কবিতার খাতা
- 30 mins
বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে – বিভাস রায়চৌধুরী।
সামান্য একটু মিথ্যে মেশালেই বলা যায়, বাবার জন্য আমি
বাড়ি ছেড়েছিলাম একদিন।
বাবার জন্যই পথে পথে আশ্রয়হীন ঘুরেছি।
কতদিন খেতে পাইনি।
সামান্য একটু সত্যি মেশালেই বলা যায়
শ্মশানে আমি ছিলাম দায়বদ্ধ।
তবে বড়োছেলে হিসেবে নয়, অনেকটা ম্যানেজারের মতন।
আমি মুখাগ্নি করিনি।
ধড়া-টড়া পরিনি।
মাথা ন্যাড়া করে শ্রাদ্ধেও অংশ নিইনি।
কেউ একজন বলল, সাচ্চা কমিউনিস্ট।
অনেকেই বলল, তোমার বাবা মারা গেছেন, তোমাকে দেখে
বোঝাই যায় না।
এর পরের ঘটনায় কিন্তু মিথ্যেও মেশাতে হল ন,
সত্যিও মেশাতে হল না
স্বপ্নে বাবা হানা দিতে লাগল প্রতিদিন।
সবাই বাবাকে ভুলে গেছে, আমি ভুলতে পারি না।
আর রাগ টাগ নেই আমার। শুধু স্বপ্নে বাবাকে
খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি
অসহায় মানুষের মত লাগে।
এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, যেন আমাকে
অনেক কিছু বলার আছে তার।
ক্রমশ অসহ্য হল। আমি সংকেতটা বুঝতে পারছিলাম। আমি ভেঙেও
পড়েছিলাম কিছুটা।
সহ্য করতে না পেরে মেয়েকে নদীর ধারে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে
বললাম, আমাকে বাবা বলবি না তুই, বন্ধু বলবি, বুঝেছিস?
মেয়ে হাসল, কেন?
বুঝুক, না বুঝুক, মেয়েকে চাপা স্বরে যেন গোপন কথাটি বললাম—
বাবারা শাসক।
শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না কোনোদিন।
বন্ধুদের ভুল একজীবনে ক্ষমা করা যায় বারবার…
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। বিভাস রায়চৌধুরী।
বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে – বিভাস রায়চৌধুরী | বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে কবিতা | বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা | বাংলা কবিতা
বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে: বিভাস রায়চৌধুরীর পিতা-সন্তান সম্পর্কের অসাধারণ আধুনিক ব্যাখ্যা
বিভাস রায়চৌধুরীর “বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে” কবিতাটি বাংলা কবিতার একটি অনন্য সৃষ্টি, যা পিতা-সন্তান সম্পর্কের জটিলতা, সামাজিক রীতিনীতি, ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং আধুনিক মানুষের দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে এক অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছে। “সামান্য একটু মিথ্যে মেশালেই বলা যায়, বাবার জন্য আমি বাড়ি ছেড়েছিলাম একদিন” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি সত্যি-মিথ্যের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে পিতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, অপরাধবোধ ও সম্পর্কের গভীর সত্যকে উন্মোচিত করে। বিভাস রায়চৌধুরী বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তার কবিতায় আধুনিক জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, মানসিক দ্বন্দ্ব ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে। “বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা পাঠকের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে।
বিভাস রায়চৌধুরী: আধুনিক বাংলা কবিতার শক্তিমান কণ্ঠ
বিভাস রায়চৌধুরী বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তার কবিতায় আধুনিক জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, মানসিক দ্বন্দ্ব ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল মানসিক অবস্থা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তোলেন। “বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা পিতা-সন্তান সম্পর্কের এক অসাধারণ আধুনিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা পাঠককে ভাবায়, আন্দোলিত করে এবং নিজের ভেতরে তাকাতে বাধ্য করে। তিনি বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।
বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে কবিতার বিশ্লেষণ
কবিতার মূল সুর ও বিষয়বস্তু
“বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে” কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো পিতা-সন্তান সম্পর্কের জটিলতা, সামাজিক রীতিনীতির চাপ, ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং অপরাধবোধের দ্বন্দ্ব। কবি শুরুতে বলেছেন — সামান্য একটু মিথ্যে মেশালেই বলা যায়, বাবার জন্য আমি বাড়ি ছেড়েছিলাম একদিন, বাবার জন্যই পথে পথে আশ্রয়হীন ঘুরেছি, কতদিন খেতে পাইনি। আবার সামান্য একটু সত্যি মেশালেই বলা যায়, শ্মশানে আমি ছিলাম দায়বদ্ধ, তবে বড়োছেলে হিসেবে নয়, অনেকটা ম্যানেজারের মতন। তিনি মুখাগ্নি করেননি, ধড়া-টড়া পরেননি, মাথা ন্যাড়া করে শ্রাদ্ধেও অংশ নেননি। কেউ একজন বলল — সাচ্চা কমিউনিস্ট। অনেকে বলল — তোমার বাবা মারা গেছেন, তোমাকে দেখে বোঝাই যায় না। এরপর স্বপ্নে বাবা হানা দিতে লাগল প্রতিদিন। সবাই বাবাকে ভুলে গেছে, তিনি ভুলতে পারেন না। রাগ নেই তার, শুধু স্বপ্নে বাবাকে খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি অসহায় মানুষের মত লাগে। বাবা এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, যেন অনেক কিছু বলার আছে। ক্রমশ অসহ্য হয়ে ওঠে। তিনি সংকেত বুঝতে পারেন, ভেঙেও পড়েন কিছুটা। সহ্য করতে না পেরে মেয়েকে নদীর ধারে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে বলেন — আমাকে বাবা বলবি না তুই, বন্ধু বলবি। মেয়ে হাসে — কেন? তিনি চাপা স্বরে বলেন — বাবারা শাসক। শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না কোনোদিন। বন্ধুদের ভুল একজীবনে ক্ষমা করা যায় বারবার।
কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক বিশ্লেষণ
“বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে” কবিতাটির ভাষা সহজ-সরল অথচ গভীর তাৎপর্যময়। বিভাস রায়চৌধুরী সত্যি-মিথ্যের দ্বন্দ্বের মাধ্যমে পিতা-সন্তান সম্পর্কের জটিলতা ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প ও প্রতীকগুলো: ‘সামান্য একটু মিথ্যে মেশালেই বলা যায়’ — আত্মজীবনীর সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব; ‘বাড়ি ছেড়েছিলাম একদিন’ — সম্পর্কের বিচ্ছেদের প্রতীক; ‘পথে পথে আশ্রয়হীন’ — অনিশ্চয়তার প্রতীক; ‘শ্মশানে দায়বদ্ধ’ — মৃত্যুর পরে দায়িত্ব পালনের প্রতীক; ‘ম্যানেজারের মতন’ — আবেগহীন, যান্ত্রিক দায়িত্বপালনের প্রতীক; ‘মুখাগ্নি করিনি, ধড়া-টড়া পরিনি, মাথা ন্যাড়া করিনি’ — সামাজিক রীতিনীতি অমান্যের প্রতীক; ‘সাচ্চা কমিউনিস্ট’ — ধর্মনিরপেক্ষ, রীতিবিরোধী পরিচয়ের প্রতীক; ‘স্বপ্নে বাবা হানা দেওয়া’ — অপরাধবোধের প্রতীক; ‘খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি’ — সময়ের প্রভাব, বার্ধক্যের প্রতীক; ‘অসহায় মানুষের মত লাগে’ — ক্ষমতাশালী পিতার অসহায় রূপ; ‘সংকেত বুঝতে পারা’ — আত্মউপলব্ধির প্রতীক; ‘মেয়েকে নদীর ধারে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া’ — সন্তানের সাথে সময় কাটানো, সম্পর্ক গড়ার প্রয়াস; ‘বাবা বলবি না তুই, বন্ধু বলবি’ — সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা দেওয়ার প্রয়াস; ‘বাবারা শাসক’ — পিতার ঐতিহ্যগত ভূমিকার প্রতীক; ‘শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না’ — পিতার প্রতি সমাজের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক; ‘বন্ধুদের ভুল ক্ষমা করা যায় বারবার’ — বন্ধুত্বের সহজ সম্পর্কের প্রতীক।
কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ও চিত্রকল্প
সত্যি-মিথ্যের দ্বন্দ্বের তাৎপর্য
কবিতার শিরোনাম ও মূল কাঠামো ‘সত্যি-মিথ্যে’র দ্বন্দ্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। কবি বারবার বলেছেন — “সামান্য একটু মিথ্যে মেশালেই বলা যায়” এবং “সামান্য একটু সত্যি মেশালেই বলা যায়”। এই দ্বন্দ্বের মাধ্যমে কবি দেখাতে চেয়েছেন যে জীবনের কোনো ঘটনাই সম্পূর্ণ সত্য বা সম্পূর্ণ মিথ্যে নয়। প্রতিটি ঘটনার একাধিক দিক থাকে, একাধিক ব্যাখ্যা থাকে। পিতার প্রতি সন্তানের সম্পর্কও তেমনি — একদিকে তিনি পিতার জন্য বাড়ি ছেড়েছেন, আবার অন্যদিকে পিতার মৃত্যুর সময় তিনি সামাজিক রীতিনীতি পালন করেননি। এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই কবি সম্পর্কের জটিলতা ফুটিয়ে তুলেছেন।
শ্মশানের দৃশ্যের তাৎপর্য
“শ্মশানে আমি ছিলাম দায়বদ্ধ। তবে বড়োছেলে হিসেবে নয়, অনেকটা ম্যানেজারের মতন। আমি মুখাগ্নি করিনি। ধড়া-টড়া পরিনি। মাথা ন্যাড়া করে শ্রাদ্ধেও অংশ নিইনি।” এই পঙ্ক্তিগুলোতে কবি পিতার মৃত্যুর সময় তার উপস্থিতি ও আচরণ বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন, কিন্তু বড় ছেলের মতো নন, বরং ম্যানেজারের মতো — অর্থাৎ দায়িত্বপালন করেছেন, কিন্তু আবেগহীনভাবে। তিনি মুখাগ্নি, ধড়া-টড়া, মাথা ন্যাড়া করা — এসব সামাজিক রীতিনীতি পালন করেননি। এটি তার ব্যক্তিত্বের একটি পরিচয় — তিনি রীতিনীতির বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে পিতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। কিন্তু সমাজ তা মেনে নেয়নি — “সাচ্চা কমিউনিস্ট”, “তোমার বাবা মারা গেছেন, তোমাকে দেখে বোঝাই যায় না” — এই মন্তব্যগুলো সামাজিক চাপের প্রতীক।
স্বপ্নে বাবার আবির্ভাবের তাৎপর্য
“এর পরের ঘটনায় কিন্তু মিথ্যেও মেশাতে হল না, সত্যিও মেশাতে হল না — স্বপ্নে বাবা হানা দিতে লাগল প্রতিদিন। সবাই বাবাকে ভুলে গেছে, আমি ভুলতে পারি না। আর রাগ টাগ নেই আমার। শুধু স্বপ্নে বাবাকে খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি অসহায় মানুষের মত লাগে। এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, যেন আমাকে অনেক কিছু বলার আছে তার।” এই অংশে কবি অপরাধবোধের কথা বলেছেন। বাইরে থেকে তিনি শক্ত, রীতিনীতির বাইরে, কিন্তু ভিতরে তিনি ভেঙে পড়েছেন। স্বপ্নে বাবার বারবার আসা তার অপরাধবোধেরই প্রকাশ। বাবা তাকে কিছু বলেন না, শুধু তাকিয়ে থাকেন — এই তাকানোই সব কথা বলে। খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি — বাবার বার্ধক্যের চিহ্ন, যা কবি আগে সম্ভবত খেয়াল করেননি। অসহায় মানুষের মত লাগে — ক্ষমতাশালী পিতার অসহায় রূপ, যা কবিকে কষ্ট দেয়।
স্বপ্নের প্রতীকী তাৎপর্য
স্বপ্ন এখানে অপরাধবোধের প্রতীক। বাবা মারা গেছেন, কিন্তু কবির মনে তিনি বেঁচে আছেন। স্বপ্নে তার বারবার আসা কবির অমীমাংসিত অনুভূতির প্রকাশ। কবি বুঝতে পারেন — তিনি বাবাকে কিছু বলেননি, বাবার কিছু কথা শোনেননি, বাবার প্রতি তার কিছু দায়িত্ব অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। এই অসম্পূর্ণতা তাকে তাড়া করে।
খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ির তাৎপর্য
খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি — এটি বাবার বার্ধক্যের চিহ্ন। কবি সম্ভবত বাবার জীবনের শেষ সময়ে তার পাশে ছিলেন না, বা তার বার্ধক্য খেয়াল করেননি। এখন স্বপ্নে সেই পাকা দাড়ি তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় — বাবা বৃদ্ধ হয়েছিলেন, তিনি অসহায় ছিলেন, কিন্তু কবি তা দেখতে পাননি।
মেয়ের সাথে কথোপকথনের তাৎপর্য
“মেয়েকে নদীর ধারে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে বললাম, আমাকে বাবা বলবি না তুই, বন্ধু বলবি, বুঝেছিস? মেয়ে হাসল, কেন? বুঝুক, না বুঝুক, মেয়েকে চাপা স্বরে যেন গোপন কথাটি বললাম— বাবারা শাসক। শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না কোনোদিন। বন্ধুদের ভুল একজীবনে ক্ষমা করা যায় বারবার…” এই অংশটি কবিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কবি তার মেয়েকে বলেন — আমাকে বাবা বলো না, বন্ধু বলো। কেন? কারণ বাবারা শাসক। শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না। কিন্তু বন্ধুদের ভুল বারবার ক্ষমা করা যায়। এটি পিতা-সন্তান সম্পর্কের এক গভীর বিশ্লেষণ। কবি নিজে পিতার শাসনে হয়তো কষ্ট পেয়েছেন, বা পিতা হিসেবে নিজের শাসন নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। তিনি চান না তার মেয়ে তাকে শাসক হিসেবে দেখুক। তিনি চান বন্ধু হিসেবে সম্পর্ক গড়তে — যেখানে ভুল হলে ক্ষমা পাওয়া যায়, যেখানে শাসন নয়, ভালোবাসা প্রধান।
নদীর ধারের তাৎপর্য
নদীর ধার — একটি নিরিবিলি, শান্ত জায়গা। কবি তার মেয়েকে এখানে নিয়ে এসেছেন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার জন্য। নদী জীবনের প্রবাহের প্রতীক। জীবনের প্রবাহে সম্পর্কের এই নতুন সংজ্ঞা তিনি দিতে চান — বাবা নয়, বন্ধু।
‘বাবারা শাসক’ উক্তির তাৎপর্য
“বাবারা শাসক” — এটি একটি শক্তিশালী উচ্চারণ। ঐতিহ্যগতভাবে বাবা পরিবারের প্রধান, শাসক, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। এই শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না। সমাজ বাবাকে একটি আদর্শ চরিত্রে আবদ্ধ করতে চায় — তিনি নিখুঁত হবেন, তিনি ভুল করবেন না। কিন্তু বাস্তবে বাবাও মানুষ, তারও ভুল হয়। কিন্তু সেই ভুল ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ কম। অন্যদিকে বন্ধুর সম্পর্ক সহজ — বন্ধুর ভুল বারবার ক্ষমা করা যায়। কবি তাই চান তার মেয়ের সাথে বন্ধুর সম্পর্ক গড়তে।
কবিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিশ্লেষণ
শুরু ও শেষের দ্বন্দ্ব
কবিতার শুরুতে কবি তার বাবার প্রতি তার আচরণ নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন — তিনি কি সত্যি বলবেন, নাকি মিথ্যে? শেষে তিনি তার মেয়ের সাথে সম্পর্কের একটি নতুন সংজ্ঞা দিতে চান — বাবা নয়, বন্ধু। এটি একটি চক্র তৈরি করেছে — এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন পথ দেখায়। কবি নিজের বাবার সাথে যে সম্পর্কের জটিলতা ভোগ করেছেন, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি তার মেয়ের সাথে ভিন্ন সম্পর্ক গড়তে চান।
‘আমাকে বাবা বলবি না তুই, বন্ধু বলবি’ — এর তাৎপর্য
এই পঙ্ক্তিটি কবিতার কেন্দ্রীয় বার্তা। কবি চান না তার মেয়ে তাকে শাসক হিসেবে দেখুক। তিনি চান বন্ধু হিসেবে সম্পর্ক গড়তে — যেখানে ভুল হলে ক্ষমা পাওয়া যায়, যেখানে শাসন নয়, ভালোবাসা প্রধান। এটি পিতা-সন্তান সম্পর্কের একটি আধুনিক ব্যাখ্যা। ঐতিহ্যগত পিতৃতন্ত্রের বাইরে গিয়ে একটি সমান, সহজ সম্পর্ক গড়ার প্রয়াস।
বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে কবিতার লেখক কে?
বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে কবিতার লেখক বিভাস রায়চৌধুরী। তিনি বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তার কবিতায় আধুনিক জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, মানসিক দ্বন্দ্ব ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে। “বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা পিতা-সন্তান সম্পর্কের এক অসাধারণ আধুনিক ব্যাখ্যা দিয়েছে।
প্রশ্ন ২: বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো পিতা-সন্তান সম্পর্কের জটিলতা, সামাজিক রীতিনীতির চাপ, ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং অপরাধবোধের দ্বন্দ্ব। কবি তার বাবার প্রতি তার আচরণ নিয়ে সত্যি-মিথ্যের দ্বন্দ্বে ভোগেন। তিনি পিতার মৃত্যুর সময় সামাজিক রীতিনীতি পালন করেননি, কিন্তু পরে স্বপ্নে বাবার আবির্ভাবে অপরাধবোধে ভোগেন। শেষে তিনি তার মেয়েকে বলেন — তাকে বাবা না বলে বন্ধু বলতে, কারণ বাবারা শাসক, আর শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না।
প্রশ্ন ৩: ‘বাবারা শাসক। শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না কোনোদিন’ — বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘বাবারা শাসক। শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না কোনোদিন’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি পিতার ঐতিহ্যগত ভূমিকা নিয়ে তাঁর দর্শন প্রকাশ করেছেন। ঐতিহ্যগতভাবে বাবা পরিবারের প্রধান, শাসক, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। এই শাসকের ভুল কেউ ক্ষমা করে না। সমাজ বাবাকে একটি আদর্শ চরিত্রে আবদ্ধ করতে চায় — তিনি নিখুঁত হবেন, তিনি ভুল করবেন না। কিন্তু বাস্তবে বাবাও মানুষ, তারও ভুল হয়। কিন্তু সেই ভুল ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ কম। তাই কবি চান তার মেয়ের সাথে বন্ধুর সম্পর্ক গড়তে, যেখানে ভুল বারবার ক্ষমা করা যায়।
প্রশ্ন ৪: ‘আমাকে বাবা বলবি না তুই, বন্ধু বলবি’ — কেন বলেছেন?
কবি তার মেয়েকে ‘বাবা’ না বলে ‘বন্ধু’ বলতে বলেছেন কারণ তিনি চান না তার মেয়ে তাকে শাসক হিসেবে দেখুক। তিনি চান বন্ধু হিসেবে সম্পর্ক গড়তে — যেখানে ভুল হলে ক্ষমা পাওয়া যায়, যেখানে শাসন নয়, ভালোবাসা প্রধান। নিজের বাবার সাথে সম্পর্কের জটিলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি তার মেয়ের সাথে ভিন্ন সম্পর্ক গড়তে চান। তিনি চান একটি সমান, সহজ সম্পর্ক, যেখানে শাসকের কাঠিন্য নেই, বন্ধুর সরলতা আছে।
প্রশ্ন ৫: স্বপ্নে বাবার আবির্ভাবের তাৎপর্য কী?
স্বপ্নে বাবার আবির্ভাব কবির অপরাধবোধের প্রতীক। বাবা মারা গেছেন, কিন্তু কবির মনে তিনি বেঁচে আছেন। স্বপ্নে তার বারবার আসা কবির অমীমাংসিত অনুভূতির প্রকাশ। কবি বুঝতে পারেন — তিনি বাবাকে কিছু বলেননি, বাবার কিছু কথা শোনেননি, বাবার প্রতি তার কিছু দায়িত্ব অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। স্বপ্নে বাবা খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি নিয়ে অসহায় মানুষের মতো তাকিয়ে থাকেন — এই দৃশ্য কবিকে বারবার কষ্ট দেয় এবং তার অপরাধবোধকে জাগ্রত করে।
প্রশ্ন ৬: বিভাস রায়চৌধুরী সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
বিভাস রায়চৌধুরী বাংলা কবিতার একজন শক্তিমান কবি। তার কবিতায় আধুনিক জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, মানসিক দ্বন্দ্ব ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় জটিল মানসিক অবস্থা ও সম্পর্কের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তোলেন। “বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে” তার একটি বহুপঠিত কবিতা যা পিতা-সন্তান সম্পর্কের এক অসাধারণ আধুনিক ব্যাখ্যা দিয়েছে। বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা পাঠককে ভাবায়, আন্দোলিত করে এবং নিজের ভেতরে তাকাতে বাধ্য করে।
ট্যাগস: বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে, বিভাস রায়চৌধুরী, বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা, বাবার জন্য সত্যি-মিথ্যে কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, পিতা-সন্তান সম্পর্কের কবিতা, বাবা সম্পর্কে কবিতা, পারিবারিক কবিতা





