কবিতার খাতা
গোলামের গর্ভধারিণী – হুমায়ুন আজাদ।
আপনাকে দেখিনি আমি; তবে আপনি আমার অচেনা
নন পুরোপুরি, কারণ বাঙলার মায়েদের আমি মোটামুটি চিনি, জানি।
হয়তো গরিব পিতার ঘরেবেড়ে উঠেছেন দুঃখিনী বালিকারূপে ধীরেধীরে;
দুঃখের সংসারে কুমড়ো ফুলের মতো ফুটেছেন
ঢলঢল, এবং সন্ত্রস্ত ক’রে তুলেছেন মাতা ও পিতাকে।
গরিবের ঘরে ফুল ভয়েরই কারণ।
তারপর একদিন ভাঙা পালকিতে চেপে দিয়েছেন
পাড়ি, আর এসে উঠেছেন আরেক গরিব ঘরে;
স্বামীর আদর হয়তো ভাগ্যে জুটেছে কখনো,তবে অনাদর জুটেছে অনেক।
দারিদ্র্য,পীড়ন, খণ্ড প্রেম, ঘৃণা, মধ্যযুগীয় স্বামীর জন্যে প্রথাসিদ্ধ
ভক্তিতে আপনার কেটেছে জীবন।
বঙ্গীয় নারীর আবেগে আপনিও চেয়েছেন বুক জুড়ে পুত্রকন্যা,
আপনার মরদ বছরে একটা নতুন ঢাকাই
শাড়ি দিতে না পারলেও বছরে বছরে উপহার
দিয়েছেন আপনাকে একের পর এক কৃশকায়
রুগ্ন সন্তান, এবং তাতেই আপনার শুষ্ক বুক
ভাসিয়ে জেগেছে তিতাসের তীব্র জলের উচ্ছ্বাস।
চাঁদের সৌন্দর্য নয়, আমি জানি আপনাকে মুগ্ধ
আলোড়িত বিহ্বল করেছে সন্তানের স্নিগ্ধ মুখ,
আর দেহের জ্যোৎস্না। আপনিও চেয়েছেন জানি
আপনার পুত্র হবে সৎ, প্রকৃত মানুষ।
তাকে দারিদ্র্যের কঠোর কামড় টলাবে না সততার
পথ থেকে, তার মেরুদণ্ড হবে দৃঢ়,পীড়নে বা
প্রলোভনে সে কখনো বুটদের সেজদা করবে না।
আপনার উচ্চাভিলাষ থাকার তো কথা নয়, আপনি
আনন্দিত হতেন খুবই আপনার পুত্র যদি হতো
সৎ কৃষিজীবী, মেরুদণ্ডসম্পন্ন শ্রমিক, কিংবা
তিতাসের অপরাজেয় ধীবর।
আপনি উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারেন নি সন্তানকে;- এই পুঁজিবাদী
ব্যবস্থায় এটাই তো স্বাভাবিক,
এখানে মোহর ছাড়া কিছুই মেলে না, শিক্ষাও জোটে না।
তবে এতে আপনার কোনো ক্ষতি নেই জানি;
কারণ আপনি পুত্রের জন্যে কোনো রাজপদ, বা ও রকম কিছুই চান নি,
কেবল চেয়েছেন আপনার পুত্র হোক সৎ, মেরুদণ্ডী, প্রকৃত মানুষ।
আপনার সমস্ত পবিত্র প্রার্থনা ব্যর্থ ক’রে
বিশশতকের এই এলোমেলো অন্ধকারে আপনার পুত্র কী হয়েছে
আপনি কি তা জানেন তা, হে অদেখা দরিদ্র জননী?
কেনো আপনি পুত্রকে পাঠিয়েছিলেন মুঘলদের এই ক্ষয়িষ্ণু শহরে,
যেখানে কৃষক এসে লিপ্ত হয় পতিতার দালালিতে,
মাঠের রাখাল তার নদী আর মাঠ হ’য়ে ওঠে হাবশি গোলাম?
আপনি কি জানেন, মাতা, আপনার পুত্র শহরের
অন্যতম প্রসিদ্ধ গোলাম আজ?
আপনি এখন তাকে চিনতেও ব্যর্থ হবেন,
আপনার পুত্রের দিকে তাকালে এখন কোনো মস্তক পড়ে না চোখে,
শুধু একটা বিশাল কুঁজ চোখে পড়ে।
দশকে দশকে যতো স্বঘোষিত প্রভু দেখা দিয়েছেন মুঘলদের
এ-নষ্ট শহরে, আপনার পুত্র তাদের প্রত্যেকের
পদতলে মাথা ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে পৃষ্ঠদেশ জুড়ে
জন্মিয়েছে কুঁজ আর কুঁজ; আজ তার পৃষ্ঠদেশ
একগুচ্ছ কুঁজের সমষ্টি;- মরুভূমিতে কিম্ভুত
বহুকুঁজ উটের মতোই এখন দেখায় তাকে।
সে এখন শহরের বিখ্যাত গোলাম মজলিশের
বিখ্যাত সদস্য, গোলামিতে সে ও তার ইয়ারেরা
এতোই দক্ষ যে প্রাচীন,ঐতিহাসিক গোলামদের
গৌরব হরণ ক’রে তারা আজ মশহুর গোলাম পৃথিবীর।
এখন সে মাথা তার তুলতে পারে না,
এমনকি ভুলেও গেছে যে একদা তারও একটি মাথা ছিলো,
এখন সে বহুশীর্ষ কুঁজটিকেই মাথা ব’লে ভাবে।
খাদ্যগ্রহণের পর স্বাভাবিক পদ্ধতিও বিস্মৃত হয়েছে সে,
প্রভুদের পাদুকার তলে প’ড়ে থাকা অন্ন চেটে খাওয়া ছাড়া
আর কিছুতেই পরিতৃপ্তি পায় না আপনার পুত্র,
একদা আপনার স্তন থেকে মধুদুগ্ধ শুষে নিয়ে জীবন ধারণ
করতো যে বালক বয়সে।
এখন সে শত্রু পাখি ও নদীর, শত্রু মানুষের, এমন কি
সে আপনার স্তন্যেরও শত্রু।
তার জন্য দুঃখ করি না,
কতোই তো গোলাম দেখলাম এ-বদ্বীপে শতকে শতকে।
কিন্তু আপনার জন্যে, হে গরিব কৃষক-কন্যা, দুঃখী মাতা,
গরিব-গৃহিণী, আপনার জন্যে বড় বেশি দুঃখ পাই;
আপনার পুত্রের গোলামির বার্তা আজ রাষ্ট্র দিকে দিকে,
নিশ্চয়ই তা পৌঁছে গেছে তিতাসের
জলের গভীরে আর কুমড়োর খেতে, লাউয়ের মাঁচায়,
পাখির বাসা আর চাষীদের উঠানের কোণে।
তিতাসের জল আপনাকে দেখলে ছলছল ক’রে ওঠে,
‘ওই দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’;
মাঠে পাখি ডেকে ওঠে, ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’;
আপনার পালিত বেড়াল দুধের বাটি থেকে
দু-চোখ ফিরিয়ে বলে, ‘গোলামের গর্ভধারিণীর
হাতের দুগ্ধ রোচে না আমার জিভে’,
প্রতিবেশী পুরুষ-নারীরা অঙ্গুলি সংকেত ক’রে কলকণ্ঠে বলে,
‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে।’
এমন কি প্রার্থনার সময়ও আপনি হয়তো বাশুনতে পান
‘গোলামের গর্ভধারিণী, ধারিণী’ স্বর ঘিরে ফেলছে চারদিক থেকে।
আপনি যখন অন্তিম বিশ্রাম নেবেন মাটির তলে তখনো হয়তো
মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলবে ঘাসফুল, বাতাসের কানে কানে ব’লে যাবে,
‘এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক গর্ভধারিণী গোলামের।’
ভিজে উঠবে মাটি ঠাণ্ডা কোমল অশ্রুতে।
কী দোষ আপনার?
