খিদে – মন্দাক্রান্তা সেন
অন্ধকার পড়ে আছে রান্নাঘর
পচা শরীরের গন্ধে
টগবগ করছে খিদে
ওখানে আর কিছু
রান্না হবে না কোনোদিন
ডেকচি থেকে উথলে উঠবে না ফ্যান
রান্নাঘর ভেসে যাবে
দুর্গন্ধ বীর্যে
পাত পেড়ে খেয়ে যাবে
ক্ষুধার্ত ফুটো পাকস্থলী
২.
বালিকা বয়েস / মন্দাক্রান্তা সেন
একটুকরো সুতোও নেই
কী দিয়ে তবে বানাব
ন্যাকড়ার পুতুল
পরনে মায়ের ছেঁড়া শাড়ির পাড়
আমি তো মায়ের অবহেলা আর
উদাসীনতা নিয়ে
একা একা পুতুল খেলি
সযত্নে গেরস্থালি সাজাই
আমার পুতুল বলতে
সব্বাই মেয়ে
কোত্থাও সুতো নেই
যে সুতোর ওপর দিয়ে
হেঁটে যাবে বালিকা বয়েস
৩.
পটলভাজা / মন্দাক্রান্তা সেন
মেয়েজন্ম পুরুষের ভোগ
একা মেয়েমানুষ রেঁধে মরে
মুসুর ডাল, বরবটি পোস্ত,
আর পটলভাজা
রোজ পটলভাজা রান্না না হলে
মেয়েজন্ম পুড়েঝুড়ে যায়
৪.
ঈর্ষা / মন্দাক্রান্তা সেন
বাহ কী সুন্দর তুই মেয়ে
কেমন মানাচ্ছে
জিন্সে শাড়িতে হাত কাটা টপে
দেখে সুন্দর একটা ঈর্ষা হয়
বুক ভরা মন খারাপ নিয়ে
ভাবি আমার আঁটোসাঁটো টপ
পচে যাচ্ছে আলমারির ফ্রিজে
বুঝেছি একটা সময়ের পর
রূপের জায়গা
ছেড়ে দিতে হয় দীর্ঘশ্বাসে
দীর্ঘশ্বাসে উড়ে গেছে
আমার বয়েসকাল
আমার ঈর্ষা যত,
তুই তত আরও সুন্দর
৫.
পুরনো আলো / মন্দাক্রান্তা সেন
পুরনো বাল্বের কমলা আলো
নিঃশব্দ, বিষণ্ণ, চুপ
বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছে একা
ঝুলপড়া ঘরের এক কোণে
ওকে কিছু জিজ্ঞেস কোরো না
ওর কথা বলার অভ্যাস নেই
শুধু ভাবো
ও-ই তোমার দীর্ঘায়িত ছায়া
ধারণ করে আছে শীর্ণ বুকে
গরিব গেরস্থালির
যৌবনে বুড়িয়ে যাওয়া
মায়ের মতো
৬.
উপাসনা – মন্দাক্রান্তা সেন
একবার তাকাও
ওই দেখ খড়, ওই দেখ মাটি
মোটা মোটা আঙুল
অসম্ভব পীনোন্নত স্তন
কোমরের অতিরিক্ত উত্তেজক ভাঁজ
দেখে ভক্তির চেয়ে
কাম জাগে বেশি ?
মধ্যরাতে বীর্যস্খলন
আঠা হয়ে লেগে থাকে বিছানার চাদরে ?
নতজানু হয়ে আমার
শরীর ভিক্ষা করে পুরুষ
আমি বলি
যাও আগে কালীমন্দিরে
চিরকুটে নামগোত্র লিখে,
লিঙ্গে চটচটে তেলসিঁদুর মাখিয়ে,
উলঙ্গ দেবীমূর্তির কাছে
পুজো দিয়ে এস
মন্ত্র মুখস্থ করো
অভ্যাস করো
আমার উপাসনা
৭.
বৃষ্টি একটি মেয়ের নাম / মন্দাক্রান্তা সেন
পৃথিবী বৃষ্টি চায়
অনধিক চোদ্দ পঙ্ক্তি
সবটাই অলীক সনেট
বৃষ্টি একটি
মেয়ের নাম হতে পারে
কোনও এক গ্রামীণ হাটে
আপন মনে একলা ঘুরে ঘুরে
যে খুঁজে ফেরে
পোড়ামাটির গয়না
৮.
কাজল / মন্দাক্রান্তা সেন
কালো শাড়ি পরা বারণ
পরলে নজর লাগে
অথচ যেন নজর না লাগে বলে
চোখের কাজল ছুঁয়ে ফোঁটা দিই
চোখে চোখ পড়ার জন্যে
মোটা করে কাজল পরেছি
দাঁড়িয়েছি ব্যবধান রেখে
একবার চোখাচোখি হোক
শাড়িতে আর কী হবে, যখন
আমার গায়ের রঙই কালো ?
