কবিতার খাতা
- 34 mins
কিছু মনে নেই – আল মাহমুদ।
কাল আমি আমার মা’র সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি।
অদ্ভুত বৃদ্ধা। একদা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সম্ভবত
এখন বিশ্বাস হতে চায় না। যখন মিটমিট করে
আমাকে দেখলেন। আমার গরম লাগছিল।
আমি বললাম, চলো মা আমরা একটু চা খাই,
বুড়ি হেসে তসবীহ টিপতে লাগলেন,
তোর যেখানে জন্ম হয়েছিলো, মনে আছে?
নিম গাছের নীচে ছনের চালায়। সে রাতে
আমাদের একফোঁটা চা-ও ছিলো না।
আমি কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললাম,
না মা, কিছু মনে নেই।
পেঁচার ডাকে আমার ভয়, এদিকে তোর কান্না
ঘরে নেই পুরুষ। তোর বাপ গেছে চরের ধান
পাহারা দিতে। কে-যেন আজান হাঁকলো
হাজী শরিয়তের মত গলা। ধাই মেয়ে
তোকে দোলাতে দোলাতে বললো,—
বল লেংটা তুই কোন মসজিদে যাবি?—
মনে আছে?
না মা, আমাদের কাপ জুড়িয়ে
পানি হয়ে গেল যে!
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। আল মাহমুদ।
কিছু মনে নেই – আল মাহমুদ | কিছু মনে নেই কবিতা আল মাহমুদ | আল মাহমুদের কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | মা ও স্মৃতির কবিতা | বিস্মৃতির কবিতা | বৃদ্ধ মায়ের কবিতা | বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
কিছু মনে নেই: আল মাহমুদের মা, দারিদ্র্য, স্মৃতি ও বিস্মৃতির অসাধারণ কাব্যভাষা
আল মাহমুদের “কিছু মনে নেই” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য ও হৃদয়গ্রাহী কবিতা। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত এই কবিতাটি মায়ের সঙ্গে এক চা-পানের আড্ডায় অতীতের স্মৃতি, জন্মের কথা, দারিদ্র্যের চিত্র, এবং শেষ পর্যন্ত ‘কিছু মনে নেই’ বলার মাধ্যমে বিস্মৃতি ও বেদনার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। “কাল আমি আমার মা’র সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি। / অদ্ভুত বৃদ্ধা। একদা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সম্ভবত / এখন বিশ্বাস হতে চায় না। যখন মিটমিট করে / আমাকে দেখলেন। আমার গরম লাগছিল। / আমি বললাম, চলো মা আমরা একটু চা খাই, / বুড়ি হেসে তসবীহ টিপতে লাগলেন, / তোর যেখানে জন্ম হয়েছিলো, মনে আছে? / নিম গাছের নীচে ছনের চালায়। সে রাতে / আমাদের একফোঁটা চা-ও ছিলো না। / আমি কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললাম, / না মা, কিছু মনে নেই।” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে মায়ের সঙ্গে কবির কথোপকথন, অতীতের স্মৃতি, দারিদ্র্যের কথা, জন্মের রাতের কথা, এবং শেষ পর্যন্ত কবির ‘কিছু মনে নেই’ বলার মাধ্যমে বিস্মৃতি ও বেদনার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের একজন প্রধান বাংলা কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও বিষয়বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। “কিছু মনে নেই” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি মায়ের সঙ্গে এক চা-পানের আড্ডায় অতীতের স্মৃতি, জন্মের কথা, দারিদ্র্যের কথা, এবং শেষ পর্যন্ত বিস্মৃতির ভানকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
আল মাহমুদ: বিদ্রোহ, বিষাদ ও ভাষার কবি
আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম পুরোধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ — সব সময়েই তিনি প্রতিরোধের কবিতা লিখেছেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘লোক লোকান্তর’ (১৯৬৩), ‘কালের কলস’ (১৯৬৬), ‘সোনালী কাবিন’ (১৯৭৩), ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ (১৯৭৬), ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ (১৯৮৩), ‘নদীর ভেতরে নদী’ (১৯৮৮), ‘আমি আর আসবো না বলে’ (১৯৯০), ‘কিছু মনে নেই’ (১৯৯৫) সহ আরও অসংখ্য গ্রন্থ। তিনি ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলা সাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
আল মাহমুদের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রেম, মৃত্যু, অস্তিত্বগত সংকট, এবং গ্রামীণ ও নগর জীবনের দ্বন্দ্ব। তাঁর কবিতায় মাতৃত্ব, দারিদ্র্য, স্মৃতি ও বিস্মৃতি গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। ‘কিছু মনে নেই’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
কিছু মনে নেই: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘কিছু মনে নেই’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একটি অস্বীকার, একটি বিস্মৃতি, একটি আত্মগোপন, একটি বেদনা লুকানোর কৌশল। কবি মায়ের সঙ্গে চা খেতে বসেছেন। মা অতীতের স্মৃতি তুলে ধরছেন — তাঁর জন্মের কথা, নিম গাছের নীচে ছনের চালার কথা, সে রাতে একফোঁটা চাও না থাকার কথা। কবি বারবার বলছেন — না মা, কিছু মনে নেই। কিন্তু পাঠক বুঝতে পারেন, তিনি সব মনে রেখেছেন। সেই দারিদ্র্য, সেই কষ্ট, সেই জন্মের রাত — সব মনে আছে। কিন্তু তিনি বলছেন ‘কিছু মনে নেই’ — সম্ভবত মাকে কষ্ট দিতে চান না, অথবা নিজের বেদনা লুকিয়ে রাখতে চান, অথবা সময়ের ক্ষয়কে মেনে নিতে চান।
কবিতার পটভূমি গ্রামীণ বাংলাদেশ। নিম গাছের নীচে ছনের চালা — এটি গ্রামের দরিদ্র পরিবারের ঘরের চিত্র। ‘চরের ধান পাহারা দেওয়া’ — নদীর চরে ধান চাষ করা, যা গ্রামীণ জীবনের অংশ। ‘আজান হাঁকলো’ — জন্মের সময় ধর্মীয় আওয়াজ। ‘হাজী শরিয়তের মত গলা’ — হাজী শরিয়ত ছিলেন একজন বিখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। ‘ধাই মেয়ে’ — ধাত্রী, যে শিশুর জন্মে সাহায্য করে। ‘লেংটা’ — নগ্ন শিশু। ‘কোন মসজিদে যাবি?’ — জন্মের সময় শিশুর ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্ন।
কবি শুরুতে বলছেন — কাল আমি আমার মা’র সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি। অদ্ভুত বৃদ্ধা। একদা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সম্ভবত এখন বিশ্বাস হতে চায় না। যখন মিটমিট করে আমাকে দেখলেন। আমার গরম লাগছিল। আমি বললাম, চলো মা আমরা একটু চা খাই। বুড়ি হেসে তসবীহ টিপতে লাগলেন।
মা বললেন — তোর যেখানে জন্ম হয়েছিলো, মনে আছে? নিম গাছের নীচে ছনের চালায়। সে রাতে আমাদের একফোঁটা চাও ছিলো না। কবি কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন — না মা, কিছু মনে নেই।
মা আবার বললেন — পেঁচার ডাকে আমার ভয়, এদিকে তোর কান্না। ঘরে নেই পুরুষ। তোর বাপ গেছে চরের ধান পাহারা দিতে। কে-যেন আজান হাঁকলো হাজী শরিয়তের মত গলা। ধাই মেয়ে তোকে দোলাতে দোলাতে বললো, — বল লেংটা তুই কোন মসজিদে যাবি? — মনে আছে?
কবি বললেন — না মা, আমাদের কাপ জুড়িয়ে পানি হয়ে গেল যে!
