কবিতার খাতা
- 28 mins
একুশের গান – মহাদেব সাহা।
একুশ মানেই আসছে
সালাম ফিরে আসছে, বরকত ফিরে আসছে
তাজুল ফিরে আসছে….
একুশ মানেই মুক্তিযুদ্ধ ফিরে আসছে
সেই সাহসে বুক-পেতে-দেয়া তারুণ্য ফিরে আসছে
তারুণ্যের চোখে দুর্জয় শপথ ফিরে আসছে,
শহীদেরা ফিরে আসছে
স্বাধীনতা ফিরে আসছে
বাংলাদেশ ফিরে আসছে;
এই পদ্মা-মেঘনার দেশে আবার ’৫২ আসছে
’৬৯ আসছে
’৭১ ফিরে আসছে,
একুশ মানেই আসছে, স্বপ্ন আসছে, ভবিষ্যৎ আসছে
একুশ মানে অতীত নয়, আগামী
মৃত্যু নয়, জন্ম
একুশ মানে শ্বাশ্বত বাংলার হিজল-তমাল
ভাটিয়ালি গান শাপলা-ফোটা দিঘি
পদ্মানদীর মাঝি
ঢাকার উন্মুক্ত রাজপথ, দীর্ঘ মিছিল
নগ্ন পায়ে হাঁটা
সারাদিন ‘আমি কি ভুলিতে পারি’।
একুশ মানে আসছে
সালাম আসছে, বরকত আসছে
তাজুল আসছে…
মায়ের অশ্রুভেজা চোখে
আবার আশার ঝিলিক ফিরে আসছে
পিতার তপ্ত বুকে
আবার বিশ্বাস ফিরে আসছে
সন্তানের ম্লান চোখে
আবার স্বপ্ন ফিরে আসছে,
একুশ মানে আসছে, আসছে, আসছে…
এই একুশে তাজুল ফিরে আসছে
শোষণের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিবাদ আসছে
সম্মিলিত সংগ্রাম আসছে
পুঁজিবাদের জন্য চরম আঘাত আসছে;
একুশ মানে আসছে
বাংলা ভাষার দিন আসছে.
কৃষ্ণচুড়া পলাশের দিন আসছে,
দুনিয়া-কাঁপানো দিন আসছে;
এই একুশ মানে মাঠভরা পাকা ধানের গন্ধ
নদীতে রূপালী মাছ
পালের নৌকা;
একুশ মানে দিগন্তজোড়া আগামী দিনের স্বপ্ন
একুশ মানে জয়নুলের ছবি,
নজরুলের কবিাত
হৃদয়মথিত রবীন্দ্রনাথের গান;
একুশ মানে আমর সোনার বাংলা
একুশ মানে শহীদের পায়ের শব্দ
একুশ মানে অজর, অমর, অবিনশ্বর।
একুশ মানে আসবে
একুশ মানে আসছে,
শহীদেরা আসছে
স্বাধীনতা আসছে
বাংলাদেশ আসছে;
একুশ মানে আসছে
সালাম আসছে, বরকত আসছে,
তাজুল আসছে….