৯.
আয়না / মন্দাক্রান্তা সেন
ধনুক নিজেও জানে না
কখন তির ছুটে যাবে
সে শুধু জানে
একদিন ছুটেই যাবে তির
অথচ সে নিশ্চিত নয় কোনদিকে
আমি তো তূণীরে
গুছিয়ে রেখেছি পঞ্চশর
রূপ, লাস্য, মায়া, জ্যোতি, তেজ
সব নিয়ে আছড়ে পড়ব
আয়নায়
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মন্দাক্রান্তা সেনের কবিতা।
কয়েকটি কবিতা – মন্দাক্রান্তা সেন | নারী, ক্ষুধা ও শরীরের কাব্য
মন্দাক্রান্তা সেনের ‘কয়েকটি কবিতা’: নারীর ক্ষুধা, ঈর্ষা ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান
মন্দাক্রান্তা সেনের কয়েকটি কবিতা সংকলনটি বাংলা কবিতায় এক অনন্য ঘটনা — যেখানে নারীর দেহ, ক্ষুধা, ঈর্ষা, মাতৃত্ব ও আত্মপরিচয় একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই নয়টি কবিতা আসলে নয়টি ভিন্ন মুখ — একই নারীর। ‘খিদে’তে আছে ক্ষুধার্ত পাকস্থলীর আর্তনাদ, ‘বালিকা বয়েসে’ আছে মায়ের অবহেলায় পুতুল খেলা, ‘পটলভাজা’য় আছে রান্নাঘরে মেয়েজন্মের জ্বলন্ত বাস্তবতা, ‘ঈর্ষা’য় আছে রূপ হারানোর দীর্ঘশ্বাস, ‘পুরনো আলো’য় আছে মায়ের শীর্ণ বুকের ছায়া, ‘উপাসনা’য় আছে ভক্তি ও কামনার দ্বন্দ্ব, ‘বৃষ্টি একটি মেয়ের নাম’ কবিতায় আছে অলীক সনেটের খোঁজ, ‘কাজল’এ আছে কালো রঙের নজরবন্দি, আর ‘আয়না’য় আছে পঞ্চশরের আত্মপ্রতিবিম্ব।
‘খিদে’ – ক্ষুধার্ত পাকস্থলীর আর্তনাদ
“অন্ধকার পড়ে আছে রান্নাঘর, পচা শরীরের গন্ধে, টগবগ করছে খিদে।” মন্দাক্রান্তা সেনের ‘খিদে’ কবিতায় রান্নাঘর আর রান্নাঘর নয় — রান্নাঘর হয়ে ওঠে এক মৃত্যুকূপ। ডেকচি থেকে ফ্যান উথলে উঠবে না, রান্নাঘর ভেসে যাবে দুর্গন্ধ বীর্যে, ক্ষুধার্ত ফুটো পাকস্থলী পাত পেড়ে খেয়ে যাবে। এই কবিতা ক্ষুধাকে দেখায় মৃত্যুর শক্তিরূপে — যা শরীরকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে।
‘বালিকা বয়েস’ – সুতো ছাড়া পুতুলের খেলা
“একটুকরো সুতোও নেই, কী দিয়ে তবে বানাব ন্যাকড়ার পুতুল।” ‘বালিকা বয়েস’ কবিতায় আছে এক ছোট্ট মেয়ের নির্জন খেলা — মায়ের ছেঁড়া শাড়ির পাড় পরনে, মায়ের অবহেলা ও উদাসীনতা সাথী। “আমার পুতুল বলতে সব্বাই মেয়ে।” এই লাইনটিই সবচেয়ে ব্যথিত — কারণ ছোট্ট বালিকাটি জানে না সুতো ছাড়া পুতুল হয় না, জানে না সুতোর ওপর দিয়েই তাকে হেঁটে যেতে হবে বালিকা বয়েস।
‘পটলভাজা’ – রান্নাঘরে মেয়েজন্মের দহন
“মেয়েজন্ম পুরুষের ভোগ, একা মেয়েমানুষ রেঁধে মরে মুসুর ডাল, বরবটি পোস্ত, আর পটলভাজা।” ‘পটলভাজা’ মন্দাক্রান্তার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সামাজিক কবিতা। রোজ পটলভাজা রান্না না হলে মেয়েজন্ম পুড়েঝুড়ে যায় — এই লাইনটি নারীশ্রমের এক চিরন্তন বন্দিত্বের চিত্র। রান্নাঘর এখানে নারীর কারাগার, পটলভাজা তার শিকল।
‘ঈর্ষা’ – রূপ হারানোর দীর্ঘশ্বাস