কিছু মনে নেই: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: মায়ের সঙ্গে দেখা ও চা খাওয়ার প্রস্তাব
“কাল আমি আমার মা’র সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি। / অদ্ভুত বৃদ্ধা। একদা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সম্ভবত / এখন বিশ্বাস হতে চায় না। যখন মিটমিট করে / আমাকে দেখলেন। আমার গরম লাগছিল। / আমি বললাম, চলো মা আমরা একটু চা খাই, / বুড়ি হেসে তসবীহ টিপতে লাগলেন,”
প্রথম স্তবকে কবি মায়ের সঙ্গে দেখা ও চা খাওয়ার প্রস্তাবের কথা বলছেন। ‘কাল আমি আমার মা’র সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি’ — গতকাল মায়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছেন। ‘অদ্ভুত বৃদ্ধা। একদা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সম্ভবত এখন বিশ্বাস হতে চায় না’ — অদ্ভুত বৃদ্ধা, একসময় তাকে জন্ম দিয়েছিলেন, সম্ভবত এখন বিশ্বাস হতে চায় না (বৃদ্ধ বয়সে দৃষ্টি অস্পষ্ট, স্মৃতি ক্ষীণ)। ‘যখন মিটমিট করে আমাকে দেখলেন’ — যখন মিটমিট করে (অস্পষ্ট দৃষ্টিতে, চোখ কুঁচকে) তাকে দেখলেন। ‘আমার গরম লাগছিল’ — তার গরম লাগছিল (সম্ভবত আবহাওয়ার কারণে, অথবা মানসিক উত্তাপ)। ‘আমি বললাম, চলো মা আমরা একটু চা খাই’ — তিনি বললেন, চলো মা আমরা একটু চা খাই। ‘বুড়ি হেসে তসবীহ টিপতে লাগলেন’ — বুড়ি হেসে তসবীহ (জপমালা) টিপতে লাগলেন (মায়ের ধর্মপ্রাণতা ও শান্ত স্বভাবের ইঙ্গিত)।
দ্বিতীয় স্তবক: জন্মের কথা ও দারিদ্র্যের স্মৃতি
“তোর যেখানে জন্ম হয়েছিলো, মনে আছে? / নিম গাছের নীচে ছনের চালায়। সে রাতে / আমাদের একফোঁটা চা-ও ছিলো না। / আমি কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললাম, / না মা, কিছু মনে নেই।”
দ্বিতীয় স্তবকে কবি জন্মের কথা ও দারিদ্র্যের স্মৃতির কথা বলছেন। ‘তোর যেখানে জন্ম হয়েছিলো, মনে আছে?’ — তোর যেখানে জন্ম হয়েছিলো, মনে আছে? (মায়ের প্রশ্ন) ‘নিম গাছের নীচে ছনের চালায়’ — নিম গাছের নীচে ছনের চালায়। ‘সে রাতে আমাদের একফোঁটা চা-ও ছিলো না’ — সে রাতে আমাদের এক ফোঁটা চাও ছিল না (চরম দারিদ্র্যের চিত্র)। ‘আমি কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললাম, না মা, কিছু মনে নেই’ — তিনি কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, না মা, কিছু মনে নেই (কাপ নামিয়ে রাখা — চা খাওয়ার ভঙ্গি, কথার ফাঁক দেওয়া)।
তৃতীয় স্তবক: জন্মরাতের ভয় ও আজানের স্মৃতি
“পেঁচার ডাকে আমার ভয়, এদিকে তোর কান্না / ঘরে নেই পুরুষ। তোর বাপ গেছে চরের ধান / পাহারা দিতে। কে-যেন আজান হাঁকলো / হাজী শরিয়তের মত গলা। ধাই মেয়ে / তোকে দোলাতে দোলাতে বললো,— / বল লেংটা তুই কোন মসজিদে যাবি?— / মনে আছে?”
তৃতীয় স্তবকে কবি জন্মরাতের ভয় ও আজানের স্মৃতির কথা বলছেন। ‘পেঁচার ডাকে আমার ভয়, এদিকে তোর কান্না’ — পেঁচার ডাকে ভয়, অন্যদিকে তোর কান্না। ‘ঘরে নেই পুরুষ। তোর বাপ গেছে চরের ধান পাহারা দিতে’ — ঘরে পুরুষ নেই, তোর বাপ চরের ধান পাহারা দিতে গেছে (রাতে চরের ধান চুরি থেকে রক্ষা করতে)। ‘কে-যেন আজান হাঁকলো হাজী শরিয়তের মত গলা’ — কে যেন আজান হাঁকলো হাজী শরিয়তের (বিখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব) মত গলায়। ‘ধাই মেয়ে তোকে দোলাতে দোলাতে বললো,— বল লেংটা তুই কোন মসজিদে যাবি?’ — ধাই মেয়ে (ধাত্রী) তোকে দোলাতে দোলাতে বললো — বল লেংটা (নগ্ন, শিশু) তুই কোন মসজিদে যাবি? (জন্মের সময় শিশুর ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্ন) ‘মনে আছে?’ — মনে আছে?
