কলেজের ছাত্রী রবীন্দ্রনাথকে-সুবোধ সরকার।

আমার সঙ্গে আমার বাবার সম্পর্ক খারাপ
আপনার জন্য।
কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে উঠেই আমি বুঝতে পারি,
জীবনটা মাধ্যমিক পরীক্ষা নয়।
ঈশান থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত একটা বিরাট আয়না
তাতে খাদ্য এবং খাদকের মুখ।
কিন্তু, দুজনের একজনও জানেনা
কে খাবে আর কে খেতে দেবে।

হ্যাঁ, আপনি—- আপনিই সেই গীতবিতানের লেখক
আমার মতো অজস্র মেয়েকে আপনি আকাশ দিয়েছেন,
হেমন্ত দিয়েছেন, শ্রাবণ দিয়েছেন
কিন্তু, আপনি যেমন দিয়েছেন, নিয়েছেনও তেমনি।
তবে নিন, আরও নিন—- আরও,আরও
আপনি যতো নেবেন, আমি তত ভাল থাকবো।
আমাকে নিংড়ে নিন।
আমাকে আমার বাবা বোঝেননি।
আপনার আকাশ তাই আমার আকাশ।
আপনি আমাকে কখনও ভুল বুঝবেন না তো?

কলেজে ঢুকতেই, একটি চমৎকার ছেলে
এসে দাঁড়িয়েছিল আমার চৌকাঠে।
দুটো স্বপ্নের চোখ, এলোমেলো চুল
হাতে পেঙ্গুইন পেপার ব্যাক,
চোখে সারাক্ষণ বার্গম্যান, কুরুসোওয়া, আইজেনস্টাইন।
কিন্তু, একটি ফিল্ম ফেস্টিভাল থেকে
আরেকটি ফিল্ম ফেস্টিভালে
পৌঁছতেই বুঝতে পারলাম,
আমি একটা আধখাওয়া আপেল।
এবং চমৎকার সেই ছেলেটি, আমার এক বছরের প্রেমিক
আরেকটি আধখাওয়া আপেলের সঙ্গে
বকখালিতে ধরা পরল।

থানা, পুলিশ, লোকাল কমিটি
সব যথাযোগ্য মর্যাদায় পার হয়ে,
একটি বৃষ্টির দুপুরে আমাকে বলল,
হাই বেবি
চল এবার আমরা তিনজন মিলে চাঁদিপুর যাব।

চড় কষাতে পারিনি সেদিন।
ঘর বন্ধ করে কেঁদেছিলাম।
চোখের জলে আপনার গীতবিতানের
৩৭ নম্বর পৃষ্ঠা ভিজে গেল।
ভিজে গিয়েছিল সেই গানটা
তুমি যে চেয়ে আছো আকাশ ভরে।

এরপর, আমার জিনসের জ্যাকেট, টাইটান ঘড়ি,
আমার ইকনমিকস অনার্স
সমস্ত কিছুকেই আকাশ মনে হয়েছিলো।
আপনাকে আর আপনার আকাশকে
এতো ভাল লাগেনি এর আগে।
রাত জেগে এরপর গীতবিতান পড়েছি
এতো আকাশ আপনার গানে
কি করেছেন এত আকাশ নিয়ে
তবে কি, সত্যিই আমার মুক্তি এই আকাশে

ঠিক এই সময়ই, বাবার সঙ্গে
আমার সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেল।
বাবা বললেন, মূর্খ, তুই মেয়ে না হয়ে
ছেলে হলে আমার ভয় ছিল না,
এতো গীতবিতান পড়ার কি আছে? স্টুপিড!

সেদিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব ভেবেছিলাম-পারিনি।
সেদিনি ঘুমের বড়ি খাব ভেবেছিলাম-পারিনি।
তার বদলে বাবার মুখের উপর দাঁড়িয়ে বললাম,
তুমি আমার বাবা নও।
তুমি আমার বাবা নও।
অন্য একজন কোথাও আছেন, তিনিই আমার বাবা।

ওপরতলার রাজনীতি করা বাবার অহং সাংঘাতিক।
ঠাস করে আমাকে চড় মেরে বললেন,
তোমার যা যা লাগবে টাকাপয়সা সব পাবে,
আজ থেকে তুমি আর আমাকে পাবেনা, মনে রেখো।

সামনে ফাইনাল, কি হবে জানিনা।
কিন্তু, ভাল আমাকে করতেই হবে,
নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে

চোখের জল লেগে ভিজে গেছে পৃষ্ঠাগুলো,
৩৭, ৫৮,২১২, ৩৫৫,
পৃষ্ঠাগুলো যেন আমার ভেজা চোখের মতো
আমি হাত দিই ভেজা পাতায়,
আর কে যেন হাত রাখে আমার পিঠে।
কবে?কবে সেই হাত আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরবে?

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। সুবোধ সরকার।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x