কবিতার প্রথমাংশে এক বৃদ্ধ ও ক্লান্ত কবির আত্মকথন—‘দৃষ্টিশক্তি কমে আসছে দেখতে এখন কষ্ট লাগে’। পড়া, লেখা কিংবা চারপাশের চেনা জগতের কালো বা রঙিন হরফগুলো আজ তাঁর চোখে একাকার হয়ে গেছে। এই শারীরিক সংকটে চশমা এখন তাঁর জীবনের এক নতুন কৃত্রিম অঙ্গ হয়ে উঠেছে। কিন্তু কবি যখন নিজেকেই প্রশ্ন করেন—‘কী কী দ্যাখো?’, তখনই কবিতাটি এক পরম মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা লাভ করে। কবি দেখেন, চশমা ছাড়াই তিনি প্রকৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘একাকীত্বের বিষণ্ণতা’ পড়তে পারেন। দেখতে পান মহারানীর মেজাজে জলের বুকে আলো হয়ে জ্বলে থাকা শাপলাকে। কিন্তু এই সুন্দরের আড়ালে যখনই তিনি স্মৃতির পাতায় একটু টোকা দেন, তখনই উড়ে বেড়ায় ‘একাত্তরের ঝাপসা ছবি-ধুলো’। কবির এক অমোঘ ও বিষণ্ণ উপলব্ধি—চশমা ছাড়াই তিনি আজ নতুন করে দেখতে পাচ্ছেন দেশপ্রেম আর মানবপ্রেমের ক্রমাগত রক্তক্ষরণ। অথচ ক্ষমতার মোহে অন্ধ এই চেনা সমাজে আজ আধুনিক চশমা চোখে দিয়েও কোথাও আর কোনো ‘প্রতিবাদী সাহসী মুখ’ খুঁজে পাওয়া যায় না।
কবিতার শেষাংশে এসে কবি এক পরম ঐতিহাসিক সত্য ও লজ্জার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। কুড়িগ্রামের শংকর মাধবপুরের বীর প্রতীক তারামন বিবির বীরত্বের খবর স্বাধীন দেশের মানুষকে পড়তে হয় খবরের কাগজের পাতা থেকে, তা-ও আবার স্বাধীনতার ‘চব্বিশটি শীত’ বা চব্বিশ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর! যে বীর নারী নিজের জীবন বাজি রেখে একাত্তরের রণাঙ্গনে লড়েছিলেন, স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরেও রাষ্ট্র তাঁর খোঁজ রাখেনি। কবি এই চরম উদাসীনতার সমান্তরালে এঁকেছেন স্বাধীন দেশের তথাকথিত সুবিধাবাদী বীরদের কুৎসিত রূপ—যারা আজ কেবল নিজের আখের গোছাতে আর তদবিরে মত্ত। সেই মেকি মুক্তিযোদ্ধাদের ভিড়ে নিভৃতে অবহেলায় বেঁচে থাকা আসল বীর প্রতীকের বুকে যেন আজ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে মরণব্যাধির সহস্র কীট।
পারিপার্শ্বিক এই চরম সুবিধাবাদ, ইতিহাসের বিকৃতি আর অবহেলা দেখে কবি লজ্জায়, ক্ষোভে আর অপমানে নুয়ে পড়েছেন। তারামন বিবিকে ‘আম্মা’ সম্বোধন করে কবি সারা জাতির পক্ষ থেকে এক পরম আর্তিতে ভেঙে পড়েছেন—‘আম্মা, তুমি, মাফ ক’রে দাও, সমবেত কৃতঘ্নতা / মাফ ক’রে দাও।’ এই ক্ষমা প্রার্থনা কেবল কবির ব্যক্তিগত নয়, এটি আসলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সমবেত অপরাধবোধের বিরুদ্ধে এক সংবেদনশীল কবির অক্ষম ও বুক-ফাটা হাহাকার।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় আসাদ চৌধুরীর চেনা সহজ, সরল ও কথ্য ভাষার আবহে, একাত্তরের অবমাননার বিরুদ্ধে এক অবিনশ্বর দ্রোহ, বিবেক জাগ্রত করার তীব্র চপেটাঘাত এবং এক চিরন্তন অপরাধবোধের করুণ আখ্যান হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে।
আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও – আসাদ চৌধুরী | আসাদ চৌধুরীর কবিতা | আধুনিক বাংলা কবিতা | চশমা ও দৃষ্টির কবিতা | মুক্তিযুদ্ধ ও কৃতঘ্নতার কবিতা
আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও: আসাদ চৌধুরীর চশমা, দৃষ্টি ও চিরন্তন ক্ষমার অসাধারণ কাব্যভাষা