মা কি কখনোও জানে দশমাস
ধ’রে যাকে সে ধারণ করছে সে মানুষ না গোলাম?
মাকে নিয়ে কবিতা পড়তে ক্লিক করুন।
গোলামের গর্ভধারিণী – হুমায়ুন আজাদ | গোলামের গর্ভধারিণী কবিতা হুমায়ুন আজাদ | হুমায়ুন আজাদের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | মাতৃত্বের কবিতা | শোষণের কবিতা | গোলামির বিরুদ্ধে কবিতা
গোলামের গর্ভধারিণী: হুমায়ুন আজাদের মাতৃত্ব, শোষণ ও গোলামির অসাধারণ কাব্যভাষা
হুমায়ুন আজাদের “গোলামের গর্ভধারিণী” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও শক্তিশালী শোষণবিরোধী কবিতা। “আপনাকে দেখিনি আমি; তবে আপনি আমার অচেনা / নন পুরোপুরি, কারণ বাঙলার মায়েদের আমি মোটামুটি চিনি, জানি। / হয়তো গরিব পিতার ঘরে বেড়ে উঠেছেন দুঃখিনী বালিকারূপে ধীরে ধীরে; / দুঃখের সংসারে কুমড়ো ফুলের মতো ফুটেছেন / ঢলঢল, এবং সন্ত্রস্ত ক’রে তুলেছেন মাতা ও পিতাকে। / গরিবের ঘরে ফুল ভয়েরই কারণ।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে একজন দরিদ্র জননীর জীবন, তার আশা-আকাঙ্ক্ষা, পুত্রকে সৎ মানুষ করার স্বপ্ন, এবং শেষ পর্যন্ত সেই পুত্র শহরে এসে গোলাম হয়ে যাওয়ার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) ছিলেন একজন বাংলাদেশী কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। তিনি তাঁর সাহসী ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বিখ্যাত। “গোলামের গর্ভধারিণী” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি দরিদ্র জননীর স্বপ্ন, পুত্রের গোলামিতে পরিণতি, এবং মায়ের চিরন্তন দুঃখকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
হুমায়ুন আজাদ: সাহসী কণ্ঠস্বর ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ
হুমায়ুন আজাদ ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এবং এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ (১৯৮৩), ‘জ্বলো চিতা’ (১৯৮৬), ‘কবিতা সংগ্রহ’ (১৯৯০), ‘রান্নাঘরে নারীবাদী’ (২০০০), ‘সেই কবে থেকে’ (২০০৫), ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ (২০০৫), ‘আমাদের মা’ (২০০৫), ‘শুভেচ্ছা’ (২০০৫), ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ (২০০৫) সহ আরও অসংখ্য গ্রন্থ। তিনি ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
হুমায়ুন আজাদের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, এবং সরল-প্রাঞ্জল ভাষায় গভীর অর্থ সৃষ্টির দক্ষতা। ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি দরিদ্র জননীর স্বপ্ন, পুত্রের গোলামিতে পরিণতি, এবং মায়ের চিরন্তন দুঃখকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
গোলামের গর্ভধারিণী: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ — অর্থাৎ যে মা গোলাম (দাস, শোষিত, আত্মসমর্পণকারী) সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। কবি এখানে এক দরিদ্র জননীর জীবনকাহিনী বর্ণনা করেছেন — যিনি পুত্রকে সৎ, মেরুদণ্ডী, প্রকৃত মানুষ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই পুত্র শহরে এসে গোলাম হয়ে গেছে।
কবি শুরুতে বলছেন — আপনাকে দেখিনি আমি; তবে আপনি আমার অচেনা নন পুরোপুরি, কারণ বাঙলার মায়েদের আমি মোটামুটি চিনি, জানি। হয়তো গরিব পিতার ঘরে বেড়ে উঠেছেন দুঃখিনী বালিকারূপে ধীরে ধীরে। দুঃখের সংসারে কুমড়ো ফুলের মতো ফুটেছেন ঢলঢল, এবং সন্ত্রস্ত করে তুলেছেন মাতা ও পিতাকে। গরিবের ঘরে ফুল ভয়েরই কারণ।
তারপর একদিন ভাঙা পালকিতে চেপে দিয়েছেন পাড়ি, আর এসে উঠেছেন আরেক গরিব ঘরে। স্বামীর আদর হয়তো ভাগ্যে জুটেছে কখনো, তবে অনাদর জুটেছে অনেক। দারিদ্র্য, পীড়ন, খণ্ড প্রেম, ঘৃণা, মধ্যযুগীয় স্বামীর জন্যে প্রথাসিদ্ধ ভক্তিতে আপনার কেটেছে জীবন। বঙ্গীয় নারীর আবেগে আপনিও চেয়েছেন বুক জুড়ে পুত্রকন্যা। আপনার মরদ বছরে একটা নতুন ঢাকাই শাড়ি দিতে না পারলেও বছরে বছরে উপহার দিয়েছেন আপনাকে একের পর এক কৃশকায় রুগ্ন সন্তান, এবং তাতেই আপনার শুষ্ক বুক ভাসিয়ে জেগেছে তিতাসের তীব্র জলের উচ্ছ্বাস।
চাঁদের সৌন্দর্য নয়, আমি জানি আপনাকে মুগ্ধ আলোড়িত বিহ্বল করেছে সন্তানের স্নিগ্ধ মুখ, আর দেহের জ্যোৎস্না। আপনিও চেয়েছেন জানি আপনার পুত্র হবে সৎ, প্রকৃত মানুষ। তাকে দারিদ্র্যের কঠোর কামড় টলাবে না সততার পথ থেকে, তার মেরুদণ্ড হবে দৃঢ়, পীড়নে বা প্রলোভনে সে কখনো বুটদের সেজদা করবে না।
আপনার উচ্চাভিলাষ থাকার তো কথা নয়, আপনি আনন্দিত হতেন খুবই আপনার পুত্র যদি হতো সৎ কৃষিজীবী, মেরুদণ্ডসম্পন্ন শ্রমিক, কিংবা তিতাসের অপরাজেয় ধীবর। আপনি উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারেন নি সন্তানকে — এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এটাই তো স্বাভাবিক, এখানে মোহর ছাড়া কিছুই মেলে না, শিক্ষাও জোটে না। তবে এতে আপনার কোনো ক্ষতি নেই জানি; কারণ আপনি পুত্রের জন্যে কোনো রাজপদ, বা ও রকম কিছুই চান নি, কেবল চেয়েছেন আপনার পুত্র হোক সৎ, মেরুদণ্ডী, প্রকৃত মানুষ।
আপনার সমস্ত পবিত্র প্রার্থনা ব্যর্থ করে বিশশতকের এই এলোমেলো অন্ধকারে আপনার পুত্র কী হয়েছে আপনি কি তা জানেন তা, হে অদেখা দরিদ্র জননী? কেন আপনি পুত্রকে পাঠিয়েছিলেন মুঘলদের এই ক্ষয়িষ্ণু শহরে, যেখানে কৃষক এসে লিপ্ত হয় পতিতার দালালিতে, মাঠের রাখাল তার নদী আর মাঠ হয়ে ওঠে হাবশি গোলাম? আপনি কি জানেন, মাতা, আপনার পুত্র শহরের অন্যতম প্রসিদ্ধ গোলাম আজ?
আপনি এখন তাকে চিনতেও ব্যর্থ হবেন, আপনার পুত্রের দিকে তাকালে এখন কোনো মস্তক পড়ে না চোখে, শুধু একটা বিশাল কুঁজ চোখে পড়ে। দশকে দশকে যতো স্বঘোষিত প্রভু দেখা দিয়েছেন মুঘলদের এ-নষ্ট শহরে, আপনার পুত্র তাদের প্রত্যেকের পদতলে মাথা ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে পৃষ্ঠদেশ জুড়ে জন্মিয়েছে কুঁজ আর কুঁজ; আজ তার পৃষ্ঠদেশ একগুচ্ছ কুঁজের সমষ্টি — মরুভূমিতে কিম্ভুত বহুকুঁজ উটের মতোই এখন দেখায় তাকে।
সে এখন শহরের বিখ্যাত গোলাম মজলিশের বিখ্যাত সদস্য, গোলামিতে সে ও তার ইয়াররা এতোই দক্ষ যে প্রাচীন, ঐতিহাসিক গোলামদের গৌরব হরণ করে তারা আজ মশহুর গোলাম পৃথিবীর। এখন সে মাথা তার তুলতে পারে না, এমনকি ভুলেও গেছে যে একদা তারও একটি মাথা ছিলো, এখন সে বহুশীর্ষ কুঁজটিকেই মাথা বলে ভাবে।
খাদ্যগ্রহণের পর স্বাভাবিক পদ্ধতিও বিস্মৃত হয়েছে সে, প্রভুদের পাদুকার তলে পড়ে থাকা অন্ন চেটে খাওয়া ছাড়া আর কিছুতেই পরিতৃপ্তি পায় না আপনার পুত্র, একদা আপনার স্তন থেকে মধুদুগ্ধ শুষে নিয়ে জীবন ধারণ করতো যে বালক বয়সে।
এখন সে শত্রু পাখি ও নদীর, শত্রু মানুষের, এমন কি সে আপনার স্তন্যেরও শত্রু। তার জন্য দুঃখ করি না, কতোই তো গোলাম দেখলাম এ-বদ্বীপে শতকে শতকে। কিন্তু আপনার জন্যে, হে গরিব কৃষক-কন্যা, দুঃখী মাতা, গরিব-গৃহিণী, আপনার জন্যে বড় বেশি দুঃখ পাই; আপনার পুত্রের গোলামির বার্তা আজ রাষ্ট্র দিকে দিকে, নিশ্চয়ই তা পৌঁছে গেছে তিতাসের জলের গভীরে আর কুমড়োর খেতে, লাউয়ের মাঁচায়, পাখির বাসা আর চাষীদের উঠানের কোণে।
তিতাসের জল আপনাকে দেখলে ছলছল করে ওঠে, ‘ওই দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’; মাঠে পাখি ডেকে ওঠে, ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’; আপনার পালিত বেড়াল দুধের বাটি থেকে দু-চোখ ফিরিয়ে বলে, ‘গোলামের গর্ভধারিণীর হাতের দুগ্ধ রোচে না আমার জিভে’, প্রতিবেশী পুরুষ-নারীরা অঙ্গুলি সংকেত করে কলকণ্ঠে বলে, ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে।’
এমন কি প্রার্থনার সময়ও আপনি হয়তো শুনতে পান ‘গোলামের গর্ভধারিণী, ধারিণী’ স্বর ঘিরে ফেলছে চারদিক থেকে। আপনি যখন অন্তিম বিশ্রাম নেবেন মাটির তলে তখনো হয়তো মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলবে ঘাসফুল, বাতাসের কানে কানে বলে যাবে, ‘এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক গর্ভধারিণী গোলামের।’ ভিজে উঠবে মাটি ঠাণ্ডা কোমল অশ্রুতে। কী দোষ আপনার? মা কি কখনোও জানে দশমাস ধ’রে যাকে সে ধারণ করছে সে মানুষ না গোলাম?
গোলামের গর্ভধারিণী: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: দরিদ্র জননীর পরিচয় ও শৈশব
“আপনাকে দেখিনি আমি; তবে আপনি আমার অচেনা / নন পুরোপুরি, কারণ বাঙলার মায়েদের আমি মোটামুটি চিনি, জানি। / হয়তো গরিব পিতার ঘরেবেড়ে উঠেছেন দুঃখিনী বালিকারূপে ধীরেধীরে; / দুঃখের সংসারে কুমড়ো ফুলের মতো ফুটেছেন / ঢলঢল, এবং সন্ত্রস্ত ক’রে তুলেছেন মাতা ও পিতাকে। / গরিবের ঘরে ফুল ভয়েরই কারণ।”
প্রথম স্তবকে দরিদ্র জননীর পরিচয় ও শৈশবের কথা বলা হয়েছে। ‘আপনাকে দেখিনি আমি; তবে আপনি আমার অচেনা নন পুরোপুরি, কারণ বাঙলার মায়েদের আমি মোটামুটি চিনি, জানি’ — কবি দরিদ্র জননীকে দেখেননি, কিন্তু বাংলার মায়েদের চেনেন। ‘হয়তো গরিব পিতার ঘরে বেড়ে উঠেছেন দুঃখিনী বালিকারূপে ধীরে ধীরে’ — গরিব পিতার ঘরে দুঃখিনী বালিকা হয়ে বেড়ে উঠেছেন। ‘দুঃখের সংসারে কুমড়ো ফুলের মতো ফুটেছেন ঢলঢল’ — দুঃখের সংসারে কুমড়ো ফুলের মতো ফুটেছেন (কুমড়ো ফুল যেমন সুন্দর অথচ ক্ষণস্থায়ী)। ‘এবং সন্ত্রস্ত করে তুলেছেন মাতা ও পিতাকে’ — আপনাকে দেখে মাতা-পিতা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ‘গরিবের ঘরে ফুল ভয়েরই কারণ’ — গরিবের ঘরে ফুল (কন্যা সন্তান) ভয়ের কারণ, কারণ তাকে বিয়ে দিতে গিয়ে সংসার ধ্বংস হয়।
দ্বিতীয় স্তবক: বিবাহ ও সংসার জীবন
“তারপর একদিন ভাঙা পালকিতে চেপে দিয়েছেন / পাড়ি, আর এসে উঠেছেন আরেক গরিব ঘরে; / স্বামীর আদর হয়তো ভাগ্যে জুটেছে কখনো,তবে অনাদর জুটেছে অনেক। / দারিদ্র্য,পীড়ন, খণ্ড প্রেম, ঘৃণা, মধ্যযুগীয় স্বামীর জন্যে প্রথাসিদ্ধ / ভক্তিতে আপনার কেটেছে জীবন। / বঙ্গীয় নারীর আবেগে আপনিও চেয়েছেন বুক জুড়ে পুত্রকন্যা, / আপনার মরদ বছরে একটা নতুন ঢাকাই / শাড়ি দিতে না পারলেও বছরে বছরে উপহার / দিয়েছেন আপনাকে একের পর এক কৃশকায় / রুগ্ন সন্তান, এবং তাতেই আপনার শুষ্ক বুক / ভাসিয়ে জেগেছে তিতাসের তীব্র জলের উচ্ছ্বাস।”
