কেউ থাকে কেউ থাকে না – সাদাত হোসাইন।

পথ মানেই পথ পেরুবার ইচ্ছে থাকে
সদর দরোজা ডিঙিয়ে পথ, পথ পেরিয়ে ধুলো, ধুলো মাড়িয়ে খেত।
খেতের ধারে আলপথ,
আর থাকে বাড়ি ফেরার তাড়া।

সবার অবশ্য থাকে না-
যাদের ঘরে সানকিতে কাঁচা লঙ্কা আর সাদা ভাত দেয়ার কেউ নেই,
হাতপাখা নেই, জানালায় আলো নেই, কেরোসিন নেই,
নুন নেই, তেল নেই, দুখানা কাজল টানা চোখ নেই-তাদের অবশ্য বাড়ি ফেরার তাড়াও নেই।

তাদের আছে আলপথের পরে জলপথ, জলপথের পর কালপথ।
তারা সেসব মাড়িয়ে যায়। তাদের পিছু ফেরার তাড়া নেই।
তারা জানে, কেউ অপেক্ষায় নেই।
সলতে নেই, আলো নেই, চেয়ারের পায়া নেই,
বিছানায় একটা মাত্র বালিশ, সেখানে গল্প নেই।

তারা হেঁটে চলে-তাদের গন্তব্য নেই।
মেঠোপথজুড়ে তীব্র কাঁটা, তাদের অপেক্ষায় কেউ নেই।

তবুও বুকের ভেতর কোথাও হঠাৎ মনে হয়,
কেউ কি সত্যি নেই, নাকি আছে?

হয়তো অপেক্ষায় আঁচলের পাখা নাড়ছে,
সানকিতে ভাত বাড়ছে,
ভাঙা আয়নায় গভীর যত্নে কাজল আঁকছে চোখে।

তারা হঠাৎ সাহস করে পেছন ফেরে-
সেখানে কেউ আছে, কেউ নেই।
আসলে, কেউ থেকেও থাকে না,
কেউ না থেকেও থেকে যায়-সবটাজুড়ে।

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সাদাত হোসাইনের কবিতা।

কবিতার খাতা-

সাদাত হোসাইনের ‘কেউ থাকে কেউ থাকে না’ কবিতাটি মানুষের চরম একাকিত্ব, নিঃসঙ্গ জীবনযাত্রা এবং মনের কোণে পুষে রাখা চিরন্তন আশার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। কবি এখানে জীবনের পথচলা ও গন্তব্যের সমান্তরালে আশ্রয়হীন মানুষের ভেতরের শূন্যতা আর হাহাকারকে অত্যন্ত দরদি ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

কবিতার শুরুতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার একটি ছবি আঁকা হয়েছে, যেখানে পথ চলার সাথে সাথে ঘরে ফেরার এক টান থাকে। কিন্তু কবি পরক্ষণেই সেই বিষাদময় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করান, যেখানে সবার ঘরে ফেরার তাগিদ থাকে না। যাদের ঘরে ভালোবাসা, মমতা কিংবা ন্যূনতম জীবনধারণের উপকরণ নেই—নাই সানকিতে ভাত, নুন-তেল কিংবা কাজলটানা দুখানি চোখ—তাদের জন্য গৃহ আর আশ্রয় থাকে না। ফলে তাদের পথচলা আলপথ থেকে জলপথ পেরিয়ে কালপথের দিকে ধাবিত হয়, যেখানে কোনো গন্তব্য বা পিছুটানের তাগিদ নেই।

প্রদীপের সলতে কিংবা বালিশের পাশে গল্পহীন একাকী জীবনের এই করুণ ধূলিমলিন বাস্তবতার মাঝেও মানুষের মন এক চিরন্তন বুভুক্ষায় ভোগে। যত তীব্র একাকিত্বই থাক না কেন, বুকের অতল গভীরে কোথাও এক ক্ষীণ আশা উঁকি দেয়—সত্যিই কি কেউ নেই? হয়তো অবচেতনে কেউ আঁচল নাড়িয়ে অপেক্ষা করছে, ভাঙা আয়নায় চোখ সাজাচ্ছে। এই ক্ষণিকের অলৌকিক আশাই মানুষকে আকস্মিকভাবে থমকে দিয়ে পেছনে তাকাতে বাধ্য করে।

কবিতার শেষাংশে কবি জীবনের এক পরম সত্য ও দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত করেছেন। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায় সেখানে সত্যি কেউ আছে, আবার কেউ নেই। জীবনের এই জটিল রসায়নে কিছু মানুষ সমস্ত আয়োজন থাকা সত্ত্বেও আত্মিকভাবে অনুপস্থিত থাকে, আবার কোনো প্রিয় মানুষ বাস্তবে পাশে না থেকেও অস্তিত্বের সবটুকু জুড়ে সারাজীবন থেকে যায়।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x