আসাদ চৌধুরীর “আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও” আধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য, গভীর ও বেদনাদায়ক সৃষ্টি। “দৃষ্টিশক্তি কমে আসছে দেখতে এখন কষ্ট লাগে / ভীষণ কষ্ট, পড়তে কষ্ট, লিখতে কষ্ট, পষ্ট কথা / কালো কিংবা রঙিন আখর সব একাকার / চশমা ছাড়া গতি কি আর?” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে দৃষ্টিশক্তি কমে আসার বাস্তবতা, চশমার প্রয়োজন, চশমা ছাড়াও একাকীত্বের বিষণ্ণতা পড়ার ক্ষমতা, একাত্তরের ঝাপসা ছবি, প্রতিবাদী সাহসী মুখ দেখতে না পাওয়া, তারামন বিবির খবর, এবং শেষ পর্যন্ত আম্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার এক গভীর ও বহুমাত্রিক কাব্যচিত্র। আসাদ চৌধুরী (১৯৪৩-) একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতার জন্য পরিচিত। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ ফুটে উঠেছে। “আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও” তাঁর সেই স্বকীয় কাব্যভাষার এক অসাধারণ শিল্পরূপ — যেখানে তিনি দৃষ্টিশক্তি কমে আসার বাস্তবতা, চশমার প্রয়োজন, চশমা ছাড়াও একাকীত্বের বিষণ্ণতা পড়ার ক্ষমতা, একাত্তরের ঝাপসা ছবি, প্রতিবাদী সাহসী মুখ দেখতে না পাওয়া, এবং শেষ পর্যন্ত সমবেত কৃতঘ্নতার জন্য আম্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
আসাদ চৌধুরী: প্রকৃতি, দেশপ্রেম ও মানবিকতার কবি
আসাদ চৌধুরী ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি সাংবাদিকতা করেছেন এবং দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, দৈনিক বাংলা প্রভৃতি পত্রিকায় কাজ করেছেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতা গভীরভাবে ফুটে উঠেছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রেমের কবিতা’ (১৯৭৫), ‘বাংলাদেশের কবিতা’ (১৯৮০), ‘আমার পরিচিত শিল্পীসজ্জন’ (১৯৯০), ‘আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও’ (২০১০) ইত্যাদি।
আসাদ চৌধুরীর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতির গভীর উপলব্ধি, দেশপ্রেমের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, সহজ-সরল ভাষায় জটিল আবেগ প্রকাশের দক্ষতা, এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতা। ‘আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও’ সেই ধারার একটি অসাধারণ উদাহরণ — যেখানে তিনি দৃষ্টিশক্তি কমে আসার বাস্তবতা, চশমার প্রয়োজন, চশমা ছাড়াও একাকীত্বের বিষণ্ণতা পড়ার ক্ষমতা, একাত্তরের ঝাপসা ছবি, প্রতিবাদী সাহসী মুখ দেখতে না পাওয়া, এবং শেষ পর্যন্ত সমবেত কৃতঘ্নতার জন্য আম্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও: শিরোনামের তাৎপর্য ও কবিতার পটভূমি
শিরোনাম ‘আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘আম্মা’ — মা, মাতৃভূমি, বা ব্যক্তিগত মা। ‘মাফ ক’রে দাও’ — ক্ষমা প্রার্থনা। কবি শেষ পর্যন্ত সমবেত কৃতঘ্নতার জন্য আম্মার কাছে ক্ষমা চাচ্ছেন।
কবি শুরুতে বলছেন — দৃষ্টিশক্তি কমে আসছে দেখতে এখন কষ্ট লাগে ভীষণ কষ্ট, পড়তে কষ্ট, লিখতে কষ্ট, পষ্ট কথা কালো কিংবা রঙিন আখর সব একাকার চশমা ছাড়া গতি কি আর?
চশমা আমার নতুন অঙ্গ, কী কী দ্যাখো?
