আমাদের সমাজ- শতাব্দী রায়।

তুলিকাদি আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ছিল।
ছোটো বেলার আদর্শ বলতে পারো।
পাড়ায় প্রতিটি মেয়ে ওকে নকল করত-
আমাদেরও মনে হতো-
বড় হলে, ওই ভাবে সাজবো, ওইভাবে গান গাইব-
সব কিছুই ওর মত করতে হবে।

মনে আছে, হলুদ গোলাপ লাগাত মাথায়।
তখন জানতামই না, গোলাপ ফুল হলুদ হয়।
পায়ে পরত কোলাপুরী,
লম্বা চেহারায়, লম্বা বিনুনী ঝুলতো।
মায়ের শাড়ি পড়ে, মাথায় গামছা দিয়ে বিনুনী বেঁধে, তুলিকাদি হতাম।
সময় পেলেই, ওর বাড়িতে যেতাম।

বিকেলে, খেলা অপ্রয়োজনীয় হয়ে গিয়েছিল,
ওর মোহে।
গান শোনাত, আইসক্রিম খাওয়াতো।
বাড়িটা আমার চোখে, স্বপ্নের মত ছিল।

একটু দুষ্টুমী করলেই; বাবা বলত-‘
‘লেখা-পড়ায় এত অমনোযোগী, তুলিকাদি হবে?
জানো, উনি কত পড়াশোনা করেছেন,
কত ভদ্র, নম্র, কত গুণের মেয়ে ॥’

একদিন হঠাৎ দেখলাম, পাড়ায় ভিড় পুলিশ এসেছে।
মা বলল, ‘বাইরে বেরিও না। কাউকে কিছু বল না।
আর ও বাড়িতে যাবে না।’
অনেক পরে জানলাম, উনি অসুস্থ- বিছানায় শোয়া।
অসুখের নাম বলা হলো না।
অসুস্থতার সঙ্গে, পুলিশের সম্পর্ক, অজানাই রইল।

পরের দিন খবরের কাগজে দেখলাম-
আমার সুন্দর তুলিকাদির, অসুন্দর একটা ছবি।
নিচে লেখা-
‘দক্ষিণ কলিকাতার তুলিকা সিনহা, ধর্ষিতা হয়েছেন,
চার অপরিচিত যুবকের দ্বারা।
পুলিশ তদন্ত কর……………

প্রায় একমাস পর, স্কুল থেকে ফেরার সময়,
তুলিকাদিকে দেখলাম।
একদম অন্য মানুষ।
আমার উচ্ছ্বাস থাকলেও, মা বারণ করল কথা বলতে।

বাড়ি ফিরে, ভীষণ কাঁদলাম।
মা, কান্না থামাতে ব্যস্ত হল।-
একবারও কথা না বলার কারণ বলল না।
সারা সন্ধে কেঁদে চললাম, পড়তে না বসে।
তবু বাবা, একবারও এসে বলল না,
‘লেখাপড়ায় অমনোযোগী, তুলিকাদি হবে?
জান, উনি কত পড়াশোনা করেছেন, কত ভদ্র, নম্র,
কত গুণের মেয়ে?’-

আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। শতাব্দী রায়।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x