“বাহ কী সুন্দর তুই মেয়ে, কেমন মানাচ্ছে জিন্সে শাড়িতে হাত কাটা টপে।” ‘ঈর্ষা’ কবিতায় এক নারীর অন্য নারীর প্রতি ঈর্ষা — যা আসলে আত্ম-ঈর্ষা। আঁটোসাঁটো টপ আলমারির ফ্রিজে পচে যাচ্ছে, দীর্ঘশ্বাসে উড়ে গেছে বয়েসকাল। শেষে স্বীকারোক্তি — “আমার ঈর্ষা যত, তুই তত আরও সুন্দর।”
‘পুরনো আলো’ – মায়ের শীর্ণ বুকের ছায়া
“পুরনো বাল্বের কমলা আলো, নিঃশব্দ, বিষণ্ণ, চুপ, বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছে একা।” ‘পুরনো আলো’ কবিতায় পুরনো বাল্বটি আসলে এক নারী — যে কথা বলার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছে। “ও-ই তোমার দীর্ঘায়িত ছায়া, ধারণ করে আছে শীর্ণ বুকে, গরিব গেরস্থালির যৌবনে বুড়িয়ে যাওয়া মায়ের মতো।” মায়ের মতো নিঃশব্দ, মায়ের মতো বিষণ্ণ, মায়ের মতো একা।
‘উপাসনা’ – ভক্তি ও কামনার দ্বন্দ্ব
‘উপাসনা’ মন্দাক্রান্তার সবচেয়ে বিতর্কিত কবিতা — যেখানে নারীদেহ, ভক্তি ও কামনার মধ্যে একটি জটিল দ্বান্দ্বিকতা তৈরি হয়েছে। নতজানু পুরুষ শরীর ভিক্ষা করে, আর নারী বলে — “যাও আগে কালীমন্দিরে চিরকুটে নামগোত্র লিখে, উলঙ্গ দেবীমূর্তির কাছে পুজো দিয়ে এস।” এই কবিতা আসলে পবিত্রতা ও কামনার সীমানা নিয়ে প্রশ্ন তোলে — যেখানে ধর্ম, যৌনতা ও ক্ষমতার সম্পর্ক একসঙ্গে মিলিত হয়।
‘বৃষ্টি একটি মেয়ের নাম’ – অলীক সনেটের খোঁজ
“পৃথিবী বৃষ্টি চায়, অনধিক চোদ্দ পঙ্ক্তি, সবটাই অলীক সনেট।” ‘বৃষ্টি একটি মেয়ের নাম’ কবিতায় বৃষ্টি যেন একটি মেয়ের নাম — যে গ্রামীণ হাটে একলা ঘুরে বেড়ায়, খুঁজে ফেরে পোড়ামাটির গয়না। সনেটের চোদ্দ পঙ্ক্তির নিয়ম ভেঙে দিয়ে কবি বৃষ্টিকে মুক্ত করে দেন।
‘কাজল’ – কালো রঙের নজরবন্দি
“কালো শাড়ি পরা বারণ, পরলে নজর লাগে।” ‘কাজল’ কবিতায় নারী নিজের কালো রঙকে নিয়ে দ্বিধায় — কালো শাড়ি নিষিদ্ধ, অথচ কাজল পরেই সাজে। শেষে প্রশ্ন — “শাড়িতে আর কী হবে, যখন আমার গায়ের রঙই কালো?” নারীদেহের রঙ নিয়ে সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ।
‘আয়না’ – পঞ্চশরের আত্মপ্রতিবিম্ব
“ধনুক নিজেও জানে না, কখন তির ছুটে যাবে।” ‘আয়না’ কবিতায় নারী নিজেকে ধনুকের সঙ্গে তুলনা করেন — যে জানে তির ছুটবেই, কিন্তু কোনদিকে তা নিশ্চিত নয়। তূণীরে গুছিয়ে রাখা পঞ্চশর — রূপ, লাস্য, মায়া, জ্যোতি, তেজ। শেষে সব নিয়ে আছড়ে পড়া আয়নায় — অর্থাৎ নিজের প্রতিবিম্বে নিজেই আঘাত।
ট্যাগস: মন্দাক্রান্তা সেন, কয়েকটি কবিতা, খিদে, বালিকা বয়েস, পটলভাজা, ঈর্ষা, পুরনো আলো, কাজল, আয়না, নারী কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা
© Kobitarkhata.com – কবি: মন্দাক্রান্তা সেন | “অন্ধকার পড়ে আছে রান্নাঘর, পচা শরীরের গন্ধে, টগবগ করছে খিদে” | নারী, ক্ষুধা ও শরীরের অনবদ্য কাব্য