দ্বিতীয় স্তবকে বিবাহ ও সংসার জীবনের কথা বলা হয়েছে। ‘তারপর একদিন ভাঙা পালকিতে চেপে দিয়েছেন পাড়ি, আর এসে উঠেছেন আরেক গরিব ঘরে’ — ভাঙা পালকিতে চেপে বিয়ে করে আরেক গরিব ঘরে এসেছেন। ‘স্বামীর আদর হয়তো ভাগ্যে জুটেছে কখনো, তবে অনাদর জুটেছে অনেক’ — স্বামীর আদর খুব কম, অনাদর অনেক বেশি। ‘দারিদ্র্য, পীড়ন, খণ্ড প্রেম, ঘৃণা, মধ্যযুগীয় স্বামীর জন্যে প্রথাসিদ্ধ ভক্তিতে আপনার কেটেছে জীবন’ — দারিদ্র্য, পীড়ন, খণ্ড প্রেম, ঘৃণা, মধ্যযুগীয় স্বামীর প্রতি প্রথাসিদ্ধ ভক্তিতে জীবন কেটেছে। ‘বঙ্গীয় নারীর আবেগে আপনিও চেয়েছেন বুক জুড়ে পুত্রকন্যা’ — বাংলার নারীর মতো আপনিও পুত্রকন্যা চেয়েছেন। ‘আপনার মরদ বছরে একটা নতুন ঢাকাই শাড়ি দিতে না পারলেও বছরে বছরে উপহার দিয়েছেন আপনাকে একের পর এক কৃশকায় রুগ্ন সন্তান’ — স্বামী বছরে একটি ঢাকাই শাড়ি দিতে না পারলেও, আপনাকে উপহার দিয়েছেন একের পর এক কৃশকায় রুগ্ন সন্তান। ‘এবং তাতেই আপনার শুষ্ক বুক ভাসিয়ে জেগেছে তিতাসের তীব্র জলের উচ্ছ্বাস’ — সন্তানদের মধ্যেই আপনার শুষ্ক বুক ভাসিয়ে জেগেছে তিতাস নদীর তীব্র জলের উচ্ছ্বাস।
তৃতীয় স্তবক: পুত্রের প্রতি মায়ের স্বপ্ন
“চাঁদের সৌন্দর্য নয়, আমি জানি আপনাকে মুগ্ধ / আলোড়িত বিহ্বল করেছে সন্তানের স্নিগ্ধ মুখ, / আর দেহের জ্যোৎস্না। আপনিও চেয়েছেন জানি / আপনার পুত্র হবে সৎ, প্রকৃত মানুষ। / তাকে দারিদ্র্যের কঠোর কামড় টলাবে না সততার / পথ থেকে, তার মেরুদণ্ড হবে দৃঢ়,পীড়নে বা / প্রলোভনে সে কখনো বুটদের সেজদা করবে না।”
তৃতীয় স্তবকে পুত্রের প্রতি মায়ের স্বপ্নের কথা বলা হয়েছে। ‘চাঁদের সৌন্দর্য নয়, আমি জানি আপনাকে মুগ্ধ আলোড়িত বিহ্বল করেছে সন্তানের স্নিগ্ধ মুখ, আর দেহের জ্যোৎস্না’ — চাঁদের সৌন্দর্য নয়, সন্তানের স্নিগ্ধ মুখ ও দেহের জ্যোৎস্না আপনাকে মুগ্ধ করেছে। ‘আপনিও চেয়েছেন জানি আপনার পুত্র হবে সৎ, প্রকৃত মানুষ’ — আপনার পুত্র সৎ, প্রকৃত মানুষ হবে — এটাই চেয়েছেন। ‘তাকে দারিদ্র্যের কঠোর কামড় টলাবে না সততার পথ থেকে’ — দারিদ্র্যের কঠোর কামড় তাকে সততার পথ থেকে টলাতে পারবে না। ‘তার মেরুদণ্ড হবে দৃঢ়, পীড়নে বা প্রলোভনে সে কখনো বুটদের সেজদা করবে না’ — তার মেরুদণ্ড হবে দৃঢ়, পীড়নে বা প্রলোভনে সে কখনো বুটদের (শোষকদের) সেজদা করবে না।
চতুর্থ স্তবক: পুত্রের জন্য কামনা ও শিক্ষার অভাব
“আপনার উচ্চাভিলাষ থাকার তো কথা নয়, আপনি / আনন্দিত হতেন খুবই আপনার পুত্র যদি হতো / সৎ কৃষিজীবী, মেরুদণ্ডসম্পন্ন শ্রমিক, কিংবা / তিতাসের অপরাজেয় ধীবর। / আপনি উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারেন নি সন্তানকে;- এই পুঁজিবাদী / ব্যবস্থায় এটাই তো স্বাভাবিক, / এখানে মোহর ছাড়া কিছুই মেলে না, শিক্ষাও জোটে না।”
চতুর্থ স্তবকে পুত্রের জন্য কামনা ও শিক্ষার অভাবের কথা বলা হয়েছে। ‘আপনার উচ্চাভিলাষ থাকার তো কথা নয়’ — আপনার উচ্চাভিলাষ থাকার কথা নয়। ‘আপনি আনন্দিত হতেন খুবই আপনার পুত্র যদি হতো সৎ কৃষিজীবী, মেরুদণ্ডসম্পন্ন শ্রমিক, কিংবা তিতাসের অপরাজেয় ধীবর’ — আপনার পুত্র সৎ কৃষিজীবী, মেরুদণ্ডসম্পন্ন শ্রমিক, বা তিতাসের অপরাজেয় জেলে হলে আনন্দিত হতেন। ‘আপনি উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারেন নি সন্তানকে’ — আপনি সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারেননি। ‘এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এটাই তো স্বাভাবিক, এখানে মোহর ছাড়া কিছুই মেলে না, শিক্ষাও জোটে না’ — পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় টাকা ছাড়া কিছুই মেলে না, শিক্ষাও জোটে না।
পঞ্চম স্তবক: পুত্রের গোলামিতে পরিণতি
“তবে এতে আপনার কোনো ক্ষতি নেই জানি; / কারণ আপনি পুত্রের জন্যে কোনো রাজপদ, বা ও রকম কিছুই চান নি, / কেবল চেয়েছেন আপনার পুত্র হোক সৎ, মেরুদণ্ডী, প্রকৃত মানুষ। / আপনার সমস্ত পবিত্র প্রার্থনা ব্যর্থ ক’রে / বিশশতকের এই এলোমেলো অন্ধকারে আপনার পুত্র কী হয়েছে / আপনি কি তা জানেন তা, হে অদেখা দরিদ্র জননী? / কেনো আপনি পুত্রকে পাঠিয়েছিলেন মুঘলদের এই ক্ষয়িষ্ণু শহরে, / যেখানে কৃষক এসে লিপ্ত হয় পতিতার দালালিতে, / মাঠের রাখাল তার নদী আর মাঠ হ’য়ে ওঠে হাবশি গোলাম? / আপনি কি জানেন, মাতা, আপনার পুত্র শহরের / অন্যতম প্রসিদ্ধ গোলাম আজ?”
