কবিতার খাতা
- 28 mins
হেমন্তরাতে – জীবনানন্দ দাশ।
হেমন্তরাতে – জীবনানন্দ দাশ | হেমন্তরাতে কবিতা | জীবনানন্দ দাশের কবিতা | বাংলা কবিতা
হেমন্তরাতে: জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতি ও জীবনদর্শনের অনন্য কাব্যভাষা
জীবনানন্দ দাশের “হেমন্তরাতে” কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সৃষ্টি, যা প্রকৃতি, সময়, ইতিহাসচেতনা ও মানবজীবনের গভীর দার্শনিক ভাবনা ধারণ করেছে। “শীতের ঘুমের থেকে এখন বিদায় নিয়ে বাহিরের অন্ধকার রাতে” — এই পঙ্ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতাটি হেমন্তের রাতের নির্জনতা, প্রকৃতির রহস্য এবং মানব ইতিহাসের চিরন্তন সত্যকে এক অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছে। জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তার কবিতায় প্রকৃতি, নিসর্গ, জীবন-মৃত্যু, সময় ও ইতিহাসচেতনার গভীর প্রকাশ ঘটে। “হেমন্তরাতে” তার একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা যা হেমন্তের রাতের পটভূমিতে মানবজীবনের চিরন্তন সত্যকে অন্বেষণ করেছে।
জীবনানন্দ দাশ: রূপসী বাংলার কবি
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ. করার পর তিনি দীর্ঘদিন অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ প্রভৃতি। তার কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতি, নিসর্গ, জীবন-মৃত্যু, সময় ও ইতিহাসচেতনার গভীর প্রকাশ। তিনি ১৯৫৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
হেমন্তরাতে কবিতার বিশ্লেষণ
কবিতার মূল সুর ও বিষয়বস্তু
“হেমন্তরাতে” কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো হেমন্তের রাতের নির্জনতায় মানবজীবনের চিরন্তন সত্য অনুসন্ধান। কবি শীতের ঘুম থেকে বিদায় নিয়ে বাহিরের অন্ধকার রাতে হেমন্তলক্ষ্মীর শেষ আবছায়া তারাদের সমাবেশ দেখেন। একটি পাখির ঘুম পাখিনীর বুকে ডুবে আছে। তাদের উপরে এই অবিরল কালো পৃথিবীর আলো আর ছায়া খেলে — মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়। কবি বলেন — এর বেশি কোনো নিশ্চয়তা নির্জনতা জীবনের পথে নেই, আমাদের মানবীয় ইতিহাসচেতনায়ও নেই। আঘ্রানরাতে তার মনে পড়ে — কত সব ধূসর বাড়ির আমলকী-পল্লবের ফাঁক দিয়ে নক্ষত্রের ভিড় দেখা যেত, ধূসরিম মহিলার নিকটে সন্নত দাঁড়ায়ে রয়েছে কত মানবের বাষ্পাকুল প্রতীকের মতো। সময়ের সমুদ্রের রক্ত ঘ্রাণ পাওয়া গেল — ভীতিশব্দ, রীতিশব্দ, মুক্তিশব্দ এসে মানবকে ডেকে নিয়ে চলে গেল। কবি প্রশ্ন করেন — সেটা কি প্রেম? সুধা? নাকি মানুষের ক্লান্ত অন্তহীন ইতিহাস-আকৃতির প্রবীণতা? আজ এই শতাব্দীতে সকলেরই জীবনের হৈমন্ত সৈকতে বালির উপরে ভেসে আমাদের চিন্তা-কাজ-সংকল্পের তরঙ্গকঙ্কাল দ্বীপসমুদ্রের মতো অস্পষ্ট বিলাপ করে। কেবলই কল্লোল আলো — জ্ঞান, প্রেম, পূর্ণতর মানবহৃদয় সনাতন মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে — তবু — উনিশ’শো অনন্তের জয় হতে পারে। তিনি বলেন — আমাদের শতাব্দীর দীর্ঘতর চেতনার কাছে আমরা সজ্ঞান হয়ে বেঁচে থেকে বড়ো সময়ের সাগরের কূলে ফিরে আমাদের পৃথিবীকে যদি প্রিয়তর মনে করি প্রিয়তম মৃত্যু অবধি; সকল আলোর কাজ বিষণ্ণ জেনেও তবুও কাজ করে গানে গেয়ে লোকসাধারণ করে দিতে পারি যদি আলোকের মানে।
কবিতার শৈলীগত ও কাব্যিক বিশ্লেষণ
“হেমন্তরাতে” কবিতাটির ভাষা চিত্রময়, গভীর দার্শনিক তাৎপর্যময়। জীবনানন্দ দাশ তার অনন্য শৈলীতে প্রকৃতি ও মানবজীবনের জটিল সম্পর্ককে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প ও প্রতীকগুলো: ‘শীতের ঘুম’ — নিষ্ক্রিয়তা, অবসানের প্রতীক; ‘হেমন্তরাত’ — জীবনের শেষ পর্যায়, পরিণতির প্রতীক; ‘হেমন্তলক্ষ্মী’ — হেমন্তের দেবী, প্রকৃতির রূপ; ‘তারাদের সমাবেশ’ — অসীমের প্রতীক; ‘পাখির ঘুম’ — শান্তি, নিশ্চিন্ততার প্রতীক; ‘কালো পৃথিবী’ — রহস্যময় পৃথিবী; ‘আলো আর ছায়া’ — জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্ব; ‘মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়’ — জীবনের তিনটি মৌলিক সত্য; ‘ধূসর বাড়ি’ — পুরনো স্মৃতির প্রতীক; ‘আমলকী-পল্লব’ — প্রকৃতির সৌন্দর্য; ‘নক্ষত্রের ভিড়’ — অসীম সময়ের প্রতীক; ‘ধূসরিম মহিলা’ — স্মৃতি, অতীতের প্রতীক; ‘বাষ্পাকুল প্রতীক’ — অস্পষ্ট স্মৃতির প্রতীক; ‘সময়ের সমুদ্রের রক্ত ঘ্রাণ’ — ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের প্রতীক; ‘ভীতিশব্দ, রীতিশব্দ, মুক্তিশব্দ’ — মানবসভ্যতার বিবর্তনের প্রতীক; ‘প্রেমিকের মতো সসম্ভ্রমে’ — সময়ের মহিমা; ‘হৈমন্ত সৈকত’ — হেমন্তের তীর, জীবনের শেষ প্রান্ত; ‘তরঙ্গকঙ্কাল’ — ব্যর্থ প্রচেষ্টার প্রতীক; ‘দ্বীপসমুদ্রের মতো অস্পষ্ট বিলাপ’ — অস্ফুট আর্তনাদ; ‘কল্লোল আলো’ — উচ্ছ্বাস, আশার প্রতীক; ‘উনিশ’শো অনন্তের জয়’ — বিংশ শতাব্দীর চিরন্তনতা; ‘বড়ো সময়ের সাগর’ — ইতিহাসের মহাসমুদ্র; ‘আলোকের মানে’ — জীবনের সত্য, জ্ঞানের আলো।
কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক ও চিত্রকল্প
হেমন্ত ও রাতের প্রতীকী তাৎপর্য
হেমন্ত হলো বাংলার ষড়ঋতুর একটি — শরৎ ও শীতের মধ্যবর্তী ঋতু। এটি ফসল তোলার ঋতু, প্রাচুর্যের ঋতু, কিন্তু একইসঙ্গে প্রকৃতির ক্রমশ নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠার সূচনা। কবি হেমন্তের রাতকে বেছে নিয়েছেন — একটি বিশেষ সময়, যখন দিন শেষ, রাত গভীর, প্রকৃতি নিস্তব্ধ। এই হেমন্তরাত জীবনের শেষ পর্যায়ের প্রতীক, যখন মানুষ ফিরে তাকায়, হিসাব নিকাশ করে। কবি এই সময়ে বসে ইতিহাস, সময় ও মানবজীবনের চিরন্তন সত্য অনুসন্ধান করেছেন।
পাখি ও নীড়ের প্রতীকী তাৎপর্য
“একটি পাখির ঘুম কাছে পাখিনীর বুকে ডুবে আছে” — এই চিত্রকল্পটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাখি ও পাখিনী — প্রেমের প্রতীক। তাদের ঘুম — শান্তি, নিরাপত্তার প্রতীক। নীড় — বাসস্থান, পরিবারের প্রতীক। কবি দেখেন — তাদের উপরে এই অবিরল কালো পৃথিবীর আলো আর ছায়া খেলে — মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়। অর্থাৎ পৃথিবীর সমস্ত জীবনই এই তিনটি সত্যের মধ্যে আবর্তিত — মৃত্যু (শেষ), প্রেম (সম্পর্ক), নীড় (বাড়ি, পরিবার)।
ধূসর বাড়ি ও ধূসরিম মহিলার তাৎপর্য
“কত সব ধূসর বাড়ির আমলকী-পল্লবের ফাঁক দিয়ে নক্ষত্রের ভিড় দেখা যেত; ধূসরিম মহিলার নিকটে সন্নত দাঁড়ায়ে রয়েছে কত মানবের বাষ্পাকুল প্রতীকের মতো” — এই পঙ্ক্তিগুলোতে কবি অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন। ধূসর বাড়ি — পুরনো দিনের স্মৃতি। আমলকী-পল্লব — প্রকৃতির সৌন্দর্য। নক্ষত্রের ভিড় — অসীম সময়। ধূসরিম মহিলা — সম্ভবত কবির দেখা কোনো নারী, যিনি এখন স্মৃতি। মানবের বাষ্পাকুল প্রতীক — মানুষের অস্পষ্ট, অবাস্তবায়িত স্বপ্নের প্রতীক। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি সময়ের প্রবাহে হারিয়ে যাওয়া মানুষ, স্মৃতি ও স্বপ্নের কথা বলেছেন।
আমলকী-পল্লবের তাৎপর্য
আমলকী একটি ফলদায়ক বৃক্ষ। এর পল্লব অর্থাৎ পাতা। আমলকী-পল্লবের ফাঁক দিয়ে নক্ষত্র দেখা — এটি একটি অসাধারণ চিত্রকল্প। আমলকী পাতা ঘন সবুজ, তার ফাঁক দিয়ে তারারা মিটমিট করে। এই চিত্রের মাধ্যমে কবি প্রকৃতির মধ্য দিয়ে অসীমকে দেখার কথা বলেছেন।
ধূসরিম মহিলার তাৎপর্য
ধূসরিম মহিলা — ধূসর বর্ণের মহিলা। তিনি কে? কবির দেখা কোনো নারী? নাকি স্মৃতির প্রতীক? নাকি মৃত্যুর প্রতীক? মানবের বাষ্পাকুল প্রতীক তার নিকটে সন্নত দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ মানুষের সমস্ত স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা এই ধূসরিম মহিলার কাছে মাথা নত করে আছে। তিনি সম্ভবত সময়ের প্রতীক, যার কাছে সব কিছু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়।
সময় ও ইতিহাসের চিত্রকল্প
“সময়ের সমুদ্রের রক্ত ঘ্রাণ পাওয়া গেল; —ভীতিশব্দ রীতিশব্দ মুক্তিশব্দ এসে আরও ঢের পটভূমিকার দিকে-দিগন্তরে ক্রমে মানবকে ডেকে নিয়ে চলে গেল প্রেমিকের মতো সসম্ভ্রমে।” এই পঙ্ক্তিগুলোতে কবি ইতিহাসের গতিপথ বর্ণনা করেছেন। সময়ের সমুদ্রের রক্ত ঘ্রাণ — ইতিহাস রক্তক্ষয়ী। ভীতিশব্দ — ভয়ের শব্দ, রীতিশব্দ — প্রথার শব্দ, মুক্তিশব্দ — মুক্তির শব্দ। এই শব্দগুলো মানবকে ডেকে নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু কবি প্রশ্ন করেন — সেটা কি প্রেম? সুধা? নাকি মানুষের ক্লান্ত অন্তহীন ইতিহাস-আকৃতির প্রবীণতা ক্রমায়াত করে সে বিলীন? অর্থাৎ ইতিহাস কি মানুষকে চিরন্তন কিছু দেয়? নাকি সব কিছু শেষ পর্যন্ত বিলীন হয়ে যায়?
কবিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশের বিশ্লেষণ
‘মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়’ এর তাৎপর্য
“মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়” — এই তিনটি শব্দে কবি মানবজীবনের তিনটি মৌলিক সত্যকে চিহ্নিত করেছেন। মৃত্যু — জীবনের অনিবার্য শেষ। প্রেম — সম্পর্ক, আবেগ, ভালোবাসা। নীড় — বাসস্থান, পরিবার, নিরাপত্তা। পৃথিবীর সমস্ত জীবনের চক্র এই তিনটি সত্যের মধ্যে আবর্তিত। এই তিনটি সত্যের উপরেই পৃথিবীর আলো-ছায়া খেলে।
‘উনিশ’শো অনন্তের জয়’ এর তাৎপর্য
“সনাতন মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে—তবু—উনিশ’শো অনন্তের জয় হয়ে যেতে পারে, নারি” — এই পঙ্ক্তিতে কবি বিংশ শতাব্দীর কথা বলেছেন। বিংশ শতাব্দী ছিল যুদ্ধ, বিপ্লব, বিজ্ঞান, প্রযুক্তির শতাব্দী। মানুষ অনেক কিছু পেয়েছে, অনেক কিছু হারিয়েছে। সনাতন অনেক কিছু মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তবুও এই শতাব্দী অনন্তের জয় হতে পারে — যদি মানুষ সত্যিকারের চেতনা অর্জন করে।
শেষাংশের তাৎপর্য
“সকল আলোর কাজ বিষণ্ণ জেনেও তবুও কাজ করে—গানে গেয়ে লোকসাধারণ করে দিতে পারি যদি আলোকের মানে।” এই শেষ পঙ্ক্তিতে কবি মানবজীবনের চিরন্তন দর্শন দিয়েছেন। সকল আলোর কাজ বিষণ্ণ — অর্থাৎ জ্ঞান, প্রেম, পূর্ণতর মানবহৃদয় — সবই শেষ পর্যন্ত বিষণ্ণ, কারণ সব কিছুই মৃত্যুর মুখোমুখি। কিন্তু তবুও কাজ করে যেতে হবে। গানে গেয়ে লোকসাধারণ করে দিতে হবে আলোকের মানে — অর্থাৎ জীবনের সত্য, জ্ঞানের আলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এটি কবির এক চিরন্তন বার্তা — জীবনের অর্থহীনতা জেনেও জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার আহ্বান।
হেমন্তরাতে কবিতা সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: হেমন্তরাতে কবিতার লেখক কে?
হেমন্তরাতে কবিতার লেখক জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। তিনি বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ প্রভৃতি।
প্রশ্ন ২: হেমন্তরাতে কবিতার মূল বিষয়বস্তু কী?
হেমন্তরাতে কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো হেমন্তের রাতের নির্জনতায় মানবজীবনের চিরন্তন সত্য অনুসন্ধান। কবি হেমন্তরাতে প্রকৃতির নানা উপাদানের মাধ্যমে সময়, ইতিহাস, প্রেম, মৃত্যু ও মানবজীবনের গভীর দার্শনিক সত্য অন্বেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন — পৃথিবীর সমস্ত জীবন মৃত্যু, প্রেম ও নীড়ের মধ্যে আবর্তিত। ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী পথ পেরিয়ে মানুষ এগিয়ে চলে। শেষ পর্যন্ত তিনি বলেছেন — সকল আলোর কাজ বিষণ্ণ জেনেও তবুও কাজ করে যেতে হবে, গানে গেয়ে লোকসাধারণ করে দিতে হবে আলোকের মানে।
প্রশ্ন ৩: ‘মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়’ — এই তিনটি শব্দে কবি মানবজীবনের তিনটি মৌলিক সত্যকে চিহ্নিত করেছেন। মৃত্যু — জীবনের অনিবার্য শেষ। প্রেম — সম্পর্ক, আবেগ, ভালোবাসা। নীড় — বাসস্থান, পরিবার, নিরাপত্তা। পৃথিবীর সমস্ত জীবনের চক্র এই তিনটি সত্যের মধ্যে আবর্তিত। এই তিনটি সত্যের উপরেই পৃথিবীর আলো-ছায়া খেলে। কবি বলতে চেয়েছেন — জীবন এই তিনটি মৌলিক সত্যের সমন্বয়ে গঠিত।
প্রশ্ন ৪: ‘ধূসরিম মহিলা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘ধূসরিম মহিলা’ — ধূসর বর্ণের মহিলা। তিনি কে? কবির দেখা কোনো নারী? নাকি স্মৃতির প্রতীক? নাকি মৃত্যুর প্রতীক? মানবের বাষ্পাকুল প্রতীক তার নিকটে সন্নত দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ মানুষের সমস্ত স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা এই ধূসরিম মহিলার কাছে মাথা নত করে আছে। তিনি সম্ভবত সময়ের প্রতীক, যার কাছে সব কিছু শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। অথবা তিনি মৃত্যুর প্রতীক, যার কাছে সব কিছু বিলীন হয়ে যায়।
প্রশ্ন ৫: ‘সকল আলোর কাজ বিষণ্ণ জেনেও তবুও কাজ করে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
‘সকল আলোর কাজ বিষণ্ণ জেনেও তবুও কাজ করে’ — এই পঙ্ক্তিতে কবি মানবজীবনের চিরন্তন দর্শন দিয়েছেন। সকল আলোর কাজ বিষণ্ণ — অর্থাৎ জ্ঞান, প্রেম, পূর্ণতর মানবহৃদয় — সবই শেষ পর্যন্ত বিষণ্ণ, কারণ সব কিছুই মৃত্যুর মুখোমুখি। কিন্তু তবুও কাজ করে যেতে হবে। এটি জীবনের প্রতি এক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি — অর্থহীনতা জেনেও অর্থ সৃষ্টি করা, ব্যর্থতা জেনেও চেষ্টা করা, মৃত্যু জেনেও জীবনকে ভালোবাসা।
প্রশ্ন ৬: জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বাংলা কবিতার এক কিংবদন্তি কবি, যিনি ‘রূপসী বাংলার কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ (১৯২৭) তাকে খ্যাতি এনে দেয়। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘রূপসী বাংলা’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ প্রভৃতি। তার কবিতায় প্রকৃতি, নিসর্গ, জীবন-মৃত্যু, সময় ও ইতিহাসচেতনার গভীর প্রকাশ ঘটে। তিনি ১৯৫৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ট্যাগস: হেমন্তরাতে, জীবনানন্দ দাশ, জীবনানন্দ দাশের কবিতা, হেমন্তরাতে কবিতা, বাংলা কবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতা, রূপসী বাংলার কবি, বাংলা সাহিত্য, হেমন্তের কবিতা, জীবন-মৃত্যুর কবিতা, ইতিহাসচেতনার কবিতা
শীতের ঘুমের থেকে এখন বিদায় নিয়ে বাহিরের অন্ধকার রাতে
হেমন্তলক্ষ্মীর সব শেষ অনিকেত আবছায়া তারাদের
সমাবেশ থেকে চোখ নামায়ে একটি পাখির ঘুম কাছে
পাখিনীর বুকে ডুবে আছে,—
চেয়ে দেখি; তাদের উপরে এই অবিরল কালো পৃথিবীর
আলো আর ছায়া খেলে—মৃত্যু আর প্রেম আর নীড়।
এ ছাড়া অধিক কোনো নিশ্চয়তা নির্জনতা জীবনের পথে
আমাদের মানবীয় ইতিহাসচেতনায়ও নেই, —(তবু আছে।)
এমনই আঘ্রানরাতে মনে পড়ে—কত সব ধূসর বাড়ির
আমলকী-পল্লবের ফাঁক দিয়ে নক্ষত্রের ভিড়
পৃথিবীর তীরে-তীরে ধূসরিম মহিলার নিকটে সন্নত
দাঁড়ায়ে রয়েছে কত মানবের বাষ্পাকুল প্রতীকের মতো—
দেখা যেত; এক-আধ মুহূর্ত শুধু; —সে-অভিনিবেশ ভেঙে ফেলে
সময়ের সমুদ্রের রক্ত ঘ্রাণ পাওয়া গেল; —ভীতিশব্দ রীতিশব্দ মুক্তিশব্দ এসে
আরও ঢের পটভূমিকার দিকে-দিগন্তরে ক্রমে
মানবকে ডেকে নিয়ে চলে গেল প্রেমিকের মতো সসম্ভ্রমে।
তবুও সে প্রেম নয়, সুধা নয়—মানুষের ক্লান্ত অন্তহীন
ইতিহাস-আকৃতির প্রবীণতা ক্রমায়াত করে সে বিলীন?
আজ এই শতাব্দীতে সকলেরই জীবনের হৈমন্ত সৈকতে
বালির উপরে ভেসে আমাদের চিন্তা কাজ সংকল্পের তরঙ্গকঙ্কাল
দ্বীপসমুদ্রের মতো অস্পষ্ট বিলাপ করে তোমাকে আমাকে
অন্তহীন দ্বীপহীনতার দিকে অন্ধকারে ডাকে।
কেবলই কল্লোল আলো, —জ্ঞান প্রেম পূর্ণতর মানবহৃদয়
সনাতন মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে—তবু—উনিশ’শো অনন্তের জয়
হয়ে যেতে পারে, নারি, আমাদের শতাব্দীর দীর্ঘতর চেতনার কাছে
ছড়ায় ভূতে আমরা সজ্ঞান হয়ে বেঁচে থেকে বড়ো সময়ের
সাগরের কূলে ফিরে আমাদের পৃথিবীকে যদি
প্রিয়তর মনে করি প্রিয়তম মৃত্যু অবধি;—
সকল আলোর কাজ বিষণ্ণ জেনেও তবুও কাজ করে—গানে
গেয়ে লোকসাধারণ করে দিতে পারি যদি আলোকের মানে।
আরো কবিতা পড়তে ক্লিক করুন। জীবনানন্দ দাশ।





