এক মহাভোরের বিলাপ – রবিশঙ্কর মৈত্রী।

আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার—
রাতের শেষ প্রহরে
অন্ধকারের বুকে প্রথম আলোর মতো
আযানের ধ্বনি ভেসে আসে।

আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম—
ঘুমের চেয়েও উত্তম নামাজ।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।

ফজরের আযান শেষে মনে হয়
আকাশই যেন এক শাশ্বত সত্য
পাখির উড়াল ডানা দেখে মনে হয়
পৃথিবীটা সত্যিই সুন্দর।

এমন নির্দয় নির্মম কে আছে পৃথিবীতে
ফজরের আযান শুনে
যার বুকের ভেতর
একবারও কেঁপে ওঠে না?

কে আছে এমন—
যে এই পবিত্র ভোরে
মাথা নত না করে
মানুষ হত্যা করতে পারে?

তেহরানের ইমামজাদেহ্ মসজিদ থেকে
দিল্লির জামে মসজিদ অথবা
ঢাকার বায়তুল মোকাররম কিংবা
ইসলামাবাদের ফয়সাল মসজিদ থেকে
অথবা গাজার সাইয়ীদ হাশিম মসজিদ থেকে
প্রতি ভোরে ফজরের একই আযান
ধ্বনিত হয় মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ থেকে।
একই আযান
একই আহ্বান
একই ভোর।
তবু কেন—
কোনো কোনো আযানে
কান্নার করুণ সুর মিশে থাকে?

কেন মনে হয় মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে
শুধু ডাক নয়—
সভ্যতার আহত বুক কেঁপে উঠছে?

ফজরের আযানের পরে
আলো-আঁধারের একেকটি ভোরে
রোজ কত নারী
কত শিশু
কত ক্লান্ত মানুষের দল
নিজেদের জীবন তুলে দেয় অনিশ্চিত যাত্রায়।

সিরিয়ার ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে
গাজার আগুনমাখা আকাশের নিচে,
লিবিয়ার বন্দুকধরা উপকূলে দাঁড়িয়ে,
তিউনিসিয়ার বাতাসে অপেক্ষা করে—
আফ্রিকার অসংখ্য মানুষ।

বাংলাদেশের নদীভাঙা গ্রাম থেকে
পাকিস্তানের ধুলোমাখা শহর থেকে
আফগানিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকা থেকে—
অগণিত তরুণ স্বপ্ন আর ক্ষুধা বুকে নিয়ে
রওনা দেয়।

মরুভূমির পথে পথে
তৃষ্ণা, ডাকাত, বন্দুক, প্রতারণা—
প্রতিটি বালিকণা জানে
মানুষের আর্তনাদ।

লিবিয়ার অন্ধকার উপকূলে
একটি ছোটো নৌকা
অসংখ্য স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা করে
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেবে বেল।

কেউ পৌঁছে যায় ওপারে—
ইউরোপের আলোয়।
কেউ ডুবে যায়—
অদৃশ্য ইতিহাস হয়ে।

কোনো শিশু মায়ের হাত থেকে ফসকে যায়,
কোনো স্বপ্ন লোনা জলে ভেসে ওঠে
এক মুহূর্তের জন্য।

দূরের কোনো মিনার থেকে ভেসে আসে—
আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম…

আর পৃথিবী
তার সমস্ত সভ্যতা নিয়ে
একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে—

মানুষ কি সত্যিই আযানের অর্থ বুঝেছে?
নাকি এখনো
মানুষের হৃদয়
মিনারের চেয়ে ছোটো হয়ে আছে…?

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। রবিশঙ্কর মৈত্রী।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x