পঞ্চম স্তবকে পুত্রের গোলামিতে পরিণতির কথা বলা হয়েছে। ‘তবে এতে আপনার কোনো ক্ষতি নেই জানি; কারণ আপনি পুত্রের জন্যে কোনো রাজপদ, বা ও রকম কিছুই চান নি, কেবল চেয়েছেন আপনার পুত্র হোক সৎ, মেরুদণ্ডী, প্রকৃত মানুষ’ — আপনি পুত্রের জন্য রাজপদ চাননি, শুধু সৎ, মেরুদণ্ডী মানুষ চেয়েছিলেন। ‘আপনার সমস্ত পবিত্র প্রার্থনা ব্যর্থ করে বিশশতকের এই এলোমেলো অন্ধকারে আপনার পুত্র কী হয়েছে আপনি কি তা জানেন তা, হে অদেখা দরিদ্র জননী?’ — আপনার প্রার্থনা ব্যর্থ করে আপনার পুত্র কী হয়েছে জানেন? ‘কেন আপনি পুত্রকে পাঠিয়েছিলেন মুঘলদের এই ক্ষয়িষ্ণু শহরে, যেখানে কৃষক এসে লিপ্ত হয় পতিতার দালালিতে, মাঠের রাখাল তার নদী আর মাঠ হয়ে ওঠে হাবশি গোলাম?’ — কেন পুত্রকে মুঘলদের এই ক্ষয়িষ্ণু শহরে পাঠিয়েছিলেন? ‘আপনি কি জানেন, মাতা, আপনার পুত্র শহরের অন্যতম প্রসিদ্ধ গোলাম আজ?’ — আপনার পুত্র শহরের অন্যতম প্রসিদ্ধ গোলাম — জানেন কি?
ষষ্ঠ স্তবক: পুত্রের কুঁজ ও গোলামি
“আপনি এখন তাকে চিনতেও ব্যর্থ হবেন, / আপনার পুত্রের দিকে তাকালে এখন কোনো মস্তক পড়ে না চোখে, / শুধু একটা বিশাল কুঁজ চোখে পড়ে। / দশকে দশকে যতো স্বঘোষিত প্রভু দেখা দিয়েছেন মুঘলদের / এ-নষ্ট শহরে, আপনার পুত্র তাদের প্রত্যেকের / পদতলে মাথা ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে পৃষ্ঠদেশ জুড়ে / জন্মিয়েছে কুঁজ আর কুঁজ; আজ তার পৃষ্ঠদেশ / একগুচ্ছ কুঁজের সমষ্টি;- মরুভূমিতে কিম্ভুত / বহুকুঁজ উটের মতোই এখন দেখায় তাকে।”
ষষ্ঠ স্তবকে পুত্রের কুঁজ ও গোলামির কথা বলা হয়েছে। ‘আপনি এখন তাকে চিনতেও ব্যর্থ হবেন’ — এখন তাকে চিনতে ব্যর্থ হবেন। ‘আপনার পুত্রের দিকে তাকালে এখন কোনো মস্তক পড়ে না চোখে, শুধু একটা বিশাল কুঁজ চোখে পড়ে’ — তার মাথা দেখা যায় না, শুধু বিশাল কুঁজ দেখা যায়। ‘দশকে দশকে যতো স্বঘোষিত প্রভু দেখা দিয়েছেন মুঘলদের এ-নষ্ট শহরে, আপনার পুত্র তাদের প্রত্যেকের পদতলে মাথা ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে পৃষ্ঠদেশ জুড়ে জন্মিয়েছে কুঁজ আর কুঁজ’ — প্রতিটি প্রভুর পদতলে মাথা ঠেকিয়ে কুঁজ সৃষ্টি করেছে। ‘আজ তার পৃষ্ঠদেশ একগুচ্ছ কুঁজের সমষ্টি — মরুভূমিতে কিম্ভুত বহুকুঁজ উটের মতোই এখন দেখায় তাকে’ — তার পৃষ্ঠদেশ বহুকুঁজ উটের মতো।
সপ্তম স্তবক: পুত্রের অবক্ষয়
“সে এখন শহরের বিখ্যাত গোলাম মজলিশের / বিখ্যাত সদস্য, গোলামিতে সে ও তার ইয়ারেরা / এতোই দক্ষ যে প্রাচীন,ঐতিহাসিক গোলামদের / গৌরব হরণ ক’রে তারা আজ মশহুর গোলাম পৃথিবীর। / এখন সে মাথা তার তুলতে পারে না, / এমনকি ভুলেও গেছে যে একদা তারও একটি মাথা ছিলো, / এখন সে বহুশীর্ষ কুঁজটিকেই মাথা ব’লে ভাবে। / খাদ্যগ্রহণের পর স্বাভাবিক পদ্ধতিও বিস্মৃত হয়েছে সে, / প্রভুদের পাদুকার তলে প’ড়ে থাকা অন্ন চেটে খাওয়া ছাড়া / আর কিছুতেই পরিতৃপ্তি পায় না আপনার পুত্র, / একদা আপনার স্তন থেকে মধুদুগ্ধ শুষে নিয়ে জীবন ধারণ / করতো যে বালক বয়সে।”
সপ্তম স্তবকে পুত্রের অবক্ষয়ের কথা বলা হয়েছে। ‘সে এখন শহরের বিখ্যাত গোলাম মজলিশের বিখ্যাত সদস্য’ — সে এখন বিখ্যাত গোলাম মজলিশের সদস্য। ‘গোলামিতে সে ও তার ইয়াররা এতোই দক্ষ যে প্রাচীন, ঐতিহাসিক গোলামদের গৌরব হরণ করে তারা আজ মশহুর গোলাম পৃথিবীর’ — গোলামিতে এত দক্ষ যে প্রাচীন গোলামদের গৌরব হরণ করেছে। ‘এখন সে মাথা তার তুলতে পারে না, এমনকি ভুলেও গেছে যে একদা তারও একটি মাথা ছিলো, এখন সে বহুশীর্ষ কুঁজটিকেই মাথা বলে ভাবে’ — মাথা তুলতে পারে না, মাথা ছিলো ভুলে গেছে, কুঁজকেই মাথা ভাবে। ‘খাদ্যগ্রহণের পর স্বাভাবিক পদ্ধতিও বিস্মৃত হয়েছে সে, প্রভুদের পাদুকার তলে পড়ে থাকা অন্ন চেটে খাওয়া ছাড়া আর কিছুতেই পরিতৃপ্তি পায় না আপনার পুত্র’ — স্বাভাবিক খাওয়ার পদ্ধতি ভুলে গেছে, প্রভুদের পায়ের তলার অন্ন চেটে খেতে চায়।
অষ্টম স্তবক: পুত্রের শত্রুতা ও মায়ের জন্য দুঃখ
“এখন সে শত্রু পাখি ও নদীর, শত্রু মানুষের, এমন কি / সে আপনার স্তন্যেরও শত্রু। / তার জন্য দুঃখ করি না, / কতোই তো গোলাম দেখলাম এ-বদ্বীপে শতকে শতকে। / কিন্তু আপনার জন্যে, হে গরিব কৃষক-কন্যা, দুঃখী মাতা, / গরিব-গৃহিণী, আপনার জন্যে বড় বেশি দুঃখ পাই; / আপনার পুত্রের গোলামির বার্তা আজ رাষ্ট্র দিকে দিকে, / নিশ্চয়ই তা পৌঁছে গেছে তিতাসের / জলের গভীরে আর কুমড়োর খেতে, লাউয়ের মাঁচায়, / পাখির বাসা আর চাষীদের উঠানের কোণে।”
অষ্টম স্তবকে পুত্রের শত্রুতা ও মায়ের জন্য দুঃখের কথা বলা হয়েছে। ‘এখন সে শত্রু পাখি ও নদীর, শত্রু মানুষের, এমন কি সে আপনার স্তন্যেরও শত্রু’ — সে পাখির শত্রু, নদীর শত্রু, মানুষের শত্রু, এমনকি আপনার স্তন্যেরও শত্রু। ‘তার জন্য দুঃখ করি না, কতোই তো গোলাম দেখলাম এ-বদ্বীপে শতকে শতকে’ — তার জন্য দুঃখ করি না, অনেক গোলাম দেখেছি। ‘কিন্তু আপনার জন্যে, হে গরিব কৃষক-কন্যা, দুঃখী মাতা, গরিব-গৃহিণী, আপনার জন্যে বড় বেশি দুঃখ পাই’ — আপনার জন্যে বেশি দুঃখ পাই। ‘আপনার পুত্রের গোলামির বার্তা আজ রাষ্ট্র দিকে দিকে, নিশ্চয়ই তা পৌঁছে গেছে তিতাসের জলের গভীরে আর কুমড়োর খেতে, লাউয়ের মাঁচায়, পাখির বাসা আর চাষীদের উঠানের কোণে’ — আপনার পুত্রের গোলামির বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
নবম স্তবক: প্রকৃতির উপহাস ও মায়ের কলঙ্ক
“তিতাসের জল আপনাকে দেখলে ছলছল ক’রে ওঠে, / ‘ওই দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’; / মাঠে পাখি ডেকে ওঠে, ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’; / আপনার পালিত বেড়াল দুধের বাটি থেকে / دو-چوخ ফিরিয়ে বলে, ‘গোলামের গর্ভধারিণীর / হাতের দুগ্ধ রোচে না আমার জিভে’, / প্রতিবেশী পুরুষ-নারীরা অঙ্গুলি সংকেত ক’রে কলকণ্ঠে বলে, / ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে।’”
নবম স্তবকে প্রকৃতির উপহাস ও মায়ের কলঙ্কের কথা বলা হয়েছে। ‘তিতাসের জল আপনাকে দেখলে ছলছল করে ওঠে, ‘ওই দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’’ — তিতাসের জল ছলছল করে ওঠে, দেখো গোলামের গর্ভধারিণীকে। ‘মাঠে পাখি ডেকে ওঠে, ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’’ — পাখিও ডেকে ওঠে। ‘আপনার পালিত বেড়াল দুধের বাটি থেকে দু-চোখ ফিরিয়ে বলে, ‘গোলামের গর্ভধারিণীর হাতের দুগ্ধ রোচে না আমার জিভে’’ — আপনার পালিত বেড়াল দুধের বাটি থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। ‘প্রতিবেশী পুরুষ-নারীরা অঙ্গুলি সংকেত করে কলকণ্ঠে বলে, ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’’ — প্রতিবেশীরা আঙুল তুলে বলে, দেখো গোলামের গর্ভধারিণীকে।
দশম স্তবক: চিরন্তন কলঙ্ক ও শেষ প্রশ্ন
“এমন কি প্রার্থনার সময়ও আপনি হয়তো বাশুনতে পান / ‘গোলামের গর্ভধারিণী, ধারিণী’ স্বর ঘিরে ফেলছে চারদিক থেকে। / আপনি যখন অন্তিম বিশ্রাম নেবেন মাটির তলে তখনো হয়তো / মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলবে ঘাসফুল, বাতাসের কানে কানে ব’লে যাবে, / ‘এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক গর্ভধারিণী গোলামের。’ / ভিজে উঠবে মাটি ঠাণ্ডা কোমল অশ্রুতে। / কী দোষ আপনার? / মা কি কখনোও জানে দশমাস / ধ’রে যাকে সে ধারণ করছে সে মানুষ না গোলাম?”
দশম স্তবকে চিরন্তন কলঙ্ক ও শেষ প্রশ্নের কথা বলা হয়েছে। ‘এমন কি প্রার্থনার সময়ও আপনি হয়তো শুনতে পান ‘গোলামের গর্ভধারিণী, ধারিণী’ স্বর ঘিরে ফেলছে চারদিক থেকে’ — প্রার্থনার সময়ও আপনি শুনতে পান ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ স্বর। ‘আপনি যখন অন্তিম বিশ্রাম নেবেন মাটির তলে তখনো হয়তো মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলবে ঘাসফুল, বাতাসের কানে কানে বলে যাবে, ‘এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক গর্ভধারিণী গোলামের’’ — মৃত্যুর পরও ঘাসফুল বলে যাবে, এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক গর্ভধারিণী গোলামের। ‘ভিজে উঠবে মাটি ঠাণ্ডা কোমল অশ্রুতে’ — মাটি ভিজে উঠবে অশ্রুতে। ‘কী দোষ আপনার? মা কি কখনোও জানে দশমাস ধ’রে যাকে সে ধারণ করছে সে মানুষ না গোলাম?’ — আপনার কী দোষ? মা কি কখনো জানে দশমাস ধরে যাকে ধারণ করছে সে মানুষ না গোলাম?
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি দশটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে দরিদ্র জননীর পরিচয় ও শৈশব, দ্বিতীয় স্তবকে বিবাহ ও সংসার জীবন, তৃতীয় স্তবকে পুত্রের প্রতি মায়ের স্বপ্ন, চতুর্থ স্তবকে পুত্রের জন্য কামনা ও শিক্ষার অভাব, পঞ্চম স্তবকে পুত্রের গোলামিতে পরিণতি, ষষ্ঠ স্তবকে পুত্রের কুঁজ ও গোলামি, সপ্তম স্তবকে পুত্রের অবক্ষয়, অষ্টম স্তবকে পুত্রের শত্রুতা ও মায়ের জন্য দুঃখ, নবম স্তবকে প্রকৃতির উপহাস ও মায়ের কলঙ্ক, দশম স্তবকে চিরন্তন কলঙ্ক ও শেষ প্রশ্ন।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কথ্যরীতির কাছাকাছি, কিন্তু তীক্ষ্ণ ও প্রতীকাত্মক। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘বাঙলার মায়েরা’, ‘গরিব পিতার ঘরে’, ‘কুমড়ো ফুল’, ‘গরিবের ঘরে ফুল ভয়ের কারণ’, ‘ভাঙা পালকি’, ‘দারিদ্র্য, পীড়ন, খণ্ড প্রেম’, ‘মধ্যযুগীয় স্বামীর জন্যে প্রথাসিদ্ধ ভক্তি’, ‘কৃশকায় রুগ্ন সন্তান’, ‘তিতাসের তীব্র জলের উচ্ছ্বাস’, ‘সন্তানের স্নিগ্ধ মুখ’, ‘দেহের জ্যোৎস্না’, ‘দারিদ্র্যের কঠোর কামড়’, ‘মেরুদণ্ড দৃঢ়’, ‘বুটদের সেজদা করবে না’, ‘সৎ কৃষিজীবী, মেরুদণ্ডসম্পন্ন শ্রমিক, তিতাসের অপরাজেয় ধীবর’, ‘পুঁজিবাদী ব্যবস্থা’, ‘মোহর ছাড়া কিছুই মেলে না’, ‘বিশশতকের এলোমেলো অন্ধকার’, ‘মুঘলদের ক্ষয়িষ্ণু শহর’, ‘পতিতার দালালি’, ‘হাবশি গোলাম’, ‘বিশাল কুঁজ’, ‘পদতলে মাথা ঠেকিয়ে’, ‘বহুকুঁজ উট’, ‘গোলাম মজলিশ’, ‘মশহুর গোলাম’, ‘প্রভুদের পাদুকার তলে পড়ে থাকা অন্ন চেটে খাওয়া’, ‘শত্রু পাখি ও নদীর’, ‘আপনার স্তন্যেরও শত্রু’, ‘গোলামের গর্ভধারিণী’, ‘অঙ্গুলি সংকেত’, ‘ভিজে উঠবে মাটি ঠাণ্ডা কোমল অশ্রুতে’, ‘মা কি কখনো জানে দশমাস ধরে যাকে ধারণ করছে সে মানুষ না গোলাম’।