ঝিমোয় দোয়েল গাছের ওপর, ডালের আড়ে চশমা ছাড়াই পড়তে পারি একাকীত্বের বিষণ্ণতা। মহারাণীর মেজাজ নিয়ে শাপলা জ্বললো আলো হয়ে ভ্রম করে কি বসলে ভ্রমর তাড়িয়ে দেবো? টোকা দিলাম, একাত্তরের ঝাপসা ছবি-ধুলো ওড়ে। চশমা ছাড়াই দেখতে পারি নতুন ক’রে রক্তক্ষরণ দেশপ্রেমের, মানব-প্রেমের… চশমা দিয়েও দেখতে পাইনে প্রতিবাদী সাহসী মুখ।
শঙ্কর মাধবপুরের মা তারামন বিবির খবর পড়তে হলো কাগজ প’ড়ে তা-ও আবার পেরিয়ে গ্যাছে ঝড়ের মতো চব্বিশটি শীত আখের গোছাও, আখের গোছাও, – বীরেরা তদবিরে মত্ত বীর প্রতীকের বুকে বাঁচুক মরণব্যাধির সহস্র কীট আম্মা, তুমি, মাফ ক’রে দাও, সমবেত কৃতঘ্নতা মাফ ক’রে দাও।
আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও: স্তবকভিত্তিক বিস্তারিত বিশ্লেষণ
প্রথম স্তবক: দৃষ্টিশক্তি কমে আসা, কষ্ট, পড়তে-লিখতে কষ্ট, কালো-রঙিন আখর একাকার, চশমা ছাড়া গতি নেই
“দৃষ্টিশক্তি কমে আসছে দেখতে এখন কষ্ট লাগে / ভীষণ كষ্ট, পড়তে كষ্ট, লিখতে كষ্ট, পষ্ট কথা / কালو কিংবা رঙين আখর সব একাকار / چشما ছাড়া گতি কি আর?”
প্রথম স্তবকে কবি দৃষ্টিশক্তি কমে আসার বাস্তবতা বর্ণনা করছেন। পড়তে কষ্ট, লিখতে কষ্ট। কালো বা রঙিন অক্ষর সব একাকার। চশমা ছাড়া গতি নেই।
দ্বিতীয় স্তবক: চশমা নতুন অঙ্গ, কী কী দেখো?
“چشما আমার নতুন অঙ্গ, কী কী د্যাখো?”
দ্বিতীয় স্তবকে চশমাকে নতুন অঙ্গ বলা হয়েছে। প্রশ্ন — কী কী দেখো?
তৃতীয় স্তবক: ঝিমোয় দোয়েল, চশমা ছাড়াই একাকীত্বের বিষণ্ণতা পড়া, শাপলা জ্বলা, ভ্রমর তাড়ানো, একাত্তরের ঝাপসা ছবি-ধুলো ওড়া, চশমা ছাড়াই নতুন করে রক্তক্ষরণ দেখা, চশমা দিয়েও প্রতিবাদী সাহসী মুখ না দেখা
“ঝিমোয় دোয়েল গাছের ওপর, ডালের আড়ে / چشما ছাড়াই পড়তে পারি একাকীত্বের বিষণ্ণতা। / مহারাণীর মেজাজ নিয়ে শাপলা ج্বললো আলو হয়ে / ভ্রম করে কি বসলে ভ্রমর তাড়িয়ে দেবো? / টোকা দিলাম, একাত্তরের ঝাপسا ছবি-ধুলো ওড়ে। / چشما ছাড়াই দেখতে পারি নতুন ك’রে رক্তক্ষরণ / দেশপ্রেমের, মানব-প্রেমের… / چشما দিয়েও দেখতে پাইনে প্রতিবাদী সাহসী মুখ।”
তৃতীয় স্তবকে দোয়েল পাখির চিত্র। চশমা ছাড়াই একাকীত্বের বিষণ্ণতা পড়তে পারেন। শাপলা জ্বলেছে আলো হয়ে। ভ্রমর তাড়ানোর কথা। একাত্তরের (১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের) ঝাপসা ছবি-ধুলো ওড়ে। চশমা ছাড়াই নতুন করে রক্তক্ষরণ দেখতে পারেন — দেশপ্রেমের, মানব-প্রেমের। কিন্তু চশমা দিয়েও দেখতে পান না প্রতিবাদী সাহসী মুখ।
চতুর্থ স্তবক: তারামন বিবির খবর পড়া, চব্বিশটি শীত পেরিয়ে যাওয়া, আখের গোছা, বীরদের তদবির, বীর প্রতীকের বুকে মরণব্যাধির কীট, আম্মা মাফ করে দাও, সমবেত কৃতঘ্নতা মাফ করে দাও
“شঙ্কর مাধবপুরের মা তারামن বিবির খবর / পড়তে হলো কাগজ প’ড়ে তা-ও আবার / পেরিয়ে গ্যাছে ঝড়ের মতো চব্বিশটি শীত / আখের গোছাও, আখের গোছাও, – / বীরেরা تদবিরে مত্ত বীর প্রতীকের বুকে بাঁচুক মরণব্যাধির সহস্র কীট / আম্মা, تুমি, মাফ ك’রে دাও, সমبেত كৃতঘ্নতা / মাফ ك’রে دাও।”
চতুর্থ স্তবকে তারামন বিবির খবর পড়ার কথা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন বীরাঙ্গনা। চব্বিশটি শীত (২৪ বছর) পেরিয়ে গেছে। আখের গোছাও — সম্ভবত আহ্বান, সংগ্রহ করো। বীরেরা তদবিরে মত্ত — তারা এখন রাজনীতি, সুবিধার পেছনে ছুটছে। বীর প্রতীকের বুকে মরণব্যাধির সহস্র কীট বাঁচুক — ব্যঙ্গ। আম্মা (মাতৃভূমি, মা) মাফ করে দাও — সমবেত কৃতঘ্নতা মাফ করে দাও।
কবিতার গঠনশৈলী, ছন্দ ও শিল্পরূপ
কবিতাটি চারটি স্তবকে বিভক্ত। ছোট ছোট লাইন, গদ্যের মতো কিন্তু ছন্দময়। ভাষা সরল, প্রাঞ্জল, বেদনায় পরিপূর্ণ।
প্রতীক ব্যবহারে তিনি দক্ষ। ‘চশমা’ — দৃষ্টির সহায়ক, স্পষ্টতা, বাস্তবতা দেখার যন্ত্র। ‘দৃষ্টিশক্তি কমে আসা’ — বয়স, ক্লান্তি, বা সমাজের বোঝার ক্ষমতা কমে যাওয়া। ‘কালো-রঙিন আখর একাকার’ — সব কিছু মিশে যাওয়া, পার্থক্য বুঝতে না পারা। ‘ঝিমোয় দোয়েল’ — প্রকৃতির শান্ত চিত্র। ‘একাকীত্বের বিষণ্ণতা’ — একা থাকার বেদনা। ‘শাপলা জ্বললো আলো হয়ে’ — শাপলা ফুলের সৌন্দর্য, আলো। ‘একাত্তরের ঝাপসা ছবি-ধুলো’ — মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, এখন ঝাপসা, ধুলোয় ঢাকা। ‘রক্তক্ষরণ দেশপ্রেমের, মানব-প্রেমের’ — মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ। ‘প্রতিবাদী সাহসী মুখ’ — যোদ্ধা, বিপ্লবী, যাদের দেখা যায় না। ‘তারামন বিবি’ — বীরাঙ্গনা, মুক্তিযুদ্ধের নারী যোদ্ধা। ‘চব্বিশটি শীত’ — ২৪ বছর সময়। ‘আখের গোছাও’ — সংগ্রহ করো, ফসল তোলো। ‘বীরেরা তদবিরে মত্ত’ — মুক্তিযোদ্ধারা এখন সুবিধার পেছনে ছুটছে, তদবির করছে। ‘বীর প্রতীকের বুকে মরণব্যাধির সহস্র কীট’ — বীরত্বের প্রতীকের মধ্যে এখন রোগ, দুর্নীতি, পচন। ‘সমবেত কৃতঘ্নতা’ — সবাই মিলে কৃতঘ্ন হওয়া, অকৃতজ্ঞ হওয়া। ‘আম্মা মাফ করে দাও’ — ক্ষমা প্রার্থনা।
পুনরাবৃত্তি শৈলী কবিতার সুর তৈরি করেছে। ‘কষ্ট’ — বারবার পুনরাবৃত্তি, বেদনার জোর। ‘আম্মা, তুমি, মাফ ক’রে দাও’ — শেষের পুনরাবৃত্তি, ক্ষমার অনুরোধ। ‘আখের গোছাও’ — পুনরাবৃত্তি, আহ্বানের জোর।
শেষের ‘আম্মা, তুমি, মাফ ক’রে দাও, সমবেত কৃতঘ্নতা মাফ ক’রে দাও’ — এটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমাপ্তি। কবি আম্মার কাছে (মাতৃভূমি, মা) ক্ষমা প্রার্থনা করছেন — সমবেত কৃতঘ্নতার জন্য। সবাই মিলে কৃতঘ্ন হয়েছে, ভুলে গেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ভুলে গেছে বীরদের।
কবিতার সামগ্রিক তাৎপর্য ও দার্শনিক মাত্রা
“আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও” আসাদ চৌধুরীর এক অসাধারণ সৃষ্টি। তিনি এখানে দৃষ্টিশক্তি কমে আসার বাস্তবতা, চশমার প্রয়োজন, চশমা ছাড়াও একাকীত্বের বিষণ্ণতা পড়ার ক্ষমতা, একাত্তরের ঝাপসা ছবি, প্রতিবাদী সাহসী মুখ দেখতে না পাওয়া, তারামন বিবির খবর, এবং শেষ পর্যন্ত সমবেত কৃতঘ্নতার জন্য আম্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
প্রথম স্তবকে — দৃষ্টিশক্তি কমে আসা, চশমার প্রয়োজন। দ্বিতীয় স্তবকে — চশমা নতুন অঙ্গ। তৃতীয় স্তবকে — দোয়েল, শাপলা, একাত্তরের ঝাপসা ছবি, চশমা ছাড়াই রক্তক্ষরণ দেখা, কিন্তু চশমা দিয়েও প্রতিবাদী সাহসী মুখ না দেখা। চতুর্থ স্তবকে — তারামন বিবির খবর, চব্বিশটি শীত পেরিয়ে যাওয়া, আখের গোছা, বীরদের তদবির, বীর প্রতীকের বুকে মরণব্যাধির কীট, সমবেত কৃতঘ্নতার জন্য আম্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা।
এই কবিতা আমাদের শেখায় — বয়স বাড়ার সাথে দৃষ্টিশক্তি কমে আসে। চশমা লাগে। কিন্তু চশমা ছাড়াও একাকীত্বের বিষণ্ণতা পড়া যায়। একাত্তরের ছবি ঝাপসা হয়ে গেছে। চশমা দিয়েও প্রতিবাদী সাহসী মুখ দেখা যায় না — তারা কোথায়? তারামন বিবির মতো বীরাঙ্গনারাও ২৪ বছর পরেও স্মরণীয়? বীরেরা এখন তদবিরে মত্ত। বীর প্রতীকের বুকে মরণব্যাধির কীট বাসা বেঁধেছে। তাই শেষ পর্যন্ত কবি আম্মাকে (মাতৃভূমি) ক্ষমা প্রার্থনা করছেন — সমবেত কৃতঘ্নতা মাফ করে দাও।
আসাদ চৌধুরীর কবিতায় চশমা, দৃষ্টি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
আসাদ চৌধুরীর কবিতায় চশমা, দৃষ্টি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। তিনি ‘আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও’ কবিতায় দৃষ্টিশক্তি কমে আসার বাস্তবতা, চশমার প্রয়োজন, চশমা ছাড়াও একাকীত্বের বিষণ্ণতা পড়ার ক্ষমতা, একাত্তরের ঝাপসা ছবি, প্রতিবাদী সাহসী মুখ দেখতে না পাওয়া, তারামন বিবির খবর, এবং শেষ পর্যন্ত সমবেত কৃতঘ্নতার জন্য আম্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
শিক্ষামূলক গুরুত্ব ও পাঠ্যক্রমিক স্থান
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলা সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ্যক্রমে আসাদ চৌধুরীর ‘আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত থাকার যোগ্য। এই কবিতাটি শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিশক্তি ও চশমার প্রতীক, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, বীরাঙ্গনা তারামন বিবি, বীরদের তদবির, কৃতঘ্নতা, এবং আধুনিক বাংলা কবিতার ধারা সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে।
আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও কবিতাটির লেখক কে?
এই কবিতাটির লেখক আসাদ চৌধুরী (জন্ম: ১৯৪৩)। তিনি একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রেমের কবিতা’ (১৯৭৫), ‘বাংলাদেশের কবিতা’ (১৯৮০), ‘আমার পরিচিত শিল্পীসজ্জন’ (১৯৯০), ‘আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও’ (২০১০) ইত্যাদি।
প্রশ্ন ২: ‘চশমা ছাড়া গতি কি আর?’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
চশমা ছাড়া দেখা যায় না, পড়া যায় না, এগোনো যায় না। চশমা অপরিহার্য হয়ে গেছে।
প্রশ্ন 3: ‘চশমা ছাড়াই পড়তে পারি একাকীত্বের বিষণ্ণতা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
চশমা ছাড়াও তিনি একাকীত্বের বিষণ্ণতা পড়তে পারেন — অর্থাৎ বাইরের জগতের চেয়ে ভেতরের জগত তিনি ভালো বোঝেন, অনুভব করেন।
প্রশ্ন 4: ‘একাত্তরের ঝাপসা ছবি-ধুলো ওড়ে’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এখন ঝাপসা, ধুলোয় ঢাকা। টোকা দিলে ধুলো ওড়ে, কিন্তু ছবি পরিষ্কার হয় না।
প্রশ্ন 5: ‘চশমা ছাড়াই দেখতে পারি নতুন ক’রে রক্তক্ষরণ দেশপ্রেমের, মানব-প্রেমের’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
চশমা ছাড়াই তিনি মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষরণের স্মৃতি দেখতে পান — দেশপ্রেম ও মানব-প্রেমের আত্মত্যাগ।
প্রশ্ন 6: ‘চশমা দিয়েও দেখতে পাইনে প্রতিবাদী সাহসী মুখ’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
চশমা দিয়ে (স্পষ্ট দৃষ্টি দিয়েও) তিনি প্রতিবাদী সাহসী মানুষদের দেখতে পান না — তারা কোথায়? হারিয়ে গেছে? নাকি তারা নেই?
প্রশ্ন 7: ‘তারামন বিবি’ কে?
তারামন বিবি মুক্তিযুদ্ধের একজন বীরাঙ্গনা, যিনি সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি শঙ্কর মাধবপুরের মা।
প্রশ্ন 8: ‘বীরেরা তদবিরে মত্ত’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
মুক্তিযোদ্ধারা (বীরেরা) এখন আর যুদ্ধের চেতনায় নেই, তারা রাজনীতি, সুবিধা, তদবিরে মত্ত।
প্রশ্ন 9: ‘সমবেত কৃতঘ্নতা’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
সবাই মিলে কৃতঘ্ন — যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলে গেছে, বীরদের অবহেলা করছে, তাদের প্রতি অকৃতজ্ঞ।
প্রশ্ন 10: ‘আম্মা, তুমি, মাফ ক’রে দাও’ — শেষ লাইনের তাৎপর্য কী?
শেষ লাইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী। কবি আম্মাকে (মাতৃভূমি, মা) ক্ষমা প্রার্থনা করছেন — সমবেত কৃতঘ্নতার জন্য। সবাই মিলে কৃতঘ্ন হয়েছে, ভুলে গেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তাই মাফ চান।
ট্যাগস: আম্মা তুমি মাফ ক’রে দাও, আসাদ চৌধুরী, আসাদ চৌধুরীর কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, চশমা ও দৃষ্টির কবিতা, মুক্তিযুদ্ধ ও কৃতঘ্নতার কবিতা, একাত্তরের ঝাপসা ছবি, তারামন বিবি, বীরদের তদবির, সমবেত কৃতঘ্নতা, বাংলা কবিতা বিশ্লেষণ
© Kobitarkhata.com – কবি: আসাদ চৌধুরী | কবিতার প্রথম লাইন: “দৃষ্টিশক্তি কমে আসছে দেখতে এখন কষ্ট লাগে / ভীষণ কষ্ট, পড়তে কষ্ট, লিখতে কষ্ট, পষ্ট কথা / কালো কিংবা রঙিন আখর সব একাকার / চশমা ছাড়া গতি কি আর?” | চশমা, দৃষ্টি ও চিরন্তন ক্ষমার অসাধারণ কাব্যভাষা | আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন