নিশানা ধরেই / এখানে ফিরেছি আমি’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘এই সব নিশানা ধরেই / এখানে ফিরেছি আমি’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি তাঁর ফিরে আসার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। দুব্বা, ধান, পাখি, নরম হাসির আভা, আদর করার মতো ঠোঁট — এই সব শৈশবের চিহ্ন, গ্রামের চিহ্ন, মায়ের চিহ্ন। এই নিশানা ধরে তিনি ফিরে এসেছেন নিজের শিকড়ে, নিজের শৈশবে।
প্রশ্ন ৪: ‘সেই পিদ্দিমের আলো দেখা যায়, / জন্মদুখিনির ঘর’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সেই পিদ্দিমের আলো দেখা যায়, / জন্মদুখিনির ঘর’ — পিদ্দিম ছোট প্রদীপ। সেই প্রদীপের আলো দেখা যায় — এটি মায়ের ঘরের আলো। ‘জন্মদুখিনির ঘর’ — মায়ের ঘর, যে ঘর জন্ম থেকে দুঃখের আশ্রয়। কিন্তু এই দুঃখের ঘরেই কবি ফিরে আসতে চান।
প্রশ্ন ৫: ‘ভাঙাচোরা বুড়ি গলা / বিশুদ্ধ অতলস্পর্শ, / ঘরে ফিরতে বলে ডাকে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ভাঙাচোরা বুড়ি গলা / বিশুদ্ধ অতলস্পর্শ, / ঘরে ফিরতে বলে ডাকে’ — এটি মায়ের ডাক। মায়ের গলা ভাঙাচোরা, বুড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ডাক বিশুদ্ধ, অতলস্পর্শ — অর্থাৎ গভীর থেকে আসে, হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি ডাকছেন ঘরে ফিরতে।
প্রশ্ন ৬: ‘সলটেটা নেভার পরও এই ডাক ঘুরতে ঘুরতে থাকবে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সলটেটা নেভার পরও এই ডাক ঘুরতে ঘুরতে থাকবে’ — সলতে নিভে গেলেও ডাক থামবে না। মায়ের ডাক, শেকড়ের ডাক চিরকাল থাকে। মা মারা গেলেও, ঘর ছেড়ে দিলেও ডাক থেকে যায়। এই ডাক চিরন্তন।
প্রশ্ন ৭: অরুণ মিত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
অরুণ মিত্র (১৯০৯-২০০০) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯০৯ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম পৃথিবী’ (১৯৫২) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় শৈশব, প্রকৃতি, স্মৃতি ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে।
ট্যাগস: জনম দুখিনির ঘর, অরুণ মিত্র, অরুণ মিত্রের কবিতা, জনম দুখিনির ঘর কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, শৈশবের কবিতা, মাতৃস্নেহের কবিতা, স্মৃতির কবিতা





