কবিতার খাতা
অনঙ্গ বউ – নির্মলেন্দু গুণ।
আমার কিছু স্বপ্ন ছিল, আমার কিছু প্রাপ্য ছিল,
একখানা ঘর সবার মতো আপন করে পাবার,
একখানা ঘর বিবাহিত, স্বপ্ন ছিল রোজ সকালে
একমুঠো ভাত লঙ্কা মেখে খাবার।
সামনে বাগান, উঠোন চাইনি,
চেয়েছিলাম
একজোড়া হাঁস, একজোড়া চোখ অপেক্ষমাণ
এই তো আমি চেয়েছিলাম।
স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতার, আর কিছু নয়,
তোমায় শুধু অনঙ্গ বউ ডাকার।
চেয়েছিলাম একখানি মুখ আলিঙ্গনে রাখার।
অনঙ্গ বউ, অনঙ্গ বউ, এক জোড়া হাঁস,
এক জোড়া চোখ, কোথায়? তুমি কোথায়?
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। নির্মলেন্দু গুণের কবিতা।
কবিতার কথা –
প্রেম ও দ্রোহের কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘অনঙ্গ বউ’ কবিতাটি মধ্যবিত্ত বা প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের অতি সাধারণ কিছু আকাঙ্ক্ষা, এক টুকরো শান্তির নীড় খোঁজার চিরন্তন স্বপ্ন এবং পরিশেষে সেই স্বপ্নভঙ্গের এক তীব্র বিষণ্ণ ও হাহাকারময় আখ্যান। কবি এখানে খুব জটিল কোনো চাওয়া-পাওয়ার কথা বলেননি; বরং মানুষের বেঁচে থাকার আদিম ও মৌলিক চাহিদার সাথে ভালোবাসার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এক অদ্ভুত আবেগের ক্যানভাস তৈরি করেছেন।
কবিতার প্রথমাংশেই কবি মানুষের জীবনের খুব সাধারণ কিছু স্বপ্নের খতিয়ান তুলে ধরেছেন—‘আমার কিছু স্বপ্ন ছিল, আমার কিছু প্রাপ্য ছিল, / একখানা ঘর সবার মতো আপন করে পাবার’। এই ঘর কেবল ইট-পাথরের দেয়াল নয়, এটি হলো এক টুকরো নিশ্চিত আশ্রয়, একখানা ‘বিবাহিত ঘর’। আর সেই ঘরের ভেতর বিলাসী কোনো আহারের আয়োজন নয়, কবির স্বপ্ন ছিল খুব সাদাসিধে ও গ্রামীণ আবহে ‘রোজ সকালে / একমুঠো ভাত লঙ্কা মেখে খাবার’। এই যৎসামান্য খাবারের আকাঙ্ক্ষা আসলে জীবনের অতি সাধারণ ও অকৃত্রিম সত্যকে প্রকাশ করে, যেখানে কোনো জাঁকজমক নেই, কিন্তু এক পরম তৃপ্তি লুকিয়ে আছে।
দ্বিতীয় স্তবকে কবির স্বপ্নের পরিধি আরও সংকুচিত ও গাঢ় হয়ে উঠেছে। তিনি কোনো বড় বাগান বা বিশাল উঠোন চাননি; তাঁর চাওয়া ছিল কেবল একটি সহজ-সরল জীবন—যেখানে থাকবে ‘একজোড়া হাঁস’ আর ঘরে ফেরার পর পথ চেয়ে থাকা ‘একজোড়া চোখ অপেক্ষমাণ’। এই অপেক্ষমাণ চোখ আসলে ভালোবাসার মানুষের সেই নিবিড় টান, যা সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দেয়। কবির কাছে ‘স্বাধীনতার’ অর্থ কোনো রাজনৈতিক বড় বুলি ছিল না; তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল খুব নিভৃতে নিজের প্রিয়তমাকে ‘অনঙ্গ বউ’ বলে ডাকার অধিকারটুকু। তিনি কেবল চেয়েছিলেন একখানি চেনা মুখ নিজের আলিঙ্গনে জড়িয়ে রাখতে।
কবিতার শেষাংশে এসে এই শান্ত ও সুন্দর স্বপ্নটি হঠাৎ এক নিদারুণ শূন্যতায় আছড়ে পড়ে। এক তীব্র হাহাকার আর আর্তনাদ নিয়ে কবি প্রশ্ন করেন—‘অনঙ্গ বউ, অনঙ্গ বউ, এক জোড়া হাঁস, / এক জোড়া চোখ, কোথায়? তুমি কোথায়?’ এই ‘কোথায়’ শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক চরম বাস্তবতার আঘাত। যে সাধারণ ঘর, যে ভালোবাসার মানুষ আর যে সরল জীবনের স্বপ্ন কবি দেখেছিলেন—তার কোনোটিই তিনি পাননি। চারপাশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিষ্ঠুরতা কিংবা নিয়তির পরিহাসে তাঁর সেই স্বপ্নগুলো আজ ধুলোয় মিশে গেছে। প্রিয়তমা ‘অনঙ্গ বউ’ আজ কেবলই এক অলীক স্মৃতি বা অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার নাম, যাকে কবি এই শূন্যতার মাঝে দাঁড়িয়ে ব্যাকুল হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
সৃষ্টির সার্থকতা লৌকিক হাততালিতে নয়, বরং স্রষ্টার নিজের মানসিক মুক্তি এবং অস্তিত্বের তাগিদে—যা এই কবিতায় নির্মলেন্দু গুণের চেনা সহজ, সাবলীল ও সংবেদনশীল গদ্যছন্দে, মানুষের অতি সাধারণ স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন ছিঁড়ে যাওয়ার এক গভীর হাহাকারকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও কালজয়ী প্রেমের কবিতা হিসেবে অমর করে রেখেছে।