চতুর্থ স্তবক: কাপ জুড়িয়ে পানির কথা
“না মা, আমাদের কাপ জুড়িয়ে / পানি হয়ে গেল যে!”
চতুর্থ স্তবকে কবি কাপ জুড়িয়ে পানির কথা বলছেন। ‘না মা, আমাদের কাপ জুড়িয়ে পানি হয়ে গেল যে!’ — না মা, আমাদের কাপ জুড়িয়ে (ঠান্ডা হয়ে) পানি হয়ে গেল যে! এটি চা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার কথা — কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সময়ের ক্ষয়, কথার শেষ, বিস্মৃতি, এবং বেদনা লুকানোর কৌশল।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত। প্রথম স্তবকে মায়ের সঙ্গে দেখা ও চা খাওয়ার প্রস্তাব, দ্বিতীয় স্তবকে জন্মের কথা ও দারিদ্র্যের স্মৃতি, তৃতীয় স্তবকে জন্মরাতের ভয় ও আজানের স্মৃতি, চতুর্থ স্তবকে কাপ জুড়িয়ে পানির কথা।
ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, কথ্যরীতির কাছাকাছি, কিন্তু গভীর আবেগে পরিপূর্ণ। তিনি ব্যবহার করেছেন — ‘অদ্ভুত বৃদ্ধা’, ‘মিটমিট করে’, ‘গরম লাগছিল’, ‘তসবীহ টিপতে লাগলেন’, ‘নিম গাছের নীচে ছনের চালায়’, ‘একফোঁটা চাও ছিলো না’, ‘কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে’, ‘কিছু মনে নেই’, ‘পেঁচার ডাকে ভয়’, ‘ঘরে নেই পুরুষ’, ‘চরের ধান পাহারা দিতে’, ‘আজান হাঁকলো’, ‘হাজী শরিয়তের মত গলা’, ‘ধাই মেয়ে’, ‘লেংটা’, ‘কোন মসজিদে যাবি’, ‘কাপ জুড়িয়ে পানি হয়ে গেল’।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘নিম গাছের নীচে ছনের চালা’ — দারিদ্র্য, গ্রামীণ জীবন, জন্মের স্থান। ‘একফোঁটা চাও ছিলো না’ — চরম দারিদ্র্য। ‘কিছু মনে নেই’ — বিস্মৃতি, বেদনা লুকানো, আত্মগোপন। ‘পেঁচার ডাকে ভয়’ — জন্মরাতের আতঙ্ক, অন্ধকারের ভয়। ‘ঘরে নেই পুরুষ’ — অসহায়তা। ‘চরের ধান পাহারা দিতে’ — গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, সংগ্রাম। ‘আজান হাঁকলো’ — জন্মের সময় ধর্মীয় আওয়াজ, নামকরণের প্রস্তুতি। ‘হাজী শরিয়তের মত গলা’ — গভীর, কর্কশ, প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। ‘ধাই মেয়ে’ — ধাত্রী, সন্তান প্রসবে সাহায্যকারী। ‘লেংটা’ — শিশু, অরক্ষিত অবস্থা, নির্দোষতা। ‘কোন মসজিদে যাবি’ — ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন। ‘কাপ জুড়িয়ে পানি হয়ে গেল’ — সময়ের ক্ষয়, কথার শেষ, বিস্মৃতি, বেদনা লুকানোর কৌশল।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘মনে আছে?’ — মায়ের প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি (প্রথমবার জন্মের স্থান নিয়ে, দ্বিতীয়বার জন্মরাতের ঘটনা নিয়ে)। ‘না মা, কিছু মনে নেই’ — কবির উত্তরের পুনরাবৃত্তি (প্রথমবার স্পষ্ট, দ্বিতীয়বার পরোক্ষভাবে কাপের কথা বলে)।
সংলাপের ফরম্যাট কবিতাটিকে নাটকীয় ও জীবন্ত করে তুলেছে। মায়ের প্রশ্ন, কবির উত্তর — এই সংলাপের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের গভীরতা, দারিদ্র্যের স্মৃতি, এবং বিস্মৃতির ভান ফুটে উঠেছে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“কিছু মনে নেই” আল মাহমুদের এক অসাধারণ সৃষ্টি। কবি মায়ের সঙ্গে চা খেতে বসেছেন। মা অদ্ভুত বৃদ্ধা, যিনি একসময় তাকে জন্ম দিয়েছিলেন, এখন সম্ভবত বিশ্বাস হতে চায় না। তিনি মিটমিট করে তাকে দেখেন। কবি বলেন — চলো মা আমরা একটু চা খাই। বুড়ি হেসে তসবীহ টিপতে থাকেন।
মা অতীতের স্মৃতি তুলে ধরেন — তোর যেখানে জন্ম হয়েছিলো, মনে আছে? নিম গাছের নীচে ছনের চালায়। সে রাতে আমাদের একফোঁটা চাও ছিলো না। কবি কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলেন — না মা, কিছু মনে নেই।
মা আবার বলেন — পেঁচার ডাকে আমার ভয়, এদিকে তোর কান্না। ঘরে নেই পুরুষ। তোর বাপ গেছে চরের ধান পাহারা দিতে। কে-যেন আজান হাঁকলো হাজী শরিয়তের মত গলা। ধাই মেয়ে তোকে দোলাতে দোলাতে বললো — বল লেংটা তুই কোন মসজিদে যাবি? — মনে আছে?
কবি বলেন — না মা, আমাদের কাপ জুড়িয়ে পানি হয়ে গেল যে!
এই কবিতা আমাদের শেখায় — মায়ের স্মৃতি চিরন্তন। তিনি তার সন্তানের জন্মের প্রতিটি মুহূর্ত মনে রাখেন — নিম গাছের নীচে ছনের চালা, একফোঁটা চাও না থাকা, পেঁচার ডাকে ভয়, স্বামীর অনুপস্থিতি, আজানের আওয়াজ, ধাই মেয়ের কথা। কিন্তু সন্তান বলে — কিছু মনে নেই। কেন? সম্ভবত মাকে কষ্ট দিতে চান না, অথবা নিজের বেদনা লুকিয়ে রাখতে চান, অথবা সময়ের ক্ষয়কে মেনে নিতে চান। শেষ পর্যন্ত কাপ জুড়িয়ে পানি হয়ে যায় — সময় ফুরিয়ে যায়, কথা ফুরিয়ে যায়, চা ঠান্ডা হয়ে যায়। কিন্তু সেই ঠান্ডা চায়ের মধ্যেও লুকিয়ে আছে দারিদ্র্যের স্মৃতি, মাতৃত্বের গভীরতা, এবং বিস্মৃতির ভান। এটি মাতৃত্ব, দারিদ্র্য, স্মৃতি ও বিস্মৃতির এক অসাধারণ কাব্যচিত্র।
আল মাহমুদের কবিতায় মা, দারিদ্র্য ও স্মৃতি
আল মাহমুদের কবিতায় মা একটি পুনরাবৃত্ত চরিত্র। তিনি মায়ের দারিদ্র্য, মায়ের কষ্ট, মায়ের স্মৃতিশক্তি, এবং নিজের বিস্মৃতির ভানকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘কিছু মনে নেই’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
তাঁর কবিতায় ‘নিম গাছের নীচে ছনের চালা’ একটি কেন্দ্রীয় প্রতীক — যা দারিদ্র্য, গ্রামীণ জীবন, জন্মের স্থানের প্রতীক। ‘চরের ধান পাহারা দেওয়া’ — গ্রামীণ জীবনের সংগ্রামের প্রতীক। ‘আজান’ — ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক। ‘কাপ জুড়িয়ে পানি হয়ে গেল’ — সময়ের ক্ষয়, বিস্মৃতির প্রতীক।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে আল মাহমুদের ‘কিছু মনে নেই’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের মাতৃত্ব, দারিদ্র্য, স্মৃতি ও বিস্মৃতি, সংলাপের ফরম্যাটে কবিতা রচনার কৌশল, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
কিছু মনে নেই সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: কিছু মনে নেই কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯)। তিনি বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের একজন প্রধান বাংলা কবি, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘লোক লোকান্তর’ (১৯৬৩), ‘কালের কলস’ (১৯৬৬), ‘সোনালী কাবিন’ (১৯৭৩), ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ (১৯৭৬), ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ (১৯৮৩), ‘নদীর ভেতরে নদী’ (১৯৮৮), ‘আমি আর আসবো না বলে’ (১৯৯০), ‘কিছু মনে নেই’ (১৯৯৫) [citation:1][citation:2]।
প্রশ্ন ২: ‘অদ্ভুত বৃদ্ধা। একদা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সম্ভবত / এখন বিশ্বাস হতে চায় না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মা অদ্ভুত বৃদ্ধা। তিনি একসময় কবিকে জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন হয়তো বিশ্বাস হতে চায় না যে এই ছেলেটি তারই সন্তান — কারণ তিনি বৃদ্ধ, দৃষ্টি অস্পষ্ট (মিটমিট করে দেখা), স্মৃতি ক্ষীণ। এটি বার্ধক্যের বাস্তব চিত্র।
প্রশ্ন ৩: ‘মিটমিট করে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘মিটমিট করা’ — চোখ কুঁচকে অস্পষ্ট দৃষ্টিতে তাকানো। এটি বৃদ্ধ মায়ের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হওয়ার ইঙ্গিত। তিনি ঠিকমতো চিনতে পারছেন না যে তাঁর সামনে বসা ব্যক্তি তাঁরই ছেলে।
প্রশ্ন ৪: ‘বুড়ি হেসে তসবীহ টিপতে লাগলেন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মা হেসে তসবীহ (জপমালা) টিপতে লাগলেন। এটি মায়ের ধর্মপ্রাণতা, শান্ত স্বভাব, এবং চা খাওয়ার প্রস্তাবে সন্তুষ্টির ইঙ্গিত। ‘তসবীহ টিপতে লাগলেন’ — অর্থাৎ তিনি আল্লাহর জপ করছেন, ধর্মীয় রুটিনে মগ্ন।
প্রশ্ন ৫: ‘তোর যেখানে জন্ম হয়েছিলো, মনে আছে? / নিম গাছের নীচে ছনের চালায়’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মা কবির জন্মের স্থানের কথা জিজ্ঞেস করছেন — নিম গাছের নীচে ছনের চালায়। এটি গ্রামীণ দারিদ্র্যের চিত্র। ছনের চালা সাধারণ মানুষের ঘর, নিম গাছ গ্রামের সাধারণ গাছ।
প্রশ্ন ৬: ‘সে রাতে / আমাদের একফোঁটা চা-ও ছিলো না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কবির জন্মের রাতে তাদের এক ফোঁটা চাও ছিল না। এটি চরম দারিদ্র্যের চিত্র। চা তখন বিলাসিতা ছিল, দরিদ্র মানুষের কাছে তা দুর্লভ।
প্রশ্ন ৭: ‘না মা, কিছু মনে নেই’ — কবি কেন বারবার এই কথা বলছেন?
কবি বারবার বলছেন ‘কিছু মনে নেই’। কিন্তু পাঠক বুঝতে পারেন, তিনি সব মনে রেখেছেন। তিনি সম্ভবত মাকে কষ্ট দিতে চান না (মাকে বলতে চান না যে তিনি দারিদ্র্যের স্মৃতি মনে রেখেছেন), অথবা নিজের বেদনা লুকিয়ে রাখতে চান, অথবা সময়ের ক্ষয়কে মেনে নিতে চান।
প্রশ্ন ৮: ‘পেঁচার ডাকে আমার ভয়, এদিকে তোর কান্না’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
জন্মরাতে পেঁচার ডাকে মায়ের ভয়, আর কবির কান্না। পেঁচা গ্রামীণ সংস্কৃতিতে অশুভের প্রতীক। এটি জন্মরাতের আতঙ্কের চিত্র।
প্রশ্ন ৯: ‘ঘরে নেই পুরুষ। তোর বাপ গেছে চরের ধান / পাহারা দিতে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
জন্মরাতে ঘরে পুরুষ নেই, বাবা চরের ধান পাহারা দিতে গেছেন। চর নদীর ভাঙা-গড়া জমি, যেখানে ধান চাষ করা হয়। রাতে ধান চুরি থেকে রক্ষা করতে পাহারা দেওয়া গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা।
প্রশ্ন ১০: ‘কে-যেন আজান হাঁকলো / হাজী শরিয়তের মত গলা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
জন্মরাতে কে যেন হাজী শরিয়তের মত গলায় আজান দিল। হাজী শরিয়ত ছিলেন একজন বিখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, তাঁর গলা ছিল কর্কশ ও প্রভাবশালী। এটি জন্মের সময় ধর্মীয় আওয়াজের প্রতীক।
প্রশ্ন ১১: ‘ধাই মেয়ে / তোকে দোলাতে দোলাতে বললো,— / বল লেংটা তুই কোন মসজিদে যাবি?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ধাত্রী মেয়ে কবিকে দোলাতে দোলাতে জিজ্ঞেস করল — লেংটা (নগ্ন শিশু) তুই কোন মসজিদে যাবি? এটি জন্মের সময় শিশুর ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্ন। ‘লেংটা’ শব্দটি শিশুর অরক্ষিত, নির্দোষ অবস্থাকে নির্দেশ করে।
প্রশ্ন ১২: ‘না মা, আমাদের কাপ জুড়িয়ে / পানি হয়ে গেল যে!’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
কাপ জুড়িয়ে পানি হয়ে গেল — চা ঠান্ডা হয়ে গেল। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সময়ের ক্ষয়, কথার শেষ, বিস্মৃতি, এবং বেদনা লুকানোর কৌশল। তিনি মায়ের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে অন্য কথা বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন ১৩: কবিতার মূল শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা কী?
কবিতাটি আমাদের শেখায় — মায়ের স্মৃতি চিরন্তন। তিনি তার সন্তানের জন্মের প্রতিটি মুহূর্ত মনে রাখেন — নিম গাছের নীচে ছনের চালা, একফোঁটা চাও না থাকা, পেঁচার ডাকে ভয়, স্বামীর অনুপস্থিতি, আজানের আওয়াজ, ধাই মেয়ের কথা। কিন্তু সন্তান বলে — কিছু মনে নেই। কেন? সম্ভবত মাকে কষ্ট দিতে চান না, অথবা নিজের বেদনা লুকিয়ে রাখতে চান, অথবা সময়ের ক্ষয়কে মেনে নিতে চান। শেষ পর্যন্ত কাপ জুড়িয়ে পানি হয়ে যায় — সময় ফুরিয়ে যায়, কথা ফুরিয়ে যায়। এটি মাতৃত্ব, দারিদ্র্য, স্মৃতি ও বিস্মৃতির এক অসাধারণ কাব্যচিত্র। আজকের পৃথিবীতে — যেখানে মা-ছেলের সম্পর্ক প্রায়ই দূরবর্তী হয়ে যায়, সময় কম হয়, স্মৃতি ম্লান হয় — এই কবিতা মায়ের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের মূল্য, দারিদ্র্যের স্মৃতি, এবং বিস্মৃতির ভানের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ট্যাগস: কিছু মনে নেই, আল মাহমুদ, আল মাহমুদের কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, মা ও স্মৃতির কবিতা, বিস্মৃতির কবিতা, বৃদ্ধ মায়ের কবিতা, দারিদ্র্যের কবিতা, গ্রামীণ জীবনের কবিতা, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ, আল মাহমুদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, মাতৃত্বের কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: আল মাহমুদ | কবিতার প্রথম লাইন: “কাল আমি আমার মা’র সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি। / অদ্ভুত বৃদ্ধা। একদা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। সম্ভবত / এখন বিশ্বাস হতে চায় না।” | মা ও স্মৃতির কবিতা বিশ্লেষণ | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন