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। মহাদেব সাহা।
একুশের গান – মহাদেব সাহা | একুশের গান কবিতা | মহাদেব সাহার কবিতা | একুশে ফেব্রুয়ারির কবিতা
একুশের গান: মহাদেব সাহার ভাষা আন্দোলন, ইতিহাস ও চিরন্তন চেতনার অসাধারণ কাব্যভাষা
মহাদেব সাহার “একুশের গান” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা ভাষা আন্দোলন, একুশের চেতনা, ইতিহাস ও চিরন্তন প্রেরণার এক গভীর কাব্যিক অন্বেষণ। “একুশ মানেই আসছে / সালাম ফিরে আসছে, বরকত ফিরে আসছে / তাজুল ফিরে আসছে….” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে এক গভীর দর্শন — একুশ মানে অতীত নয়, আগামী; মৃত্যু নয়, জন্ম। মহাদেব সাহা (১৯৪৪-২০১৬) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। “একুশের গান” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা একুশের চেতনাকে চিরন্তন রূপ দিয়েছে।
মহাদেব সাহা: ভাষা আন্দোলনের কবি
মহাদেব সাহা (১৯৪৪-২০১৬) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯৪৪ সালের ২৫ আগস্ট বৃহত্তর বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহিম চন্দ্র সাহা এবং মাতা সুনীতি সাহা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি দৈনিক সংবাদ, দৈনিক বাংলা, সাপ্তাহিক বিচিত্রা প্রভৃতি পত্রিকায় কাজ করেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই নদী এই শীত’ (১৯৭৫) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মাছের রান্না’, ‘দুঃখীরা কথা বলে’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘শতাব্দীর সূর্য’, ‘বসন্তের একটি বাংলা উদ্ধৃতি’ প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, প্রকৃতি ও মানবিক সম্পর্কের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। “একুশের গান” তাঁর একটি বহুপঠিত কবিতা যা একুশের চেতনাকে চিরন্তন রূপ দিয়েছে।
একুশের গান কবিতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ
কবিতার শিরোনামের তাৎপর্য
“একুশের গান” শিরোনামটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘একুশে’ — ২১শে ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলনের দিন, শহীদ দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ‘গান’ — কেবল গীত নয়, এটি এক ধরনের স্তব, এক ধরনের মহিমাকীর্তন। শিরোনামেই কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন — এই কবিতা একুশের চেতনার গান, একুশের মহিমার গান। এটি একটি স্তোত্রের মতো, যেখানে একুশের চিরন্তনতা বারবার ঘোষিত হয়েছে।
প্রথম অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“একুশ মানেই আসছে / সালাম ফিরে আসছে, বরকত ফিরে আসছে / তাজুল ফিরে আসছে…. / একুশ মানেই মুক্তিযুদ্ধ ফিরে আসছে / সেই সাহসে বুক-পেতে-দেয়া তারুণ্য ফিরে আসছে / তারুণ্যের চোখে দুর্জয় শপথ ফিরে আসছে, / শহীদেরা ফিরে আসছে / স্বাধীনতা ফিরে আসছে / বাংলাদেশ ফিরে আসছে;” প্রথম অংশে কবি একুশের সাথে বিভিন্ন ঘটনা ও চেতনার প্রত্যাবর্তনের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন — একুশ মানেই আসছে। সালাম, বরকত, তাজুল ফিরে আসছে। মুক্তিযুদ্ধ ফিরে আসছে। সেই সাহসে বুক পেতে দেওয়া তারুণ্য ফিরে আসছে। তারুণ্যের চোখে দুর্জয় শপথ ফিরে আসছে। শহীদরা ফিরে আসছে, স্বাধীনতা ফিরে আসছে, বাংলাদেশ ফিরে আসছে।
‘একুশ মানেই আসছে’ — পঙ্ক্তির তাৎপর্য
‘একুশ মানেই আসছে’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার মূল সুর। একুশ মানে অতীত নয়, বর্তমান; একুশ মানে চিরন্তন প্রত্যাবর্তন। একুশ এলে সবকিছু আবার ফিরে আসে — ইতিহাস, চেতনা, প্রেরণা।
শহীদদের নামের তাৎপর্য
সালাম, বরকত — ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রধান শহীদ। তাজুল — সম্ভবত তাজউদ্দীন আহমদ? অথবা অন্য কোনো শহীদ? এই নামগুলো উচ্চারণের মাধ্যমে কবি শহীদদের স্মরণ করেছেন। তারা একুশে ফিরে আসেন — চেতনায়, স্মৃতিতে।
মুক্তিযুদ্ধ, তারুণ্য, শপথ ফিরে আসার তাৎপর্য
একুশ এলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরে আসে, বুক পেতে দেওয়া তারুণ্যের সাহস ফিরে আসে, তারুণ্যের চোখে দুর্জয় শপথ ফিরে আসে। অর্থাৎ একুশ শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, এটি ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।
শহীদ, স্বাধীনতা, বাংলাদেশ ফিরে আসার তাৎপর্য
শহীদরা ফিরে আসেন চেতনায়, স্বাধীনতা ফিরে আসে উপলব্ধিতে, বাংলাদেশ ফিরে আসে গৌরবে। একুশ আমাদের আবারও স্বাধীনতার তাৎপর্য মনে করিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“এই পদ্মা-মেঘনার দেশে আবার ‘৫২ আসছে / ‘৬৯ আসছে / ‘৭১ ফিরে আসছে, / একুশ মানেই আসছে, স্বপ্ন আসছে, ভবিষ্যৎ আসছে / একুশ মানে অতীত নয়, আগামী / মৃত্যু নয়, জন্ম / একুশ মানে শ্বাশত বাংলার হিজল-তমাল / ভাটিয়ালি গান শাপলা-ফোটা দিঘি / পদ্মানদীর মাঝি / ঢাকার উন্মুক্ত রাজপথ, দীর্ঘ মিছিল / নগ্ন পায়ে হাঁটা / সারাদিন ‘আমি কি ভুলিতে পারি’।” দ্বিতীয় অংশে কবি একুশের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও চিরন্তন রূপ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — পদ্মা-মেঘনার দেশে আবার ‘৫২ আসছে, ‘৬৯ আসছে, ‘৭১ ফিরে আসছে। একুশ মানেই স্বপ্ন আসছে, ভবিষ্যৎ আসছে। একুশ মানে অতীত নয়, আগামী; মৃত্যু নয়, জন্ম। একুশ মানে শ্বাশত বাংলার হিজল-তমাল, ভাটিয়ালি গান, শাপলা-ফোটা দিঘি, পদ্মানদীর মাঝি, ঢাকার উন্মুক্ত রাজপথ, দীর্ঘ মিছিল, নগ্ন পায়ে হাঁটা, সারাদিন ‘আমি কি ভুলিতে পারি’।
‘৫২, ‘৬৯, ‘৭১-এর তাৎপর্য
‘৫২ — ভাষা আন্দোলনের বছর। ‘৬৯ — গণঅভ্যুত্থানের বছর। ‘৭১ — মুক্তিযুদ্ধের বছর। এই তিনটি বছর বাঙালির ইতিহাসের তিনটি মাইলফলক। একুশ এলে এই তিনটি বছরই ফিরে আসে — অর্থাৎ একুশ এই সব আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে।
‘একুশ মানে অতীত নয়, আগামী / মৃত্যু নয়, জন্ম’ — এই পঙ্ক্তির তাৎপর্য
এই পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন। একুশ শুধু স্মৃতির দিন নয়, এটি ভবিষ্যতের দিন। একুশ শুধু শহীদদের মৃত্যুর দিন নয়, এটি নতুন জন্মের দিন, নতুন চেতনার জন্মের দিন। একুশ আমাদের অতীত মনে করিয়ে দেয় না, বরং ভবিষ্যতের পথ দেখায়।
বাংলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতির চিত্র
হিজল-তমাল — বাংলার গাছ। ভাটিয়ালি গান — বাংলার লোকগান। শাপলা-ফোটা দিঘি — বাংলার প্রকৃতি। পদ্মানদীর মাঝি — বাংলার মানুষের জীবন। ঢাকার উন্মুক্ত রাজপথ, দীর্ঘ মিছিল — আন্দোলনের চিত্র। নগ্ন পায়ে হাঁটা — প্রভাতফেরির চিত্র। সারাদিন ‘আমি কি ভুলিতে পারি’ — ভাষা আন্দোলনের অমর গান। এই সব চিত্রের মাধ্যমে কবি একুশকে বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সাথে যুক্ত করেছেন।
তৃতীয় অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“একুশ মানে আসছে / সালাম আসছে, বরকত আসছে / তাজুল আসছে… / মায়ের অশ্রুভেজা চোখে / আবার আশার ঝিলিক ফিরে আসছে / পিতার তপ্ত বুকে / আবার বিশ্বাস ফিরে আসছে / সন্তানের ম্লান চোখে / আবার স্বপ্ন ফিরে আসছে, / একুশ মানে আসছে, আসছে, আসছে…” তৃতীয় অংশে কবি একুশের মানবিক প্রভাব বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — একুশ মানে সালাম, বরকত, তাজুল আসছে। মায়ের অশ্রুভেজা চোখে আবার আশার ঝিলিক ফিরে আসছে। পিতার তপ্ত বুকে আবার বিশ্বাস ফিরে আসছে। সন্তানের ম্লান চোখে আবার স্বপ্ন ফিরে আসছে। একুশ মানে আসছে, আসছে, আসছে…
মা-বাবা-সন্তানের চিত্রের তাৎপর্য
একুশ এলে শহীদদের মায়ের চোখে অশ্রু থাকে, কিন্তু সেই অশ্রুর মধ্যেও আশার ঝিলিক ফিরে আসে। পিতার বুকে বিশ্বাস ফিরে আসে। সন্তানের চোখে স্বপ্ন ফিরে আসে। একুশ শুধু শোকের নয়, এটি নতুন আশা, নতুন বিশ্বাস, নতুন স্বপ্নেরও দিন।
‘আসছে, আসছে, আসছে’ — পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য
এই পুনরাবৃত্তি একুশের চিরন্তন আগমনকে নির্দেশ করে। একুশ বারবার আসে, একুশের চেতনা বারবার ফিরে আসে। এটি একটি চিরন্তন ধারা।
চতুর্থ অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“এই একুশে তাজুল ফিরে আসছে / শোষণের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিবাদ আসছে / সম্মিলিত সংগ্রাম আসছে / পুঁজিবাদের জন্য চরম আঘাত আসছে; / একুশ মানে আসছে / বাংলা ভাষার দিন আসছে / কৃষ্ণচুড়া পলাশের দিন আসছে, / দুনিয়া-কাঁপানো দিন আসছে;” চতুর্থ অংশে কবি একুশের রাজনৈতিক তাৎপর্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — এই একুশে তাজুল ফিরে আসছে। শোষণের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিবাদ আসছে। সম্মিলিত সংগ্রাম আসছে। পুঁজিবাদের জন্য চরম আঘাত আসছে। একুশ মানে বাংলা ভাষার দিন আসছে, কৃষ্ণচূড়া পলাশের দিন আসছে, দুনিয়া-কাঁপানো দিন আসছে।
শোষণ, সংগ্রাম, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আঘাতের তাৎপর্য
একুশের চেতনা শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সম্মিলিত সংগ্রাম, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আঘাত — সব কিছুকে ধারণ করে। একুশ শুধু ভাষার জন্য নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারেরও প্রতীক।
বাংলা ভাষার দিন, কৃষ্ণচূড়া-পলাশের দিন, দুনিয়া-কাঁপানো দিনের তাৎপর্য
একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এটি বাংলা ভাষার দিন, বাঙালির গর্বের দিন। কৃষ্ণচূড়া-পলাশ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ফোটে — এই রক্তিম ফুল শহীদদের রক্তের প্রতীক। একুশ এখন দুনিয়া-কাঁপানো দিন — সারা বিশ্বে এই দিন পালিত হয়।
পঞ্চম অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“এই একুশ মানে মাঠভরা পাকা ধানের গন্ধ / নদীতে রূপালী মাছ / পালের নৌকা; / একুশ মানে দিগন্তজোড়া আগামী দিনের স্বপ্ন / একুশ মানে জয়নুলের ছবি, / নজরুলের কবিতা / হৃদয়মথিত রবীন্দ্রনাথের গান; / একুশ মানে আমাদের সোনার বাংলা / একুশ মানে শহীদের পায়ের শব্দ / একুশ মানে অজর, অমর, অবিনশ্বর।” পঞ্চম অংশে কবি একুশের সাংস্কৃতিক ও চিরন্তন তাৎপর্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন — একুশ মানে মাঠভরা পাকা ধানের গন্ধ, নদীতে রূপালী মাছ, পালের নৌকা। একুশ মানে দিগন্তজোড়া আগামী দিনের স্বপ্ন। একুশ মানে জয়নুলের ছবি, নজরুলের কবিতা, হৃদয়মথিত রবীন্দ্রনাথের গান। একুশ মানে আমাদের সোনার বাংলা। একুশ মানে শহীদের পায়ের শব্দ। একুশ মানে অজর, অমর, অবিনশ্বর।
বাংলার অর্থনীতি ও প্রকৃতির চিত্র
মাঠভরা পাকা ধানের গন্ধ — কৃষি প্রধান বাংলা। নদীতে রূপালী মাছ — মৎস্য সম্পদ। পালের নৌকা — নদী পরিবহন। একুশ এই বাংলার অর্থনীতি ও প্রকৃতির সাথে যুক্ত।
বাংলার সংস্কৃতির চিত্র
জয়নুলের ছবি — শিল্পী জয়নুল আবেদিন। নজরুলের কবিতা — জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথের গান — বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একুশ বাংলার সংস্কৃতির সাথে যুক্ত।
অজর, অমর, অবিনশ্বরের তাৎপর্য
একুশ অজর — যার বার্ধক্য নেই। অমর — যার মৃত্যু নেই। অবিনশ্বর — যা কখনও ধ্বংস হয় না। এই তিনটি বিশেষণ দিয়ে কবি একুশের চিরন্তনতা ঘোষণা করেছেন।
ষষ্ঠ অংশের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
“একুশ মানে আসবে / একুশ মানে আসছে, / শহীদেরা আসছে / স্বাধীনতা আসছে / বাংলাদেশ আসছে; / একুশ মানে আসছে / সালাম আসছে, বরকত আসছে, / তাজুল আসছে….” ষষ্ঠ অংশে কবি কবিতার সূচনায় ফিরে গেছেন। তিনি বলেছেন — একুশ মানে আসবে, একুশ মানে আসছে। শহীদরা আসছে, স্বাধীনতা আসছে, বাংলাদেশ আসছে। সালাম আসছে, বরকত আসছে, তাজুল আসছে।
চক্রাকার কাঠামোর তাৎপর্য
কবিতাটি শুরু হয়েছিল ‘একুশ মানেই আসছে’ দিয়ে, শেষ হয়েছে ‘একুশ মানে আসছে’ দিয়ে। এই চক্রাকার কাঠামো একুশের চিরন্তন আগমনকে নির্দেশ করে। একুশ আসবেই, আসছেই, আসছে।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য
“একুশের গান” কবিতাটি একুশের চিরন্তন চেতনার এক অসাধারণ গান। কবি বারবার বলেছেন — একুশ মানেই আসছে। সালাম, বরকত, তাজুল ফিরে আসছে। মুক্তিযুদ্ধ, তারুণ্য, শপথ, শহীদ, স্বাধীনতা, বাংলাদেশ — সবকিছু ফিরে আসছে। ‘৫২, ‘৬৯, ‘৭১ ফিরে আসছে। একুশ মানে অতীত নয়, আগামী; মৃত্যু নয়, জন্ম। একুশ বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি — সবকিছুর সাথে যুক্ত। একুশ অজর, অমর, অবিনশ্বর। একুশ আসবেই, আসছেই, আসছে।
একুশের গান কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: একুশের গান কবিতার লেখক কে?
একুশের গান কবিতার লেখক মহাদেব সাহা (১৯৪৪-২০১৬)। তিনি বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই নদী এই শীত’ (১৯৭৫) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মাছের রান্না’, ‘দুঃখীরা কথা বলে’, ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘শতাব্দীর সূর্য’ প্রভৃতি।
প্রশ্ন ২: একুশের গান কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
একুশের গান কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো একুশের চিরন্তন চেতনা। কবি দেখিয়েছেন — একুশ মানেই সালাম, বরকত, তাজুল ফিরে আসছে। মুক্তিযুদ্ধ, তারুণ্য, শপথ, শহীদ, স্বাধীনতা, বাংলাদেশ — সবকিছু ফিরে আসছে। একুশ মানে অতীত নয়, আগামী; মৃত্যু নয়, জন্ম। একুশ অজর, অমর, অবিনশ্বর।
প্রশ্ন ৩: ‘একুশ মানে অতীত নয়, আগামী / মৃত্যু নয়, জন্ম’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘একুশ মানে অতীত নয়, আগামী / মৃত্যু নয়, জন্ম’ — এই পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় দর্শন। একুশ শুধু স্মৃতির দিন নয়, এটি ভবিষ্যতের দিন। একুশ শুধু শহীদদের মৃত্যুর দিন নয়, এটি নতুন চেতনার জন্মের দিন। একুশ আমাদের অতীত মনে করিয়ে দেয় না, বরং ভবিষ্যতের পথ দেখায়।
প্রশ্ন ৪: কবিতায় একুশের সাথে কোন কোন ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলা হয়েছে?
কবিতায় একুশের সাথে তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলা হয়েছে: ‘৫২ (ভাষা আন্দোলন), ‘৬৯ (গণঅভ্যুত্থান) এবং ‘৭১ (মুক্তিযুদ্ধ)। এই তিনটি বছর বাঙালির ইতিহাসের তিনটি মাইলফলক। একুশ এলে এই তিনটি বছরই ফিরে আসে — অর্থাৎ একুশ এই সব আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে।
প্রশ্ন ৫: ‘একুশ মানে আসছে’ — বারবার বলার তাৎপর্য কী?
‘একুশ মানে আসছে’ বারবার বলার মাধ্যমে কবি একুশের চিরন্তন আগমনকে নির্দেশ করেছেন। একুশ বারবার আসে, একুশের চেতনা বারবার ফিরে আসে। এটি একটি চিরন্তন ধারা। কবিতার শুরু ও শেষেও এই পঙ্ক্তিটি আছে, যা একুশের চক্রাকার আগমনকে নির্দেশ করে।
প্রশ্ন ৬: কবিতায় বাংলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতির কী কী চিত্র আছে?
কবিতায় বাংলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতির অনেক চিত্র আছে: হিজল-তমাল গাছ, ভাটিয়ালি গান, শাপলা-ফোটা দিঘি, পদ্মানদীর মাঝি, মাঠভরা পাকা ধানের গন্ধ, নদীতে রূপালী মাছ, পালের নৌকা, জয়নুলের ছবি, নজরুলের কবিতা, রবীন্দ্রনাথের গান, আমাদের সোনার বাংলা। এই সব চিত্র একুশকে বাংলার সাথে যুক্ত করেছে।
প্রশ্ন ৭: মহাদেব সাহা সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
মহাদেব সাহা (১৯৪৪-২০১৬) বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তিনি ১৯৪৪ সালের ২৫ আগস্ট বরিশালের গৌরনদীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই নদী এই শীত’ (১৯৭৫) তাঁকে খ্যাতি এনে দেয়। তাঁর কবিতায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ট্যাগস: একুশের গান, মহাদেব সাহা, মহাদেব সাহার কবিতা, একুশের গান কবিতা, একুশে ফেব্রুয়ারির কবিতা, ভাষা আন্দোলনের কবিতা, শহীদ দিবসের কবিতা, ২১শে ফেব্রুয়ারির কবিতা, বাংলা কবিতা