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘কুমড়ো ফুল’ — ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য, গরিবের ঘরে কন্যা সন্তানের প্রতীক। ‘ভাঙা পালকি’ — দারিদ্র্যের বিবাহের প্রতীক। ‘তিতাসের তীব্র জলের উচ্ছ্বাস’ — জীবনের তীব্রতা, সন্তানের জন্মের আনন্দের প্রতীক। ‘মেরুদণ্ড’ — আত্মসম্মান, সততা, প্রতিরোধের শক্তির প্রতীক। ‘বুটদের সেজদা’ — শোষকদের কাছে আত্মসমর্পণের প্রতীক। ‘পুঁজিবাদী ব্যবস্থা’ — শোষণের কাঠামোর প্রতীক। ‘মুঘলদের ক্ষয়িষ্ণু শহর’ — আধুনিক শহর, শোষণের কেন্দ্রের প্রতীক। ‘কুঁজ’ — আত্মসমর্পণের চিহ্ন, গোলামির প্রতীক। ‘বহুকুঁজ উট’ — চরম আত্মসমর্পণের প্রতীক। ‘প্রভুদের পাদুকার তলে পড়ে থাকা অন্ন চেটে খাওয়া’ — আত্মসম্মানহীনতার চরম রূপের প্রতীক। ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ — মায়ের কলঙ্কের প্রতীক। ‘অঙ্গুলি সংকেত’ — সামাজিক উপহাসের প্রতীক। ‘ভিজে উঠবে মাটি’ — প্রকৃতির কান্নার প্রতীক।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ — নবম ও দশম স্তবকের পুনরাবৃত্তি মায়ের কলঙ্ক ও সামাজিক উপহাসকে জোরালো করে। ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে’ — প্রকৃতি ও সমাজের কণ্ঠের পুনরাবৃত্তি।
শেষের ‘মা কি কখনোও জানে দশমাস ধ’রে যাকে সে ধারণ করছে সে মানুষ না গোলাম?’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাপ্তি। মায়ের অপরাধ কোথায়? তিনি তো জানেন না যে তিনি গোলামের জন্ম দিচ্ছেন। এটি দার্শনিক প্রশ্ন — শোষণের দায় কার?
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“গোলামের গর্ভধারিণী” হুমায়ুন আজাদের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি এক দরিদ্র জননীর জীবনকাহিনী বর্ণনা করেছেন — যিনি গরিব পিতার ঘরে কুমড়ো ফুলের মতো ফুটেছিলেন, ভাঙা পালকিতে বিয়ে করে আরেক গরিব ঘরে এসেছিলেন। স্বামীর আদর জোটেনি, অনাদর জুটেছে অনেক। দারিদ্র্য, পীড়ন, খণ্ড প্রেম, ঘৃণা, মধ্যযুগীয় স্বামীর প্রতি প্রথাসিদ্ধ ভক্তিতে জীবন কেটেছে। বছরে বছরে উপহার পেয়েছেন একের পর এক কৃশকায় রুগ্ন সন্তান — এবং তাতেই শুষ্ক বুক ভাসিয়ে জেগেছে তিতাসের তীব্র জলের উচ্ছ্বাস।
তিনি চেয়েছিলেন পুত্র সৎ, প্রকৃত মানুষ হোক। তার মেরুদণ্ড দৃঢ় হোক, পীড়নে বা প্রলোভনে সে কখনো বুটদের সেজদা করবে না। তিনি উচ্চাভিলাষী ছিলেন না — পুত্র সৎ কৃষিজীবী, মেরুদণ্ডসম্পন্ন শ্রমিক, কিংবা তিতাসের অপরাজেয় ধীবর হলে আনন্দিত হতেন। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মোহর ছাড়া শিক্ষা জোটে না — তিনি পুত্রকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারেননি।
পুত্রকে পাঠিয়েছিলেন মুঘলদের ক্ষয়িষ্ণু শহরে। সেখানে কৃষক হয়ে ওঠে পতিতার দালাল, মাঠের রাখাল হয়ে ওঠে হাবশি গোলাম। আপনার পুত্র এখন শহরের অন্যতম প্রসিদ্ধ গোলাম। তার মাথা দেখা যায় না, শুধু বিশাল কুঁজ দেখা যায়। দশকে দশকে যতো স্বঘোষিত প্রভু দেখা দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের পদতলে মাথা ঠেকিয়ে পৃষ্ঠদেশ জুড়ে জন্মিয়েছে কুঁজ আর কুঁজ। এখন সে বহুকুঁজ উটের মতো।
সে এখন বিখ্যাত গোলাম মজলিশের সদস্য। প্রাচীন গোলামদের গৌরব হরণ করে আজ মশহুর গোলাম পৃথিবীর। মাথা তুলতে পারে না, ভুলে গেছে একদা মাথা ছিলো, এখন কুঁজকেই মাথা ভাবে। প্রভুদের পাদুকার তলে পড়ে থাকা অন্ন চেটে খাওয়া ছাড়া পরিতৃপ্তি পায় না।
এখন সে শত্রু পাখি ও নদীর, শত্রু মানুষের, এমনকি আপনার স্তন্যেরও শত্রু। তার জন্য দুঃখ করি না, অনেক গোলাম দেখেছি। কিন্তু আপনার জন্যে, গরিব কৃষক-কন্যা, দুঃখী মাতা, আপনার জন্যে বড় বেশি দুঃখ পাই। আপনার পুত্রের গোলামির বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে — তিতাসের জলের গভীরে, কুমড়োর খেতে, লাউয়ের মাঁচায়, পাখির বাসায়, চাষীদের উঠানের কোণে।
তিতাসের জল ছলছল করে ওঠে — ‘ওই দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে।’ পাখি ডেকে ওঠে — ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে।’ আপনার পালিত বেড়াল দুধের বাটি থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। প্রতিবেশীরা আঙুল তুলে বলে — ‘দ্যাখো গোলামের গর্ভধারিণীকে।’ প্রার্থনার সময়ও আপনি শুনতে পান ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ স্বর। আপনি যখন মাটির তলে বিশ্রাম নেবেন, তখনো মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলবে ঘাসফুল, বাতাস বলে যাবে — ‘এখানে ঘুমিয়ে আছেন এক গর্ভধারিণী গোলামের।’ ভিজে উঠবে মাটি ঠাণ্ডা কোমল অশ্রুতে।
কী দোষ আপনার? মা কি কখনো জানে দশমাস ধরে যাকে ধারণ করছে সে মানুষ না গোলাম?
এই কবিতা আমাদের শেখায় — শোষণের কাঠামো মায়ের স্বপ্নকে ভেঙে দেয়। একজন মা চেয়েছিলেন পুত্র সৎ, মেরুদণ্ডী মানুষ হোক। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, শহরের শোষণ, প্রভুদের পদতলে মাথা ঠেকানোর অভ্যাস — সব মিলিয়ে পুত্রকে গোলাম বানিয়ে দেয়। মায়ের অপরাধ কোথায়? তিনি তো জানেন না যে তিনি গোলামের জন্ম দিচ্ছেন। এটি দার্শনিক প্রশ্ন — শোষণের দায় কার? শোষিতের? নাকি শোষকের? নাকি শোষণের কাঠামোর?
হুমায়ুন আজাদের কবিতায় মাতৃত্ব, শোষণ ও গোলামি
হুমায়ুন আজাদের কবিতায় মাতৃত্ব, শোষণ ও গোলামি একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ কবিতায় দরিদ্র জননীর স্বপ্ন, পুত্রের গোলামিতে পরিণতি, এবং মায়ের চিরন্তন দুঃখকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — কীভাবে শোষণের কাঠামো মায়ের স্বপ্নকে ভেঙে দেয়, কীভাবে পুত্র গোলাম হয়ে যায়, কীভাবে মা কলঙ্কিত হয়।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে হুমায়ুন আজাদের ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের শোষণের কাঠামো, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রকৃতি, মাতৃত্বের বেদনা, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
গোলামের গর্ভধারিণী সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: গোলামের গর্ভধারিণী কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪)। তিনি একজন বাংলাদেশী কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ (১৯৮৩), ‘জ্বলো চিতা’ (১৯৮৬), ‘কবিতা সংগ্রহ’ (১৯৯০), ‘রান্নাঘরে নারীবাদী’ (২০০০), ‘সেই কবে থেকে’ (২০০৫), ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ (২০০৫), ‘আমাদের মা’ (২০০৫), ‘শুভেচ্ছা’ (২০০৫), ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ (২০০৫)।
প্রশ্ন ২: ‘গরিবের ঘরে ফুল ভয়েরই কারণ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গরিবের ঘরে ফুল (কন্যা সন্তান) ভয়ের কারণ — কারণ তাকে বিয়ে দিতে গিয়ে সংসার ধ্বংস হয়। এটি দারিদ্র্যের বাস্তবতা ও কন্যাশিশুর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক।
প্রশ্ন ৩: ‘বছরে বছরে উপহার দিয়েছেন আপনাকে একের পর এক কৃশকায় রুগ্ন সন্তান’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
স্বামী বছরে একটি ঢাকাই শাড়ি দিতে না পারলেও, আপনাকে উপহার দিয়েছেন একের পর এক কৃশকায় রুগ্ন সন্তান। এটি বিদ্রূপাত্মক — সন্তান জন্ম দেওয়াই ছিল মায়ের একমাত্র পুরস্কার, আর সেই সন্তান ছিল রুগ্ন, দুর্বল।
প্রশ্ন ৪: ‘তার মেরুদণ্ড হবে দৃঢ়, পীড়নে বা প্রলোভনে সে কখনো বুটদের সেজদা করবে না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মা চেয়েছিলেন পুত্রের মেরুদণ্ড দৃঢ় হোক, পীড়নে বা প্রলোভনে সে কখনো শোষকদের (বুটদের) কাছে মাথা নত করবে না। এটি মায়ের স্বপ্ন ও প্রতিরোধের চেতনার প্রতীক।
প্রশ্ন ৫: ‘পুত্রের দিকে তাকালে এখন কোনো মস্তক পড়ে না চোখে, শুধু একটা বিশাল কুঁজ চোখে পড়ে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পুত্রের মাথা দেখা যায় না, শুধু বিশাল কুঁজ দেখা যায়। এটি গোলামির চিহ্ন — বারবার মাথা নত করার ফলে পিঠে কুঁজ পড়েছে।
প্রশ্ন ৬: ‘প্রভুদের পাদুকার তলে পড়ে থাকা অন্ন চেটে খাওয়া ছাড়া আর কিছুতেই পরিতৃপ্তি পায় না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
পুত্র স্বাভাবিকভাবে খেতে পারে না, শুধু প্রভুদের পায়ের তলার অন্ন চেটে খেতে চায়। এটি আত্মসম্মানহীনতার চরম রূপ — গোলামি মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোকে বিকৃত করে দেয়।
প্রশ্ন ৭: ‘আপনার পালিত বেড়াল দুধের বাটি থেকে দু-চোখ ফিরিয়ে বলে, গোলামের গর্ভধারিণীর হাতের দুগ্ধ রোচে না আমার জিভে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মায়ের পালিত বেড়ালও তার হাতের দুধ পান করতে চায় না। এটি সামাজিক কলঙ্কের চরম রূপ — এমনকি গৃহপালিত প্রাণীও মাকে উপেক্ষা করে।
প্রশ্ন ৮: ‘মা কি কখনোও জানে দশমাস ধ’রে যাকে সে ধারণ করছে সে মানুষ না গোলাম?’ — এই পঙ্ক্তির তাৎপর্য কী?
এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী ও চূড়ান্ত প্রশ্ন। মায়ের অপরাধ কোথায়? তিনি তো জানেন না যে তিনি গোলামের জন্ম দিচ্ছেন। এটি দার্শনিক প্রশ্ন — শোষণের দায় কার? শোষিতের? নাকি শোষকের? নাকি শোষণের কাঠামোর?
প্রশ্ন ৯: কবিতায় ‘তিতাসের জল’ কী প্রতীক?
‘তিতাসের জল’ — তিতাস নদী বাংলাদেশের একটি নদী, যা গ্রামীণ জীবনের প্রতীক। এখানে এটি মায়ের স্বদেশ, তার শিকড়, তার পরিচয়ের প্রতীক। তিতাসের জল ছলছল করে ওঠে — প্রকৃতিও মায়ের দুঃখে কাঁদে।
প্রশ্ন ১০: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — শোষণের কাঠামো মায়ের স্বপ্নকে ভেঙে দেয়। একজন মা চেয়েছিলেন পুত্র সৎ, মেরুদণ্ডী মানুষ হোক। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, শহরের শোষণ, প্রভুদের পদতলে মাথা ঠেকানোর অভ্যাস — সব মিলিয়ে পুত্রকে গোলাম বানিয়ে দেয়। মায়ের অপরাধ কোথায়? তিনি তো জানেন না যে তিনি গোলামের জন্ম দিচ্ছেন। এটি দার্শনিক প্রশ্ন — শোষণের দায় কার? আজকের পৃথিবীতে — যেখানে এখনও শোষণ, দুর্নীতি, আত্মসমর্পণের সংস্কৃতি রয়েছে — এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম।
ট্যাগস: গোলামের গর্ভধারিণী, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ুন আজাদের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, মাতৃত্বের কবিতা, শোষণের বিরুদ্ধে কবিতা, গোলামির কবিতা, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কবিতা, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: হুমায়ুন আজাদ | কবিতার প্রথম লাইন: “আপনাকে দেখিনি আমি; তবে আপনি আমার অচেনা / নন পুরোপুরি, কারণ বাঙলার মায়েদের আমি মোটামুটি চিনি, জানি। / হয়তো গরিব পিতার ঘরেবেড়ে উঠেছেন দুঃখিনী বালিকারূপে ধীরেধীরে;” | শোষণ ও মাতৃত্বের কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন




